শুক্রবার, ১৯ জুলাই ২০২৪, ৪ শ্রাবণ ১৪৩১

সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে সচেতনতা

ইন্টারনেট সহজলভ্যতার এই যুগে একে অন্যের সঙ্গে ভার্চুয়ালি যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম সোশ্যাল মিডিয়া তথা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। ফেসবুক, মেসেঞ্জার, হোয়াটস অ্যাপ, টুইটার, ইনস্টাগ্রাম ইত্যাদি এখন নিত্যদিনের ব্যবহৃত যোগাযোগ মাধ্যম। প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে ওঠে আগে ডেটা অন করে নোটিফিকেশন চেক করতে হয়; দেখতে হয় কে কী পোস্ট করল, কে কী মেসেজ পাঠাল। এমনও মানুষ আছেন যারা কিনা ঘণ্টায় ঘণ্টায় সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজেদের তুলে ধরতে বিভিন্ন লেখা ও ছবি শেয়ার করে থাকেন...
মোহাম্মদ অংকন
  ০৯ জুলাই ২০২২, ০০:০০
সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে সচেতনতা

সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের জীবনাচারণকে যতটা সহজলভ্য ও আরামপ্রদ করে দিয়েছে, তার চেয়ে অনেকে ঝুঁকির মুখোমুখিও করছে। বিপদের মুখোমুখি না-হলে আপনারা সহজে বিষয়টা উপলব্ধি করতে পারবেন না। নচেৎ দিনে যত সংখ্যক সাইবার ক্রাইম হচ্ছে, সাইবার বুলিংয়ে স্বীকার হচ্ছে যা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন দিয়েও অনেকাংশে রোধ করা যাচ্ছে না।

ইন্টারনেট সহজলভ্যতার এই যুগে একে অন্যের সঙ্গে ভার্চুয়ালি যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম সোশ্যাল মিডিয়া তথা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। ফেসবুক, মেসেঞ্জার, হোয়াটস অ্যাপ, টুইটার, ইনস্টাগ্রাম ইত্যাদি এখন নিত্যদিনের ব্যবহৃত যোগাযোগ মাধ্যম। প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে আগে ডেটা অন করে নোটিফিকেশন চেক করতে হয়; দেখতে হয় কে কী পোস্ট করল, কে কী মেসেজ পাঠাল। এমনও মানুষ আছেন যারা কিনা ঘণ্টায় ঘণ্টায় সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজেদের তুলে ধরতে বিভিন্ন লেখা ও ছবি শেয়ার করে থাকেন। পরিচিতদের ইনবক্সে হাই-হ্যালো দিয়ে দিনের কার্যক্রম শুরু করেন অনেকেই। সোশ্যাল মিডিয়ায় সবাই সুন্দর পরিবেশ বজায় রাখতে চেষ্টা করলেও এর কিছু ব্যত্যয় ঘটেই প্রতিনিয়ত যা সোশ্যাল মিডিয়াতেই ভেসে ওঠে।

সোশ্যাল মিডিয়ায় এক ইউজারের সঙ্গে অন্য ইউজারের সখ্যতা অনেকাংশে পূর্বপরিচয়ের ভিত্তিতে গড়ে ওঠে না। হোমপেজ স্ক্রল করতে করতে সমমনাভাবাপন্ন, সমকর্মসম্পন্ন কিংবা আকর্ষণীয় ইউজার প্রোফাইল দেখে ফ্রেন্ডশিপ গড়ে ওঠে। ফ্রেন্ড তো অনেকেই হয়; কিন্তু সবার সঙ্গে কি আর সখ্যতা গড়ে ওঠে? সবার সঙ্গে কি আর সময়ে-অসময়ে চ্যাটিং হয়? তা হয়তো হয় না। তবে কারও না-কারও সঙ্গে তো হয়ই। নচেৎ সোশ্যাল মিডিয়া মুহূর্তেই বোরিং হয়ে উঠত। বিভিন্ন স্ট্যাটাসকে কেন্দ্র করে একে অন্যের সঙ্গে সখ্যতার জায়গাটা গড়ে ওঠে প্রথমে। এতে লাগে না কোনো ফেস টু ফেস পরিচয়। মিটআপেরও দরকার নেই। কে কোথায় থেকে ব্রাউজ করছে, তা-ও জানার প্রয়োজন পড়ে না।

মনে করেন, আপনি একটি বিষয় নিয়ে স্ট্যাটাস দিলেন। এর পক্ষে-বিপক্ষে কিছু মানুষের কমেন্ট করার সুযোগ আছে। বিপক্ষের কমেন্টগুলো হয়তো আপনার ভালো লাগবে না এবং যারা বিরুদ্ধাচরণ করবে, তাদেরও ভালো লাগবে না- এটাই স্বাভাবিক। বিপরীতটাও স্বাভাবিক। আপনার পক্ষের সমর্থনকারীরা অবশ্যই আপনার ভালো লাগার পাত্র হয়ে উঠবে ধীরে ধীরে। আর এভাবেই ক্রমাগত ভালো লাগা থেকে স্ট্যাটাসে কমেন্টকারী ইউজার-ফ্রেন্ডের সঙ্গে শুরু হয় চ্যাটিং। আর চ্যাটিং মানেই কতশত ব্যক্তিগত আলাপ-আলোচনা। পরিচয়পর্ব থেকে শুরু করে কবে যেন ঘরের ভেতরের গল্পও উঠে আসে চ্যাটিংয়ে, তার আর খেয়াল করা হয়ে ওঠে না। সোশ্যাল মিডিয়ায় মানুষ অতিসহজে আপন হয়ে ওঠে। ঘরের কেউ খেয়েছে কিনা তার খোঁজ নেওয়া না-হলেও সোশ্যাল মিডিয়ার মানুষের খোঁজ নেওয়া হয়।

সোশ্যাল মিডিয়ায় আমরা নিজেদের ব্যক্তিগত তথ্য শেয়ারের আগে এটা একবারও চিন্তা করতে পারি না যে যার কাছে আমার ব্যক্তিগত বিষয়গুলো আলোচনা করছি, সে কি আমার পূর্বপরিচিত? তাকে যে সব বলছি, তা কি গোপন থাকবে? না কি যে কোনো মুহূর্তে ফাঁস হয়ে মানহানি হবে? আপাতদৃষ্টিতে বিশ্বাসযোগ্যতার অভিপ্রায়ে ব্যক্তিগত তথ্যাদি শেয়ার নিরাপদ মনে হবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এই সামাজিক পস্ন্যাটফর্মভিত্তিক সখ্যতা বা সম্পর্ক কতদিন অটুট থাকে? ঠিক যেভাবে আপনার সঙ্গে একজন অপরিচিত ব্যক্তি সোশ্যাল মিডিয়ায় ফ্রেন্ড হয়েছে, সখ্যতা গড়ে তুলেছে, ঠিক সেই একইভাবে যে কোনো মুহূর্তে সখ্যতা নষ্ট হতে পারে। কেননা, সোশ্যাল মিডিয়ায় কন্ট্রাভার্সির শেষ নেই। আছে ভিন্নমতের মানুষের পদচারণা। আপনি যাকে মতের মিলের কারণে বন্ধু হিসেবে অ্যাকসেপ্ট করেছেন, আপনারই ভিন্ন কোনো ইসু্যতে সে আপনাকে অপছন্দের তালিকায় নিতে পারে। হতে পারে মনোমালিন্য। হতে পারে মুহূর্তে আনফ্রেন্ড। বস্নকও দিতে পারে। এ পর্যন্তও স্বাভাবিকই রয়ে যায়। সম্পর্ক নষ্ট হয়েছে, আনফ্রেন্ড বা বস্নক দিয়েছে, ঝামেলা মুক্ত হয়েছে। কিন্তু 'না'। আপনার সঙ্গে ব্যক্তিগত আলোচনার সব কথোপকথন তার কাছে রয়েই গেছে। ব্যক্তি আক্রোশ থেকে যেটি সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দিয়ে যে কোনো মুহূর্তে আপনার বিরাট ক্ষতি করে বসতে পারে। এবং এটি করতে উক্ত ব্যক্তি একবারও ভাববে না, কেননা আপনার সঙ্গে তার নেই কোনো পূর্বপরিচয়, নেই কোনো আত্মিক সম্পর্ক। এবং এমনটা না ঘটা অবধি আপনি ভাবতেই পারবেন না যে এমনটাও হতে পারে! যাকে বিশ্বাস করে সব বলেছিলাম, সে কিনা বিশ্বাসঘাতকতা করল!

বন্ধু ভেবে যার কাছে আপনার সব ব্যক্তিগত তথ্য শেয়ার করেছেন, আপনি তার কাছে দুর্বল কিনা সেই মুহূর্তে? এই দুর্বলতাকে পুঁজি করে যদি আপনার মানহানি কিংবা অর্থহানি করে থাকে, তবে আপনার সামাজিক পরিচিতির জায়গাটা কোথায় গিয়ে ঠেকবে, ভেবেছেন একবার? আপনি, আমি হয়তো সাধারণ সোশ্যাল মিডিয়া ইউজার; কিন্তু যারা সমাজে পরিচিত- এই ধরেন খেলোয়াড়, গায়ক, নায়ক ইত্যাদি তারাও যদি সমকক্ষ কারও সঙ্গে ব্যক্তিগত তথ্য শেয়ার করে বিপদের মুখোমুখি হয়, তখন আইনের দ্বারস্থ হওয়া ছাড়া কোনো উপায় থাকে না। সমাধান একটা হয় হয়তো; কিন্তু ততক্ষণে সামাজিক ব্যক্তিত্বের অধঃপতন হয়ে যায়, তা পুনরুদ্ধার কষ্টসাধ্য। মুহূর্তে ওয়ালে ওয়ালে ছড়িয়ে পড়ে ব্যক্তিগত ইসু্য।

সামাজিক যোগাযোগ্য মাধ্যম বা সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহার সহজসাধ্য হলেও এটি নিয়ন্ত্রণে একটু জটিলতা আছে বৈকি প্রাইভেসির কথা বিবেচনা করলে। কিন্তু প্রাইভেসি রক্ষার বিষয়টি কজনই বা খেয়াল করে আর। মনের বিষণ্নতা দূর করতে, একাকিত্বতা দূর করতে অনেক গোপন আলোচনাও চ্যাটিংয়ে উঠে আসে। উঠে আসে পারিবারিক, ব্যবসায়িক, চাকরি, আইন-আদালতসংক্রান্ত কিংবা কারও বিরুদ্ধে বিষোদাগারের তথ্যও যা ফাঁস হলে ব্যক্তিত্ব বিনাশের পাশাপাশি নষ্ট হতে পারে স্বাভাবিক জীবন। তাহলে এ ধরনের উপায় থেকে বাঁচার উপায় কী হতে পারে? দেখুন, সোশ্যাল মিডিয়াকে আপনি কীভাবে পরিচালিত করবেন, এটা আপনার ব্যক্তিগত ব্যাপার। তবে যে সব বিষয়ের জন্য আপনার চরম ক্ষতির সম্মুখীন হওয়া লাগতে পারে, সে সব বিষয়ে অবশ্যই সতর্ক হতে হবে। সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে হতে হবে সচেতনও।

সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যক্তিগত তথ্য শেয়ারের সতর্কতা :

সোশ্যাল মিডিয়া আপনি যার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন বা যুক্ত করে নিচ্ছেন, তার প্রোফাইলটা ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করুন যে ইউজারটি অরিজিনাল না কি ফেক। ফেক বা অরিজিনাল যাচাই করতে প্রোফাইল পিকচার, সাম্প্রতিক স্ট্যাটাস এবং অন্যান্য তথ্য যাচাই করুন। এই যেমন- কোথায় বসবাস করছে, জন্ম কত সালে, কোথায় চাকরি বা পড়াশোনা করে ইত্যাদি।

একদম অপরিচিত ব্যক্তিদের এড়িয়ে চলাই উত্তম। যার সঙ্গে কখনো দেখা হয়নি কিংবা অদূর ভবিষ্যতে সম্ভাবনাও নেই, তাদের সঙ্গে ফ্রেন্ডশিপ গড়তে হলেও ভেবেচিন্তে করতে হবে। কাছের মানুষ কিংবা পরিচিত কেউ আপনার ক্ষতি করতে চাইলে একবারের জন্য হলেও ভাববে; কিন্তু দূরের মানুষ কখনই তা বিবেচনায় আনবে না।

সোশ্যাল কমিউনিকেশনে সতর্কতাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। পরিচিত হোক কিংবা অপরিচিত হোক সোশ্যাল মিডিয়ায় সখ্যতা গড়ে ওঠা ব্যক্তির সঙ্গে অতিব্যক্তিগত বিষয়গুলো শেয়ার থেকে বিরত থাকুন। চ্যাটিংয়ে যা লিখছেন, ভয়েসে যা বলছেন, তা সেন্ড করার আগে একটু ভাবুন- এটি তাকে জানানো ঠিক হবে কিনা।

মানুষের সঙ্গে যে কোনো মুহূর্তে যে কোনো বিষয় নিয়ে মতানৈক্য হয়ে সম্পর্ক নষ্ট হতে পারে। তখনই আপনার সম্পর্কে জানা দুর্বল বিষয়গুলো জনসম্মুখে এনে হেনস্তা করতে পারে। তাই অতিআবেগী হয়ে নিজের দুর্বল বিষয়গুলো দূরসম্পর্কের কারও সঙ্গে শেয়ার করবেন না। আপনার মনের কথা যদি পরিবারের কাউকে বলতেই না-পারেন, তবে ডায়েরিতে লিখে রাখুন। আর না-হয় বিকল্প ভাবুন।

শুধু তথ্য শেয়ার নয় ব্যক্তিগত ছবি, ভিডিও, কোনো কিছুর যুক্তিপরামর্শের জন্য কাগজপত্র, নথি, দলিল-দস্তাবেজ, পাসওয়ার্ড কিংবা স্বাক্ষরও অপরিচিত সোশ্যাল মিডিয়ার বন্ধুর সঙ্গে শেয়ার করবেন না। আপনার অনুপস্থিতে কিংবা সরলতার সুযোগ বড় ধরনের ক্ষতি করে বসতে পারে।

সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের জীবনাচারণকে যতটা সহজলভ্য ও আরামপ্রদ করে দিয়েছে, তার চেয়ে অনেকে ঝুঁকির মুখোমুখিও করছে। বিপদের মুখোমুখি না-হলে আপনারা সহজে বিষয়টা উপলব্ধি করতে পারবেন না। নচেৎ দিনে যত সংখ্যক সাইবার ক্রাইম হচ্ছে, সাইবার বুলিংয়ে স্বীকার হচ্ছে যা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন দিয়েও অনেকাংশে রোধ করা যাচ্ছে না। জালের মতো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বিশাল এই নেটওয়ার্ককে মনিটরিং করা চাট্টিখানি কথা নয়, এবং সময় ও প্রযুক্তিগত দক্ষতারও ব্যাপার। আইনের মাধ্যমে প্রতিকার পাব ভেবে সোশ্যাল মিডিয়া পস্ন্যাটফর্মকে ব্যক্তিগত নিয়ন্ত্রণক্ষেত্র বানিয়ে বিপদের মুখোমুখি হওয়ার চেয়ে জেনেবুঝে সতর্ক ও সচেতন হওয়া প্রত্যেকেরই উচিত। সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যক্তিগত তথ্য ব্যক্তি আক্রোশ থেকে প্রচার-প্রসার করে পরিবেশ নষ্ট না-হোক, সে প্রত্যাশা।

লেখক : কম্পিউটার-বিজ্ঞান প্রকৌশলী।

বিমানবন্দর, ঢাকা

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

উপরে