স্রোতের বিপরীতে হাবিব

দেশের লোকসংগীতের ধারাটিও বদলানোর আলোচিত রূপকার হাবিব। ২০০৩ সালে 'কৃষ্ণ' নামের অভিষেক অ্যালবামের মধ্য দিয়ে সাড়া ফেলে দেন। তার রিনিঝিনি কিন্নর কণ্ঠের মসৃণ গায়কি ঢংটি লোকসংগীতে দিয়েছে এমন জাদুকরী আবেশ- যা আবালবৃদ্ধবনিতা সব ধরনের শ্রোতার মন জয় করে নিয়েছে। লোকসংগীতের যে অফুরন্ত ভান্ডার, তাতে তিনি নিত্যনতুন ফিউশনে এটা আরও জনপ্রিয় করতে বড় ভূমিকা রাখতে পারেন।
স্রোতের বিপরীতে হাবিব

দেশের সংগীতাঙ্গনে উজ্জ্বলতম তারকা হাবিব ওয়াহিদ। চলতি শতকে একটি নতুন ধারার সূচনা করেছেন তিনি। পরে এই পথের পথিক হয়েছেন আরও অনেকেই। শুধু অডিও গান, মিউজিক ভিডিও, পেস্ন-ব্যাক কিংবা অন্যের জন্য সুর-সংগীত- যেখানেই তার হাতের ছোয়া পড়েছে সাফল্য পেয়েছেন। শোবিজের তারকা হিসেবে যারা প্রতিষ্ঠিত, তাদের সন্তানদের বেশির ভাগই ততটাই নিষ্প্রভ ও অনালোচিত। ব্যতিক্রম কেবল হাবিব ওয়াহিদ। হাবিব তো বাবাকেই ছাড়িয়ে যাওয়া এমন প্রতিভা- যা এখন খুব কম শিল্পীর সন্তানদের মধ্যে মেলে। সংগীতে তার অনেক ব্যতিক্রমী কাজ থাকায় বিশিষ্ট সংগীতজ্ঞদের কাছেও সমাদৃত তিনি। সম্প্রতি অন্যের সুরে 'অপারেশন সুন্দরবন'-এ 'অভিমানী রোদ্দুরে' শিরোনামের পেস্ন-ব্যাক করেছেন তিনি।

হঠাৎ নিজের সুর ছেড়ে অন্যের সুরে কেন মজলেন? হাবিবের জবাব, 'আসলে নিজের কণ্ঠসুর যেন কিছুটা একঘেয়ে লাগছিল আমার কাছে। এটাই হচ্ছে বাস্তবতা। টানা দুই দশক নিজের সুরে আমার কণ্ঠ শুনে আসছি। আমার কম্পোজার পরিচয়টাকে একপাশে রেখে যদি কণ্ঠশিল্পী হিসেবে ভাবি, তখন কৌতূহল হয়, আচ্ছা ওই গানটা আমার কণ্ঠে কেমন লাগবে! এমনিতেই তো ভালো লাগলে নিজের বাইরেও অন্যের গান গুনগুন করি। তখন ভাবি, ওই সুরটার সঙ্গে যদি আমার কণ্ঠটা পড়তো অসাধারণ একটা গান হতে পারতো। সে চিন্তা থেকেই অন্যের সুরে গাওয়া।'

দেশের লোকসংগীতের ধারাটিও বদলানোর আলোচিত রূপকার হাবিব। ২০০৩ সালে 'কৃষ্ণ' নামের অভিষেক অ্যালবামের মধ্য দিয়ে সাড়া ফেলে দেন। তার রিনিঝিনি কিন্নর কণ্ঠের মসৃণ গায়কি ঢংটি লোকসংগীতে দিয়েছে এমন জাদুকরী আবেশ- যা আবালবৃদ্ধবনিতা সব ধরনের শ্রোতার মন জয় করে নিয়েছে। লোকসংগীতের যে অফুরন্ত ভান্ডার, তাতে তিনি নিত্যনতুন ফিউশনে এটা আরও জনপ্রিয় করতে বড় ভূমিকা রাখতে পারেন। কেন আর পারছেন না- এমন প্রশ্নে হাবিব বলেন, 'আসলে আমাদের দেশটা হতভাগা। আমি যখন ওই গান করি তখন সিডি, ক্যাসেটের যুগ। তখনকার সময় আর এখনকার সময়ে রয়েছে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। এখন সবকিছু ডিজিটাল আইনে চলছে। যারাই এই পস্ন্যাটফর্ম চালান কিছু ডিজিটাল আইনগত বিষয় অনুসরণ করেন। এই গানের অনেক প্রকৃত গীতিকার, সুরকার বা গায়ক-গায়িকারা এখনো জীবিত আছেন। ফলে এ নিয়ে কাজ করতে গেলে তাদের অনুমতি, ছাড়পত্র লাগবে। এটা তো আমার একার পক্ষে সম্ভব নয়। তা ছাড়া এই গানের প্রপার কোনো ডকুমেন্টেশন এমনকি আর্কাইভও নেই। সবই চলছে লোক পরম্পরায় মুখে মুখে। আগে যারা সিডি বা ক্যাসেট করতেন তারাই এর দায়দায়িত্ব নিতেন। এ কারণেই এটা আর সম্ভব হচ্ছে না। এখন যদি এটা আমার ইউটিউব চ্যানেলেও করতে যাই তখনও এ সমস্যায় পড়তে হবে।'

তাই বলে থেমে নেই তিনি। ইতোমধ্যেই এমন মিউজিক অ্যাপ শুরু করেছেন যেখানে ভিডিও থাকবে না। তিনি বলেন, 'ভিডিও ছাড়া অ্যাপ বিশ্বব্যাপীই জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। ভারতেও অডিও গানের বড় মার্কেট আছে যেমন- 'গানা', 'শ্রাবণ'। আমাদের এখানে এটা আন কমন। কিছুদিন আগে আমাদের দেশেও 'ফোরটি ফাইভ' নামে একটি মিউজিক অ্যাপের লঞ্চ হয়েছে। যদিও এটা জনপ্রিয় হতে পারেনি। সীমিত পরিসরে হলেও এই মিউজিক শুরু করেছিল দেশের মোবাইল অপারেটরগুলো। যাদের অ্যাপে ভিডিও থাকে না। এগুলো জিপি মিউজিক, বাংলালিঙ্ক, রবি, এয়ারটেল প্রভৃতি। কিন্তু এর শ্রোতা ও গ্রাহক একই অপারেটরের। সে কারণে সব শ্রোতার কাছে একটি অ্যাপের গান সবাইর কাছে পৌঁছাতে পারে না। আগে আমাদের এখানে মিউজিক অ্যাপের প্রতি জোর দেয়নি। এখন কিছুটা আগ্রহ দেখাতেই 'ফোরটি ফাইভ' লঞ্চ হলো। মিউজিক ভিডিওতে শ্রোতার স্বাধীনতা থাকে না। কিন্তু অডিও থেকে শ্রোতা যে যার মতো করে কল্পনা, ভাবনা, অনুভূতি, অর্থ ইত্যাদি করতে পারে। মিউজিক ভিডিওতে এই সুযোগ নেই। বরং এখানে একটা চাপিয়ে দেওয়া গল্পচিত্র ধরিয়ে দেওয়া হয়। গল্পচিত্রটা যেমন তেমনইভাবে সেটা শ্রোতার মাথায় ঘুরপাক খায়; তখন মাথায় আর গান থাকে না। ভিডিওর গল্পটিই তার মাথায় স্থায়ী হয়ে যাচ্ছে- গান নয়। এ কারণেই গানটি দীর্ঘস্থায়ী হতে পারছে না। তবে মিউজিক অ্যাপটা আমাদের দেশে নতুন হওয়ায় সে রকম স্থায়ী গান হতে সময় লাগবে। এজন্য আমাদের দেশে যারা প্রমিন্যান্ট শিল্পী আছেন তাদের কন্ট্রিবিউশন লাগবে। তারা যদি শ্রোতাদের কাছে বলতে থাকেন 'আমার গান অমুক মিউজিক অ্যাপে শোনা যাচ্ছে, মিউজিক অ্যাপে গান শোনেন'- তাহলে শ্রোতাদের কাছে মিউজিক অ্যাপ জনপ্রিয় হতে পারে। এই বিবেচনাতেই আমি মিউজিক অ্যাপের প্রতি জোর দিয়েছি। মিউজিক ভিডিও মিউজিক ভিডিওর জায়গায় থাকুক। কিন্তু আলাদাভাবে শুধু মিউজিকভিত্তিক অ্যাপও তো থাকতে পারে।

সিনেমার গানও তো এক ধরনের মিউজিক ভিডিও। সে গানও অডিওতে দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে। মিউজিক ভিডিওতে কি সেটা হতে পারে না এমন প্রশ্নে হাবিব বলেন, 'একজন শিল্পী কিন্তু বছরে সলো ও মিক্সড অ্যালবাম এবং সিনেমায় মিলিয়ে অন্তত ১৫/১৬টি গান করতে পারেন। কিন্তু ১৫টি মিউজিক ভিডিও তো সম্ভব নয়। বাজেটেও কুলাবে না। একটা ভালো মিউজিক ভিডিও বানাতে ১৫/১৬ লাখ টাকা লাগে। এই বাজেটে প্রতি মাসে একটা মিউজিক ভিডিও দেওয়া যাবে না। বাজেট যতই থাকুক, মার্কেট থাকুক, মিউজিক ভিডিও বছরে ৬/৭টার বেশি করা ঠিক নয়। নয়তো বোরিং হয়ে যাবে। কিন্তু অডিও গান মাসে একটা ছাড়লেও শ্রোতার কাছে ক্লান্তিকর হবে না। বরং মিউজিক ভিডিও দেখে শ্রোতারা গানটি ছেড়ে একটা পার্টিকুলার গল্পের ভিডিওটা নিয়েই ভাবতে থাকে। কিন্তু শুধু মিউজিক হলে এবং তাতে কল্পনার রং বৈচিত্র্য থাকলে শ্রোতা ওই গানটি নিয়ে নানা কল্পনার রঙে ভাবতে থাকবে। এভাবেই কিন্তু একটি ভালো গান দীর্ঘস্থায়ী হয়। তবে অনেক গবেষণা করে, প্রপার গল্প নিয়ে, সময় নিয়ে মিউজিক ভিডিও করলে তার গান দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। কিন্তু এত সময় নিয়ে মিউজিক ভিডিও হলে গান অনেক কম হবে। সিনেমার কথা আলাদা। সেখানে নায়ক-নায়িকা থাকে, গল্প থাকে, গানটির সঙ্গে গল্পটির যোগ থাকে। এই চিন্তা থেকেই যখন আমি কয়েকটি অডিও গান করি তখনই আমার মনে হলো আরে...... এটা তো আরও আগেই শুরু করা উচিত ছিল। আমি যদি বছরে ১৫টি গান দিতে চাই তাহলে আমাকে এটাই করা উচিত।'

কিন্তু এই প্রজেক্টে আগের অডিওর মতো শ্রোতা হবে? তাতে তো সে গান ফ্লপও হতে পারে- এমন কথায় হাবিব বলেন, 'আগে যখন অডিও গান হতো তখন সেটা সবার কাছে পৌঁছাতে পারত। কিন্তু মিউজিক ভিডিওতে যত সাবস্ক্রাইবার তাদেরই শুধু ভিউ, লাইক, কমেন্টস থাকছে। অ্যাপগুলোও তাই। কাজেই এসব গান ফ্লপ হবে কেন। এটা যদি দেশের সবার কাছে পৌঁছাত তখন বুঝতাম কতজন সেটা নিচ্ছে বা নিচ্ছে না। আমি গান করি ৫/৬ কোটি মানুষের জন্য সেখানে আমার সাবস্ক্রাইবার আছে মাত্র ৬ লাখ তখন সেখানে আপনি কী আশা করতে পারেন?'

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

আরও খবর

Copyright JaiJaiDin ©2022

Design and developed by Orangebd


উপরে