যে কারণে বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করা হয়েছিল

পরিবারের সন্তানদের প্রতি জাতির একটা কর্তব্য রয়েছে। তারা যাতে উপলব্ধি করতে পারেন যে, তাদের ত্যাগ বৃথা যায়নি। আজও বর্তমান প্রজন্ম তা মনে রেখেছে। যারা বাংলাদেশ পরিচালনা করছেন, তাদের প্রতি শ্রদ্ধার ঘাটতি নেই
যে কারণে বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করা হয়েছিল

ডিসেম্বরে মহান বিজয় অর্জনের কারণে আমরা একদিকে যেমন আনন্দ উচ্ছ্বাসে উদ্বেলিত হই; একইসঙ্গে এই মাস আমাদের কাছে বেদনা বিধুরও বটে। ১৬ ডিসেম্বর পাক হানাদার বাহিনীর আত্মসপর্ণের মাধ্যমে আমাদের মহান বিজয় শুরু। ঠিক তার দুদিন আগে এ দেশের রাজাকার, আলবদর, আলশামস হানাদার বাহিনীর প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় আমাদের দেশের জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের বধ্যভূমিতে নিয়ে হত্যা করা হয়। সাধারণত আমরা শুধু রায়েরবাজার বধ্যভূমি বলি। তবে বাস্তবতা হচ্ছে প্রত্যেকটি শহরে যেখানে ওদের অপারেশন ক্যাম্প ছিল; তার পাশেই ছিল বধ্যভূমি। প্রকৃত হিসাবে দেখা যায় ডিসেম্বরের ৭-১৪ তারিখ পর্যন্ত গোটা দেশে কয়েকশত বুদ্ধিজীবী হত্যা করেছেন। এর মধ্যে ছিল শিক্ষক, সাংবাদিক, শিল্পী, সাহিত্যিক, কবি, লেখক, ডাক্তারসহ যেখানে যাকে পেয়েছে হত্যা করেছে। যুদ্ধে নিশ্চিত পরাজয় জেনে শুনে ওরা আমাদের বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করেছে। লক্ষ্য ছিল বাঙালিকে যদি মেধাশূন্য করা যায়, তাহলে জাতি হিসেবে আমরা পঙ্গু হয়ে যাবো, মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে না। একটু বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, আমাদের জাতীয়তাবাদী চেতনার বিকাশে আমাদের বুদ্ধিজীবীরা মহান অবদান রেখেছেন। উদাহরণ স্বরূপ ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে এ দেশে যত বই-পুস্তক ছাপানো হয়েছে, নাটক-নাটিকা প্রদর্শিত হয়েছে, যত সংগীত রচয়িত হয়েছে; এক কথায় বলতে গেলে শিল্প-কর্মে যে অগ্রগতি হয়েছে; তাই আমাদের ভাষা ও সাংস্কৃতিকভিত্তিক জাতিসত্তাকে জনগণের কাছে বোধগম্য করে তুলেছে। সাংবাদিক শ্রদ্ধেয় আব্দুল গফ্‌ফার চৌধুরী লিখিত ভাষা সংগীত- 'আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রম্নয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি'। এখনো যদি সেই সংগীত বাজানো হয়, আমাদের মনে সেই ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি ভেসে ওঠে। আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর ভিত্তি করেই জাতিসত্তা প্রতিষ্ঠিত। আমরা বাঙালি। বাঙালিত্বের যে চেতনায় আমরা উদ্বুদ্ধ তার উৎস ভাষা ও সংস্কৃতি। এই বাঙালিত্ব বোধের শ্রেষ্ঠ সন্তান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত বাংলার জয়গান তিনি গেয়ে গেছেন। বাঙালি কবি রবীন্দ্রনাথের সংগীতই আমাদের জাতীয় সংগীত। বাঙালি কবি নজরুলের বিদ্রোহী কবিতায় বাঙালির চেতনা। ভাষা-সংস্কৃতি, আচার-ঐতিহ্য, চাল-চলন, আচরণে এমনকি খাদ্যোভাসে আমরা যে একটা পৃথক জাতিসত্তা এই উপলব্ধির কারণেই বাঙালিকে পাকিস্তানিতে রূপান্তরিত করা সম্ভব হয়নি। পকিস্তানিরা যখনই আমাদের ওপর আগ্রাসন চালিয়েছে, আমার সচেতনভাবে তার জবাব দিয়েছি। পৃথক জাতিসত্তার ব্যাপারে প্রতিপক্ষই সচেতন করেছে। পাকিস্তানিরা ভালো করেই জানত বাঙালিত্ব ধ্বংস করে তাদের পদানত করা অসম্ভব। তাই প্রথম থেকেই সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের ধর্ম ইসলামকে তারা পতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করেছে। কবি রবীন্দ্রনাথকে হিন্দু কবি, আর কবি নজরুল ইসলামকে মুসলমানের কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেছে। এ দেশে এখনো এমন লোক আছে যে, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের কবিতা জাতীয় সংগীতে স্থান পাওয়ায় বিক্ষুব্ধ। সংখ্যায় কম হলেও তাদের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যায়নি। এর কু-প্রভাব সাহিত্যে মাঝে মাঝে তার প্রকাশ দেখা য়ায়। বঙ্গবন্ধু ৬ দফা ঘোষণার পর সেই ৬ দফাকে জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য করার জন্য মুসাফিরের কলাম হচ্ছে- প্রকৃষ্ট উদাহরণ। কোথায়, কীভাবে পাকিস্তানিরা বাঙালিকে শোষণ করছে, তার প্রতিটি বিষয় এই কলামে উলেস্নখ করা হতো। তখন পূর্ব পাকিস্তানে প্রকাশিত রাজশাহীর মুজিবর রহমান লিখিত আইয়ুব খানের (ফ্রেন্ডস নট মাষ্ট্রার্স) বইতে অর্থনৈতিক বৈষ্যমের যে বিবরণ রয়েছে, তা পড়লে বোঝা যায়, ৬ দফা ঘোষণার পর একদিকে বঙ্গবন্ধু উল্কার মতো ছুটে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া বঙ্গবন্ধু তার বক্তব্য তুলে ধরেন, অপর দিকে শিল্পী, সাহিত্যিকরা তার ওপর অকুণ্ঠ সমর্থন দেন। সে দিনের শিল্পী, সাহিত্যিকরা বাঙালিকে পাকিস্তান কর্তৃক শোষণের যে চিত্র তুলে ধরেছিলেন, তাই আমাদের পৃথক জাতিসত্তাকে স্বাধীন হওয়ার ইন্ধন জোগায়। বাঙালির শ্রেষ্ঠ সন্তান বঙ্গবন্ধুই ভাষাভিত্তিক সাহিত্যিক আন্দোলনকে, রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপান্তরিত করেন। ''৭০-এর নির্বাচনে একচ্ছত্রভাবে বিজয়ী হয়ে স্বাধীনতার স্বপ্নকে সজাগ করে তোলেন। ৬ দফা ভিত্তিক' '৭০-এর নির্বাচনে আমাদের স্বাধীনতার পথ সুগম করেন। সেই দিনের রাজনৈতিক আন্দোলনে যদি শিল্পী- সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীরা ওই ধরনের অবিস্মরণীয় অবদান না রাখতেন, তাহলে বঙ্গবন্ধুর একার পক্ষে '৬৯-এর মহাগণজাগরণ সৃষ্টি করা হয়তো সম্ভব হতো না। ব্যক্তি বাঙালি বঙ্গবন্ধু রাজনৈতিকভাবে বাঙালিকে স্বাধীন করা হয়তো সম্ভব না হতে পারত। আসলে পাকিস্তানিদের মূল আক্রোশ ছিল বাঙালি জাতিসত্তার বিরুদ্ধে। জাতিসত্তার ধারক ও বাহক বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের বিরুদ্ধে ওরা চেয়েছিল বাঙালি জাতিসত্তাকে চিরদিনের জন্য বিস্মৃতির অতলগর্ভে তলিয়ে দিতে। আর বঙ্গবন্ধু সেই জাতিসত্তাকে সিংহের গর্জনে গোটা বিশ্বের মানুষকে জানিয়ে দেন যে, বাঙালি ও পকিস্তানিরা কখনো এক নয়। ড. জেসি দেবের মতো আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মানুষকে কেন তারা নির্মমভাবে হত্যা করল। কে হত্যা করল, ড. ফজলে রাব্বির মতো প্রমিজিং কার্ডিওলজিস্টকে; কেন হত্যা করা হলো ডা. আলীম চৌধুরী মতো একজন চক্ষুবিশারদকে; শিক্ষাবিদ মুনির চৌধুরীকে ওরা ভালো করেই জানতো। বাঙালি বুদ্ধিজীবীরাই হচ্ছে বাংলার প্রাণশক্তি। সেই প্রাণশক্তিকে ধ্বংস করে ওরা বাঙালি জাতিকে ধ্বংস করতে চেয়েছিল। তাই ১৪ ডিসেম্বর পরাজয় সুনিশ্চিত জেনেই, ওরা স্থানীয় বদর বাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে বুদ্ধিজীবীদের বাসায় হামলা চালিয়ে তাদের বধ্যভূমিতে নিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে। অনেককে আবার মিরপুরে বিশেষ টর্চার সেলে নিদারুণভাবে নির্যাতন করা হয়। লেখকদের হাতের আঙুল কেটে, চোখ তুলে, পা কেটে হত্যা করা হয়। মৃতু্যর পরও বেওনেটের আঘাত দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে তারা তাদের জিঘাংসা মেটায়। নাম না জানা অনেক জনপ্রিয় বুদ্ধিজীবী দেশব্যাপী ওদের হাতে প্রাণ দেন। এব্যাপারে বদর বাহিনী স্থানীয় জামায়াত, ছাত্র-শিবিররাই তাদের সাহায্য করে। ১৪ ডিসেম্বর বিজয়ের মাত্র দুদিন আগে বাংলাদেশের বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করে পাকিস্তানরা যে নির্মম, বর্বর, নিষ্ঠুর দৃষ্টান্তস্থাপন করেছিল, বিশ্বে গণহত্যার ইতিহাসেও তা কলঙ্কিত হয়ে থাকবে। আসুন এই দিনকে আমরা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি, সেসব সূর্যসন্তানদের- যাদের আত্মত্যাগের মাধ্যমে আমরা স্বাধীন দেশ পেয়েছি। আমরা শ্রদ্ধাশীল হই ওইসব শহীদ পরিবারের সদস্যদের প্রতি, তাদের সন্তানদের প্রতি। তাদের মহান ত্যাগ বিনিময়যোগ্য নয়; তবে আমরা পারি তাদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে তাদের স্মৃতির প্রতি সম্মান প্রদর্শন জানিয়ে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিতে।

পরিবারের সন্তানদের প্রতি জাতির একটা কর্তব্য রয়েছে। তারা যাতে উপলব্ধি করতে পারেন যে, তাদের ত্যাগ বৃথা যায়নি। আজও বর্তমান প্রজন্ম, তা মনে রেখেছেন। যারা বাংলাদেশ পরিচালনা করছেন, তাদের প্রতি শ্রদ্ধার ঘাটতি নেই।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

আরও খবর

Copyright JaiJaiDin ©2021

Design and developed by Orangebd


উপরে