তবুও টনক নড়ছে না কারও

তবুও টনক নড়ছে না কারও

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিলস্নার দাউদকান্দি উপজেলার গৌরীপুর বাসস্ট্যান্ডে গত বৃহস্পতিবার যাত্রীবাহী বাসে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে অগ্নিদগ্ধ হয়ে এক শিশুসহ ২ জনের মৃতু্য হয়েছে। এ ঘটনায় অন্তত আরও ২০ জন আহত হন। এদের মধ্যে তিন-চারজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।

বাসার গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে অগ্নিদগ্ধ হয়ে গত ১০ মার্চ ফেনীর বাসিন্দা মেহেরুন নেছা লিপি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। এ দুর্ঘটনায় অগ্নিদগ্ধ তার এক শিশুসন্তান এখনো মৃতু্যর সঙ্গে লড়ছে। গত ৫ মার্চ গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে বাসার দরজা, জানালা, বারান্দার গ্রিল ও দেওয়াল ভেঙে যায়।

এর আগে গত ১১ জানুয়ারি গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার কালামপুরে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে স্বামী-স্ত্রীসহ চারজন নিহত হয়েছেন। দগ্ধ ও আহত হয় আরও অন্তত ১৫ জন। বিস্ফোরণের পর লাগা আগুনে পাশাপাশি চারটি বাসার প্রায় ৫০টি টিনশেড ঘর পুড়ে যায়।

শুধু এ দুটি দুর্ঘটনাই নয়- নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে বাসাবাড়ি ও গাড়িতে নিম্নমানের মেয়াদোত্তীর্ণ গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহারের কারণে প্রায়ই তা বিস্ফোরিত হয়ে প্রাণহানি ও হতাহতের ঘটনা ঘটছে। অথচ এসব গ্যাস সিলিন্ডার নিম্নমানের কিংবা মেয়াদোত্তীর্ণ কিনা তা দুর্ঘটনার আগ পর্যন্ত অজ্ঞাতই থেকে যাচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যানবাহন মালিকদের অনীহা, এলএনজি ব্যবসায়ীদের দুর্নীতি এবং সর্বোপরি প্রশাসনের উদাসীনতায় গ্যাস সিলিন্ডার নিয়ে পরিস্থিতি ক্রমে নাজুক হয়ে উঠছে। একটা সিলিন্ডার প্রস্তুতের পর অনন্তকাল ধরে ব্যবহারের প্রচলিত ধারাই এই খাতের বড় হুমকি বলে বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

বিস্ফোরক অধিদপ্তর, ফায়ার সার্ভিস এবং গ্যাস সেক্টরের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশে গ্যাস সিলিন্ডারের ব্যবহার দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। রান্নাঘর থেকে শুরু করে যানবাহন, অফিস, দোকানপাট, রেস্টুরেন্ট সর্বত্রই গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহৃত হচ্ছে। এক সময় বিদেশ থেকে সিলিন্ডার আমদানি করে ব্যবহার করা হলেও বর্তমানে দেশে প্রচুর সিলিন্ডার তৈরি হচ্ছে। তবে মানসম্পন্ন সিলিন্ডার তৈরির পাশাপাশি কিছু অসাধুচক্র শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডের পাইপ জোড়াতালি দিয়ে সিলিন্ডার তৈরি করছে। যার কোনোটির গায়েই উৎপাদন ও মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ লেখা নেই।

বিস্ফোরক অধিদপ্তরের প্রজ্ঞাপন ও সিএনজি বিধিমালা-২০০৫ অনুসারে সিএনজিচালিত যানবাহনের সিলিন্ডার স্থাপনের পাঁচ বছর অন্তর বা চৌদ্দ হাজার বার রিফিল করার পর পুনঃপরীক্ষার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু দেশের লাখ লাখ সিলিন্ডারের খুবই স্বল্পসংখ্যকের রি-টেস্ট করা হয়। সিলিন্ডার রি-টেস্ট সনদ দেওয়া না হলে গাড়ির ফিটনেস আটকের একটি নিয়ম করেছিল বিআরটিএ। পরে ওই নিয়ম শিথিল হয়ে যায়। এতে দেশের কয়েক লাখ যানবাহনে অন্তত ১৫ বছরের বেশি পুরনো গ্যাস সিলিন্ডার থাকলেও তা নিয়ে কারও কোনো মাথাব্যথা নেই।

অন্যদিকে বাসাবাড়িতে প্রাকৃতিক গ্যাসের সংযোগ দেওয়া বন্ধ থাকায় ও গ্রামগঞ্জে লাকড়ির ব্যবহার কমে যাওয়াসহ নানা কারণে দেশে লিকুইফাইড পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) ব্যবহার ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। গৃহস্থালির পাশাপাশি হোটেল রেস্তোরাঁয়ও চলছে এলপিজি। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের নিয়ন্ত্রণাধীন এলপিজি লিমিটেড বছরে অন্তত ১৪ লাখ সিলিন্ডার বাজারজাত করছে। এটি দেশের এলপি গ্যাসের চাহিদার ৩ শতাংশেরও কম। এছাড়া অনুমোদিত অন্তত ২৫টি প্রতিষ্ঠান কয়েক কোটি এলপিজি সিলিন্ডার রিফিল করে বাজারজাত করে। বিদেশ থেকে এলপিজি সিলিন্ডার আমদানির পাশাপাশি দেশে সিলিন্ডার প্রস্তুতকারী ১৬টি প্রতিষ্ঠান প্রতি মাসে অন্তত তিন লাখ সিলিন্ডার উৎপাদন এবং বাজারজাত করে। বছরে ৩৬ লাখ এলপিজি সিলিন্ডার উৎপাদিত হচ্ছে দেশেই। এর বাইরে চীন, ভারত, থাইল্যান্ড এবং তুরস্ক থেকেও প্রচুর এলপিজি সিলিন্ডার আমদানি হচ্ছে।

বিস্ফোরক অধিদপ্তরের পদের একজন কর্মকর্তা বলেন, এই পরিসংখ্যান থেকেই অনুমান করা যায়, দেশে গ্যাসের ব্যবহার কী পরিমাণ বেড়েছে। অথচ এসব সিলিন্ডার ঘরে ঘরে গ্যাসভর্তি হয়ে গেলেও এগুলোর অধিকাংশরই কোনো মেয়াদকাল নেই। যতদিন পর্যন্ত সিলিন্ডারগুলো বাহ্যিকভাবে নষ্ট না হয়ে যায় বা কোনো অঘটন না ঘটে ততদিন সেগুলো রিফিল হচ্ছে।

বিস্ফোরক অধিদপ্তরের পদের একজন কর্মকর্তা এ প্রসঙ্গে বলেন, এলপি গ্যাসের সিলিন্ডার অনেক ঝুঁকিপূর্ণ একটি বস্তু। কিন্তু এর চেয়ে অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হচ্ছে সিএনজি সিলিন্ডার। এলপি গ্যাস থেকে এলএনজি গ্যাসের প্রেসার ২০ গুণ বেশি উলেস্নখ করে তিনি বলেন, এলপি গ্যাসের চেয়ে সিএনজি অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। এজন্য প্রতি পাঁচ বছর অন্তর সিএনজি সিলিন্ডার রি-টেস্টের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। অথচ দেশে আইনটি বাস্তবায়িত হচ্ছে না। আবার এলপি গ্যাস সারাক্ষণই আগুনের খুব কাছাকাছিতে থাকে। এতে এই সিলিন্ডারকেও একেবারে অবহেলা করার কোনো সুযোগ নেই। অথচ প্রচন্ড ঝুঁকি নিয়ে এসব সিলিন্ডার এক বাসা থেকে আরেক বাসায় ঘুরছে। তিনি তথ্য প্রকাশ করে বলেন, গত ১০ বছরে দেশে সংঘটিত এক সহস্রাধিক ছোট-বড় গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ঘটনায় অন্তত দুই হাজার মানুষ হতাহত হয়েছেন। এ ধরনের দুর্ঘটনা ঠেকাতে নিম্নমানের সিলিন্ডার প্রস্তুত ও ব্যবহার বন্ধের পাশাপাশি রি-টেস্টের বিষয়ে জোর দিতে হবে। সিলিন্ডারের গায়ে প্রস্তুত ও মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ লিখে রাখতে হবে। তাহলেই বড় ধরনের ঝুঁকি থেকে বাঁচা যাবে।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের একজন কর্মকর্তা বলেন, শুধু নিম্নমানের সিলিন্ডারের কারণেই নয়- অসচেতনতার কারণেও অনেক সময় বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটছে। কেননা সিলিন্ডারের সঙ্গে থাকা নিম্নমানের হোস পাইপ, রেগুলেটরসহ বিভিন্ন যন্ত্রাংশ ঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয় না। এজন্য সিলিন্ডার ঠিক থাকলেও অনেক সময় অগ্নিকান্ড কিংবা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে।

গ্যাসের অনিরাপদ ব্যবহার ক্রমেই উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে বলে মন্তব্য করে ফায়ার সার্ভিসের ওই কর্মকর্তা বলেন, সিলিন্ডার প্রস্তুতের তারিখ ও মেয়াদকাল উলেস্নখ, সচেতনতা বাড়ানো এবং নির্দিষ্ট সময়ে রি-টেস্ট করানোর উপর জোর দেওয়া হলে এ ধরনের দুর্ঘটনা কমবে।

বিস্ফোরক পরিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, সিলিন্ডারে গ্যাস ভরার সময় নিয়মিত যে সংকোচন-প্রসারণ হয়, তার ফলে সিলিন্ডারের সহনীয়তার মাত্রা কমে যায়। ঠিকমতো রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ডেন্টিং পেইন্টিং নষ্ট হয়ে সিলিন্ডারে ক্ষয় হয়, পুরুত্ব কমে যায়। এছাড়া সিলিন্ডারের ভাল্বের কার্যক্ষমতাও অনেক সময় কমে যায়। এজন্য স্টিলের তৈরি সিলিন্ডারের নির্দিষ্ট মেয়াদ বিশ-ত্রিশ বছর হলেও পরীক্ষা ছাড়া একটানা তা ব্যবহার করা উচিত নয়। প্রতি পাঁচ বছর পরপর তা পরীক্ষা করতে হয়। এর মানে হলো, সিলিন্ডারটি কতটা নিরাপদ আছে, আর কতদিন টিকতে পারে তা দেখা।

সিলিন্ডার পুনঃপরীক্ষা করা হচ্ছে কিনা তা দেখার দায়িত্ব কার জানতে চাইলে আরপিজিসিএলের একজন শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা বলেন, এ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বিআরটিএকে। প্রতিটি গাড়িকে ফিটনেসের জন্য প্রতি বছর বিআরটিএতে যেতে হয়। সিএনজিচালিত প্রতিটা গাড়ির ফিটনেস নবায়ন করার সময় সিলিন্ডার টেস্ট সার্টিফিকেট পরীক্ষা করে দেখতে হবে। ওই সার্টিফিকেট দেখাতে না পারলে ফিটনেস সার্টিফিকেট নবায়ন করা যাবে না। কিন্তু এটা ঠিকমতো করা হচ্ছে না।

তিনি বলেন, বিআরটিএ যদি সিলিন্ডার টেস্ট সার্টিফিকেট ঠিকভাবে পরীক্ষা করত, তাহলে এক বছরের মধ্যেই সব গাড়ির সিলিন্ডার পরীক্ষা হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু আমরা সন্দিহান, এই প্রক্রিয়াটা পুরোপুরি দেখা হচ্ছে না অথবা সার্টিফিকেট যদি দেখিয়ে থাকে সেগুলো জাল হতে পারে।

বিস্ফোরক পরিদপ্তরের প্রধান পরিদর্শক জানান, সিএনজি রূপান্তর কারখানা, ফিলিং স্টেশন এবং রি-টেস্টিং সেন্টারগুলোর অনুমতি তারা দেন। কিন্তু যানবাহনগুলোকে সিলিন্ডার পরীক্ষা করতে তারা বাধ্য করতে পারেন না।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

আরও খবর

সকল ফিচার

রঙ বেরঙ
উনিশ বিশ
জেজেডি ফ্রেন্ডস ফোরাম
নন্দিনী
আইন ও বিচার
ক্যাম্পাস
হাট্টি মা টিম টিম
তারার মেলা
সাহিত্য
সুস্বাস্থ্য
কৃষি ও সম্ভাবনা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

Copyright JaiJaiDin ©2021

Design and developed by Orangebd


উপরে