ধর্ষিতাকে বিয়ের শর্তে আপস জামিনে বাড়ছে উদ্বেগ

ধর্ষিতাকে বিয়ের শর্তে আপস জামিনে বাড়ছে উদ্বেগ

ধর্ষিতাকে বিয়ের শর্তে ধর্ষণ মামলার আপস-মীমাংসা এবং ধর্ষণকারীকে কারাগার থেকে জামিন দেওয়ার ঘটনায় উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বাড়ছে। সমাজবিজ্ঞানীরা একে আইনের শাসনের দুর্বলতারই নজির বলে মনে করছেন। তাদের ভাষ্য, ধর্ষণের মামলায় আপস-মীমাংসার মাধ্যমে ধর্ষণের শিকার এবং ধর্ষকের বিয়ের ঘটনায় আইনের ব্যাপ্তয় হচ্ছে।

অন্যদিকে মানবাধিকারকর্মীদের আশঙ্কা, সমাজে যদি একের পর এক ধর্ষকের সঙ্গে ধর্ষিতার বিয়ে হতেই থাকে, তাহলে এ ধরনের অপরাধ আরও বাড়বে। ধর্ষকদের মধ্যে ধর্ষণের কঠিন সাজার ভীতি পুরোপুরি উবে যাবে। আদালত এ ধরনের আপসে সায় দিলে ধর্ষণের সাজা মৃতু্যদন্ড করার যে লক্ষ্য তা-ও ভেস্তে যাবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তারা।

অথচ দেশে ধর্ষকের সঙ্গে ধর্ষণের শিকার নারীর বিয়ের ঘটনা একের পর এক ঘটছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, আগে এ ধরনের আপস-মীমাংসা ও বিয়ে গ্রাম্য সালিসিতে হলেও এখন তাতে আদালতও সায় দেওয়া হচ্ছে। গত এক বছরে অন্তত দশজন ধর্ষক-ধর্ষিতা নারীকে বিয়ের পর জামিন পেয়েছে। এর মধ্যে একাধিক মামলার এজাহারে 'বিয়ের প্রলোভন'-এ ধর্ষণের অভিযোগ রয়েছে।

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯(১) ধারা অনুযায়ী, বিয়ে ব্যতীত ১৬ বছরের বেশি বয়সের কোনো নারীর সঙ্গে সম্মতি ব্যতিরেকে, ভীতি প্রদর্শন বা প্রতারণামূলকভাবে তার সম্মতি আদায় করে তা যেমন ধর্ষণ, তেমনি ১৬ বছরের কম বয়সের কোনো নারীর সঙ্গে তার সম্মতিসহ বা সম্মতি ব্যতিরেকে যৌন সঙ্গম করলে সেটিও ধর্ষণ বলে বিবেচিত হবে।

দন্ডবিধির ৪৯৩ ধারা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যদি কোনো নারীকে প্রতারণামূলকভাবে আইনসম্মত বিবাহিত বলে বিশ্বাস করান, কিন্তু আদৌ ওই বিয়ে আইনসম্মতভাবে না হয় এবং ওই নারীর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করেন, তবে অভিযুক্ত ব্যক্তি সর্বোচ্চ ১০ বছর পর্যন্ত সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদন্ডে দন্ডিত হবে। এ ক্ষেত্রে আসামির সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত নারীর আপসের কোনো সুযোগ নেই। খোদ আইনমন্ত্রী আনিসুল হকও বলেছেন, 'আইনে ধর্ষণের অপরাধ আপসযোগ্য নয়।'

অথচ গত ১১ ফেব্রম্নয়ারি ঝিনাইদহ জেলা ও দায়রা জজ আদালতে এ ধরনের একটি বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে। বিজ্ঞ জেলা ও দায়রা জজ আবু আহসান হাবিবের আদালতে বিয়ের শর্তে জামিন লাভ করেন নাজমুল হোসেন নামে এক ধর্ষক। পরে আদালত প্রাঙ্গণে ধর্ষণ মামলার আসামি ও ক্ষতিগ্রস্ত নারীর আত্মীয়-স্বজন এবং উভয়পক্ষের আইনজীবীর উপস্থিতিতে এই বিয়ে সম্পন্ন হয়।

গত ১৭ জানুয়ারি ঝালকাঠিতে ধর্ষণের শিকার তরুণীকে বিয়ের শর্তে ধর্ষকের জামিন মঞ্জুর করেন জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক মো. শহিদুলস্নাহ। পরে দুই পক্ষের স্বজনদের উপস্থিতিতে ধর্ষণ মামলার আসামির সঙ্গে ভুক্তভোগী নারীর বিয়ে সম্পন্ন হয়।

গত ৩ জানুয়ারি মাদারীপুরে ধর্ষণের শিকার নারীকে বিয়ে করার শর্তে ধর্ষণ মামলার আসামি রবিউল বেপারিকে জামিন দেয় মাদারীপুরের জেলা ও দায়রা জজ আদালত। আদালত চত্বরে ১০ লাখ টাকা দেনমোহরে দুজনের বিয়ে হয়।

নাটোরের গুরুদাসপুরে এক কিশোরীকে ধর্ষণের অভিযোগে গত বছরের ১৯ অক্টোবর একটি মামলা হওয়ার পর ১৯ নভেম্বর আদালতের সম্মতির ভিত্তিতে নাটোর আদালত চত্বরে আসামির সঙ্গে ভুক্তভোগীর বিয়ে হয়। বিয়ে সম্পন্ন হওয়ার পর আসামি মানিকের জামিন মঞ্জুর করে জেলা ও দায়রা জজ আদালত।

ফেনীর সোনাগাজীর উত্তর চর দরবেশ গ্রামের এক যুবকের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগে গত বছর ২৭ মে স্থানীয় থানায় মামলা করেন এক তরুণী। ২৯ মে অভিযুক্ত যুবককে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। বিচারিক আদালতে জামিনের আবেদন নামঞ্জুর হওয়ার পর ভুক্তভোগীকে বিয়ে করবেন উলেস্নখ করে হাইকোর্টে জামিনের আবেদন করেন আসামি। বিয়ে করলে জামিনের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে বলে ১ নভেম্বর আদালত আসামিপক্ষের আইনজীবীদের জানানোর পর ১৯ নভেম্বর ফেনী জেলা কারাগারে ভুক্তভোগীর সঙ্গে বিয়ের পর ৩০ নভেম্বর শর্তসাপেক্ষে আসামিকে এক বছরের অন্তর্র্বর্তীকালীন জামিন দেওয়া হয়।

গত বছর ২০ ডিসেম্বর ঝালকাঠির অবকাশকালীন নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইবু্যনালের এজলাসে ধর্ষণ মামলার আসামি নাঈম সরদারের সঙ্গে ৫ লাখ টাকা দেনমোহরে বিয়ে হয় ভুক্তভোগী তরুণীর। এর আগে ২৩ সেপ্টেম্বর ধর্ষণের অভিযোগ এনে ৮ নভেম্বর ঝালকাঠির নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইবু্যনালে একটি নালিশি মামলা করেন ওই তরুণী। ১৩ নভেম্বর গ্রেপ্তার হওয়া নাঈমকে বিয়ের পরপরই জামিন দেন আদালত।

এভাবে ধর্ষণের শিকার নারীর সঙ্গে ধর্ষণ মামলার আসামির বিয়ের শর্তে জামিনের বিষয়ে জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি সালমা আলী যায়যায়দিনকে বলেন, ধর্ষণের শিকার নারীর সঙ্গে আসামির কোনোমতেই বিয়ে হতে পারে না। এ ধরনের যে প্রবণতা তাতে আসামিরা কিন্তু শাস্তির আওতা থেকে বেরিয়ে যাবে। তিনি আরও বলেন, ধর্ষণের আসামি স্বামী হলে গ্রহণযোগ্য হয় না। বিয়ের পর দাম্পত্যের বিষয়টি তদারকি কে করবে? ধর্ষণের আসামি স্বামী হিসেবে সারাজীবন সম্মান পেতে পারে না। আসামির সঙ্গে বিয়ে হলে ক্ষতিগ্রস্ত নারী সারাজীবন মানসিক ও শারীরিক ট্রমার মধ্যদিয়ে যাবে।

এদিকে সমাজ বিশ্লেষকরা এ বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, নিছক কারাগার থেকে মুক্ত হতেই অপরাধীরা এ কৌশল বেছে নিয়ে থাকতে পারে। তাই বিষয়টি সতর্কতার সঙ্গে দেখা প্রয়োজন। এটি ভিকটিম এবং শান্তিপ্রিয় নাগরিকের জন্য নতুন ভাবনারও বিষয়। যদিও সম্প্রতি উচ্চ আদালত থেকে একাধিক জামিন লাভ এবং উল্টো বাদীর বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু পরবর্তীতে ধর্ষকের সঙ্গে ধর্ষিতার 'ঘর-সংসার' কেমন যাচ্ছে- সে খবর অজ্ঞাত রয়ে যাচ্ছে।

পরিবারবিষয়ক কাউন্সিলর অধ্যাপক ড. কামরুন মোস্তফা এ প্রসঙ্গে বলেন, পারিবারিক সমঝোতায় ধর্ষিতা আর ধর্ষকের বিয়ে হলো। অতঃপর ধর্ষকের কারামুক্তি ঘটল- এটি হয়তো ঘটনার আপাত সমাধান। কিন্তু টেকসই সমাধান নয়। ধর্ষক-ধর্ষিতার পরবর্তী দাম্পত্যজীবন কেমন যাচ্ছে, ধর্ষিতা ধর্ষকের পরিবারে নিগৃহ হচ্ছেন কিনা সেই তথ্য আমরা পাচ্ছি না। তাই বিয়ের শর্তে ধর্ষকের জামিন লাভের পাশাপাশি পরবর্তী পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণেরও ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। ধর্ষণের মতো ঘৃণ্য অপরাধের পর ধর্ষিতাকে বিয়ে-এটি তার কারামুক্তির কৌশল কিনা সেটিও খতিয়ে দেখা জরুরি।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

আরও খবর

সকল ফিচার

রঙ বেরঙ
উনিশ বিশ
জেজেডি ফ্রেন্ডস ফোরাম
নন্দিনী
আইন ও বিচার
ক্যাম্পাস
হাট্টি মা টিম টিম
তারার মেলা
সাহিত্য
সুস্বাস্থ্য
কৃষি ও সম্ভাবনা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

Copyright JaiJaiDin ©2021

Design and developed by Orangebd


উপরে