ভেজালকারী সিন্ডিকেট বেপরোয়া

ভেজালকারী সিন্ডিকেট বেপরোয়া

রমজান মাসকে সামনে রেখে প্রতি বছরের মতো এবারও ভেজাল খাদ্যপণ্য প্রস্তুতকারী সিন্ডিকেট সক্রিয় হয়ে উঠেছে। এরই মধ্যে তারা বিপুল পরিমাণ পণ্য ঢাকার উপকণ্ঠসহ আশপাশের জেলাগুলোতে তা সরবরাহ করেছে। সেখানে অন্য একটি চক্র তা মজুত করে রমজানের বেচা-কেনা শুরুর হিড়িকের অপেক্ষা করছে। একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা এ ব্যাপারে সরকারকে অবহিত করে ভেজাল পণ্যের বিরুদ্ধে সাড়াশি অভিযান চালানোর পরামর্শ দিয়েছে।

বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন চলতি মাসের শেষভাগ থেকে টানা অভিযান পরিচালনার উদ্যোগ নিয়েছে। ভেজাল পণ্য জব্দ করে তা বিনষ্টের পাশাপাশি এ চক্রের হোতাদের গ্রেপ্তারে কৌশলী ছক তৈরি করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ভেজালপণ্য উৎপাদনের কারখানাগুলো স্থায়ীভাবে বন্ধের পথ খুঁজছে সংশ্লিষ্টরা।

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্রগুলো জানায়, ভেজাল পণ্য উৎপাদনের কারখানাগুলো প্রধানত জনবহুল এলাকার ভাড়াবাড়িতে গড়ে ওঠে। বাড়ির মালিকরা এ ব্যাপারে ওয়াকিবহাল থাকলেও মোটা ভাড়া পাওয়ার লোভে তারা বিষয়টি গোপন রাখে। এমনকি অনেক সময় ভ্রাম্যমাণ আদালত আকস্মিক অভিযান চালালে তারা এসব ভেজাল কারখানার বিভিন্ন পণ্য সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। এ কারণে অনেক সময় ওইসব ভেজাল কারখানা চিহ্নিত করা সম্ভব হয় না।

এসব বিষয় বিবেচনায় রেখে এবার ভেজাল পণ্যের কারখানার মালিক-কর্মচারীদের পাশাপাশি বাড়ির মালিকদের বিরুদ্ধে আইনগত কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, এ পদক্ষেপ নেওয়া হলে ভেজাল পণ্যের অনেক কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যাবে। বাড়ির মালিকরা ভেজালকারীদের কাছে বাসা ভাড়া দিতে ভয় পাবে।

বাজার সংশ্লিষ্টরা জানান, নকল পণ্যের পাইকারি বাজার পরিচিত হিসেবে পুরান ঢাকার বেশকিছু এলাকা। সেখানকার গলি-ঘুপচিতে বহুতল আবাসিক ভবনের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে গড়ে তোলা হয়েছে বাংলা সেমাই, লাচ্ছা সেমাই, নুডলস, ঘি, হলুদ, মরিচ, মসলা, বেসন, আটা, ময়দা, ভোজ্যতেল, পাউরুটি ও কেকসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্যের কারখানা। এসব ভেজাল পণ্যে জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর মেয়াদোত্তীর্ণ কাঁচামাল, সুতা রাঙানোর বিষাক্ত রঙ, ভেজাল পামতেল, পারফিউম, পচা ডিমসহ নানা উপকরণ ও রাসায়নিক মেশানো হচ্ছে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে ফাঁকি দিতে কৌশলে বাইরে তালা ঝুলিয়ে দিন-রাত সেখানে ভেজাল পণ্য উৎপাদন চলছে।

এছাড়া কেরানীগঞ্জ, জিঞ্জিরা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, সাভার, কুমিলস্না, চট্টগ্রাম, সৈয়দপুরে ভেজালপণ্য উৎপাদনে সক্রিয় বলে জানিয়েছে গোয়েন্দারা। বিভিন্ন সময় এসব এলাকায় অভিযান চালিয়ে প্রায় ১০০ কোটি টাকা মূল্যের নকল পণ্য জব্দ করেছে পুলিশ।

এদিকে শুধু খাদ্যপণ্যই নয়, রমজান মাসকে সামনে রেখে পুরান ঢাকার চকবাজার, লালবাগ ও কেরানীগঞ্জের অলিগলিতে তৈরি হচ্ছে নকল ও নিম্নমানের সাবান, চন্দন, মেছ্‌তা-দাগ নাশক ক্রিম, নানা প্রসাধনী, তেল ও পারফিউমও। যাত্রাবাড়ীর মীরহাজিরবাগে অনেক আগে থেকেই আছে নকল ফ্যানসহ ইলেকট্রিক যন্ত্রপাতি তৈরির কারখানা। রায়েরবাগে আছে নকল ঘি, মধু, দই ও মিষ্টির কারখানা। যাত্রাবাড়ী ও কদমতলী থানা এলাকাতেই নকল ক্যাবল তৈরির কারখানা আছে ডজন চারেক। দনিয়া ও পাটেরবাগ এলাকায় নকল মশার কয়েল, ঘি, গুড়, হারপিক, খাবার স্যালাইন, ভিটামিন ওষুধ ও ইলেক্ট্রিক সুইচ, সকেট, হোল্ডার তৈরির কারখানা আছে বেশ কয়েকটি। আছে শতাধিক নকল মিনারেল ওয়াটারের কারখানা। মুগদা এলাকায় নকল সোয়াবিন তেল থেকে শুরু করে নকল ডিটারজেন্ট পাউডার পর্যন্ত তৈরি হচ্ছে অবাধে। পুরান ঢাকার নর্থ সাউথ রোডের অলিতে-গলিতে তৈরি হচ্ছে নকল টিভি, ফ্রিজ, এনার্জি সেভিং বাল্ব, মোটর, ফ্যান, এয়ারকন্ডিশন মেশিনসহ বিভিন্ন দামি ইলেকট্রিক সামগ্রী।

বাজার সংশ্লিষ্টরা জানান, বিএসটিআইর নির্লিপ্ততার কারণেই সারা বছর নকল পণ্য সামগ্রী তৈরি হচ্ছে। আর রমজানে সব ধরনের পণ্যের বেচাকেনা বাড়ায়, এ সময় নকল পণ্যের উৎপাদন কয়েকগুণ বাড়ছে। অথচ শিল্প মন্ত্রালয়ের অধীনস্থ বিএসটিআই যুগ যুগ ধরে জনবল সঙ্কটের দোহাই দিয়ে দায় এড়িয়ে চলছে। ভুক্তভোগীরা মনে করেন, বিএসটিআইর অভিযান অব্যাহত থাকলে নকল পণ্যের দাপট অনেকাংশেই কমে যেতো।

এদিকে বিএসটিআই কর্তৃপক্ষের দাবি, নানা প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও সারা বছরই তারা ভেজালবিরোধী অভিযান চালাচ্ছে। তবে রমজানে যেহেতু নকল পণ্য প্রস্তুতকারীদের দৌরাত্ম্য বাড়ে, এজন্য এসময় অভিযান আরও জোরদার করা হয়।

সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, রমজানে দেশব্যাপী ভেজালবিরোধী অভিযান জোরদার করবে বিএসটিআই। ঢাকা মহানগরীতে বিএসটিআই ও জেলা প্রশাসন যৌথভাবে প্রতিদিন তিনটি, ঢাকা মহানগর ছাড়া পার্শ্ববর্তী জেলা-উপজেলায় প্রতিদিন কমপক্ষে দুটি এবং বিএসটিআইয়ের ১০টি আঞ্চলিক অফিসের মাধ্যমে প্রতিদিন একটি করে ১০টি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হবে। এছাড়ার্ যাবের সঙ্গে যৌথভাবে প্রতিদিন একাধিক মোবাইল কোর্ট পরিচালনায় বিএসটিআই প্রতিনিধি অংশ নেবে।

এছাড়া ইফতারির চাহিদায় গুরুত্ব পাওয়া ফল-ফলাদি আপেল, কমলা, আঙ্গুর, খেজুর, বেদানা, নাশপাতি, পাকা পেঁপে, বেল, আনারস, তরমুজসহ দেশি-বিদেশি ফলে কোনো বিষাক্ত কেমিক্যাল মেশানো হচ্ছে কিনা সেদিকেও নজর রাখা হবে। পাশাপাশি ইফতারের অপরিহার্য পাঁচটি সামগ্রী ছোলা, পিঁয়াজি, বেগুনি, মুড়ি ও জিলাপিতে বিষাক্ত কিছু মেশানো হচ্ছে কিনা তা শনাক্তে নিয়মিত অভিযান চালাবে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন।

প্রসঙ্গত, কম খরচে বেশি লাভের আশায় একশ্রেণির ইফতারি বিক্রেতা বেগুনি, পিঁয়াজি, চপ কিংবা জিলাপিতে টেক্সটাইল কালার ব্যবহার করেন। মুড়ি আকারে বড় ও সাদা করতে ব্যবহার করা হয় ট্যানারির বিষাক্ত রাসায়নিক সোডিয়াম হাইড্রোসালফাইড। মিষ্টিজাতীয় খাবার তৈরিতে ব্যবহার করা হয় ভেজাল চিনি। এর রাসায়নিক নাম সোডিয়াম সাইক্লামেট। খাবারকে অধিকতর মিষ্টি করতে কেউ কেউ ব্যবহার করে স্যাকারিন, সুকরালেস ইত্যাদি। ইফতারির আরেক আইটেম হালিমে আগের দিনের অবিক্রিত ডাল ও মাংসের উচ্ছিষ্ট মেশানো হয়। ইফতারে রোজাদারদের খুব পছন্দ ফল কিংবা এর জুস। জিলাপি দীর্ঘক্ষণ মচমচে রাখতে তেলের সঙ্গে মেশানো হয় গাড়ির পোড়া লুব্রিকেন্ট।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

আরও খবর

সকল ফিচার

রঙ বেরঙ
উনিশ বিশ
জেজেডি ফ্রেন্ডস ফোরাম
নন্দিনী
আইন ও বিচার
ক্যাম্পাস
হাট্টি মা টিম টিম
তারার মেলা
সাহিত্য
সুস্বাস্থ্য
কৃষি ও সম্ভাবনা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

Copyright JaiJaiDin ©2021

Design and developed by Orangebd


উপরে