বিরল ঘটনাবলির সাক্ষী ঐতিহাসিক যে বাড়িটি

৩২ নম্বর রোডের বাড়িটি থেকেই আওয়ামী লীগ পুনর্গঠিত হয় এবং দলীয় সভায় বঙ্গবন্ধু দলের সভাপতি নির্বাচিত হন। ৬ দফা প্রণয়নের আগে বিশ্বস্ত নেতা ও সুধীজনদের সঙ্গে সব বৈঠক এখানেই অনুষ্ঠিত হয়। ম
বিরল ঘটনাবলির সাক্ষী ঐতিহাসিক যে বাড়িটি

হিমালয়সম একজন বিশ্বনেতা। সাড়ে সাত কোটি মানুষের সমন্বিত একটিই কণ্ঠস্বর। সরকারে না থেকেও যার এককথায় দেশের সবকিছু চলে। দেশের সব মানুষ যার সিদ্ধান্ত বিনা বাক্যব্যয়ে পালন করে এমন একজন মানুষের বাড়ি যা আজ কিনা জাদুঘর। কেমন হতে পারে সেই বাড়ি? আমেরিকার প্রেসিডেন্টের বা যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রীর বাড়ির ছবি মিডিয়ার কল্যাণে, ইন্টারনেটের সহজলভ্যতায় যে কোনো সময় যে কেউ দেখতে পারে। হোয়াইট হাউস নাম বা ১০নং ডাউনিং স্ট্রিট এ ধরনের ঠিকানা সবার মুখস্থ দৈনন্দিন সংবাদের কল্যাণে। আর বাঙালির মুখস্থ একটি ঠিকানা। ৩২নং ধানমন্ডি। এই ঠিকানার কথা বললেই চোখে ভাসে একটি বাড়ির ছবি। বিশ্বের দুর্লভ ইতিহাসের এক কালজয়ী সাক্ষী। সাক্ষী যেমন আনন্দ, বেদনা, জন্মদিনের, বিয়ের, সাড়ে সাত কোটি মানুষের আশা-আস্থার, তেমনি সাক্ষী এক বিভীষিকাময় ভোরের। যেই ভোরে ছিল কালো জোড়া জোড়া ভারী বুটের শব্দ, রাইফেল আর স্টেনগানের গুলির শব্দ, যে গুলি থামিয়ে দিয়েছিল অনেকগুলো নিরপরাধ তাজা প্রাণ, যাদের হৃৎপিন্ড নিঃসৃত লাল রক্তের প্রলেপ ঢেকে দিয়েছিল তাদের হাতের মেহেদির রং, নিরস্ত্র এক বজ্রকণ্ঠ থামিয়ে দিয়েছিল যে গুলি, থামিয়ে দিয়েছিল বাংলার কৃষক, শ্রমিক মেহনতি মানুষের স্বপ্ন দেখার কান্ডারির হৃৎস্পন্দন, সিঁড়িতে পড়ে থাকা সেই হিমালয়সম মানুষের নিথর দেহ দেখে তার সহধর্মিণীর চিৎকার 'তোমরা ওনাকে মেরেছ, আমাকেও মেরে ফেলো।' খুনিরা তাকে বলেছিল, আমাদের সঙ্গে চলেন। খুনিদের তিনি বলে দেন, 'তোমাদের সঙ্গে আমি যাব না তোমরা এখানেই আমাকে খুন করো।' সেই বাড়ি, যে বাড়ি তিনি নিজ হাতে তিলে তিলে কষ্টের পয়সায় তৈরি করেছিলেন। আড়াইতলার এই ঐতিহাসিক বাড়ি তৈরি আড়াই মাসে হয়নি, আড়াই বছরেও হয়নি। কত সময় লেগেছিল, কেমন সেই বাড়ি, আর কীভাবেই বা তৈরি হয়েছে এই বাড়িটা? কি কি ঘটনা ছিল এই বাড়িতে। মায়ের সঙ্গে সন্তানের নাড়ির যে সম্পর্ক, বাঙালির সঙ্গে এই বাড়ির সেই সম্পর্ক। এই বাড়িই হলো বাংলাদেশের জন্মস্থান, বাংলাদেশের স্থায়ী ঠিকানা। বাংলাদেশের জন্মস্থান এই বাড়িটা তিলে তিলে একটার উপর একেকটা ইট দিয়ে তৈরিতে দীর্ঘদিন বা অনেক বছর লেগেছে। চলুন জেনে নিই এ বাড়ি তৈরির ইতিহাস ও আদ্যোপান্ত।

একটি আদর্শ বাড়ি। নিচে ছোট-বড় সব মিলিয়ে পাঁচটি, দোতলায়ও পাঁচটি কক্ষ বা ঘর। তৃতীয় তলায় দুটি। বাড়ির পেছনের দিকে একটি রান্না ঘর এবং পাশে কবুতর ও মুরগির বেশ বড় দুটি ঘর।

ধান, জমি-জিরাত বিক্রি করে দৈনন্দিন খরচাদির পর যা অবশিষ্ট থাকত তা দিয়ে শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব এ বাড়ি তৈরি এগিয়ে নিয়ে গেছেন। পাশে সার্বক্ষণিক ও সর্বপ্রকার সমর্থন দিয়েছিলেন তার পিতৃতুল্য শ্বশুর। এবং বেগম মুজিবের দাদা। তার দাদা যে সম্পত্তি দিয়ে গেছেন, তা প্রচুর জমিজমা। এর থেকে যে টাকা আসত তার দাদা সবসময় সে টাকা বেগম মুজিবের হাতে দিয়ে দিতেন।

এখনকার দৃষ্টিতে বলা যায় অপরিপক্ব বয়সে বাবা-মায়ের পছন্দে ও চাপে আত্মীয়া কিশোরী ফজিলাতুন্নেছা রেণুকে বিয়ে করেছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান, যার উপাধি এখন বঙ্গবন্ধু। স্কুলজীবনেই তার শুধু রাজনীতিতে হাতেখড়ি নয়, কারা জীবনেরও সূচনা ঘটেছিল। বিয়ের পর তাদের সংসার সন্তান হয়েছে ঠিকই; কিন্তু কারাগার ও দলীয় অফিসে পূর্ণ মেধা ও সময় চলে যায় শেখ মুজিবের, আর গোপালগঞ্জ টুঙ্গিপাড়ায় দাদা শেখ লুৎফর রহমানের হাত ধরেই প্রাথমিক স্কুল যাতায়াত শুরু শেখ মুজিবের সন্তানদের।

ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া ও ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে বেগম মুজিব শ্বশুর ও সন্তানদের নিয়ে সেই ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময়ে ঢাকায় পাড়ি জমিয়েছিলেন। নাজিরাবাজার, সেগুনবাগিচা, সিদ্ধেশ্বরী ও এর আশপাশে বাড়িভাড়া নিয়ে তখন থেকেছিলেন।

এক এক ভাড়াবাড়িতে থাকারও পিছনে আছে এক একটা ইতিহাস। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে জয়ী হলে বঙ্গবন্ধু মন্ত্রী হন। কয়দিন পর সে মন্ত্রিসভা ভেঙেও যায় এবং তিনি গ্রেপ্তার হন। বাধ্য হয়ে ৩নং মিন্টো রোডের বাড়ি ছেড়ে নাজিরাবাজার ভাড়া বাসায় উঠতে হয়।

তারপর ১৯৫৫ সালে বঙ্গবন্ধু আবার মন্ত্রী হন, তিনি ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলিতে নির্বাচন করে জয়ী হন, মন্ত্রিসভায় যোগ দেন। বসবাস শুরু হয় ১৫ নম্বর আবদুল গনি রোডের বাসায়। বাংলাদেশের ইতিহাস দেখলে দেখা যায় সবাই মন্ত্রিত্বের জন্য দল ত্যাগ করে, আর বঙ্গবন্ধু সংগঠন শক্তিশালী করার জন্য নিজের মন্ত্রিত্ব ছেড়ে দিলেন। ছেড়ে দিয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব নিলেন। সবকিছু গুছিয়ে নিয়ে চলে যেতে হয় ছোট্ট জায়গায়। এরপর বঙ্গবন্ধুকে টি-বোর্ডের চেয়ারম্যান করেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। তখন সেগুনবাগিচায় একটা বাসায় থাকতে দেওয়া হলো। আইয়ুব খান একদিন মার্শাল ল ডিক্লিয়ার করলেন। বঙ্গবন্ধু করাচিতে ছিলেন, সেখান থেকে ফিরলে তাকে গ্রেপ্তার করা হলো। গ্রেপ্তার করার সঙ্গে সঙ্গে বাড়িতে যে নগদ টাকা ছিল আর গাড়ি ছিল তা সব সিজ করে মাত্র ছয়দিনের নোটিশ দিয়ে তাদের বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হলো। ছোট ছোট ছেলেমেয়ে আর মালপত্র নিয়ে বেগম মুজিব তখন রাস্তার ওপর। একজন দুই কামরার একটা বাসা দিলে সেখানে উঠেই দিন-রাত বাড়ি খোঁজা, মামলা-মোকদ্দমা চালানো, কোর্টে যাওয়া সব কাজ বেগম মুজিব অত্যন্ত ধৈর্যের সঙ্গে করতেন। এরপর সেগুনবাগিচায় দোতলা একটা বাসায় বসবাস করেন।

দিন যতই এগিয়ে যায় একদিকে ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার চাপ, অন্যদিকে রাজনীতিতে সরকারবিরোধী কর্মকান্ডে অধিকতর সক্রিয়তা বঙ্গবন্ধুকে রাজনীতি থেকে দূরে রাখার মতলবে তৎকালিন পাকিস্তানের গোয়েন্দা বাহিনীগুলো তার বাড়িওয়ালাদের ভয়ভীতি প্রদর্শন শুরু করে- তারা যেন কোনোমতেই মুজিবের পরিবারকে ঠাঁই না দেয়। এ অবস্থায় আত্মীয়-শুভাকাঙ্ক্ষীরা এগিয়ে এলেও কতদিন এভাবে চলতে পারে? ১৯৫৫-১৯৫৬ সালে তৎকালিন সরকার লালমাটিয়া, শুক্রবাদ, কলাবাগান, কাঁটাবন, ঢাকা কলেজ ঝিগাতলার মধ্যবর্তী ধানমন্ডির ১.৬৮ বর্গমাইলজুড়ে পস্নট বরাদ্দের জন্য আবেদনপত্র আহ্বান করে। খুব কমসংখ্যক আবেদনপত্র জমা পড়ে। ফলে শেখ মুজিবের নাম খুব সহজেই ধানমন্ডি ৩২ নম্বর রোডের ৬৭৭ নম্বর পস্নটটি বরাদ্দ হয়ে যায়। পস্নট বরাদ্দের কথা জেনে বঙ্গবন্ধুর পিতা শেখ লুৎফর রহমান তড়িঘড়ি তার সঞ্চয়গুলো নগদ অর্থে ঢাকায় নিয়ে আসেন। শুরু হয়ে যায় মাটি ভরাটের কাজ। এক বছরে মাত্র দুটি কক্ষ নির্মাণের পরপরই ছেলেমেয়ে নিয়ে ৩২ নম্বর রোডের ৬৭৭ নম্বর বাড়িতে উঠে পড়েন। এ বাড়িটা তৈরি করার সময় লেবার খরচ বাঁচানোর জন্য বেগম মুজিব নিজের হাতে দেওয়ালে পানি দিতেন, ইট বিছাতেন। সন্তানদের নিয়ে কাজ করতেন।

মুজিবুর ঢাকায় বাড়ি বানিয়েছেন, এমন সংবাদ চাউর হয়ে গেলে আত্মীয়রা তো বটেই; টুঙ্গিপাড়ার সাধারণ মানুষও ঢাকায় এসে সামান্য কাজের অজুহাতে এ বাড়িতে মেহমান হতে থাকে। এ বাড়িতে নিজেদের থাকা, মেহমানদের থাকা এ সব বিষয় চিন্তা করে, উপায়ন্তর না দেখে পৈতৃকসূত্রে প্রাপ্ত বেশকিছু জমিজমা বিক্রি করে বেগম মুজিব নিচ তলা সম্প্রসারিত করে আরও ছোট ছোট তিনটি কক্ষ বাড়াতে বাধ্য হন।

মজার ব্যাপার হলো, কক্ষ সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে অতিথির সংখ্যা আরও বেড়ে যায়। আত্মীয় এবং গ্রামের মানুষ, যারা ভর্তি পরীক্ষা থেকে শুরু করে চাকরির খোঁজ, মামলা-মোকাদ্দমা কিংবা চিকিৎসার জন্য ঢাকায় আসে; তাদের সবার বর্তমান ঠিকানা হয়ে যায় ৬৭৭/৩২ ধানমন্ডি। শুধু তাই নয় জেলের ভেতর বা বাইরে যেখানেই মুজিব থাকুন না কেন; আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের দ্বিতীয় দলীয় অফিস হিসেবে এই বাড়ি ব্যবহৃত হতে থাকে। এ অবস্থায় ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার কথা বিবেচনা করে পশ্চিম দিকের সিঁড়িকে আরও উপরে নিয়ে দ্বিতীয় তলার এক এক করে পাঁচটি কক্ষ নির্মাণ করেন। দক্ষিণ দিকে ব্যালকনি, পূর্বপাশে টানা তিনটি ও পশ্চিম পাশে সিঁড়ির ডান দিকে একটি এবং মাঝখানে কিছুটা অন্ধকারাচ্ছন্ন ড্রয়িং কক্ষ, খাবার কক্ষ। উত্তর-পূর্ব কোণের কক্ষে থাকতেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, মাঝখানে রাসেলকে নিয়ে বেগম মুজিব। পাশের কক্ষটিতে শেখ রেহেনা, এর উল্টোদিকে অর্থাৎ দক্ষিণ-পশ্চিম কোণের কক্ষে ছেলে শেখ জামাল ও কামাল। প্রতিটি কক্ষে আছে একটি খাট, টেবিল, আলমিরা, একটি ড্রেসিং টেবিল ও চেয়ার।

১৯৬৬ সালে ছয় দফা উপস্থাপনের পর থেকে এ বাড়িটি আর মুজিবের থাকেনি, এটি বাঙালি রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু হয়ে যায়। বঙ্গবন্ধু জেলে থাকলেও প্রতিদিন অসংখ্য নেতাকর্মী হাজিরা দিতেন এ বাড়িতে। বেগম মুজিবকে অভয় দেওয়ার লক্ষ্যে তারা স্স্নোগান তুলত 'জেলের তালা ভাঙব শেখ মুজিবকে আনব'। সংগ্রামী এ জনতা তাদের অঙ্গীকার ঠিকই রেখেছিল। তারা মুজিবকে মুক্ত করেই ঘরে ফিরেছেন। মৃতু্যর কোল থেকে তারা মুজিবকে বের করে এনে বঙ্গবন্ধু উপাধিতে ভূষিত করেছে। বঙ্গবন্ধুর মুক্তির পর থেকে ৬৭৭ নম্বর বাড়ি বাঙালির তীর্থস্থানে পরিণত হয়ে যায়।

বাড়ির ভেতর ও বাইরে বক্তৃতা, স্স্নোগান, মিছিলে নির্বিঘ্নে পড়াশোনার আর কোনো সুযোগই নেই। মিটিং-মিছিল বক্তৃতা দিয়ে কিছুক্ষণ আগেই নেতা মুজিব হয়তো দোতলায় উঠে এসেছেন, এমন সময় সামনের গেটের বাইরে আরেকটি মিছিল উপস্থিত। লুঙ্গি, পাঞ্জাবি পরিহিত বঙ্গবন্ধু নিরুপায়। কী আর করা! ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে মেগাফোনে আবারও বক্তৃতা। সন্তানদের শিক্ষা নিয়ে সর্বদা সিরিয়াস বেগম মুজিব; এবার উপরে তিনতলায় আরও দুটি কক্ষ বাড়াতে বাধ্য হন। পরীক্ষা কিংবা পড়াশোনার গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ছেলেমেয়েরা তিনতলায় লেখাপড়া করে। পরে বড় ছেলে শেখ কামালের জন্য উত্তর পাশের কক্ষটি বরাদ্দ হয়। নিচতলার দক্ষিণ দিকের দরজা দিয়ে ঢুকে প্রথমে যে বড় কক্ষটি তা মূলত রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের অপেক্ষা, সাক্ষাৎ কিংবা ছোটখাটো সভার কাজে ব্যবহৃত হয়। বেগম মুজিব সত্যিই এক মহীয়সী ধৈর্যশীল নারী। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত সাক্ষাৎকারার্থী অতিথিদের যে স্রোত লেগে থাকে তাদের কিছু আপ্যায়ন ছাড়া তারা তো যেতে পারে না। বড় এ কক্ষটির পূর্বপাশে বঙ্গবন্ধুর লাইব্রেরি। প্রায় প্রতিদিনই তিনি সময় করে কিছুক্ষণের জন্য হলেও এখানে বসেন, পড়াশোনা করেন। রাজনীতি, সমাজনীতি, অর্থনীতি, ইতিহাস থেকে শুরু করে পবিত্র কোরআনও এখানে আছে। নিচতলার পশ্চিম পাশে ছোট ছোট তিনটি কক্ষ, যা বরাবরই ঢাকার বাইরে থেকে আসা দলীয় নেতাকর্মী কিংবা টুঙ্গিপাড়ার আত্মীয়-অনাত্মীয়দের দখলে থাকে। অনেক সময় বঙ্গবন্ধু বেগম মুজিব বা তাদের ছেলেমেয়েরাও জানেন না, কে কতদিন ধরে বাড়িতে আছে। বেগম মুজিব সাধারণত নিজেই রান্না করে তৃপ্তি পান, সহযোগী হিসেবে আছে একজন মহিলা। প্রতিদিন সকালে ও রাতে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে খাবার খেতে পছন্দ করেন মুজিব দম্পতি। সাড়ে তিন বাই সাড়ে তিন ফুটের ডাইনিং টেবিলের চারদিকে ছেলেমেয়ে, অনেক সময় ভাগ্নে-ভাতিজা, আত্মীয়-স্বজনদের নিয়ে গাদাগাদি করে খাওয়া-দাওয়ায় দারুণ তৃপ্ত মুজিব। একটি খাঁটি বাঙালি মধ্যবিত্ত সুখী পরিবার তার।

৩২ নম্বর রোডের বাড়িটি থেকেই আওয়ামী লীগ পুনর্গঠিত হয় এবং দলীয় সভায় বঙ্গবন্ধু দলের সভাপতি নির্বাচিত হন। ৬ দফা প্রণয়নের আগে বিশ্বস্ত নেতা ও সুধীজনদের সঙ্গে সব বৈঠক এখানেই অনুষ্ঠিত হয়।

১৯৭০-এর নির্বাচনের পর কৌশল ও নির্দেশনা এখান থেকেই নিয়েছেন বঙ্গবন্ধু। ২৫ মার্চ রাতে তাড়াহুড়ো করে শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে সর্বশেষ শলাপরামর্শ এ বাড়ির তিনতলার দক্ষিণ দিকের কক্ষেই এবং গ্রেপ্তারের আগে স্বাধীনতা ঘোষণা এ বাড়ি থেকেই দেওয়া হয়েছিল। মহাকালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এখন এ বাড়িটি। এ বাড়িটি মালিক শেখ মুজিবুর বহমানের রাজনৈতিক শত্রম্নর শেষ নেই সেই ১৯৪৭ সাল থেকে। প্রতিদিন পরিচিত অপরিচিত মানুষের আনাগোনা দেখে সহজেই অনুমেয়, শত্রম্নর সঙ্গে চলাচল করলেও বাড়ির কর্তাব্যক্তি কিংবা কোনো প্রাণীই নিরাপত্তার বিষয়টি কখনো আমলে নিচ্ছে না।

১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে বঙ্গবন্ধু এ বাড়িতে ওঠেন। ১২ জানুয়ারি ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব গ্রহণ করার পর সুরক্ষিত গণভবন তার কার্যালয় হলেও একটি বেসামরিক আবাসিক এলাকার এ সাধারণ বাড়িতেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী হলেও কোনো ধরনের বিলাসী জীবনযাপন করেননি বেগম মুজিব। বলেছেন 'না, আমার ছেলেমেয়ে বেশি বিলাসিতায় থাকলে ওদের নজর খারাপ হয়ে যাবে, অভ্যাস খারাপ হয়ে যাবে'। অথচ এ বাড়ির পূর্ব-পশ্চিম ও উত্তরদিকে রয়েছে সারি সারি অট্টালিকা। প্রতিবেশীদের সঙ্গেও রয়েছে তার আত্মিক সম্পর্ক, তাই তিন দিকের বাড়িতে যাতাযাতের জন্য রাখা হয়েছে পকেট গেট। বাড়ির দক্ষিণ দিকে ছয় ফুট দেয়ালের পরই রাস্তা, যা সর্বসাধারণের জন্য ব্যবহার হয়ে থাক। রাস্তার দক্ষিণ-পূর্বদিকে প্রবাহিত ১০০ গজ প্রশস্ত ধানমন্ডি লেক।

জনগণের মুজিবের দরজা যেন সর্বসাধারণের জন্য বন্ধ না হয়ে যায় সেদিক বিবেচনা করে সদ্য স্বাধীন দেশের প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তার সার্বিক দায়িত্বে আছে হাতেগোনা কয়েকজন এসপি ও পুলিশ। সেনাবাহিনীর এক কোম্পানি নিরাপত্তায় আছে বলা হলেও কেউই নিশ্চিত নন। তাদের দায়িত্ব আসলে কী? সকালে ও বিকালে জাতীয় পতাকা উত্তোলন ও নামানোই সেনাবাহিনীর কাজ। এ সময়ে একজন হাবিলদারের নেতৃত্বে সাত সৈনিক উপস্থিত থাকে। দায়িত্বরত সেনা অফিসার বিকাল বেলা চলে যান। বাড়ির নিরাপত্তার দায়িত্ব তখন কেবলই পুলিশের এক ডজন সাদা ও খাকি পোশাকধারীদের। এদের কারোরই ছাড়পত্র নেই, ভিভিআইপি নিরাপত্তার উপর কোনো প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতাও নেই। নিরাপত্তা এলাকা বলতে যা বোঝায়, তা সেখানে নেই। বাড়ির আঙিনার ভেতরেই চারদিকে পাঁচটি গার্ডপোস্ট তৈরি করা হয়েছে। দুঃখজনক হলো, যে ব্যক্তি ও পরিবার এই দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন-যৌবন দিলেন; তাদের নিরাপত্তা দেখার কেউ নেই। যার পরিণতি হলো ইতিহাসের সর্বনিকৃষ্ট নৃশংস হত্যাকান্ড। অথচ ১৯৭২ সালে মুক্তির পর বিদেশি সাংবাদিকের বঙ্গবন্ধুর প্রতি প্রশ্ন ছিল 'হোয়াট ইজ ইওর কোয়ালিফিকেশন?' শিশুসুলভ বঙ্গবন্ধুর সহজ উত্তর ছিল, লাভ মাই পিপল। আবারও প্রশ্ন ছিল, 'হোয়াট ইজ ইওর ডিসকোয়ালিফিকেশন?' এবার উত্তর ছিল- 'আই লাভ দেম টু মাচ।' ৩২ নম্বর রোডের ৬৭৭ বাড়িটি এখন বাঙালির আবেগ ও ভালোবাসার ঠিকানা। তিনি বিশ্বাস করেছিলেন, কোনো বাঙালি তাকে হত্যা করতে পারে না। তাহলে যারা তাকে হত্যা করল, ওরা কারা?

তথ্যসূত্র : 'ফজিলাতুননেছা মুজিব, আমার মা'- শেখ হাসিনা, এমপি (৮ আগস্ট, ২০২১ ইত্তেফাক পত্রিকায় প্রকাশিত নিবন্ধ এবং 'বত্রিশ নম্বর রোডের সেই বাড়িটি'- এ টি এম মহিউদ্দিন সেরনিয়াবাত (১৫ আগস্ট, ২০১৯ সাপ্তাহিক মুক্তির ডাক পত্রিকায় প্রকাশিত নিবন্ধ)।

ড. এ কে এম শামীম আলম: কৃষিবিদ

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

আরও খবর

সকল ফিচার

রঙ বেরঙ
উনিশ বিশ
জেজেডি ফ্রেন্ডস ফোরাম
নন্দিনী
আইন ও বিচার
ক্যাম্পাস
হাট্টি মা টিম টিম
তারার মেলা
সাহিত্য
সুস্বাস্থ্য
কৃষি ও সম্ভাবনা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

Copyright JaiJaiDin ©2021

Design and developed by Orangebd


উপরে