আগস্টের শোকগাথা

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাফল্যকে ম্স্নান করতে দূরভিসন্ধি এঁটে দিন-রাত মরিয়া হয়ে ওঠে তার ঘনিষ্ঠ সহচরদের কয়েকজন। সেই সূত্র ধরে আমরা বাঙালি জাতি আমাদের প্রিয় নেতাকে হারিয়ে ফেললাম '৭৫-এর ১৫ আগস্টে।
আগস্টের শোকগাথা

শোকের মাস আগস্ট আবার এসে গেল। আমাদের জাতীয় জীবনে যেমন ঠিক তেমনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আগস্টের শোকগাঁথা সর্বজনবিদিত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে ১৯৪৫ খিষ্টাব্দের ৬ আগস্ট সোমবার রৌদ্র ঝলমল সকাল ৮টা ১০ মিনিটে তিনিয়ান দ্বীপের মার্কিন বিমান ঘাঁটি থেকে যুগপৎ ৩টি-বি ২৯ বোমারু বিমান সূর্যোদয়ের দেশ জাপানের হিরোশিমা শহরে দুর্ধর্ষ বৈমানিক কর্নেল পল টিবেটস্‌ তার আনবিক বোমা বহনকারী বিমানটি থেকে নিক্ষিপ্ত 'লিটল বয়' নামক বোমায় প্রাণচঞ্চল শহর মৃতু্যপুরীতে রূপ নেয়। মাত্র তিনদিন পর ৯ আগস্ট সকাল ১১টায় জাপানের জনবহুল ও গুরুত্বপূর্ণ শহর নাগাসাকিতে বক্সার বোমারু বিমান থেকে 'ফ্যাটম্যান' নামক দ্বিতীয় আনবিক বোমাটি নিক্ষিপ্ত হলে প্রায় তিন লাখ মানুষের মৃতু্যসহ ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের সৃষ্টি হয়। এই নিরিখে আন্তর্জর্াতিক পরিমন্ডলে কোটি কোটি শান্তিপ্রিয় মানুষ আগস্ট মাসে আজও ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে ওঠে। শোকের মাস হিসেবে আগস্টের নাম বুকের বাঁপাশে চিন চিন করে। আমাদের জাতীয় জীবনেও গা শিউরে ওঠা মাস আগস্ট। ৭৫-এর ১৫ আগস্ট ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে ঘাতকদের হামলায় আমরা হারিয়েছি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। আগস্টের হত্যাযজ্ঞের ধারাবাহিকতায় সেই বঙ্গবন্ধু তনয়া, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপর ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা চালানো হয়। আগস্ট তাই শোকের মাস, দুঃখের মাস। ১৫ থেকে ২১ আগস্ট। জানিনা ঘাতকদের নিকট এই আগস্ট কেন এত বেশি প্রিয়? জানিনা, হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে আনবিক বোমা নিক্ষেপকারী বিশ্বমানবতার সেই শত্রম্ন ও জঘন্য নরপিশাচদের সতীর্থ, অনুচর কিংবা উত্তরসূরি তারা কিনা। শুধু জানি তারা আমাদের শত্রম্ন, দেশের শত্রম্ন, জাতীয় শত্রম্ন তথা বিশ্বশান্তি বা মানবতার সরস শত্রম্ন। জাতীয় এই শত্রম্নরা শেখ হাসিনার উপর তাদের বেছে নেওয়া হামলায় পুরোপুরি সফল হতে পারেনি, পেরেছে বঙ্গবন্ধুর উপর হামলা করে। যেভাবে মানবতার উপর হামলা করেছিল জাপানের হিরোশিমা-নাগাসাকিতে। উলেস্নখ্য, জাপানের হিরোশিমা-নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা হামলার ৬৬ বছর পর ২০০৫ সালে আমেরিকার একটি প্রতিনিধি দল জাপানে পাঠিয়ে সমবেদনা জানিয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। শাশ্বত বাংলার সঞ্চিত ধন। একটি মহানাম, একটি জাতি, একটি মানচিত্র, একটি পতাকা, একটি ইতিহাস। স্থপতি বাংলার। জীবদ্দশায় অসম্ভব জনপ্রিয় ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বজ্রকণ্ঠখ্যাত এ মানুষটির ভাষণে অনায়াসে সৃষ্টি হতো অভাবিত জনজোয়ার। শ্রোতাসাধারণ যেন হয়ে উঠত মন্ত্রমুগ্ধের মতো সম্মোহিত। শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে তার কণ্ঠ ছিল সদা সোচ্চার। বিশেষ করে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকদের বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর প্রতিবাদী রাজনৈতিক ভূমিকা তার রাজনৈতিক জীবনের উত্থান ঘটিয়েছিল। তেমনিভাবে তা স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের সৃষ্টিতেও করে তোলে অপরিহার্য। বিশ্ব রাজনীতির মহাকাশে উজ্জ্বল নক্ষত্রের মেলায় বাঙালি জাতির ত্রাতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের তীক্ষ্ন তর্জনীর গর্জন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে অগ্নির উত্তাপ ছড়িয়ে পদ্মা, মেঘনা, যমুনায় সুউচ্চ ঢেউ তুলেছিল। আর সেই আঙুল বেয়ে লাল কবিতার দল মানুষকে মুক্তিযুদ্ধে ঠেলে মৃতু্যর দলিলে সোনালি স্বাক্ষর রাখতে উদ্বুদ্ধ করেছিল। ফলে সবুজের ছামিয়ানায় উদিত হল লাল সূর্য, নতুন পতাকা, স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ। কাব্যের ক্যানভাসে উপস্থাপিত হলো সমৃদ্ধ এক সুন্দর। মোদ্দা কথা, বাংলাদেশের অভু্যদয়ে তার ভূমিকা ছিল অসমান্তরাল। বাঙালি জাতির মুক্তিদাতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমাদের মুক্তির জন্য অনেক জেল-জুলুম সহ্য করছেন। তিনি মোট ৪৬৮২ দিন কারাভোগ করেন। এর মধ্যে ৭ দিন কারাভোগ করেন ব্রিটিশ আমলে। আর ৪৬৭৫ দিন তাকে জেলে রেখেছে পাকিস্তানি সরকার। অর্থাৎ ২৪ বছরের পাকিস্তানি আমলের ১৪ বছরই জেলে কাটিয়েছেন বাবা-মায়ের আদরের 'খোকা', গ্রামবাসীর মিয়া ভাই, জনপ্রিয় শেখ সাহেব এবং সর্বোপরি সারা বিশ্বের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সেই মুক্তিদাতা তার জীবদ্দশায় মানবতার মুক্তিতে তিনি অগণিত ভাষণ দিয়েছেন। বজ্রকণ্ঠের সঙ্গে তর্জনী উঁচিয়েছেন অসংখ্য। গেরিলা যুদ্ধের কৌশল নিহিত থাকা মুক্তির সনদ ৭ মার্চের ওই ভাষণ আসলে যোগাযোগ বিজ্ঞানের তাত্ত্বিক প্রয়োগের এক বিস্ময়কর ঘটনা। যোগাযোগ বিষয়ে আধুনিক নিয়ম-কানুনের এক আশ্চর্য প্রতিফলন ঘটেছে ঐতিহাসিক সেই ভাষণে। প্রতি মিনিটে ৫৮ থেকে ৬০টি শব্দ উচ্চারণ করে বঙ্গবন্ধু ১৯ মিনিটে কালজয়ী এ ভাষণ দেন। সম্প্রচার তথ্যে প্রতি মিনিটে ৬০টি শব্দের উচ্চারণ একটি আদর্শ হিসাব। ১১০৭ শব্দের ওই ভাষণে ৫টি প্রশ্নের উত্থাপন ছিল। বিসমিলস্নাহির রাহমানির রাহিমের ১৯টি আরবি অক্ষরের আদলে বঙ্গবন্ধুর ১৯ মিনিটের ঐতিহাসিক ভাষণের ইসলামের ৫টি স্তম্ভের আদলেও ৫টি প্রশ্নের উত্থাপন ভাষণটিকে অভূতপূর্ব ও বিশেষত্বের মাত্রা জুগিয়ে দৃষ্টিনন্দন করে তোলে। প্রভাতের নির্মল আলোর ন্যায় স্নিগ্ধ ও চিরঞ্জীব বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সকল অসম, অন্যায়-অত্যাচার, জুলুম, নির্যাতন, নিপীড়ন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে পুরো জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে ধারাবাহিক আন্দোলন-সংগ্রাম ও সশস্ত্র যুদ্ধের বীরোচিত নেতৃত্বের মাধ্যমে 'বাংলাদেশ' নামক যে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন এর সূতিকাগার ছিল ৭ মার্চের ভাষণটি। তাই তো বিশ্বদরবারে বিরল মর্যাদায় অভিষিক্ত হয়েছে এটি। কার্যত ওই ভাষণটি ছিল আমাদের জাতীয় জীবনে এক যুগ সন্ধিক্ষণের দিকনির্দেশনা। কখনো ভোলা যায় না কালজয়ী সেই ভাষণের কথা। যেমনিভাবে বিশ্ববাসী ভুলতে পারেনি ১৮৬৩ খিষ্টাব্দে ১৯ নভেম্বর গেটিসবার্গ লড়াইয়ে প্রাণ বিসর্জনকারী সৈনিকদের উদ্দেশ্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ষোড়শ প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকনের 'এড়াবৎহসবহঃ ড়ভ :যব ঢ়বড়ঢ়ষব নু :যব ঢ়বড়ঢ়ষব ভড়ৎ :যব ঢ়বড়ঢ়ষব্থ ভাষণটি। রাজনৈতিক জীবনে সফল এই মানুষটি যখন বাংলাদেশ শাসনের হাল ধরলেন প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি হিসেবে, তখন তিনি সঙ্গী সহচরদের পেলেন বিশ্বাসঘাতক ও অকৃতজ্ঞ হিসেবে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাফল্যকে ম্স্নান করতে দূরভিসন্ধি এঁটে দিন-রাত মরিয়া হয়ে ওঠে তার ঘনিষ্ঠ সহচরদের কয়েকজন। সেই সূত্র ধরে আমরা বাঙালি জাতি আমাদের প্রিয় নেতাকে হারিয়ে ফেললাম ৭৫-এর ১৫ আগস্টে। বাঙালির কৃষ্ণতম দিনটির প্রথম প্রহরে স্বাধীনতাবিরোধী ঘাতকচক্র নির্মমভাবে হত্যা করে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। আগস্টের নির্মম হত্যাকান্ডে জাতির জনকের শরীরে মোট ২৯টি গুলি লেগেছিল। গুলি করে হত্যা করে তার স্ত্রী বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, বড় ছেলে শেখ কামাল, তার স্ত্রী সুলতানা কামাল, মেজো ছেলে শেখ জামাল, তার স্ত্রী পারভীন জামাল, ১০ বছরের শিশুপুত্র শেখ রাসেল, বঙ্গবন্ধুর ভগ্নিপতি ও তৎকালীন ভূমিমন্ত্রী আবদুর রব সেরনিয়াবাত, কিশোরী বেবি সেরনিয়াবাত, ৪ বছরের পুত্র সুকান্ত বাবু, আত্মীয় আবদুর নঈম খান রিন্টু, বঙ্গবন্ধুর ভাগ্নে ও আওয়ামী লীগের তৎকালীন চেয়ারম্যান শেখ ফজলুল হক মণি, তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আরজু মণি ও বঙ্গবন্ধুর ছোট ভাই শেখ নাসেরকে। বঙ্গবন্ধুকে রক্ষা করতে ৩২ নম্বর রোডের প্রবেশ মুখে নিহত হন তার সামরিক সচিব কর্নেল জামিল। হত্যা করা হয় বঙ্গবন্ধুর বাসায় নিরাপত্তার দায়িত্ব নিয়োজিত কয়েকজন কর্মকর্তা। যে ঘটনায় বিস্মিত হলো দেশবাসী। সেদিন প্রতু্যষে প্রতিদিনের পরিচিতি অনুষ্ঠান মালার পরিবর্তে ইথারে ভেসে এলো একটি বজ্রকণ্ঠ- 'আমি মেজর ডালিম বলছি, খন্দকার মোশতাক আহমেদের নেতৃত্বে শেখ মুজিবকে হত্যা করা হয়েছে'। সমগ্র বাংলাদেশে সামরিক শাসন জারি করা হলো। অনির্দিষ্টকালের জন্য সারাদেশে সান্ধ্য আইন বলবৎ থাকবে। জনগণ জানল, রাষ্ট্রপ্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নেই। ১৫ আগস্টের সকালে সবার দিনের কর্মসূচি বদলে গেল। সবাই যেন কর্মহীন। শুধু জল্পনা, কল্পনা, শোক, সান্ত্বনা, হতাশা-প্রত্যাশা। মুখে মুখে বঙ্গবন্ধুর হত্যার সংবাদ। পাশাপাশি আরেকটি কৌতূহল, কে এই মেজর ডালিম? কেন তারা মারল বঙ্গবন্ধুকে? এতটা নিষ্ঠুর কাজ করতে পারল কীভাবে? নেপথ্যে যতদূর জানা যায়, ঘটনার রাতে সামরিক কৌশল নির্ধারণের প্রাক্কালে অপারশনে উদ্যোগী অফিসারদের দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়। সেনানিবাসের স্কোয়াড্রন অফিসের টেবিলে ঢাকা শহরের ম্যাপ রেখে ভাগ করে দেওয়া হয় দায়িত্ব। অভু্যত্থান অধিনায়ক মেজর ফারুক এ সময়ে ধানমন্ডি ৩২ নম্বর সড়কের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাস ভবনটিকে হামলার নির্দেশ দেয় মেজর ডালিমকে। কিন্তু তা মানতে অস্বীকার করে। সে বলল, 'শেখ পরিবারের সাথে আমার সুসম্পর্ক। ওদের বিরুদ্ধে অস্ত্র উঁচিয়ে ধরা আমার পক্ষে অসুবিধা হতে পারে। তবে অন্য যে কোনো দায়িত্ব পালনে আমার আপত্তি নেই'। যদিও বঙ্গবন্ধু পরিবারে সরাসরি আক্রমণে তাকে দেখা যায়নি তথাপি জাতির জনকের হত্যাকান্ডে মেজর ডালিম অন্যতম সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে। মেজর ডালিমের আপত্তিতে শুধু দায়িত্ব বদলে যায়। বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে সরাসরি অপারেশন চালাতে এক নম্বর দলের তালিকায় থাকে মেজর নূর, মেজর হুদা, মেজর মহিউদ্দীন (আর্মড) ও মেজর মহিউদ্দীন (আর্টিলারি) প্রমুখ। মেজর শাহরিয়ারসহ মেজর ডালিমকে দেওয়া হয় দুই নম্বর দলের দায়িত্ব। মন্ত্রী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভগ্নিপতি আবদুর রব সেরনিয়াবাতের বাসভবনে আক্রমণ চালায় ঘাতকরা। বড় ছেলে আবুল হাসনাত প্রথমে সশস্ত্র প্রতিবাদও করেছিলেন। অপারেশন শেষে পাঁচ নম্বর দলের দখল করা রেডিও স্টেশনে গিয়ে মেজর ডালিম গোটা বিশ্বকে অভু্যত্থানের খবর জানায়। ঘড়ির কাঁটায় ছয়টা বাজার আগেই রেডিওতে বাজিয়ে দেওয়া হলো বজ্রকণ্ঠ- আমি মেজর ডালিম বলছি। বক্তব্যের বিষয় ঠিক থাকলেও ভাষা পরিবর্তিত হচ্ছিল, ঘাতকদের ঘোষিত শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করা হয়েছে পাল্টিয়ে বলা হয়- শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হয়েছে। জানানো হয় খন্দকার মোশতাক নতুন রাষ্ট্রপতি পদে অধিষ্ঠিত হয়েছেন। সেদিন সকালে মেজর ডালিমের ঘোষণা নিয়ে নানা রকম কৌতূহল, প্রশ্ন, বিতর্ক রয়ে গেছে। এদিকে ঘটনাবলির নেপথ্য নায়ক কর্নেল (অব.) ফারুক হত্যাকান্ডের ১৭ বছর পর বলল, ডালিমের ঘোষণাটি ছিল অপরিকল্পিত। সে যখন বলেছে শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করা হয়েছে, তখনও শেখ মুজিবুর রহমান জীবিত। অর্থাৎ মৃতু্যর আগেই দেশবাসী জানতে পারে সেই রাষ্ট্রপতি আর নেই। মেজর ডালিম সম্পর্কে বলতে হয়, মেজর ডালিমের আসল নাম হলো শরিফুল হক। পৈতৃক নিবাস কেরানীগঞ্জে তবে ঢাকার মালিবাগে স্থায়ী বসবাস দীর্ঘদিন থেকেই। পিতা শামসুল হক ছিলেন মৎস্য দপ্তরের কর্মকর্তা। মেজর ডালিমের সংসার আছে, সন্তান নেই। তার প্রিয় পত্নির নাম তাসনিম চৌধুরী ওরফে নিম্মি। তাদের বিয়েটা মহান মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সম্পর্কিত। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রাক্কালে পাকিস্তান থেকে এসে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিল সেনা সদস্য ডালিম। একদিন যুদ্ধে আহত হলে চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয় তাকে কলকাতায়। সেখানে তখন জনাব আর আই চৌধুরী ছিলেন কলকাতা মিশনের একজন কর্মকর্তা। তার মাধ্যমেই চিকিৎসার ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এ সময় আহত মুক্তিযোদ্ধাদের সেবা দিতে এগিয়ে আসেন চৌধুরীর তরুণী কন্যা নিম্মি চৌধুরী। সেই সেবা থেকেই সমবেদনা, সহানুভূতি, সাহচর্য এবং সুখময় সংসার গড়া। যুদ্ধ জয়ের পর স্বাধীন বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হয় তাদের শুভ বিবাহ। সেই বিয়েতে উকিল বাবা করা হয়েছিল জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। এই যোগসূত্রের অন্যতম কারণ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের তনয়া শেখ রেহানা ও নিম্মি চৌধুরীর পুরনো বন্ধুত্ব। আন্তরিকতার পটভূমি এ পরিবারে এতটাই প্রগাঢ় ছিল, ডালিম দম্পতি বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে নাইওর গিয়েছিল। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার পরিবারের সঙ্গে মেজর ডালিম ও মিসেস ডালিমের সম্পর্ক ছিল বিনি সুতোর মালায় গাঁথা। সেই গাঁথা মালা ছিঁড়ে ছিন্নভিন্ন হলো। ঘাতক তথা হীনম্মন্যরা এক মুজিবকে হত্যা করে তার নিশানা নিশ্চিহ্ন করতে চাইলেও মাটি ও মানুষের অবিসংবাদিত নেতা বাঙালির মাটি ও মানুষের অন্তরে তার অন্তরঙ্গ আসন স্বমহিমায় অধিষ্ঠিত করে গেছেন আলস্নাহর অসীম অনুগ্রহে। অনেক হীনম্মন্যরা বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে সমালোচনা করে থাকেন। আসলে আত্মসমালোচনার প্রয়োজন আছে কিন্তু তা করতে গিয়ে আমরা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তাকে হেয় প্রতিপন্ন করতে পারি না। কারণ স্পর্ধিত সাহসের মনুমেন্টখ্যাত জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ছোট করার অপচেষ্টা করলে আমরা নিজেরাই যে ছোট হয়ে যাই, এটা যে কোনো মূর্খের বোঝা উচিত। বোঝা উচিত একথাও ঢ়ড়ড়ৎ ধৎব :যড়ংব হধঃরড়হং যিড় ফড় হড়ঃ ড়িৎংযরঢ় :যবরৎ হধঃরড়হধষ যবৎড়বং. আমাদের অবিসংবাদিত সেই জাতীয় বীর টুঙ্গিপাড়ায় সমাহিত হলেও বাংলার কোটি হৃদয়ে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ সন্তান বাঙালির মুক্তিদাতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সুরম্য স্মৃতিসৌধ বিদ্যমান। মৃতু্যঞ্জয়ী বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে আমরা ভারতের মনীষী, সাহিত্যিক অন্নদা শংকর রায়ের অনবদ্য ছোট কবিতাটি আওড়াতে পারি এভাবে- 'যতদিন রবে পদ্মা, মেঘনা/ গৌরী যমুনা বহমান/ ততদিন রবে কীর্তি তোমার/ শেখ মুজিবুর রহমান'। অবিভক্ত ভারতের মহান নেতা চিত্তরঞ্জন দাসের মৃতু্যতে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন, এনেছিলে সাথে করে মৃতু্যহীন প্রাণ, মরণে তাহাই তুমি করে গেলে দান।' বঙ্গবন্ধুর সম্মানে আজ আমরা বলতে পারি, চক্রশীল আকাশে ও বিদারণশীল পৃথিবীতে যে অমর, অব্যয়, অক্ষয় নাম আমাদের কৃতার্থ, প্রাণিত, শানিত করে, সেটা হলো- বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবস হোক আমাদের জাতিসত্তার নবজাগরণের এক অনুপম উৎস। জ্ঞানভিত্তিক সুশীল, শান্তিময়, নিরাপদ ও আধুনিক তথা ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়তে সেই নবজাগরণের পথিকৃত হোক ১৫ আগস্টে হারিয়ে যাওয়া আমাদের সীমাহীন সঞ্জীবনী শক্তি। ১৫ আগস্টে শহীদ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ অন্য সব শহীদের আত্মার চিরশান্তি প্রত্যাশার পাশাপাশি জাতির জনকের তনয়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেক হায়াত ও সুস্থতা কামনার মহৎ ও সত্য উপলব্ধির সিংহ দুয়ার সবার জন্য উন্মুক্ত হোক- সেটাই প্রত্যাশিত। আবেদুর আর শাহীন : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

আরও খবর

সকল ফিচার

রঙ বেরঙ
উনিশ বিশ
জেজেডি ফ্রেন্ডস ফোরাম
নন্দিনী
আইন ও বিচার
ক্যাম্পাস
হাট্টি মা টিম টিম
তারার মেলা
সাহিত্য
সুস্বাস্থ্য
কৃষি ও সম্ভাবনা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

Copyright JaiJaiDin ©2021

Design and developed by Orangebd


উপরে