এরশাদের পতন: পর্দার আড়ালে যা ঘটেছিলবিবিসি বাংলা হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ১৯৯০ সালের ডিসেম্বর মাসের এক তারিখে ঢাকা সেনানিবাসে এক জরম্নরি বৈঠকে বসেন ঊর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তারা। সেই বৈঠকের উদ্দেশ্য ছিল প্রেসিডেন্ট এইচএম এরশাদ যেভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করছেন, সেই প্রেক্ষাপটে সেনাবাহিনীর ভূমিকা কী হওয়া উচিত, সে বিষয়ে আলোচনা করা।
এরশাদবিরোধী আন্দোলন তখন তুঙ্গে। এর কয়েকদিন আগেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকায় চিকিৎসক নেতা ডা. শামসুল আলম মিলনকে গুলি করে হত্যা করা হয়।
সেনানিবাসের ভেতর ঊর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তারা সিদ্ধান্ত্ম নেন দেশের চলমান সংকট একটি রাজনৈতিক বিষয় এবং এই সংকট সমাধানের জন্য রাষ্ট্রপতিকে রাজনৈতিক উদ্যোগ নিতে হবে। ঊর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তারা আরও সিদ্ধান্ত্ম নেন চলমান রাজনৈতিক সংকটে সেনাবাহিনীর করণীয় কিছু নেই।
এমন অবস্থায় এরশাদ সেনাসদরকে প্রস্ত্মাব দিয়েছিলেন যে, দেশে সামরিক আইন জারি করা হবে। এরপর ডিসেম্বরের তিন তারিখে তখনকার সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল নূর উদ্দিন এরশাদের সঙ্গে দেখা করতে যান।
সেনা কর্মকর্তারা চেয়েছিলেন যে সেনাবাহিনীর প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল নূর উদ্দিন যেন প্রেসিডেন্ট এরশাদকে পদত্যাগের জন্য সরাসরি বলেন।
কিন্তু সেনাপ্রধান প্রেসিডেন্ট এরশাদকে সরাসরি পদত্যাগের কথা না বললেও তিনি জানিয়ে দেন যে দেশের উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনীর অফিসাররা কোনো দায়িত্ব নিতে রাজি হচ্ছে না।
তখন ঢাকা সেনানিবাসে ব্রিগেডিয়ার পদে কর্মরত ছিলেন আমিন আহমেদ চৌধুরী, যিনি পরবর্তীতে মেজর জেনারেল হয়েছিলেন। চৌধুরী ২০১৩ সালে পরলোক গমন করেন।
২০১০ সালে বিবিসি বাংলার সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে জেনারেল চৌধুরী বলেন, উনি (সেনাপ্রধান) প্রেসিডেন্টকে বলেছিলেন আপনার উচিত হবে বিষয়টির দ্রম্নত রাজনৈতিক সমাধান করা। অথবা বিকল্প কোনো ব্যবস্থা নেয়া।
জেনারেল এরশাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী সামরিক শাসন জারির বিষয়ে সেনাবাহিনী একমত নয় বলে প্রেসিডেন্টকে পরিষ্কার জানিয়েছিলেন তখনকার সেনাপ্রধান।
প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সেনাপ্রধানের বৈঠক নিয়ে তখন দেশজুড়ে নানা গুঞ্জন। সেসব বৈঠক নিয়ে নানা অনুমান তৈরি হয়েছিল সে সময়।
একদিকে ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে নানা তৎপরতা অন্যদিকে রাস্ত্মায় এরশাদবিরোধী বিক্ষোভ। সব মিলিয়ে এক উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল।
ডিসেম্বর মাসের চার তারিখে সেনাবাহিনীর চিফ অব জেনারেল স্টাফ মেজর জেনারেল আব্দুস সালাম প্রেসিডেন্ট এরশাদকে সরাসরি বলেন যে তার পদত্যাগ করা উচিত।
জরম্নরি অবস্থা এবং কারফিউর মতো কঠোর পদক্ষেপের মাধ্যমেও যখন গণআন্দোলন দমানো যাচ্ছিল না তখন সেনাবাহিনীর দিক থেকে নেতিবাচক মনোভাব দেখলেন প্রেসিডেন্ট এরশাদ। এমন অবস্থায় ডিসেম্বরের চার তারিখ রাতেই পদত্যাগের ঘোষণা দেন জেনারেল এরশাদ।
তখন এরশাদ সরকারের ভাইস-প্রেসিডেন্ট ছিলেন মওদুদ আহমদ. যিনি বর্তমানে বিএনপির একজন সিনিয়র নেতা। মওদুদ আহমদ জানান সেনাবাহিনীর মনোভাব বোঝার পরেই পদত্যাগের সিদ্ধান্ত্ম নিতে দেরি করেননি এরশাদ।
সামরিক শাসক জেনারেল এরশাদ ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য নানা ধরনের কৌশল অবলম্বন করেছিলেন। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর আন্দোলন মোকাবিলার জন্য তিনি সাধারণ নির্বাচনের ঘোষণাও দিয়েছিলেন। কিন্তু বিরোধী রাজনৈতিক জোটগুলো এরশাদের সে প্রস্ত্মাব প্রত্যাখ্যান করে।
ডিসেম্বর মাসের চার তারিখে তখনকার ভাইস প্রেসিডেন্ট মওদুদ আহমদকে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেয়ার জন্য বাংলাদেশে টেলিভিশনে পাঠিয়েছিলেন এরশাদ। উদ্দেশ্য ছিল, প্রেসিডেন্টের পরিকল্পিত নির্বাচন সম্পর্কে বিস্ত্মারিত ব্যাখ্যা তুলে ধরা।
বিরোধী দলগুলো এ নির্বাচনের প্রস্ত্মাব আগেই বর্জন করার পরেও এরশাদ চেয়েছিলেন ভাইস প্রেসিডেন্টের মাধ্যমে নির্বাচন সম্পর্কে বিস্ত্মারিত ব্যাখ্যা তুলে ধরার মাধ্যমে জনগণকে আশ্বস্ত্ম করা।
এরশাদের নির্দেশমতো মওদুদ আহমদ সন্ধ্যার সময় বাংলাদেশ টেলিভিশনে গিয়েছিলেন ভাষণ রেকর্ড করার জন্য। সে ভাষণ তিনি রেকর্ডও করেছিলেন।
সে ভাষণ রেকর্ড করার পর মওদুদ আহমদ যখন বাসায় ফিরে আসেন তখন তিনি জানতে পারেন প্রেসিডেন্ট পদত্যাগের সিদ্ধান্ত্ম নিয়েছেন।
এরপর কয়েক ঘণ্টা পর মধ্যরাতে মওদুদ আহমদকে আবারও বাংলাদেশ টেলিভিশনে যেতে হয়েছিল এরশাদের পদত্যাগের ঘোষণা দেয়ার জন্য।
১৯৯০ সালের ৪ ডিসেম্বর রাতের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে মওদুদ আহমদ বলেন, 'প্রথম ভাষণ রেকর্ড করে আমি যখন বাসায় ফিরে আসলাম, তখন আমার স্ত্রী বললেন, প্রেসিডেন্ট সাহেব ফোন করেছিলেন। তখন আমি ওনাকে ফোন করলাম। উনি তখন বললেন, আমি এখনই পদত্যাগের সিদ্ধান্ত্ম নিয়েছি। তখন আমি ওনার বাসায় গেলাম। তখন রাতে নিউজের পরে ওনার পদত্যাগের ঘোষণা দেয়া হলো। '
এরশাদবিরোধী আন্দোলনে বিভিন্ন সময় ছন্দপতন হয়েছিল। ১৯৮৭ সালে একটি মিছিলে পুলিশের গুলিতে নূর হোসেন নিহত হওয়ার ঘটনা আন্দোলনে গতি এনেছিল।
আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির নেতৃত্বে রাজনৈতিক জোট একই সাথে আন্দোলন কর্মসূচি নিয়ে এগিয়েছে। জামায়াতে ইসলামীও মাঠে ছিল।
১৯৯০ সালের অক্টোবর মাস থেকে ছাত্র সংগঠনগুলো 'সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের' ব্যানারে আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিল।
সে সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ বা ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক ছিলেন বিএনপি সমর্থিত ছাত্র সংগঠন ছাত্রদলের নেতা খায়রম্নল কবির খোকন।
তিনি বলেন, ২৭ নভেম্বর চিকিৎসক নেতা ডা. শামসুল আলম মিলনকে হত্যার পর আন্দোলনের মোড় ঘুরে গিয়েছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসকে দখল করার জন্য বহিরাগত মাস্ত্মানরা পরিকল্পিতভাবে ডা. মিলনকে হত্যা করা হয়েছিল। এটা ছিল আন্দোলনের টার্নিং পয়েন্ট।
ডা. মিলন যখন রিকশায় করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা দিয়ে যাচ্ছিলেন তখন তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ডা. মিলনের সঙ্গে একই রিকশায় ছিলেন বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের তখনকার মহাসচিব ডা. মোস্ত্মফা জালাল মহিউদ্দিন।
অভিযোগ রয়েছে জেনারেল এরশাদসমর্থিত ছাত্র সংগঠনের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দখল চেষ্টার অংশ হিসেবে ডা. মিলনকে হত্যা করা হয়।
ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে ডা. মোস্ত্মফা জালাল মহিউদ্দিন বলেন, 'আমার রিকশাটা যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকায় উপস্থিত হয়েছে তখন মিলন আরেকটি রিকশায় করে আমাকে ক্রস করে সামনে চলে যাচ্ছিল। তখন আমি মিলনকে বললাম তুমি ওই রিকশা ছেড়ে আমার রিকশায় আস। এরপর মিলন আমার রিকশায় এসে ডানদিকে বসল। রিকশাওয়ালা ঠিকমতো একটা প্যাডেলও দিতে পারেনি। মনে হলো সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের দিকে থেকে গুলি এলো। গুলিটা মিলনের বুকের পাশে লেগেছে। তখন মিলন বলল, জালাল ভাই কী হইছে দেখেন। একথা বলার সঙ্গে সঙ্গে সে আমার কোলে ঢলে পড়ল। '
ডা. মিলনকে হত্যার পর জেনারেল এরশাদ বিরোধী আন্দোলন আরও তুঙ্গে ওঠে। তখন জনগণের ক্ষোভের বিষয়টি বিবেচনায় নিতে শুরম্ন করেছিল সেনাবাহিনী।
একইসঙ্গে জেনারেল এরশাদের ওপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহারের প্রক্রিয়াও শুরম্ন করেছিল সেনাবাহিনী।
ডা. মিলন হত্যাকা-ের পর আন্দোলন সামাল দিতে সেনাবাহিনী মোতায়েন করতে চেয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট এরশাদ। সেনা মোতায়েনের জন্য জেনারেল এরশাদ যথেষ্ট চাপ প্রয়োগ করেছিলেন।
প্রয়াত মেজর জেনারেল আমিন আহমেদ চৌধুরীর বর্ণনা মতে, সেনাবাহিনী সৈনিকদের পাঠিয়ে রাস্ত্মায় মোতায়েন করার পরিবর্তে রমনা পার্কে সীমাবদ্ধ করে রাখে। কমান্ডিং অফিসাররা সরকারের 'অপকর্মের' দায়িত্ব নিতে রাজি ছিলেন না।
জেনারেল এরশাদ ক্ষমতা ছাড়লে কী হবে সে বিষয়টি নিয়ে আন্দোলনকারী দলগুলো নিজেদের মধ্যে ঐকমত্যের ভিত্তিতে একটি ফর্মুলা ঠিক করে রেখেছিল। সে ফর্মুলা মতে সাধারণ নির্বাচন পরিচালনার জন্য তিনমাস মেয়াদি একটি অন্ত্মর্র্বর্তীকালীন সরকার গঠনের কথা ছিল।
কিন্তু সে অন্ত্মর্র্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান কে হবেন সেটি তখন নির্ধারিত ছিল না।
ড. কামাল হোসেন তখন আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতার পাশাপাশি সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতিও ছিলেন।
তিনি জানালেন, জেনারেল এরশাদের পদত্যাগের ঘোষণা দেয়ার পর আন্দোলনকারী দলগুলো তখনকার প্রধান বিচারপতি মো. সাহাবুদ্দিন আহমদের বিষয়ে একমত হয়েছিল।
অস্থায়ী সরকার প্রধানের নাম আসার পর ৬ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতির দপ্তরে ক্ষমতা হস্ত্মান্ত্মরের প্রক্রিয়া হয়েছিল।
ক্ষমতা হস্ত্মান্ত্মর প্রক্রিয়া সম্পর্কে ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, 'পাঁচ তারিখে বিরোধী দল থেকে আনুষ্ঠানিক প্রস্ত্মাব আসলো যে প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দিন সাহেব উপ-রাষ্ট্রপতির পদ গ্রহণ করে তারপর ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির কাজ করবেন তিনি এবং তার অধীনেই একটি নির্দলীয় সরকার হবে। ছয় তারিখ বিকেল তিনটায় আমি রিজাইন করলাম। আমি রিজাইন করার পরে সাহাবুদ্দিন সাহেবকে ভাইস-প্রেসিডেন্ট এপয়েন্ট করলেন প্রেসিডেন্ট সাহেব। তারপর প্রেসিডেন্ট এরশাদ নিজে রিজাইন করলেন এবং তারপর সাহাবুদ্দিন সাহেব ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করে গণতন্ত্রের নতুন যাত্রা শুরম্ন করলেন।'
ডিসেম্বর মাসের চার তারিখে জেনারেল এরশাদ যখন পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছিলেন, তখন রাস্ত্মায় মানুষের যে ঢল নেমেছিল সেটি ৬ ডিসেম্বর বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদের কাছে জেনারেল এরশাদের ক্ষমতা হস্ত্মান্ত্মর পর্যন্ত্ম বজায় ছিল।
 
এই প্রতিবেদন সম্পর্কে আপনার মতামত দিতে এখানে ক্লিক করুন
শেষের পাতা -এর আরো সংবাদ
অনলাইন জরিপ
অনলাইন জরিপআজকের প্রশ্নজঙ্গিবাদ নিয়ে মন্ত্রীদের প্রচারে আস্থাহীনতার সৃষ্টি হয়েছে_ বিএনপি নেতা আসাদুজ্জামান রিপনের এই বক্তব্য সমর্থন করেন কি?হ্যাঁনাজরিপের ফলাফল
আজকের ভিউ
পুরোনো সংখ্যা
2015 The Jaijaidin