ওরা সংগ্রামী ওরা জয়িতাজীবন সংগ্রামে নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে অর্জিত সফলতায় আজ প্রশান্ত্মির ঢেঁকুর তুলেছেন নিজ নিজ অবস্থানে। এরা হলেন- অর্থনৈতিকভাবে সফল নারী রহিমা বেগম, কর্মক্ষেত্রে সফল নারী রোজিনা খাতুন, সফল জননী নারী সাহারা বেগম, নির্যাতনের বিভীষিকা মুছে ফেলে নতুনভাবে জীবন শুরম্ন করেছেন ঝর্ণা বেগম এবং সমাজ উন্নয়নে অসামান্য অবদান রেখে সফলতা অর্জন করেছেন সুফিয়া খাতুন। সাফল্যের কাহিনী তুলে ধরেছেন বড়াইগ্রামের আশরাফুল ইসলামরোজিনা খাতুনজীবন সংগ্রামে নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে অর্জিত সফলতায় আজ প্রশান্ত্মির ঢেঁকুর তুলেছেন নিজ নিজ অবস্থানে। এরা হলেন- অর্থনৈতিকভাবে সফল নারী রহিমা বেগম, কর্মক্ষেত্রে সফল নারী রোজিনা খাতুন, সফল জননী নারী সাহারা বেগম, নির্যাতনের বিভীষিকা মুছে ফেলে নতুনভাবে জীবন শুরম্ন করেছেন ঝর্ণা বেগম এবং সমাজ উন্নয়নে অসামান্য অবদান রেখে সফলতা অর্জন করেছেন সুফিয়া খাতুন। সফল ওই ৫ নারীর কর্মকা- সরেজমিনে দেখা যায়-

রহিমা বেগম
উপজেলার মাঝগাঁও ইউনিয়নের বাহিমালী গ্রামে তার বাড়ি। স্বামী দিনমজুর ইমান আলী ভাদুরী। রহিমা বেগম বলেন, বিয়ের বয়স হতে না হতে বাবা ও মা দিনমজুরের সঙ্গে বিয়ে দেয়। স্বামীর সংসারে এসে দেখি সংসারে তেমন কিছুই নেই। দিনমজুরে কাজ করে সংসার চলতো। এরই মধ্যে শ্বশুরবাড়ি থেকে বের করে দেয়। অন্যের বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে জীবন শুরম্ন করি। ব্র্যাক সমিতিতে ভর্তি হয়ে গরম্ন-ছাগল, হাঁস-মুরগি পালন করে সংসার চালাতে থাকি। পরে ব্র্যাকের আওতায় স্বাস্থ্য সেবিকার কাজ শুরম্ন করি। এতে সংসারের আয় বৃদ্ধি পাওয়ায় আর পেছনের দিকে তাকাতে হয়নি। এমনিভাবে আমাদের সংসারে একটি ছেলে ও একটি মেয়ে হয়। মেয়েটি বিয়ে দিয়েছি। ছেলেটি এসএসসি পাস করে ঢাকায় গার্মেন্টে কাজ করছে। বর্তমানে আমি ১ বিঘা জমি কিনেছি ও ৪ বিঘা জমি বন্ধক নিয়েছি। আমার সংগ্রামীজীবনে ছেলেমেয়ে ও স্বামীকে নিয়ে সুখে সংসার করতে পারছি। এখন আমি অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী।

রোজিনা খাতুন
উপজেলার চান্দাই ইউনিয়নের দাশগ্রাম গ্রামের বাচ্চু প্রামাণিকের মেয়ে রোজিনা খাতুন। তিনি বলেন, আমার বয়স যখন এক বছর তখন মা-বাবা পৃথক হয়ে যায়। বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করেন। আর মা আমাকে নিয়ে অন্যের বাড়িতে কাজ করে জীবনযাপন শুরম্ন করেন। পরে আমার ভবিষ্যৎ চিন্ত্মা করে নানার বাড়িতে রেখে ঢাকায় গার্মেন্টে কাজ শুরম্ন করেন। আমাকে সফল মানুষ করার চেষ্টায় স্কুলে ভর্তি করে দিয়ে পড়ালেখা চালিয়ে নিয়েছেন। ব্র্যাক স্কুলে প্রাথমিক ও দাশগ্রাম মাদ্রাসা থেকে দাখিল, আলিম, ফাজিল এবং কামিল পাস করি। এর মাঝে গ্রামের ব্র্যাক প্রি-প্রাইমারি স্কুলে আমি একজনের পরিবর্তে চাকরি করতাম। পরে তারা আমার যোগ্যতা অভিজ্ঞতা দেখে আমাকে স্থায়ীভাবে স্কুলটার দায়িত্ব দিয়ে দেয়। এখন আমি এই স্কুলে চাকরি করছি। মা আমাকে বুকে আগলে আছেন। সেই মহীয়সী মায়ের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য অবিরাম চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।

সাহারা বেগম
উপজেলার গোপালপুর ইউনিয়নের নারায়াণপুর গ্রামের মমতাজ হোসেনের স্ত্রী সাহারা বেগম। তিনি বলেন, পিতা-মাতা আমাকে মাত্র ১৪ বছরে বিয়ে দেন। অনেক আগ্রহ থাকলেও পড়ালেখার সুযোগ হয়নি। স্বামী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক ছিলেন। বড় সংসার, আমার সংসারে একে একে ৬টি পুত্র ও ৩টি কন্যা সন্ত্মানের জন্ম হয়। স্বামীর আর্থিক অবস্থা মোটামোটি ভালো ছিল। স্বামীর সংসারে জায়গা-জমি তদারকি ও সন্ত্মানদের পড়াশোনার দেখাভাল করতে হতো। পরে সন্ত্মানদের ভালো শিক্ষার জন্য বাড়ি ছেড়ে একটানা ১২ বছর রাজশাহীতে ভাড়া বাসায় থেকেছি। ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার খরচ জোগাতে প্রায় ১৫ বিঘা জমি বিক্রি করতে হয়েছে। ফলশ্রম্নতিতে আমার ৯টি সন্ত্মানের ৮টিকে এমএ পাস এবং সব ছোট মেয়েটাকে এমবিবিএস ডাক্তার বানাতে সক্ষম হয়েছি। আমার স্বামী যৌথ পরিবারের সন্ত্মান হওয়ায় পরিবারের সকল দায়-দায়িত্ব পালন করতে হতো। এখনও আমার সন্ত্মানরা যৌথ পরিবারে বসবাস করছে। বর্তমানে আমার সন্ত্মানদের অবস্থা স্বচ্ছল এবং তারা সমাজে প্রতিষ্ঠিত। আমি সন্ত্মানদের সুশিক্ষায় শিক্ষিত করতে পেরে পূর্বের কষ্টের কথা ভুলে গেছি। সন্ত্মানদের সুশিক্ষায় শিক্ষিত করতে পেরে আমি যেমন খুশি হয়েছি তেমনি শান্ত্মি পেয়েছি এবং আমি একজন গর্বিত মা হিসেবে গর্ববোধ করি।

ঝর্ণা বেগম
উপজেলার জোয়াড়ী ইউনিয়নের কুমরম্নল গ্রামের আনোয়ার হোসেনের মেয়ে ঝর্ণা বেগম। তিনি বলেন, বিয়ের বয়স না হতেই বাবা-মা এক মুদি দোকানির সঙ্গে ৮ম শ্রেণি পড়া অবস্থায় বিয়ে দিয়ে বিদায় করেন। স্বামী দিনমজুর। বিয়ের পর স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির সবাই অত্যাচার নির্যাতন করে, যৌতুকের জন্য চাপ দেয়। বিয়ের ৪ বছর পরে আমি গর্ভবতী হই। গর্ভের সন্ত্মানের বয়স ৬ মাস হলে স্বামী আল্ট্রাসনোগ্রাম করে দেখেন মেয়ে সন্ত্মান হবে। তখন আমাকে মারধর করে বাড়ি থেকে বের করে দেয়। ওই অবস্থায় বাবার বাড়িতে চলে আসি। এ অবস্থা দেখে আমার বৃদ্ধ মা স্ট্রোক করে মারা যান। আমার দুঃখের জীবন শরম্ন হয়। পরে ব্র্যাক পলস্নী সমাজ থেকে ৪টি ছাগল ও ৫টি মুরগি দেয়। সেই থেকে আমার জীবনে বেঁচে থাকার সংগ্রাম শুরম্ন। পরে আমার মেয়ের জন্ম হয়। বর্তমানে আমার মেয়ে বনপাড়া মহিলা কলেজে অনার্সে পড়াশোনা করছে। আমাকে তালাক দেয়নি কিন্তু কোনো খরচও দেয় না। বর্তমান অর্থনৈতিকভাবে আমি অনেকটাই স্বাবলম্বী।

সুফিয়া খাতুন
উপজেলার মাঝগাঁও ইউনিয়নের আটুয়া গ্রামের আবুল হোসেনের স্ত্রী সুফিয়া খাতুন। তিনি বলেন, বিয়ের বয়স হতে না হতেই এক দিনমজুরের সঙ্গে বিয়ে দেয় বাবা-মা। সংসারে স্বচ্ছলতা ফিরাতে বিয়ের কিছুদিন পর থেকে আমার সংগ্রামী জীবন শুরম্ন হয়। সংসারে গরম্ন ছাগল হাঁস মুরগি পালন করে সংসার চালাতে থাকি। এরপর আমার কোলে সন্ত্মান আসে। সন্ত্মানের ভবিষ্যৎ ভেবে আরও কঠিন পরিশ্রম শুরম্ন করি। পরে নিজের সঙ্গে এলাকার হতদরিদ্র মানুষদের জড়িয়ে কাজ শুরম্ন করি। এক সময় পরিচিতি বাড়ে আমার। ইউনিয়ন পরিষদের বিভিন্ন কমিটি এবং পুলিশিং কমিটিতে অংশগ্রহণ করে সরকারি-বেসরকারি সেবা মানবাধিকার লঙ্ঘনজনিত ঘটনার প্রতিবাদ করতে শুরম্ন করি। সংসারে জমি বন্ধক নিয়ে আয় বৃদ্ধি পাওয়ায় আর পিছনের দিকে তাকাতে হয়নি। এখন আমি সমাজের ঝগড়া বিবাদসহ সালিশে অংশগ্রহণ, মেয়েদের বিয়ের পর বিবাহ রেজিস্ট্রেশনে উদ্বুদ্ধকরণ, পারিবারিক নির্যাতন রোধ, বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ, জন্ম ও মৃতু্য নিবন্ধনে উদ্বুদ্ধ ও সহযোগিতামূলক কাজ করে চলছি। এ ছাড়া এলাকার গর্ভবতী মহিলাদের পরামর্শসহ সরকারি-বেসরকারি সুযোগ-সুবিধাসহ গরিব মানুষের উন্নয়ন করার চেষ্টায় কাজ করে চলছি। নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার সংগ্রামী ওই ৫ নারীকে তাদের এ সফলতাকে সম্মান জানাতে দেয়া হয়েছে জয়িতার স্বীকৃতি। স্বীকৃতির সনদ ও ক্রেস্ট তুলে দিয়ে তাদের সম্মানিত করেছেন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সাবেক সফল প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক আব্দুল কুদ্দুস এমপি। বেগম রোকেয়া দিবসে তাদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেছিলেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার আনোয়ার পারভেজ। আর সংগ্রামী নারীদের অনুসন্ধান করে মঞ্চে আসার পথ তৈরি করেছেন উপজেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা রাশেদা পারভীন।
 
এই প্রতিবেদন সম্পর্কে আপনার মতামত দিতে এখানে ক্লিক করুন
অনলাইন জরিপ
অনলাইন জরিপআজকের প্রশ্নজঙ্গিবাদ নিয়ে মন্ত্রীদের প্রচারে আস্থাহীনতার সৃষ্টি হয়েছে_ বিএনপি নেতা আসাদুজ্জামান রিপনের এই বক্তব্য সমর্থন করেন কি?হ্যাঁনাজরিপের ফলাফল
আজকের ভিউ
পুরোনো সংখ্যা
2015 The Jaijaidin
close