পাঠক মতআবুল বাজানদার থেকে শিক্ষা গ্রহণমো. মাকসুদ উল্যাহ চিকিৎসক, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ঢাকা যেদিন প্রথম ডাক্তারি শুরম্ন করেছি, সেদিন থেকেই দেখে আসছি আমাদের অধিকাংশ লোক কৃতজ্ঞতা স্বীকার করতে জানে না। বরং যে উপকার করবে, আমাদের লোকেরা তার ক্ষতি করবে এবং তার বিরম্নদ্ধে অত্যান্ত্ম আপত্তিকর অভিযোগ করবে! আমি নিজে ডাক্তারি করতে গিয়ে অনেকবার এ ধরনের পরিস্থিতির শিকার হয়েছি! ইন্টার্নীর সময় গাইনি বিভাগে বাচ্চা প্রসবের পর এক মহিলার পেশাবের নমুনা পরীক্ষা করার জন্য প্যাথলজি বিভাগে পৌঁছানোর জন্য তার লোনো স্বজন উপস্থিত ছিল না। এটা জেনে নিজে দয়াপরবশ হয়ে নিজ হাতে তার পেশাবের নমুনার পরীক্ষানল প্যাথলজি বিভাগে পৌঁছে দিয়ে টাকার রশিদ তার হাতে বুঝিয়ে দিয়েছিলাম। পরবর্তীতে মেয়েটি অভিযোগ করেছে, কোনো ডাক্তারই নাকি আসে না। চিকিৎসা নাকি হচ্ছে না! ইন্টার্নির সময়ে মেডিসিন বিভাগে এক রোগী বুকব্যথা নিয়ে ভর্তি হয়। তাকে উপযুক্ত ওষুধ প্রয়োগ করলাম। তার কাগজপত্র লেখালেখি করাসহ শুধু তার জন্য তখনকার মতো মোট ত্রিশ মিনিটের মতো সময় লাগল। জিজ্ঞাসা করলাম এখন কেমন লাগছে? ব্যথা কমছে কি-না? বললো, একটু কমেছে। রোগীর চেহারার দিকে তাকিয়ে নিজেও বুঝতে পারলাম, ব্যথা কমেছে। তার দুই মিনিট পরেই আক্ষেপ করে রোগী বললো, 'আমার জন্য এখনো কিছুই করলেন না!' এক সময় এক রোগীকে রাত ৪টায় চিকিৎসা দিয়েছি। পরের সকালে সে তার বেড ডাক্তারকে বলে, রাতে কোনো ডাক্তার ছিল না ওয়ার্ডে। অথচ সেই রাতে ওয়ার্ডের সেই কক্ষের বাকি আরও দুজন রোগীকেও রাত ১১টায় এবং ভোর সাড়ে ৪টায় চিকিৎসা দিয়েছি। এগুলো অসভ্যতা। মানুষ আবেগ দিয়ে এমন অসভ্যতা করে। তারা ভেবে দেখে না যে, তারা কী বলতেছে। এক সময় ওয়ার্ডে ১৩-১৪ বছর বয়সি এক ছেলে ভর্তি ছিল। তার অবস্থা গুরম্নতর ছিল। সেদিন ছুটির দিন ছিল। সকালে চারজন ডাক্তার ডিউটিতে ছিলাম। সর্বমোট প্রায় চলিস্নশ জনের মতো রোগী ছিল ওয়ার্ডে। ডিউটিরতদের মধ্যে আমি ছিলাম সবার সিনিয়র। শুধু সেই ছেলেটার জন্য আমি আমাদের চারজন ডাক্তারের মধ্যে একজন ডাক্তারকে আলাদা করে নিয়োগ রেখেছিলাম। আমরা বাকি তিনজন বাকি ঊনচলিস্নশ রোগী দেখতেছিলাম। এর মধ্যেও আমি নিজে থেকে সেই ছেলেটার শারীরিক অবস্থা সতর্কতার সাথে পর্যবেক্ষণ করত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করছিলাম। ছেলেটির অবস্থা হঠাৎ করে খুব খারাপ হয়ে যায়। সকালে বিভাগীয় প্রধান এসে রোগীকে দেখে পরামর্শ দিয়ে গেছেন আমাদেরকে। নিজের জুনিয়রকে দৌড়ের ওপর রেখেছিলাম সেই ছেলেটার জন্য। সেই জুনিয়র ডাক্তারকে নিজে গিয়ে আইসিইউ এবং বক্ষব্যাধি বিভাগে রেফারেল পৌঁছাতে বাধ্য করেছিলাম। কিন্তু ছেলেটি মারা যায়। তারপর ছেলেটির মা বলতে থাকে, একটা ডাক্তারও ছিল না। কোনো চিকিৎসাই হয়নি! রোগী বেঁচে গেলে কদাচিৎ তারা বলে আলস্নায় সারাইছে! মারা গেলে বলে, ডাক্তার ছিল না! ডাক্তারের দোষ! ডাক্তারের অবহেলা আর ভুল চিকিৎসা! আল কোরআনে আলস্নাহ বলেন, বস্ত্মুত তাদের কোনো কল্যাণ সাধিত হলে তারা বলে যে, এটা সাধিত হয়েছে আলস্নাহর পক্ষ থেকে। আর যদি তাদের কোনো অকল্যাণ হয়, তবে বলে, এটা হয়েছে তোমার পক্ষ থেকে। সুরা নিসা, আয়াত-৭৮। এগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। আমাদের রোগীদের নিত্যনৈমিত্তিক আচরণ এগুলো! এ ধরনের দুঃখজনক ঘটনার সর্বশেষ উদাহরণ, আবুল বাজানদার। ভ্যানচালক হিসেবে দিন আনে দিন খায় অবস্থায় ছিল সে। সে অপুষ্টিতে ভুগছিল। হঠাৎ তার একটি রোগ দেখা দেয়। সে হয়ে ওঠে বৃক্ষমানব। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর তত্ত্বাবধানে তার চিকিৎসা চলে আড়াই বছর। ২৫ বার অপারেশন হয় তার। ঢাকা মেডিক্যালে তাকে জামাই আদরে চিকিৎসা দেয়া হয় এবং উন্নত পরিবেশে উন্নত খাবার প্রদান করা হয়। তার আড়াই বছর আগের চেহারা আর এখনকার চেহারা তুলনা করলেই বুঝতে পারবেন। সে শেষ পর্যন্ত্ম নাকি হাসপাতাল থেকে পালিয়েছে!
তারপর ডাক্তারদের বিরম্নদ্ধে মিডিয়াতে অভিযোগ করতেছে! নিজে মোটা চালের ভাত খেয়েই বড় হয়েছি। এখন মোটা চাল খাইনা, কারণ সেটা হাতের কাছে পাই না। পেলে আগ্রহ সহকারে খাব। কিন্তু আবুল বাজানদার নাকি মোটা চালের ভাত খেতে পারে না। অথচ হাসপাতালের অন্য সব রোগী সরবরাহকৃত মোটা চালের ভাত খায়! অন্য রোগীরা এসি ছাড়া দিন কাটায়। তার নাকি এসি ছাড়া চলে না! হায়! উলোবনে মুক্তা ছড়ালে এমনই হয়। যে যতটুকুর উপযুক্ত, তাকে তার চাইতে বেশি দিলে এমনই হয়! দশ বছর ধরে ডাক্তারি করি। কোথাও কোনো জমি কেনাতো দূরের কথা, লেখাপড়া করতে ঢাকায় এসে ছোট দুটি কক্ষের সাবলেটে থাকি। একটি বেসিনও নাই। সরম্ন একটি গোসলখানা! গোসল করার সময় বালতি রাখতে চাইলে নিজে ঠিকমতো জায়গা নিয়ে দাঁড়াতে পারি না। বারান্দাতো নেইই! শুনেছি ঢাকা মেডিকেলের চর্ম যৌন রোগ বিভাগের প্রফেসর কবির চৌধুরী স্যার আবুল বাজানদারকে সর্বমোট ছয় লাখ টাকা দিয়েছেন বাড়ি করার জন্য! একজনের একটা বিরল রোগ হলে তাকে ছয় লাখ টাকা দিয়ে বদান্যতা দেখাতে হবে? সে ছিল ভ্যানচালক। কোনো যোগ্যতা নাই তার। কোনো যোগ্যতা পরিশ্রম ছাড়া কারও হাতে ছয় লাখ টাকা তুলে দিলেতো এমনটা হবেই। এখন দেখা যাচ্ছে তার ফলাফল কী? অযোগ্য লোককে এভাবে অতি উপকার করলে তারা এটার মূল্য বুঝে না! ছয় লাখ দূরের কথা, হালাল উপায়ে ত্রিশ হাজার টাকা কীভাবে আয় করতে হয়, তাইতো সে জানে না! দরিদ্র পরিবারের এসএসসি এইচএসসি পাস কত যুবক একটি চাকরির খোঁজে ক্লান্ত্ম। বর্তমান যুগে অধিকাংশ চাকরির জন্য কম্পিউটারের ব্যবহার জানা আবশ্যক। কম্পিউটারের নানামুখী ব্যবহার শেখার জন্য বিশ-ত্রিশ হাজার টাকার প্রশিক্ষণ গ্রহণ করলেই হয়। আবুল বাজানদারকে ছয় লাখ টাকা না দিয়ে বিশ জন এইচএসসি পাস বেকার যুবককে ত্রিশ হাজার টাকা করে কম্পিউটার প্রশিক্ষণের জন্য দিলে তারা সবাই কম্পিউটার ব্যবহার শিখে ভালো চাকরি পেত এবং ত্রিশ হাজার টাকার মূল্য বুঝতে পারতো! কিন্তু আবুল বাজানদার ছয় লাখ টাকার মূল্য দিতে জানল না! বানরের গলায় মুক্তার হার। গত আড়াই বছরে তার চিকিৎসার জন্য সরকারের এবং ডাক্তারদের যত সময় ও অর্থ ব্যয় হয়েছে, তা দিয়ে বার্ন ও পস্নাস্টিক সার্জারি বিভাগের গড়পরতা অন্ত্মত ৩০০ রোগীকে চিকিৎসা দেয়া যেত! কিন্তু সে এখন বিশ্রী অভিযোগ করতেছে ডাক্তারদের বিরম্নদ্ধে! আমাদের অধিকাংশ রোগী কখনোই ডাক্তারদের কাজের স্বীকৃতি দেয় না। কেননা তারা মনে করে তাদের রোগতো এমনিতেই ভালো হয়ে যেত! হাসপাতালে আসলে রোগতো এমনিতেই ভালো হয়ে যায়! কিন্তু কোনো ডাক্তার আসেনি! কোনো চিকিৎসাই তারা পায়নি! হাসপাতালে এসেছে বিধায় রোগ এমনিতেই ভালো হয়ে গেছে! তবে হাতে গোনা কিছু ব্যতিক্রম আছে। তাছাড়া সে অভিযোগ করতেছে, তার এই রোগ নাকি বংশগত না! অথচ তার রক্তের নমুনা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মাধ্যমে বাইরের দেশ থেকে পরীক্ষা করে আনা হয়েছে! অতএব, দেখা গেল এদেশের রোগীরা চিকিৎসা বিষয়ে কেমন মনগড়া অভিযোগ করে! তারা মনে করে বড় বর ডাক্তারদের সাথে হাসপাতালে কিছুদিন ঘুরলেই যে কেউ ডাক্তার হয়ে যায়! তাদের চিকিৎসা করার জন্য কাগজপত্র লিখতে ডাক্তারদের যে সময় ব্যয় হয়, সেটাকে তারা কখনোই তাদের চিকিৎসার অংশ বলে মনে করে না! সে কারণেই তারা অভিযোগ করে, তাদের জন্য ডাক্তারেরা কোনো সময় দেয় নি! এসব ঘটনা থেকে চিন্ত্মাশীল ব্যক্তিরা যেন শিক্ষা গ্রহণ করে!
 
এই প্রতিবেদন সম্পর্কে আপনার মতামত দিতে এখানে ক্লিক করুন
অনলাইন জরিপ
অনলাইন জরিপআজকের প্রশ্নজঙ্গিবাদ নিয়ে মন্ত্রীদের প্রচারে আস্থাহীনতার সৃষ্টি হয়েছে_ বিএনপি নেতা আসাদুজ্জামান রিপনের এই বক্তব্য সমর্থন করেন কি?হ্যাঁনাজরিপের ফলাফল
আজকের ভিউ
পুরোনো সংখ্যা
2015 The Jaijaidin
close