নানুবাড়িতে মেহমুমরম্নমান হাফিজ অনেকদিন ধরেই মেহমুম বলে আসছে তাকে নানুবাড়িতে নিয়ে যেতে। বারবার দিনক্ষণ ঠিক করেও যাওয়া হয়নি তার। মেহমুমের স্কুল, কোচিং, বাবার অফিসের ব্যস্ত্মতা- সব মিলিয়ে আর সময় বের করা যাচ্ছে না। তবুও বারবার আম্মুর কাছে জিজ্ঞেস করতে থাকে মেহমুম, কবে যাবে নানুর বাড়িতে?
আচ্ছা এবার বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হোক, আব্বুকে বলব অফিস থেকে ছুটি নিতে, একসঙ্গে আমরা কিছুদিন নানুর বাড়িতে থেকে আসব। আম্মুর কথা শুনে কী যে খুশি মেহমুম! আম্মুকে জড়িয়ে ধরে অনেকগুলো চুমু খায়। তখন থেকেই অপেক্ষা করতে থাকে, কখন যে পরীক্ষাটা শেষ হবে আর নানুর বাড়িতে বেড়াতে যাবে।
মেহমুম এবার চতুর্থ শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষা দিচ্ছে। পড়ালেখায় সে অনেক ভালো। শুধু কি পড়ালেখা? মেহমুম গান, আবৃত্তি, ছবি আঁকা- এগুলোতেও অনেক পারদর্শী। এজন্য স্কুলের ছোট-বড় সবার কাছে সে প্রিয়মুখ। স্কুলের অনুষ্ঠানগুলোতে মেহমুমের পারফরম্যান্স সবার কাছেই প্রশংসনীয়। এরই মধ্যে অনেকগুলো প্রতিযোগিতায় সে সাফল্য অর্জন করেছে। আর এজন্য আব্বু-আম্মুসহ স্কুলের সবাই মেহমুমকে নিয়ে ভীষণ গর্ববোধ করেন।
আজ মেহমুমের বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হয়েছে। বাসায় এসেই আম্মুর কাছে প্রশ্ন-
- আম্মু, আজ তো পরীক্ষা শেষ হলো, নানুবাড়িতে কখন যাব?
- হঁ্যা মা, বলেছি তো যাব, তাড়াহুড়ো কিসের?
- আম্মু, তুমি না বললে বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হলেই নানুবাড়িতে নিয়ে যাবে। পিস্নজ আম্মু।
- আচ্ছা ঠিক আছে, তোমার আব্বু অফিসের কাজ শেষ করে নিক, তারপর...।
সেদিন রাতেই বাসায় ফেরেন মেহমুমের আব্বু বাছিত সাহেব। তিনি বেসরকারি সংস্থায় ঊর্ধ্বতন পদে চাকরি করেন। সব সময়ই বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত্ম থাকতে হয় তাকে। একমাত্র মেয়ে মেহমুমকেও তেমন সময় দিতে পারেন না। এ জন্য তার নিজের কাছেই অনেক খারাপ লাগে। কিন্তু কী আর করা? রাতে বাসায় ফিরে বেশির ভাগ সময়ই মেহমুমকে ঘুমের মধ্যে পান। আর সকালে তো অফিসে যাওয়ার ব্যস্ত্মতা।
খাবার খেতে বসে মেহমুমের আম্মু জিজ্ঞেস করেন, আচ্ছা অফিস থেকে ছুটি নিচ্ছ কবে? মেহমুমের পরীক্ষা তো শেষ। এখন তো সে নানুর বাড়িতে বেড়াতে যাবে বলে অনেক আশা নিয়ে বসে আছে।
- মনে হয় এবার ছুটি পাচ্ছি না, এ মাসেই বিদেশে একটা প্রোগ্রামে যেতে হচ্ছে।
খাবার মুখে উত্তর দেন বাছিত সাহেব।
স্বামীর না-বাচক উত্তরে একদম অপ্রস্তুত ছিলেন মেহমুমের আম্মু। শুধু মেয়ে নয়, তিনি নিজেও অনেকদিন ধরে সেই আশায় ছিলেন। উত্তরটা শুনে মেহমুমের আম্মুর মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। কী বলবেন তখন, কিছুই বুঝতে পারছেন না। এদিকে মেয়েকে কী বলবেন? না যাওয়ার কথা বললে তো ও ভীষণ কষ্ট পাবে। এটা কি ঠিক হবে? এই চিন্ত্মায় রাতে ঘুমাতেই পারেননি তিনি।
পরদিন সকালবেলা ঘুম থেকে উঠেই আম্মুর কাছে প্রশ্ন করে মেহমুম। আমরা আজ যাচ্ছি তো? জানো আম্মু, আমি না রাতে অনেক স্বপ্ন দেখেছি, নানু আমাকে নিয়ে ঘুরতে গেলেন, গল্প করতে করতে অনেক কিছুই দেখালেন। আরও কী করেছেন জানো? দাদু আমাকে পুকুরে সাঁতার শেখাতে নিয়ে গেলে আমি পানিতে নেমেই ভয়ে কাঁদতে শুরম্ন করি। নানু আমাকে আদর করে গোসল করিয়ে দিলেন। আচ্ছা আম্মু বলো না, আমরা কবে যাব?
মেয়ের প্রশ্নে নিজেকে ঠিক করে বললেন, হঁ্যা আম্মু, আমরা তো যাবই। আম্মু তুমি কাঁদছ যে! কী হয়েছে? কই, না তো! মেয়ের স্বপ্নের কথা শুনে তিনি হারিয়ে যান শৈশবের সেই দিনগুলোতে। তাই নিজের অজান্ত্মেই চোখের কোণ বেয়ে অশ্রম্ন ঝরতে থাকে। কতই না সুখের ছিল সেই দিনগুলো। কিন্তু ইট-পাথরের এই শহুরে জীবনে ছেলেমেয়েরা এসব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। সবাই ব্যস্ত্ম, অবসর কোথায়? তাদের কাছে এসব কেবলই গল্প।
মেয়েকে কীভাবে 'না' বলবেন, সেই চিন্ত্মায় তিনি অস্থির। হঠাৎ মাথায় একটা বুদ্ধি এলো-আচ্ছা, মুহিতকে দিয়ে তো মেহমুমকে পাঠানো যাবে। সে নিয়ে গেলে তো আর ঝামেলা হবে না। মুহিত মেহমুমের ছোট মামা। সবেমাত্র এসএসসি দিয়েছে। এখন খানিকটা ফ্রি। তাই মুহিতকে ফোন করে দুপুরের মধ্যেই বাসায় নিয়ে আসা হলো। খাবার শেষ করেই মেহমুমকে প্রস্তুত করে দিলেন আম্মু। ব্যাগে কাপড়-চোপড় সব ঠিকঠাকমতো ঢুকিয়ে দিলেন।
বাসার গেট পর্যন্ত্ম এগিয়ে দিয়ে আম্মু বললেন, মেহমুম, তুমি নানুবাড়িতে সবার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করবে, সবাইকে সালাম দেবে। জি আচ্ছা আম্মু, মেহমুম উত্তর দেয়। মেয়ের কপালে চুমু দিয়ে বিদায় জানান। গাড়ি ছুটে চলল শহর ছেড়ে গ্রামের দিকে। সন্ধ্যার সঙ্গে সঙ্গে তারা পৌঁছে যায়। নানুবাড়ির সবাই বেরিয়ে আসেন মেহমুমকে এগিয়ে নিতে। তা দেখে মেহমুম রীতিমতো অবাক! সবার এত এত আদরে সে হারিয়ে যায় অন্য এক জগতে। ঘরে এসে সবার সঙ্গে অনেকক্ষণ গল্পগুজব হয় মেহমুমের। রাতে খাবার খেতে সবাই একসঙ্গে বসেন। নানু তখন বললেন, মেহমুম, কাল সকালবেলা তোমাকে নিয়ে ঘুরতে যাব। সবজিবাগান, মাছের পুকুর- সবই দেখাব, কেমন। জি আচ্ছা, নানু। খাওয়া শেষ করে নানুর কাছে ঘুমাতে যায় মেহমুম। নানু তখন মেহমুমকে গল্প শোনাতে লাগলেন। এভাবে এত আদর-আপ্যায়ন করবে, তা ভাবতেও পারেনি। নানুর গল্প শুনতে শুনতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়ে, তা টেরই পায়নি মেহমুম...।
 
এই প্রতিবেদন সম্পর্কে আপনার মতামত দিতে এখানে ক্লিক করুন
অনলাইন জরিপ
অনলাইন জরিপআজকের প্রশ্নজঙ্গিবাদ নিয়ে মন্ত্রীদের প্রচারে আস্থাহীনতার সৃষ্টি হয়েছে_ বিএনপি নেতা আসাদুজ্জামান রিপনের এই বক্তব্য সমর্থন করেন কি?হ্যাঁনাজরিপের ফলাফল
আজকের ভিউ
পুরোনো সংখ্যা
2015 The Jaijaidin
close