পূর্ববর্তী সংবাদ
নতুন বছরে নতুন চিন্ত্মাকামাল লোহানী আরও একটি নতুন বছর এলো। পহেলা জানুয়ারি। আন্ত্মর্জাতিকভাবে এই দিনটি পালিত হয়। বাংলাদেশও ১ জানুয়ারি ইংরেজি নববর্ষ পালনে জাঁকজমকপূর্ণ প্রস্তুতি আনন্দানুষ্ঠান আয়োজন করে। আলোকসজ্জা উৎসব ও প্রীতি সমাবেশ আর সঙ্গীতানুষ্ঠানের আয়োজন করে। কার্ড পাঠান অসংখ্যজনের 'হ্যাপি নিউ ইয়ার' শুভেচ্ছা জানিয়ে। কিন্তু এদের পহেলা বৈশাখ যা আমাদের প্রকৃতি এবং উৎপাদনের সঙ্গে সম্পর্কিত, সেই বাংলার মানুষের চিরন্ত্মন, ঐতিহ্যবাহী বাংলা বছরের প্রথম দিনটিকে পালন করেন না, শুভেচ্ছাপত্র বিনিময় করতে কার্পণ্য করেন। এই হীনমন্যতা দেশের জনগোষ্ঠীকে ক্রমেই গ্রাস করে বিদেশিদের চাপিয়ে দেয়া বাধ্যতামূলক 'নিউ ইয়ার' পালনকে বর্ণময় করে তুলছেন আর নিজ ঐতিহ্য ও কৃষ্টি ভুলে বসতে বসতে নতুন প্রজন্মকেও ঠেলে দিয়েছেন সেদিকে। সবাই এ বিজাতীয় কালচার মেনে নিচ্ছেন না বটে কিন্তু তাদের সাধ্য আর সামর্থ্য মতো উপভোগও করতে পারছেন না। আমার ধারণা, রাষ্ট্রকে এগিয়ে আসতে হবে এবং নিজ ঐতিহ্যকে লালনের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। ইংরেজি নববর্ষ আনন্দানুষ্ঠান হোক কিন্তু নিজ সংস্কৃতি ও জাতীয় কৃষ্টিকে বিলুপ্ত অপমানিত করে নয়। সে ক্ষেত্রে শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে শুরম্ন করে আবার আচরণের যে পরিবর্তন মুক্তিযুদ্ধ শেষে আনা উচিত ছিল। সেটা যথাসময়ে তো বটেই, পরেও যথেচ্ছচার করার সুযোগ দিয়েছে বলেই আজ বিদেশি কৃষ্টি আমাদের ওপর ঐতিহ্য হয়ে চেপে বসতে চাইছে মাত্র মুষ্টিমেয় মানুষের কারণে। এর বিচার আদৌ কি প্রয়োজন আছে? আমরা কেন বাংলার নববর্ষের দিনপঞ্জিকা প্রচলনে উৎসাহী হচ্ছি না? ভিনদেশি 'কালচারকে অসম্মান অবশ্যই আমরা করতে চাই না। তাই বলে এগুলো গোটা জাতিকে গ্রাস করবে তাও তো মেনে নেয়া যায় না। যায় না কিন্তু নীরব দর্শক হয়ে বসে থাকলে কিন্তু ওই ভিনদেশি আচার-আচরণ পোশাক-পরিচ্ছদ অনুষ্ঠান-আয়োজন আমাদের ঐতিহ্যে দাসবৃত্তির উপাচারগুলো জেঁকে বসছে। এ বিষয়ে আপত্তি না থাকলেও নিজ ঐতিহ্য কৃষ্টি বিলুপ্ত হতে দিতে পারি না। তাহলে তো নিজ পরিচয়ই ধ্বংস হয়ে যাবে।
এ ক্ষেত্রে মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে যে ধারা পুনঃপ্রতিষ্ঠা হওয়া উচিত ছিল, তা হয়নি। আমরা কি দেশের অভ্যন্ত্মরে বাংলা বর্ষপুঞ্জি চালু করতে পারি না। উন্নয়নের জোয়ার নাকি বইছে দেশে, তাহলে আমাদের এই ভূ-খ-ের জনগোষ্ঠীর আদর্শিক বিষয়গুলোয় কেন পালন করতে পারছি না? ধর্মান্ধতা ও সাম্প্রদায়িকতার কাছে আত্মসমর্পণ করে আমরা বাংলার চিরন্ত্মন সংস্কৃতিকে রক্ষা করতে পারব না। আমরা আজ শুভ নববর্ষ বলতে ১ জানুয়ারি আর ইংরেজি নতুন বছরকে বোঝাই। অথচ আমাদের নববর্ষ বর্ষবরণ কী অসাধারণ আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আজও বাংলার ঘরে ঘরে পালিত হচ্ছে আর যত সামান্যই হোক সে আয়োজন, সে তো আমার নিজস্ব সংস্কৃতি। শহরে, নগরে কিছু বাঙালি জনগোষ্ঠীর পর্ব পার্বণ আয়োজন করে তাকে ধরে রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। বঙ্গবাসীর চিরন্ত্মন ঐতিহ্যকে ভুলে আমদানি করা পোশাক-খাবারে প্রবলভাবে আকৃষ্ট হন সবাই সারাটা বছর। এই হীনমন্যতার জন্য আমরাই দায়ী, যারা সংস্কৃতিচর্চা করি কিংবা বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চাকে লোভ লাভের প্রাপ্তি হিসেবে গ্রহণ করেন। তাদের প্রাধান্য দেখি সমাজে।
এ সব থেকে মুক্তি পেতে হলে বাংলার মানুষের হাজার হাজার বছরের ঐতিহ্য-সংস্কৃতিকে ভুলে যাওয়া চলবে না। এটাই এই ভূ-খ-ের বসবাসকারী মানুষের কামনা। আমরা পরাশ্রয়ী কিংবা পরভোজী হতে চাই না। তাই তো অন্যকে অবমাননা নয়, নিজ ঐতিহ্যকে লালন, সংরক্ষণ ও চর্চার পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। বিষয়টিকে সুষ্ঠুভাবে
চিন্ত্মা করে মুক্ত স্বদেশের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যপূর্ণ প্রচারে ব্রতী হওয়া কি উচিত নয়? আমাদের নজর এই 'বয়ে যাওয়া' অনুপ্রবেশটি 'কালচার'কেই প্রশ্রয় দিতে দিতে নিমগ্নতা আমরা হারিয়ে ফেলছি। এই জায়গাটাকে সংস্কার করা প্রয়োজন।
এই নজরদারি নেই বলেই 'থার্টিফার্স্ট নাইট' পালনে উটকো সব আয়োজন আমাদের নতুন প্রজন্মকে ঠেলে দিচ্ছে বেলেলস্নাপনার দিকে।
এভাবে প্রচলিত ইংরেজি বছরে আমাদের সাধ্য-সাধনার সঙ্গে কর্মফলের সংযোজন নিয়ে দু'একটা কথা বলল। দেশে উন্নয়ন ঘটেছে বলে সরকারের মন্ত্রী-সচিব, নেতাকর্মীদের মুখ থেকে শুনেছি অনেক। দেখেছি না যে তাও বলব না। বিশ্ব ব্যাংকের সঙ্গে টক্কর দিয়ে ওদের মিথ্যাচারকে ছুড়ে ফেলে 'পদ্মা সেতু' আমরা নিজেদের অর্থায়নে নির্মাণ করছি, এ এক বিরাট অর্জন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রায় শেষ পর্যায়ে। ফাঁসি হয়েছে নিজামী, কাদের মোলস্না, মীর কাসেমসহ অনেকেরই। আমাদের এ এক বিশাল পাওয়া অবশ্যই।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণকে স্বীকৃতি দিয়ে 'মেমরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল রেজিস্টারে' (এমওডবিস্নউ) তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। এমওডবিস্নউ-তে এটাই প্রথম কোনো বাংলাদেশি দলিল, যা আনুষ্ঠানিক ও স্থায়ীভাবে সংরক্ষিত হবে। বাঙালির শ্রেষ্ঠতম কবিতা অভূতপূর্ব জাগরণের বিশুদ্ধ সংগীত ৭ মার্চের ভাষণ। পৃথিবীর নানা দেশের ৪২৭টি অতি গুরম্নত্বপূর্ণ ডকুমেন্টের সঙ্গে যুক্ত হলো ৭ মার্চের ভাষণ। এর ফলে মুক্তিযুদ্ধের আগমুহূর্তে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি ও বাংলাদেশের অবিসংবাদিত নেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা ও মহান মুক্তিযুদ্ধের দিকনির্দেশনামূলক বক্তৃতা সারা পৃথিবীর মানুষের তথ্যভিত্তিক ঐতিহ্যের মর্যাদা লাভ করল। ২০১৭ সালে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর তৎপরতার কারণে জঙ্গিরা মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারেনি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শৈথিল্যের সুযোগে তারা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার চেষ্টা করেছিল। কমছে না সড়ক দুর্ঘটনা। থামছে না মৃতু্যর মিছিল। গত বছর সড়ক দুর্ঘটনায় কয়েকশ মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। সড়ক দুর্ঘটনা প্রাকৃতিক নয়, মানবসৃষ্ট কারণ। সে হিসেবে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতরা পরোক্ষভাবে হত্যারই শিকার হন। কিন্তু হত্যাকারীদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্ত্মমূলক শাস্ত্মির আওতায় আনার জনাকাঙ্ক্ষিত উদ্যোগ নেই বাংলাদেশে। ফলে সড়ক দুর্ঘটনা না কমে জ্যামিতিক হারেই বেড়ে চলছে।
বছরের সমাপ্তি ঘটেছে দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো প্রধান বিচারপতিকে দিয়ে। বাকি সময়ে হাইকোর্টে নিষ্পত্তি হয়েছে সবচেয়ে বড় মামলা পিলখানায় হত্যাযজ্ঞের মামলা। সাবেক ব্রিটিশ হাইকমিশনারের ওপর গ্রেনেড হামলা মামলায় রিভিউ খারিজ হওয়ায় হুজি নেতা মুফতি হান্নানসহ তিনজনের ফাঁসির দ- কার্যকর করা হয়েছে। গত বছরের ১৬ জানুয়ারি বহুল আলোচিত নারায়ণগঞ্জের সাত খুন মামলার রায়ে প্রধান আসামি নূর হোসেন এবংর্ যাবের তিন কর্মকর্তাসহ মোট ২৬ আসামির বিরম্নদ্ধে মৃতু্যদ-াদেশ দিয়েছে আদালত। উলেস্নখ্য, এ মামলায় আসামি ছিল মোট ৩৫ জন। বাকি ৯ আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদ- দিয়েছে আদালত।
আমাদের ২৩ বছরে যে পরিমাণ সম্পদ অপহরণ করেছে কিংবা একাত্তরে যে হত্যা, খুন, ধর্ষণ, লুট, অগ্নিসংযোগ ইত্যাদির কি কোনো ক্ষতি দাবি করেছি? আজ ওই ৪৬ বছর পরেও পাকিস্ত্মানি নাগরিকদের পাকিস্ত্মানিরা ফেরত নেয়নি, আমরা তাদের পোষে যাচ্ছি। এর কিছুই বিহিত হয়নি। ব্যাংকিং খাতে বাংলাদেশ ব্যাংক যে বিশাল অঙ্কের কেলেঙ্কারি, অর্থ পাচার প্রমাণ দিয়েছে, তার কি বিহিত হয়েছে?
সাম্প্রদায়িকতা আর সাম্রাজ্যবাদ, লুট-দুর্নীতি, ভোগ-বিলাসিতার বিরম্নদ্ধে মানুষকে জাগ্রত করার প্রত্যয় ব্যক্ত হয়েছে। রাজনীতির পাশাপাশি সুষ্ঠু পরিপূরক সহায়ক শক্তি হিসেবে সংস্কৃতিকে তুলে ধরতে হবে। গণসংস্কৃতির এই বিকাশে সাহসী ভূমিকার অপেক্ষায় রইলাম।
রাষ্ট্র পরিচালনায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ প্রধান রাজনৈতিক দল, বঙ্গবন্ধুর সংগঠন। তার উদারতা ও আদর্শ দেশকে সঠিক পথে পরিচালিত করবে, এটাই আমাদের সবার কামনা। নতুন বছরটা কিছু উন্নতির কথা শুনবো তো বটেই, তেমনি রাজনীতিতে সৃজনশীলতা সৃষ্টি হোক- এই কামনা রইল।
 
পূর্ববর্তী সংবাদ
এই প্রতিবেদন সম্পর্কে আপনার মতামত দিতে এখানে ক্লিক করুন
অনলাইন জরিপ
অনলাইন জরিপআজকের প্রশ্নজঙ্গিবাদ নিয়ে মন্ত্রীদের প্রচারে আস্থাহীনতার সৃষ্টি হয়েছে_ বিএনপি নেতা আসাদুজ্জামান রিপনের এই বক্তব্য সমর্থন করেন কি?হ্যাঁনাজরিপের ফলাফল
আজকের ভিউ
পুরোনো সংখ্যা
2015 The Jaijaidin
close