জ্বালানি উন্নয়নে বাংলাদেশ ও জার্মানিবিশ্ব উন্নয়নের কক্ষপথে। সে উন্নয়নে জ্বালানি চাহিদা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। চাহিদার সঙ্গে সরবরাহ বজায় রাখতে নানা দেশে নানাভাবে জ্বালানি খাতে নানা রকম সংস্কার বা রূপান্ত্মর চলছে। অর্থাৎ জ্বালানি খাত উন্নয়ন হচ্ছে। সে উন্নয়নের প্রকার ও প্রকৃতি পর্যালোচনায় এ-প্রবন্ধে স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশ এবং উন্নত দেশ হিসেবে জার্মানিকে বেছে নেয়া হয়েছে। আর্থিক প্রবৃদ্ধির দর্শনে বিশ্ব এখন দুই ধারায় বিভক্ত : (ক) জ্বালানি ব্যবহার বৃদ্ধিতে জিডিপি বৃদ্ধি পায়।ড. এম. শামসুল আলম বিশ্ব উন্নয়নের কক্ষপথে। সে উন্নয়নে জ্বালানি চাহিদা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। চাহিদার সঙ্গে সরবরাহ বজায় রাখতে নানা দেশে নানাভাবে জ্বালানি খাতে নানা রকম সংস্কার বা রূপান্ত্মর চলছে। অর্থাৎ জ্বালানি খাত উন্নয়ন হচ্ছে। সে উন্নয়নের প্রকার ও প্রকৃতি পর্যালোচনায় এ-প্রবন্ধে স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশ এবং উন্নত দেশ হিসেবে জার্মানিকে বেছে নেয়া হয়েছে। আর্থিক প্রবৃদ্ধির দর্শনে বিশ্ব এখন দুই ধারায় বিভক্ত : (ক) জ্বালানি ব্যবহার বৃদ্ধিতে জিডিপি বৃদ্ধি পায়। আবার জিডিপি বৃদ্ধি হলে জ্বালানি ব্যবহার বৃদ্ধি হয়। এভাবে চক্রাকারে উভয় প্রবৃদ্ধি অব্যাহত থাকে। (খ) জিডিপির অব্যাহত বৃদ্ধিতে জ্বালানিপ্রবাহ/ব্যবহার হ্রাস অব্যাহত থাকে। জার্মানিতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি দ্বারা কার্বণযুক্ত জ্বালানি প্রতিস্থাপন ও জ্বালানির ব্যবহার কমানোর কার্যক্রম বাস্ত্মবায়নে প্রতি বছর ব্যয় হয় ২ হাজার ৬০০ কোটি ইউরো (জিডিপির ১২%)। জ্বালানি ব্যবহার বৃদ্ধি দ্বারা আর্থিক প্রবৃদ্ধি নয়, আর্থিক প্রবৃদ্ধি দ্বারা জ্বালানি ব্যবহার হ্রাসই জার্মানির উন্নয়ন দর্শন। বাংলাদেশের উন্নয়ন দর্শনে জ্বালানি উন্নয়ন কার্যক্রম এ লেখায় খতিয়ে দেখা হয়েছে।
২.
বাংলাদেশের আয়তন ১ লাখ ৪৭ হাজার ৫৭০ বর্গকিলোমিটার। জনসংখ্যা ১৬০ মিলিয়ন। বাংলাদেশের মতো এত বেশি ঘন জনবসতির দেশ বিশ্বে বিরল। প্রাকৃতিক সম্পদ সীমিত। কৃষিনির্ভর। সিংহভাগ বিদেশি মুদ্রা আসে অদক্ষ শ্রমশক্তি ও তৈরি পোশাক রপ্তানি থেকে। মাথাপিছু আয় ১ হাজার ৫০০ ডলার। প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ২ শতাংশ। গড় আয়ু ৭০ বছর। উন্নয়নের এমন ধারা অব্যাহত থাকায় বাংলাদেশ এখন মধ্যম আয়ের দেশ হতে চলেছে। তবে বিগত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশটি প্রাথমিক জ্বালানি ও বিদু্যৎ সংকটে আছে। ফলে আর্থিক প্রবৃদ্ধির ওই ধারা এখন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। ফলে এ উন্নয়ন টেকসই কিনা তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। তাই জ্বালানি ও বিদু্যৎ সঙ্কট মোকাবেলা করা এখন দেশটির জন্য জরম্নরি। সে সঙ্কট মোকাবেলায় চলতি অর্থবছরে প্রায় ৩ হাজার মেগাওয়াট তেলভিত্তিক বিদু্যৎ উপাদনক্ষমতা জরম্নরিভিত্তিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে। সেই সঙ্গে ১ হাজার মিলিয়ন সিএফডি এলএনজিও আমদানি হচ্ছে। সঙ্কট মোকাবেলায় তেল ও এলএনজি আমদানি বাড়ছে। নিজস্ব কয়লা উত্তোলন এবং জল-স্থলের গ্যাস অনুসন্ধান গুরম্নত্ব্ব পাচ্ছে না।
৩.
বাংলাদেশে জ্বালানি সংস্কারের (রূপান্ত্মর) লক্ষ্য : এ-খাত উন্নয়নে (ক) প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা, (খ) ব্যক্তি খাত বিনিয়োগ নিশ্চিত করা, এবং (গ) ভোক্তাদের অংশগ্রহণ ও ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা। এ-লক্ষ্য অর্জনে- (ক) একীভূত বা সমন্বিত ইউটিলিটি বিভাজিত হয়েছে, (খ) বিভাজিত ইউটিলিটিগুলো বাণিজ্যিকীকরণ করা হয়েছে এবং (গ) স্বাধীন ও নিরপেক্ষ রেগুলেটরি সংস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
৪.
বাস্ত্মবে দেখা যায়, প্রেক্ষিত পরিকল্পনা, ষষ্ঠ ও সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা এবং বিদু্যৎ খাত মহাপরিল্পনায় প্রদর্শিত পথে জ্বালানি ও বিদু্যৎ খাত উন্নয়ন না হওয়ায় চাহিদা মাফিক জ্বালানি ও বিদু্যৎ সরবরাহ হয়নি। আবার গ্যাস ও বিদু্যতের মূল্যহার বৃদ্ধি থামেনি। ফলে সঙ্কট মোকাবেলা করা যায়নি। পলিসি ও পরিকল্পনা উপেক্ষা করে বছরের পর বছর ধরে জরম্নরি বিবেচনায় এডহকভিত্তিক ব্যবস্থাদির আওতায় জ্বালানি ও বিদু্যৎ সরবরাহ বজায় রাখা হচ্ছে। নতুন আইন (বিশেষ বিধান) দ্বারা বিদু্যৎ ও জ্বালানি খাত উন্নয়ন প্রতিযোগিতা মুক্ত করা হয়েছে। বাণিজ্যিক বিবেচনায় বিতরণ ইউটিলিটি বিভাজিত হয়ে সরকারি মালিকানাধীন নানা কোম্পানিতে পরিণত হলেও কোম্পানি ভেদে লাভ/লস যাই হোক না কেন বেতন-ভাতাদি ও আর্থিক সুযোগ সুবিধাদির ক্ষেত্রে কোনো তারতম্য নেই। অর্থাৎ তা সমান এবং সরকারি স্কেল ও সুযোগ-সুবিধাদির তুলনায় অনেক বেশি। অর্থাৎ বিদু্যৎ বিতরণ প্রতিযোগিতাহীন। ফলে এ খাত সংস্করণ বা রূপান্ত্মরণ ফলপ্রসূ হয়নি।
৫.
ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তি হলেও সাগরের গ্যাস গ্রিডে আসেনি। সে-গ্যাস অনুসন্ধানেও অগ্রগতি নেই। মজুদ বৃদ্ধি ছাড়া স্থলভাগের গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধি জ্বালানি সঙ্কটকে ঘনীভূত করেছে। কয়লা-বিদু্যৎ উৎপাদন বৃদ্ধির উদ্যোগ গৃহীত হলেও সে-বিদু্যৎ গ্রিডে আসেনি। অথচ জ্বালানি মিশ্রে তরল জ্বালানি (তেল) কমানোর পরিবর্তে ক্রমাগত বৃদ্ধি দ্বারা বিদু্যৎ উৎপাদন বৃদ্ধি অব্যাহত রাখা হয়েছে। অর্থাৎ গ্যাস তথা জ্বালানি সঙ্কট মোকাবেলায় তরল জ্বালানি ব্যবহার বৃদ্ধি অব্যাহত আছে। ফলে এ-গ্রীষ্মে ব্যয়বহুল তেল-বিদু্যৎ উৎপাদন হতে পারে মোট বিদু্যতের ৪০ শতাংশের বেশি। পাশাপাশি এলএনজির কারণে গ্যাসও ব্যয়বহুল। এ সত্ত্বেও জ্বালানি তেলের সরবরাহ ব্যয় সাশ্রয়ের জন্য তেল শোধনাগারের শোধনক্ষমতা বৃদ্ধি করা হয়নি। স্বাধীনতার পরপর ১৫ লাখ টন শোধন ক্ষমতাসম্পন্ন তেল শোধনাগার 'ইস্টার্ন রিফাইনারি' নির্মাণ করা হয়। জ্বালানি তেল আমদানি বৃদ্ধি অব্যাহত আছে। এখন সে-তেল আমদানি হয় বছরে ৫৫ লাখ টন। অথচ শোধন ক্ষমতা সেই ১৫ লাখ টনই রয়ে গেছে। আবার তেল আমদানি ব্যয় হ্রাস সমন্বয় না করায় ২০১৫-১৬ অর্থবছরে বিদু্যৎ উৎপাদন ব্যয়বৃদ্ধি হয় ২ হাজার ৮৬৩ কোটি টাকা।
৬.
বিদু্যৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত গ্যাসের বর্তমান মূল্যহার ৩ টাকা ১৬ পয়সা। এলএনজি মিশ্রণের ফলে সে গ্যাসের মূল্যহার ১০ টাকা প্রস্ত্মাব করা হয়েছে। ভোক্তা পর্যায়ে সে-গ্যসের মূল্যহার বৃদ্ধি পাবে ভারিত গড়ে ৭৫ শতাংশ। অর্থাৎ বর্তমানে গ্যাসের মূল্যহার ভারিত গড়ে ৭ টাকা ৩৯ পয়সা। এলএনজি আসায় সে-মূল্যহার হবে ১২ টাকা ৯৫ পয়সা। গত বছর মার্চ ও জুন মাসে দুই দফায় ভোক্তা পর্যায়ে গ্যাসের মূল্যহার প্রায় সাড়ে ২২ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়। দেশীয় কোম্পানি তথা বাপেক্স দ্বারা গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধি করা হলে কম খরচে অর্থাৎ ১ টাকারও কম মূল্যহারে অধিক গ্যাস কেনা যায়। পিএসসির আওতায় অধিক মূল্যহারে (৩ টাকা ২৬ পয়সা) বিদেশি কোম্পানির উৎপাদিত গ্যাস ক্রয় বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়। এই বিবেচনায়, 'গ্যাস উন্নয়ন তহবিল' গঠিত হয়। বাস্ত্মবে দেখা যায়, গ্যাস উন্নয়ন তহবিল কোনো কাজে আসেনি। এ-তহবিলের অর্থ অনুদানের পরিবর্তে ঋণ দিয়ে দেশীয় কোম্পানিকে ঋণগ্রস্ত্ম করায় তাদের সক্ষমতা উন্নতির পরিবর্তে অবনতি হচ্ছে। বাপেক্সের পরিবর্তে বিদেশি কোম্পানিকে দিয়ে গ্যাস উত্তোলন করায় বাপেক্সের গ্যাস ক্রয় মূল্যহার এখন ৩ টাকা। অর্থাৎ বিদেশি কোম্পানির (আইওসি) গ্যাস ক্রয় মূল্যহারের কাছাকাছি। গ্যাসের মূল্যহার এলএনজি আসায় যেমন বাড়ছে, পিএসসির আওতায় বিদেশি কোম্পানির উৎপাদিত গ্যাস বেশি বেশি ক্রয় করা এবং দেশীয় কোম্পানির পরিবর্তে বিদেশি কোম্পানির ঠিকাদারিতে গ্যাস উৎপাদন করায় সে-মূল্যহার তেমন বাড়ছে।
৭.
ভোক্তা পর্যায়ে এলএনজি সরবরাহ ব্যয়হার জ্বালানি বিভাগের হিসাবে প্রায় ৩০ টাকা। অথচ পরিবহনে সিএনজি ও এলপিজি ব্যবহার হয় যথাক্রমে ৪০ ও ৫০ টাকা মূল্যহারে। এলএনজির মূল্যহারের সঙ্গে সমতা রক্ষার্থে সিএনজি ও এলপিজির মূল্যহার কমিয়ে কম-বেশি ৩০ টাকা করা যৌক্তিক ও ন্যায়সংগত। কিন্তু তা হয়নি। নীতি ও ন্যায্যতা উপেক্ষিত। বরং সিএনজির মূল্যহার ৪০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪৮ টাকা করা হবে।
৮.
'সবার জন্য বিদু্যৎ' কর্মসূচি পলিসি বিভ্রান্ত্মির শিকার। তাই এ-কর্মসূচি ব্যয়বহুল হচ্ছে। ফলে বিদু্যৎ উৎপাদন ও বিতরণে আর্থিক ঘাটতি অতিমাত্রায় বেড়েছে। ২০১৫ সালে যখন মূল্যহার পুনর্নির্ধারিত হয়, তখন পাইকারি বিদু্যতের মূল্যহার ছিল ভারিত গড়ে ৪ টাকা ৯০ পয়সা। কিন্তু প্রান্ত্মিক বিদু্যৎ গ্রাহক সংখ্যা ও সাবসিডি মূল্যহারে বিদু্যৎ বিক্রির পরিমাণ বৃদ্ধিতে সে-মূল্যহার কমে হয় ৪ টাকা ৮৪ পয়সা। ২০১৫ সালে আরইবি ছাড়া সব বিতরণ ইউটিলিটির পাইকারি বিদু্যতের মূল্যহার ৪ টাকা ৯০ পয়সার অধিক ছিল। তখন কেবল আরইবিই রেয়াতি মূল্যহার সুবিধা পায়। ২০১৭ সালে বিদু্যতের মূল্যহার পুনর্নির্ধারণের আদেশে পাইকারি বিদু্যতে ঘাটতিহার ৭১ পয়সা হলেও সে মূল্যহার পরিবর্তন করা হয়নি। ৪ টাকা ৮৪ পয়সায় রাখা হয়। অথচ সে আদেশে আরইবি বর্ধিত হারে রেয়াতি সুবিধা পায়। নেসকো ও ওজোপাডিকো লি. নতুনভাবে এ সুবিধার আওতায় আসে। হিসেবে দেখা যায়, রেয়াতি সুবিধার কারণে পাইকারি বিদু্যতে আর্থিক ঘাটতি ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ছিল প্রায় ৫০০ কোটি টাকা। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৪ হাজার কোটি টাকারও বেশি। এ ঘাটতি বৃদ্ধি আগামীতেও অব্যাহত থাকবে।
৯.
এমন অবস্থায় বিদু্যৎ খাতকে বাণিজ্যিক খাতে পরিণত করা কঠিন। অথচ বাণিজ্যিক বিবেচনায় গ্রিড সম্প্রসারণ এবং ফসিল ফুয়েল (কার্বণযুক্ত জ্বালানি) বিদু্যৎ উৎপাদন বৃদ্ধির কৌশল গ্রহণের পাশাপাশি সমন্বিতভাবে নবায়নযোগ্য বিদু্যৎ উৎপাদন বৃদ্ধির কৌশল গৃহীত হয়নি। হলে একদিকে এ বিদু্যৎ বাজার সম্প্রসারণ হতো, অন্যদিকে বিদু্যৎ খাত আর্থিক ঘাটতির শিকার হতো না এবং বিদু্যৎ ঘাটতি মোকাবেলা করা সহজ হতো। জ্বালানির দরপতন সুবিধাবঞ্চিত ভোক্তাদের বিদু্যতের মূল্যহার বারবার বেশি বেশি বৃদ্ধির অভিঘাতও সইতে হতো না। বাস্ত্মবে নবায়নযোগ্য বিদু্যৎ উন্নয়ন কার্যক্রম সীমাবদ্ধতা ও বিচ্ছিন্নতার শিকার।
১০.
বছরে (২০১৬-১৭) মাথাপিছু বিদু্যৎ খরচ ২৯৫ ইউনিট। বিদু্যৎ উৎপাদন সক্ষমতা ১০ হাজার ২১৩ মেগাওয়াট। ঘাটতি প্রায় ৩ হাজার মেগাওয়াট। বিদু্যৎ খাত উন্নয়ন পরিকল্পনা মতে ২০৪১ সাল নাগাদ উৎপাদন ক্ষমতা হবে ৫৬ হাজার মেগাওয়াট। নবায়নযোগ্য বিদু্যৎ হবে এর ১০ শতাংশ। অর্থাৎ ৫ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট। সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা মতে ২০২০ সাল নাগাদ বিদু্যৎ উৎপাদন ক্ষমতা হবে ২৩ হাজার মেগাওয়াট এবং নবায়নযোগ্য বিদু্যৎ উৎপাদন ক্ষমতা হবে ২৩০ মেগাওয়াট (১০ শতাংশ)। স্রেডা প্রণীত পরিকল্পনায় ২০১৫-২১ সাল অবধি বছরভিত্তিক নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা স্থির করা হয়েছে। সে লক্ষ্যমাত্রা মতে ২০২১ সাল নাগাদ বিদু্যৎ উৎপাদন ক্ষমতা হবে ৩ হাজার ১৬৮ মেগাওয়াট। সে ক্ষমতায় বিদু্যৎ উৎপাদন হবে ৭ বিলিয়ন ইউনিট। ওই পরিকল্পনা মতে ২০১৮ সালে ১ হাজার ৭৯১ মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য বিদু্যৎ উৎপাদন ক্ষমতায় বিদু্যৎ উৎপাদন হবে ৩ দশমিক ৯ বিলিয়ন ইউনিট। বাস্ত্মবে এমন অবস্থা অনুপস্থিত।

১১.
বাংলাদেশ পেশকৃত আইএনডিসিতে ২০৩০ সাল নাগাদ কার্বণমুক্ত জ্বালানি উন্নয়নে ৫ দশমিক ১৫ ইউএস ডলার বিনিয়োগ প্রস্ত্মাব রয়েছে। তাতে অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়েছে, ২০৩০ সাল নাগাদ গ্রিন হাউস গ্যাস ইমিশন বিদ্যমান অবস্থা থেকে ২০ শতাংশ কমিয়ে আনা হবে। বিদু্যৎ, পরিবহন ও শিল্প খাতের ইমিশন কমানোর ব্যাপারে বিশেষ গুরম্নত্ব দেয়া হয়েছে। বাস্ত্মবে দেখা যায়, সৌরবিদু্যৎ উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি অব্যাহত আছে। কিন্তু সে উৎপাদন ক্ষমতায় বিদু্যৎ উৎপাদন বৃদ্ধি আশানুরূপ নয়। সোলার হাম, মিনিগ্রিড, রূপটপ ও অনগ্রিড বিদু্যৎ উৎপাদন হয়। কিন্তু বিদু্যতের পরিমাণ ও প্রবৃদ্ধি কত এবং নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে তা-কি সংগতিপূর্ণ- এমন সব প্রশ্নের জবাব ও তথ্য সংশিস্নষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে নেই। এ সব সংরক্ষণও করা হয় না।
এরপর ৪২ পৃষ্ঠায়
০০ পৃষ্ঠার পর

তা ছাড়া নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও জ্বালানি দক্ষতা উন্নয়ন পরিকল্পনা সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে বাস্ত্মবায়নের ব্যাপারে সরকারের কোনো নীতি বা কৌশল নেই। ফলে সরকারি বিনিয়োগে যে সব উন্নয়ন হয়, তা এডহকভিত্তিক এবং সমন্বয়হীন। বিভিন্ন বিদেশি সাহায্য সংস্থার অর্থায়নে এ খাত উন্নয়ন হচ্ছে। কিন্তু তাদের কার্যক্রমের মধ্যে সমন্বয় হওয়া দরকার।


১২.
গ্রিড তথা তরল জ্বালানিভিত্তিক বিদু্যতে সরকারি সাবসিডি বিদ্যমান। অথচ অব-গ্রিড তথা নবায়নযোগ্য বিদু্যতে সে সাবসিডি নেই। অব-গ্রিড এলাকায় সোলার হোম সিস্টেম বিদু্যৎ ভোক্তা প্রতি ব্যবহার হয় মাসে ২ থেকে ৫ ইউনিট। উৎপাদন ব্যয় ইউনিট প্রতি ভোক্তা ভেদে ৫০-৬০ টাকা। ৫০ শতাংশ বিদেশি অনুদান সমন্বয় হওয়ায় মিনিগ্রিড সোলার বিদু্যতের মূল্যহার ৩০ টাকা। তা ছাড়া সার্ভিস চার্জ আছে। মাসে ০-৫০ ইউনিট গ্রিড বিদু্যৎ ব্যবহারকারী গ্রাহকরা লাইফ লাইন শ্রেণির গ্রাহক। তারা ৩ টাকা ৫০ পয়সা মূল্যহারে বিদু্যৎ পায়। আসলেই সোলার বিদু্যৎ গ্রাহক চরম মূল্যহার বৈষম্যের শিকার।
১৩.
সবার জন্য বিদু্যৎ কর্মসূচির আওতায় আর্থিকভাবে অলাভজনক হওয়া সত্ত্বেও গ্রিড লাইন সম্প্রসারণ করায় বিদু্যৎ খাতে আর্থিক ঘাটতি বাড়ছে। ফলে বর্তমান অর্থবছরে পাইকারি বিদু্যতে আর্থিক ঘাটতি সমন্বয়ে ৪ হাজার ২০০ কোটি টাকা সরকার সাবসিডি দিচ্ছে। গ্রিড সম্প্রসারণ সীমিত রেখে যদি সাবসিডি সাশ্রয় করা হতো এবং অব-গ্রিড এলাকায় সে সাবসিডি দিয়ে সৌরবিদু্যৎ সম্প্রসারণ করা হতো, তাহলে সবার জন্য বিদু্যৎ কর্মসূচি বাস্ত্মবায়ন সফল হতো। তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী মূল্যহারে গ্রামীণ হতদরিদ্র মানুষ বিদু্যৎ পেতো। গ্রিড ও অবগ্রিড এলাকার মধ্যে বিদু্যতের মূল্যহারে সমতা রক্ষা করা যেত। ফলে উভয় বিদু্যৎ ভোক্তার মধ্যে মূল্যহার বৈষম্য কম হতো।
১৪.
বিদু্যৎ ও জ্বালানি সরবরাহ চেইনকে সংস্কার কর্মসূচির আওতায় নানা সেগমেন্টে বিভাজন এবং সেই সঙ্গে বাণিজ্যিকীকরণও করা হয়েছে। তবুও কোনো সেগমেন্টই বিনিয়োগকারীর জন্য স্বচ্ছ ও লেভেল পেস্নয়িং ফিল্ড হিসেবে উপযোগী হয়নি। অর্থাৎ প্রতিযোগিতা না থাকায় সুসম বিনিয়োগ হয়নি এবং বিনিয়োগ সঙ্কটও কাটেনি। চাহিদামাফিক দক্ষ ও উপযুক্ত জনবল সৃষ্টি হয়নি। বিদু্যৎ উৎপাদন ক্ষমতা ব্যবহার ও বৃদ্ধি জ্বালানি সরবরাহ ও বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন। পিক ও বেজ লোড বিদু্যৎ উৎপাদন ক্ষমতার অনুপাতও সামঞ্জস্যহীন। বর্তমানে পিক লোড বিদু্যৎ উৎপাদন ক্ষমতা মোট উৎপাদন ক্ষমতার প্রায় ৬০ শতাংশ। ক্যাপটিভ বিদু্যৎ উৎপাদন ক্ষমতা হিসেবে ধরা হলে এ অনুপাত আরও বেশি হতো। তা ছাড়া বিদু্যৎ উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণ ক্ষমতা এবং এ সব সেগমেন্টের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও ব্যবহার যৌক্তিক ও সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এ সব কারণে বিদু্যৎ সরবরাহে অযৌক্তিক ব্যয়বৃদ্ধি এখন নিয়ন্ত্রণহীন।
১৫.
হিসেবে দেখা যায়, বিদু্যৎ উৎপাদন ও বিতরণে অযৌক্তিক ব্যয়বৃদ্ধি পায় ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ১৩ হাজার কোটি টাকা। প্রতিযোগিতার অভাবে যে অযৌক্তিক ব্যয়বৃদ্ধি, তা এ হিসেবে আসেনি। পলিসি (আপস্ট্রিম) রেগুলেটর হিসেবে বিদু্যৎ ও জ্বালানি উভয় বিভাগই স্বার্থসংঘাত মুক্ত নয়। অথচ তারা বিদু্যৎ ও জ্বালানি উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণ ইউটিলিটি পরিচালনায় সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। ফলে ডাউন স্ট্রিম রেগুলেটর হিসেবে বিইআরসি এ সব ইউটিলিটির ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে। তরল জ্বালানির মূল্যহার নির্ধারণ করে জ্বালানি বিভাগ। আবার এলপিজির ক্ষেত্রে সে মূল্যহার নির্ধারণ করে এলপিজি ব্যবসায়ীরা। আসলে ওই উভয় মূল্যহার নির্ধারণের আইনি এখতিয়ার কেবল বিইআরসির, অন্য কারও নয়। বিইআরসি মূলত অকার্যকর হয়েছে এভাবেই। বিদু্যৎ ও জ্বালানি খাত সুশাসন সঙ্কট ও অস্বচ্ছতার শিকার। তাই এ খাতে ভোক্তাদের কার্যকর অংশগ্রহণ ও ক্ষমতায়ন নিশ্চিত হয়নি। প্রতিযোগিতাও সৃষ্টি হয়নি। মানসম্মত ব্যক্তি খাত বিনিয়োগ অপ্রতুল। সরকারি খাত বিনিয়োগও অপর্যাপ্ত এবং সামঞ্জস্যহীন। বিদু্যৎ ও জ্বালানি সরবরাহ ব্যয়বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণহীন। ফলে ভোক্তা বা জনস্বার্থ সুরক্ষা অনিশ্চিত। কার্যত জ্বালানি ও বিদু্যৎ খাত সংস্কার সফল হয়নি।
১৬.
তেল ও কয়লার দরপতন যৌক্তিক সমন্বয় না হওয়ায় সে সুবিধা জনগণ একদিকে পায়নি, অন্যদিকে যৌক্তিক ও ন্যয়সংগত না হওয়া সত্ত্বেও বারবার বেশি বেশি গ্যাস ও বিদু্যতের মূল্যহার বৃদ্ধি পাচ্ছে। গত ১ ডিসেম্বর ২০১৭ থেকে বিদু্যতের মূল্যহার আবারও বৃদ্ধির আদেশ হয়। মোট বিদু্যতের (৫৫.৫৭ বিলিয়ন ইউনিট) প্রায় ৪৭ শতাংশ ব্যবহার হয় আরইবির আওতায় পিবিএসগুলিতে। ওই আদেশ মতে পাইকারি বিদু্যতের মূল্যহার এখন ভারিত গড়ে ৪ টাকা ৮৪ পয়সা। অর্থাৎ আগের মূল্যহার অপেক্ষা ৬ পয়সা কম। ফলে পাইকারি বিদু্যতে ঘাটতি থাকে ৭১ পয়সা। অর্থাৎ প্রায় ৪ হাজার ২০০ কোটি টাকা। সে ঘাটতি বিদু্যৎ উন্নয়ন তহবিলে অনুদানহার (১১ পয়সা) কমিয়ে এবং সরকারি সাবসিডি (৬০ পয়সা) দিয়ে সমন্বয় করা হয়েছে। অর্থাৎ মূল্যহার বৃদ্ধি দ্বারা নয়, বিদু্যৎ উৎপাদনে ঘাটতি সরকারি সাবসিডি দ্বারা সমন্বয় হয়েছে। কিন্তু সরকারের হিসেবে বিদু্যৎ খাত সাবসিডি ঋণ হিসেবে গণ্য হওয়ায় এ সাবসিডি বিদু্যতের মূল্যহার কমায় না, বৃদ্ধি করে। আবার বিদু্যৎ উৎপাদন ব্যয়বৃদ্ধি কারণ বিশেস্নষণে প্রতিয়মান হয় : (ক) স্বল্পতম ব্যয়ে কম এবং অধিকতম ব্যয়ে বেশি বিদু্যৎ উৎপাদন হয়, (খ) নন-ফুয়েল ব্যয়হার যৌক্তিক করা হয়নি, (গ) বিদু্যৎ উৎপাদন ক্ষমতা ব্যবহার অসম, (ঘ) প্রতিযোগিতাহীন দর-প্রস্ত্মাবের ভিত্তিতে বিদু্যৎ ও জ্বালানি খাত উন্নয়ন হয় এবং (ঙ) তরল জ্বালানি আমদানি ব্যয় হ্রাস সমন্বয় যৌক্তিক ও সমতাভিত্তিক হয়নি। ফলে বিদু্যৎ উৎপাদন ব্যয় অযৌক্তিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। জ্বালানি সরবরাহ ও বিদু্যৎ উৎপাদন কৌশল এভাবেই সাজানো হয়েছে।
১৭.
বিদু্যৎ বিতরণ ব্যয় পর্যালোচনায় দেখা যায়, আগের মূল্যহার অপেক্ষা পাইকারি বিদু্যতের মূল্যহার কমানো হয়েছে আরইবির জন্য ১৭ দশমিক ২ পয়সা। নেসকোর জন্য ৬২ দশমিক ২ পয়সা। অথচ বিতরণে আর্থিক ঘাটতি ২ হাজার ৭৮ কোটি টাকা সমন্বয়ে গ্রাহক পর্যায়ে বিদু্যতের মূল্যহার বেড়েছে ৩৫ পয়সা। এ সব তথ্যাদিতে প্রতীয়মান হয়, বিদু্যৎ বিতরণ ইউটিলিটি একদিকে আর্থিক সক্ষমতা, অন্যদিকে প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা হারাচ্ছে।
১৮.
বিদু্যৎ বিতরণ ব্যয়বৃদ্ধি বিশেস্নষণে প্রতীয়মান হয়, ২০১৭-১৮ অর্থবছরের হিসাব মতে সরবরাহকৃত মোট বিদু্যতের (৫ হাজার ৫৭১ কোটি ইউনিট) প্রায় ৪৭ শতাংশ আরইবির গ্রাহকরা ব্যবহার করেন। আরইবির বিদু্যৎ বিতরণ ক্ষমতা স্বল্প ব্যবহার হওয়ায় জনবল (৯০ পয়সা) ও অবচয় (৬১ পয়সা) ব্যয়হার অত্যাধিক। আদর্শিক মানদ-ে এ ব্যয়হার যথাক্রমে ৪০ ও ৩০ পয়সার অধিক নয়। তা ছাড়া পিডিবি ছাড়া আরইবিসহ সব বিতরণ কোম্পানি ইউনিফাইড স্কেলে বেতন-ভাতাদি বৃদ্ধি করায় জনবল ব্যয় অন্যায় ও অযৌক্তিকভাবে বৃদ্ধি পায়। যেহেতু আরইবির আওতাধীন পিবিএসসমূহ কোম্পানি নয়, সেহেতু কোম্পানি স্কেলে পিবিএসের বেতন-ভাতাদি বৃদ্ধি অসংগতিপূর্ণ। তা ছাড়া এ বেতন-ভাতাদি বৃদ্ধি গণশুনানির ভিত্তিতে বিইআরসি কর্তৃক অনুমোদিত না হওয়ায় ভোক্তাদের আপত্তি রয়েছে। বিষয়টি আইনি বিবেচনায় একটি বিরোধ। আদর্শিক বিবেচনায় আরইবিতেই অযৌক্তিক বিতরণ ব্যয়বৃদ্ধি পেয়েছে ১ হাজার ৩০৬ কোটি টাকা। আবার পিডিবি ভেঙে বিদু্যৎ বিতরণ কোম্পানি নেসকো গঠিত। অতঃপর পিডিবির জনবল লিয়েনে কোম্পানি স্কেলে নিয়োগ দিয়ে নেসকো জনবল ব্যয়বৃদ্ধি করেছে ১৪১ কোটি টাকা। অর্থাৎ বিদু্যৎ বিতরণে অযৌক্তিক জনবল ব্যয়বৃদ্ধি পেয়েছে ১ হাজার ৪৪৭ কোটি টাকা। আরইবিতে অযৌক্তিক অবচয় ব্যয়বৃদ্ধি পেয়েছে ৮০৭ কোটি টাকা। এসব অযৌক্তিক ব্যয়বৃদ্ধিজনিত ঘাটতি মূল্যহার বৃদ্ধি দ্বারা সমন্বয় করা না হলে বিদু্যৎ বিতরণে ১৭৬ কোটি টাকা উদ্বৃত্ত থাকে। মূল্যহার বৃদ্ধি হতো না।
১৯.
সার্বিক পর্যালোচনায় দেখা যায়, নূ্যনতম ব্যয়ে বিদু্যৎ উৎপাদন ও জ্বালানি সরবরাহ এবং যৌক্তিক ব্যয়ে বিদু্যৎ বিতরণ নীতি ও কৌশল অকার্যকর। আবার মেরিট অর্ডার লোড ডিসপ্যাস নীতিও অচল। সর্বোপরি বিদ্যমান জ্বালানি ও বিদু্যৎ খাত উন্নয়ন নীতি ও কৌশল জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ও দেশকে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করার ক্ষেত্রে বড় বাধা।
২০.
বাংলাদেশে ১০ শতাংশ বিদু্যৎ উৎপাদন প্রবৃদ্ধির বিপরীতে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশ। অর্থাৎ এক ইউনিট জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে বাংলাদেশে বিদু্যৎ উৎপাদন প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন প্রায় ১ দশমিক ৫ গুণ। সেখানে ভারতে ০ দশমিক ২০ গুণ। চীনে ০ দশমিক ৫৯ গুণ। অন্যান্য অগ্রগামী দেশের তুলনায় বাংলাদেশে বিদু্যৎ উৎপাদন প্রবৃদ্ধির সঙ্গে জিডিপি প্রবৃদ্ধি সামঞ্জস্যহীন। এ মানদ-ে জ্বালানি সংরক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়ন হতাশাব্যঞ্জক। জার্মানির ক্ষেত্রে দেখা যায়, ১৯৯০ সাল থেকে বিদু্যৎ ব্যবহার তথা বিদু্যৎ উৎপাদন ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে। অথচ জিডিপি বেড়েই চলেছে। অর্থাৎ বিদু্যৎ উৎপাদন প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক হলেও জিডিপি প্রবৃদ্ধি ধনাত্মক। জার্মানির এ দৃষ্টান্ত্ম জ্বালানি সংরক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়নে জার্মানি কতটা সফল, তারই প্রমাণ। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সে সফলতা অনুপস্থিত। বরং জিডিপি ও বিদু্যৎ উভয় প্রবৃদ্ধি ভিন্ন কথা বলে। এভাবেই জ্বালানি বা বিদু্যৎ খাত সংস্করণে (রূপান্ত্মরণ) বাংলাদেশ চরম ব্যর্থতার শিকার, তা আর বলার অপেক্ষায় নেই।
২১.
জার্মানির আয়তন ৩ লাখ ৫৭ হাজার ৩৭৬ বর্গকিলোমিটার। বর্তমানে জনসংখ্যা ৮২ মিলিয়ন। বার্ষিক মাথাপিছু আয় ৪১ হাজার ৯৩৬ ডলার। জিডিপি প্রবৃদ্ধি ১.৯ শতাংশ। গড় আয়ু ৮১ দশমিক ০৯ বছর। জ্বালানিতে স্বনির্ভর নয়। অর্থনীতি শিল্পনির্ভর। কার্বণমুক্ত অর্থনীতি বিনির্মাণের লক্ষ্যে জ্বালানি রূপান্ত্মরণের আওতায় জার্মানিতে : (ক) নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন হচ্ছে, (খ) জ্বালানি সংরক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়নে নতুন নতুন মেশিন, কলকব্জা, যন্ত্রপাতি, উপকরণ, হাতিয়ার ইত্যাদি উদ্ভাবন, তৈরি, স্থাপন, প্রতিস্থাপন ও বাজারজাত করা হচ্ছে, (গ) তাপরোধী ভবন এবং বিদু্যৎচালিত বাহন বাড়ছে, এবং (ঘ) জনগণের অভিপ্রায়, মনোভাব, চাল-চলন, অভ্যাস ইত্যাদি পরিবর্তন হচ্ছে।
২২.
জার্মানির চলমান জ্বালানি রূপান্ত্মরণ (ঊহবৎমু ঞৎধহংরঃরড়হ) পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০১৫ সালের হিসাবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে প্রাথমিক জ্বালানি ও বিদু্যৎ আসে যথাক্রমে ১৪ ও ৩১ শতাংশ। ২০৩০ সালে তা হবে যথাক্রমে ৩০ ও ৫০ শতাংশ এবং ২০৫০ সালে যথাক্রমে ৬০ ও ৮০ শতাংশ। জার্মানিতে বায়োমাস, বায়ু এবং সোলার পিভি নাবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রধান উৎস। ২০০৮ সালের তুলনায় ২০৫০ সালে সাশ্রয় হবে প্রাথমিক জ্বালানি ৫০ শতাংশ, বিদু্যৎ ৮০ শতাংশ, পরিবহনে ব্যবহৃত জ্বলানি ৪০ শতাংশ এবং ভবন উত্তাপে ব্যবহৃত তাপ ৮০ শতাংশ। গ্রিন হাউস গ্যাস নির্গমণ হ্রাস পাবে ৯০ শতাংশ। জার্মানি আমদানিনির্ভর : জ্বালানি তেলে ৯৭ শতাংশ, গ্যাসে ৮৯ শতাংশ কয়লায় ২৩ শতাংশ এবং বিদু্যতে ১৩ শতাংশ। অবশ্য বিদু্যৎ রপ্তানি ৬ শতাংশ। বিদু্যৎ উৎপাদন ৬৪১ বিলিয়ন ইউনিট। প্রাথমিক জ্বালানি সরবরাহ ৩০৭ দশমিক ৮ এমটিওই। প্রাথমিক জ্বালানি মিশ্রে কয়লা ২৬ শতাংশ, তেল ৩৩ শতাংশ, গ্যাস ২১ শতাংশ এবং নিউক্লিয়ার ৮ শতাংশ। নবায়নযোগ্য বিদু্যৎ উৎপাদন হয় ১৯৯৯ সালে ২৯ বিলিয়ন ইউনিট। ২০১৪ সালে বৃদ্ধি পেয়ে তা হয় ১৬১ বিলিয়ন ইউনিট। পক্ষান্ত্মরে ওই সময় নিউক্লিয়ার ও কয়লা বিদু্যৎ উৎপাদন কমে যথাক্রমে ১৮০-৯৭ এবং ২৯১-২৬৫ বিলিয়ন ইউনিট। ওই রূপান্ত্মরণের লক্ষ্য ফসিল ও নিউক্লিয়ার জ্বালানি নবায়নযোগ্য জ্বালানি দ্বারা প্রতিস্থাপন করা এবং জ্বালানি সংরক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়ন দ্বারা প্রাথমিক জ্বালানি, বিদু্যৎ ও তাপের চাহিদা কমিয়ে গ্রিন হাউস গ্যাস তথা কার্বণ নির্গমন শূন্যে নামিয়ে আনা। অর্থাৎ কার্বণমুক্ত অর্থনীতি বিনির্মাণ করা। পাশাপাশি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে জ্বালানিতে স্বনির্ভর হওয়া এবং বিদু্যৎ রপ্তানি বৃদ্ধি করা। দৃশ্যমান অগ্রগতিতে বলা যায়, জ্বালানি রূপান্ত্মরণে জার্মানি সফলতা লাভের পথে।

২৩.
চলমান রূপান্ত্মরণের কারণে জার্মানিতে বিদু্যৎ সরবরাহ ব্যয়হার ২০০৮ থেকে ২০১৪ সাল অবধি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকে। এ সময়ে বিদু্যতের মূল্যহার বৃদ্ধি পায় ৩৬ শতাংশ। ২০১৫ সালের শুরম্নতে প্রথমবারের মতো আবাসিক গ্রাহকদের বিদু্যতের মূল্যহার হ্রাস পায়। পরে সে বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রিত ও অবদমিত। এমন অবস্থার মধ্যদিয়ে জ্বালানি রূপান্ত্মরণ আগামীতেও অব্যাহত থাকবে এবং ২০৩০ সাল নাগাদ আর বিদু্যতের মূল্যহার বৃদ্ধি হবে না- এমন পূর্বাভাস রয়েছে। ইতোমধ্যে ফিড-ইন-ট্যারিফ প্রত্যাহার করা হয়েছে। অর্থাৎ নবায়নযোগ্য বিদু্যতে সাবসিডি এখন অনাবশ্যক।
২৪.
আবাসিক গ্রাহকদের বিদু্যতের গড় মূল্যহার ২০১৭ সালে ছিল ২৯.১৬ ইউরো সেন্ট। এর ৫৫% বিভিন্ন ট্যাক্স, লেভি ও সারচার্জ। সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যয় ২৫ দশমিক ৬ শতাংশ। উৎপাদন ব্যয় ১৯.৩ শতাংশ (৫ দশমিক ০৭ টাকা : ১ ইউরো = ৯০ টাকা)। বাংলাদেশে সে-উৎপাদন ব্যয় ৫ দশমিক ২৯ টাকা। অর্থাৎ জার্মানির বিদু্যৎ উৎপাদন ব্যয়হার অপেক্ষা ২২ পয়সা বেশি। নবায়নযোগ্য বিদু্যৎ উৎপাদনক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সে বিদু্যৎ বাজারে আনতে বিদু্যৎ সঞ্চালন ক্ষমতা উন্নয়ন ও সম্প্রসারণে প্রচুর অর্থ বিনিয়োগ হচ্ছে। সে বিনিয়োগ ব্যয় বিদু্যতের মূল্যহারে সমন্বয় হওয়ায় গ্রাহকের বিদু্যৎ বিল বৃদ্ধি অব্যাহত থাকে। ফলে ২০১৩ সালে ইউরোপের যে কোনো দেশ (পোল্যান্ড, সুইডেন, ডেনমার্ক ও ফ্রান্স) অপেক্ষা জার্মানিতে বিদু্যতের মূল্যহার সর্বাধিক হয়। পরে নবায়নযোগ্য বিদু্যৎপ্রবাহ বৃদ্ধিতে নবনির্মিত বিদু্যৎ অবকাঠামো ব্যবহার বৃদ্ধি পাচ্ছে। সনাতনী বিদু্যৎ উৎপাদন হ্রাস পাচ্ছে। আবার ওই অবককাঠামো উন্নয়ন ব্যয়হারও হ্রাস পাচ্ছে। ফলে বিদু্যৎ সরবরাহ ব্যয়হার হ্রাস মূল্যহারে সমন্বয় হওয়ায় গ্রাহক পর্যায়ে বিদু্যতের মূল্যহার হ্রাস পাচ্ছে। সেই সঙ্গে জ্বালানি সংরক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়ন অব্যাহত থাকায় জ্বালানি ও বিদু্যৎ চাহিদা ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে। বিদু্যৎ বিল সাশ্রয় হচ্ছে। সেবা ও পণ্যের উৎপাদন ব্যয়হার কমছে। ফলে ভোক্তা বা জনগণের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ছে এবং জীবনমান উন্নয়ন হচ্ছে। বাংলাদেশ এমন সুযোগ হারাচ্ছে। তাই জ্বালানি উন্নয়ন নিয়ে উদ্বেগ ও ভাবনা বাড়ছে।
২৫.
২০১৪ সালের এক সমীক্ষার সূত্রে বলা হয়, নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণ জোরদারে জার্মানির ৯৪% জনগণের সমর্থন রয়েছে। সেখানকার সরকার মনে করে, কোনো রাজনৈতিক দলের সরকারে আসা অনেকটাই নির্ভর করে কথিত জ্বালানি রূপান্ত্মরণে তার দক্ষতা ও সক্ষমতার ওপর। অর্থাৎ জ্বালানি রূপান্ত্মরণে জার্মানিতে গণতন্ত্রায়ন ও জনগণের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত হয়েছে। জ্বালানি রূপান্ত্মরণ নানা কারিগরি কর্মযজ্ঞের সমাহার ও সমন্বয়। সেগুলোর মধ্যে অন্যতম : (১) বিদু্যৎ মজুদ (এখনো খুবই ব্যয়বহুল), (২) জ্বালানি দক্ষতা উন্নয়ন এবং (৩) ব্যাপকভাবে জাতীয় বৈদু্যতিক নেটওয়ার্কসমূহ সংযোজন ও একীভূতকরণ (যা নানা অঞ্চলের বিদু্যৎ পরস্পরের মধ্যে ভাগাভাগির সুবিধা দেয়) অন্যতম। এ কর্মযজ্ঞের পরিকল্পনায় রয়েছেন বিশেষজ্ঞরা, বাস্ত্মবায়নে পেশাজীবীরা। তাতে জনগণের অংশগ্রহণ ও ক্ষমতায়ন দৃশ্যমান ও কার্যকর। জার্মান বিশেষজ্ঞদের মতে জ্বালানি রূপান্ত্মরণের সামাজিক ও রাজনৈতিক নানা মাত্রা রয়েছে। সে রূপান্ত্মরণে প্রযুক্তিক, রাজনীতিক ও অর্থনীতিক কাঠামোবলির আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন হয়। অর্থাৎ এটি একটি প্রক্রিয়া। প্রচলিত ব্যবস্থার পরিবর্তনও বলা যায়। পক্ষভুক্ত ব্যক্তিরা ও প্রতিষ্ঠান এবং সংশিস্নষ্ট আইনি সংস্কার এ পরিবর্তনের আওতাভুক্ত। ধারণা করা হচ্ছে, সংস্কারের আওতায় পরিবর্তিত আইন জ্বালানি শিল্পে অনেক ক্ষেত্রে মৌলিক পরিবর্তন আনবে। তবে অর্থনীতি ও ভোক্তার ওপর তার প্রভাব হবে সীমিত। তাই ওই সংস্করণ আরও বেশি অর্থনীতিবান্ধব ও ভোক্তা স্বার্থসম্মত হওয়ার ব্যাপারে সেখানকার সরকার মনোযোগী।
২৬.
জ্বালানি রূপান্ত্মরণের ধারণা ১৯৮০ সালে জার্মানির কোনো এক গবেষণা প্রতিষ্ঠান থেকে প্রথম প্রকাশ পায়। তাতে নিউক্লিয়ার ও পেট্রোলিয়াম জ্বালানি সম্পূর্ণ বর্জনের আহ্বান জানানো হয় এবং দাবি করা হয়, জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি না করেও আর্থিক প্রবৃদ্ধি সম্ভব। সে ধারণার পরিধি পরে সম্প্রসারণ হয় এবং আজকের অবয়বে পরিণত হয় ২০০২ সালে। জলবায়ু কর্মপরিকল্পনা গৃহীত হয় ২০১৬ সালে। তাতে বলা হয়, ২০৫০ সাল নাগাদ প্রায় সম্পূর্ণ কার্বণমুক্ত জ্বালানি সরবরাহ হবে। অবশেষে প্রায় সম্পূর্ণ বিদু্যৎ উৎপাদন নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক হবে এবং তাতে বায়ু ও সৌর বিদু্যতের হিস্যা অনেক বেশি হবে। তা সত্ত্বেও রূপান্ত্মরণ কালে স্বল্প কার্বণ সমৃদ্ধ গ্যাস-বিদু্যৎ পস্নান্টগুলোর সঙ্গে বিদ্যমান অত্যাধুনিক কয়লা-বিদু্যৎ পস্নান্টসমূহও অন্ত্মর্বর্তীকালীন প্রযুক্তি হিসেবে আবশ্যক।
২৭.
ওই রূপান্ত্মরণের লক্ষ্য অর্জনে বিশেষভাবে গুরম্নত্ব পাচ্ছে : (১) সব খাতে কার্বণ মূল্য আরোপ করা, (২) পরিবহন আদল বদলের মাধ্যমে জ্বালানি চাহিদা হ্রাস করা, (৩) নবায়নযোগ্য জ্বালানি অথবা বায়োএনার্জি উৎস থেকে নিট বিদু্যৎ আহরণ করা, (৪) জনগণের আহার-উত্থাপন-যাতায়াত অভ্যাস পরিবর্তন করা, (৫) শিল্প খাতে গ্রিন হাউস গ্যাস নির্গমণ হ্রাসে 'সিসিএস' প্রযুক্তি ব্যবহার করা, (৬) নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন বৃদ্ধির তাগিদে বাজার উন্নয়ন ও উদ্ভাবন করা, এবং (৭) অর্থনৈতিক কর্মকা-ের সব পর্যায়ে স্বচ্ছতা ও সুষ্ঠু প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা। ধারণা করা হচ্ছে, বিদু্যৎ সঞ্চালন নেটওয়ার্ক উন্নয়ন অব্যাহত থাকবে এবং নরওয়ে ও সুইডেনের পানি-বিদু্যৎ জার্মানি ব্যবহার করতে পারবে। নিউক্লিয়ার জ্বালানি বর্জনের সময়সীমা বৃদ্ধি অথবা কয়লা-বিদু্যৎ পস্নান্ট নির্মাণ করার আর দরকার হবে না। জ্বালানি সাশ্রয় ও জ্বালানি দক্ষতা উন্নয়ন কার্যক্রম এবং বিদু্যৎ সঞ্চালন ব্যয় হ্রাস বিদু্যতের মূল্যহার কমিয়ে আনবে।


২৮.
সর্বোপরি ২০৫০ সাল নাগাদ জ্বালানি রূপান্ত্মরণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে। জার্মান অর্থনীতি কার্বণমুক্ত হবে। ভোজ্য-তেল ও প্রাণিজ-চর্বিমুক্ত আহারে জনগণ আরও বেশি বেশি অভ্যস্ত্ম হবে। জাতীয়ভাবে জার্মানরা আরও অনেক বেশি কায়িক পরিশ্রমী ও সবদিক দিয়ে মিতব্যয়ী হবে। পরিশেষে কার্বণ তথা দূষণমুক্ত পরিবেশ এবং দুর্নীতি তথা দূষণমূক্ত সমাজ জার্মান জাতিকে মহিমান্বিত করবে। অবশেষে জার্মানির এই 'জ্বালানি রূপান্ত্মরণ' অন্যান্য দেশের জন্য মডেল হবে। এসব আজ আর জার্মানজাতির স্বপ্ন বা ভাবনা নয়, দৃশ্যমান বাস্ত্মব। বিদু্যৎ ও জ্বালানির জগতে উন্নয়নের নামে বাংলাদেশে যা কিছু ঘটেছে, তাও এক ধরনের 'জ্বালানি রূপান্ত্মরণ'। সে রূপান্ত্মরণ পরিবেশ ও সমাজ উভয়কেই দূষণমুক্ত নয় বিরামহীনভাবে দূষণযুক্ত করে চলেছে। এমন 'রূপান্ত্মরণ' কোনো জাতির কাম্য হতে পারে না। বাঙালি জাতিরও নয়।
২৯.
জার্মানির 'জ্বালানি রূপান্ত্মরণ' জার্মানির উন্নয়ন দর্শন হিসেবে স্বীকৃত ও প্রতিষ্ঠিত। জাতির জন্য কার্বণমুক্ত অর্থনীতি নির্মাণের মাধ্যমে দূষণমুক্ত পরিবেশ ও সমাজ তৈরি করা এ দর্শনের নৈতিক ও আদর্শিক ভিত্তি ভূমি। ওপরে বর্ণিত পর্যালোচনায় বাংলাদেশের 'জ্বালানি রূপান্ত্মরণ'-এর যে স্বরূপ প্রকাশ পেয়েছে, তাতে প্রতীয়মান হয়, বাংলাদেশের 'জ্বালানি রূপান্ত্মরণ' তথা উন্নয়ন দর্শন জনস্বার্থ ও জনকল্যাণের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। জাতির জন্য উচ্চতর আর্থিক প্রবৃদ্ধি বজায় রেখে দূষণমুক্ত পরিবেশ ও সমাজ নির্মাণ করা এ দর্শনের ভিত্তি ভূমি নয়। উন্নয়নের এমন দর্শন দেশকে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত করার ক্ষেত্রে সহায়ক, নাকি প্রতিবন্ধক- এ প্রশ্ন এখন সর্বসাধারণের উদ্বেগ ও ভাবনার বিষয়। বিশেস্নষণে দেখা যায়, আর্থিক প্রবৃদ্ধিতে অদক্ষ শ্রমশক্তি ও তৈরি পোশাক রপ্তানি আয় মুখ্য। সে আয় বৃদ্ধিতে বিদু্যৎপ্রবাহ প্রবৃদ্ধির ভূমিকা গৌণ। আবার বিদু্যৎপ্রবাহ প্রবৃদ্ধি কমাতে আর্থিক প্রবৃদ্ধি অকার্যকর। বাংলাদেশের আর্থিক প্রবৃদ্ধি বিশ্বের দুই ধারার কোনো ধারার প্রবৃদ্ধিরই অনুরূপ নয়। অর্থাৎ এ প্রবৃদ্ধির কোনো তাত্ত্বিক ভিত্তি নেই। তাই বাংলাদেশে বর্তমান আর্থিক প্রবৃদ্ধি কতটা টেকসই, তাও ভাবনার বিষয়।
৩০.
অষ্টাদশ শতাব্দীতে কয়লার ব্যবহার ইউরোপে শিল্প বিপস্নব ঘটায়। সে বিপস্নব দেশে দেশে ছড়িয়ে পড়ে। ঊনবিংশ শতাব্দীতে তেল আমেরিকায় সমৃদ্ধি আনে। পুঁজির বিকাশ ও প্রভাব অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পায়। যার পরিণতিতে বিশ্বব্যাপী ভূ-রাজনীতিতে আমেরিকার প্রভাবও বৃদ্ধি পায়। একতা, সমতা ও সংহতি ঝুঁকিতে পড়ে। বিংশ শতাব্দীতে বিশ্বের কোনো কোনো দেশ নিউক্লিয়ার শক্তিতে সমৃদ্ধ হওয়ায় তারা পরাশক্তিতে পরিণত হয়। ফলে ভূ-রাজনীতিতে সঙ্কট আরও বৃদ্ধি পায়। একবিংশ শতাব্দীতে বিশ্বের অর্থনীতিতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিকল্প জ্বালানি হিসেবে বিকশিত হচ্ছে এবং ফসিল জ্বালানির বিকল্প হিসেবে বাজার দখল করছে। ফলে কার্বণমুক্ত অর্থনীতি বিনির্মাণ বিপস্নব শিল্প বিপস্নবের মতোই ইউরোপে শুরম্ন হয়েছে। সে বিপস্নব দেশে দেশে ছড়িয়ে পড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় বিশ্বব্যাপী এ বিপস্নব জরম্নরি। তাতে শুধু পরিবেশই নয়, সমাজও দূষণমুক্ত তথা দুর্নীতিমুক্ত হবে। বাংলাদেশের উন্নয়নে জ্বালানি উন্নয়ন তথা সংস্কার কৌশল দেশকে অতিমাত্রায় দুর্নীতিগ্রস্ত্ম করে চলেছে। কার্বণদূষণে জলবায়ু পরিবর্তনের মতোই সে দুর্নীতিতে সমাজ পরিবর্তন হচ্ছে। এ পরিবর্তন মোকাবেলা করা এখন বাংলাদেশের জন্য অতীব জরম্নরি। সে জন্য 'জ্বালানি উন্নয়ন দর্শন' বদলাতে হবে।
 
এই প্রতিবেদন সম্পর্কে আপনার মতামত দিতে এখানে ক্লিক করুন
-এর আরো সংবাদ
অনলাইন জরিপ
অনলাইন জরিপআজকের প্রশ্নজঙ্গিবাদ নিয়ে মন্ত্রীদের প্রচারে আস্থাহীনতার সৃষ্টি হয়েছে_ বিএনপি নেতা আসাদুজ্জামান রিপনের এই বক্তব্য সমর্থন করেন কি?হ্যাঁনাজরিপের ফলাফল
আজকের ভিউ
পুরোনো সংখ্যা
2015 The Jaijaidin
close