বিদু্যৎ খাত: প্রয়োজন স্থায়ী সমাধানগত কয়েক বছরে কোনো বিদু্যৎ উৎপাদন হয়নি তা নয়। বিদু্যৎ উৎপাদন হয়েছে। কিন্তু মূল বিষয়টি অন্য খানে। এ সমস্যা সমাধানে ভ্রান্ত্মনীতি অদক্ষতা প্রমাণ দিয়েছে। তাছাড়া কোন পদ্ধতিতে কীভাবে এ সমস্যা সমাধান করা যায়, তা নিয়ে রয়েছে বিতর্ক। সরকার যখন ক্ষমতায় এসে কুইক রেন্টাল পদ্ধতিতে দ্রম্নত এ সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করে তখন অনেকে এর বিরোধিতা করে কয়লাভিত্তিক বিদু্যৎ উৎপাদনের পরামর্শ দেন। আবার এখনও কেউ কেউ কুইক রেন্টাল পদ্ধতিতে বিদু্যৎ সমস্যার অনেক অগ্রগতি হয়েছে বলে দাবি করেন। অগ্রগতি হলেও এ পদ্ধতি অনেক ব্যয়বহুল।সালাহউদ্দিন আহমেদ জনবহুল দেশ বাংলাদেশ। দেশে এখন সতেরো কোটি মানুষের বসবাস। এ বিপুল জনগোষ্ঠীর বিদু্যৎ চাহিদা মেটানো সহজ কাজ নয়, এটা সত্যি। চাহিদার তুলনায় বিদু্যৎ উৎপাদন বা সরবরাহ এখনো অনেক কম। কাগজে-কলমে উৎপাদন বাড়লেও, বাস্ত্মবতা হলো শহুরে বিদু্যৎ এখনো গ্রামে পৌঁছেনি। কোথাও আছে নামেমাত্র, বাকি সব অন্ধকার।
বিদু্যৎ একটি দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম সঞ্চালক ব্যবস্থা। বিদু্যৎ উৎপাদন ও ব্যবস্থাপনা উভয় ক্ষেত্রেই বিশ্বেও অন্যান্য দেশগুলোর তুলনায় এখনো বাংলাদেশে বিদু্যৎ খাত যথেষ্ট পিছিয়ে রয়েছে। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম (ডবিস্নউইএফ) কর্তৃক প্রকাশিত 'এনার্জি আর্কিটেকচার পারফরম্যান্স ইনডেক্স-২০১৭' শীর্ষক প্রতিবেদন অনুসারে বিদু্যতের কাঠামোগত দক্ষতা সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ১০৪তম বিশ্বের ১২৭টি দেশের মধ্যে। তথ্যমতে, বাংলাদেশে বিদু্যতের মাথাপিছু উৎপাদন হলে ৪০৭ কি.ও.আ., যা দক্ষিণ এশীয় দেশগুলো যেমন- ভারত, পাকিস্ত্মান কিংবা শ্রীলঙ্কার মধ্যে সর্বনিম্ন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে বিদু্যৎ খাতটি, বিদু্যৎ জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের একীভূত অবস্থায় ছিল। এই খাতে সার্বিক উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করতে ১৯৯৮ সালে বিদু্যৎ খাতটিকে, বিদু্যৎ জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ে পৃথক বিদু্যৎ বিভাগে পরিণত করা হয়।
গত কয়েক বছরে কোনো বিদু্যৎ উৎপাদন হয়নি তা নয়। বিদু্যৎ উৎপাদন হয়েছে। কিন্তু মূল বিষয়টি অন্য খানে। এ সমস্যা সমাধানে ভ্রান্ত্মনীতি অদক্ষতার প্রমাণ দিয়েছে। তাছাড়া কোন পদ্ধতিতে কীভাবে এ সমস্যা সমাধান করা যায়, তা নিয়ে রয়েছে বিতর্ক। সরকার যখন ক্ষমতায় এসে কুইক রেন্টাল পদ্ধতিতে দ্রম্নত এ সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করে তখন অনেকে এর বিরোধিতা করে কয়লাভিত্তিক বিদু্যৎ উৎপাদনের পরামর্শ দেন। আবার এখনও কেউ কেউ কুইক রেন্টাল পদ্ধতিতে বিদু্যৎ সমস্যার অনেক অগ্রগতি হয়েছে বলে দাবি করেন। অগ্রগতি হলেও এ পদ্ধতি অনেক ব্যয়বহুল।
বিশ্ব বাজার জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির কারণে সরকারকে বেশ কয়েকবার জ্বালানি তেল ও বিদু্যতের মূল্য বৃদ্ধি করতে হয়েছে। কারণ কুইক রেন্টালে বিদু্যৎ উৎপাদনের তেলের প্রয়োজন হওয়ায় বেশি দামে তেল আমদানি করতে গিয়ে যে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় হচ্ছে, তা বিদু্যতে মূল্য বৃদ্ধি করে সাধারণ জনগণের নিকট থেকে সে অর্থ আদায় করা হচ্ছে। এর নেতিবাচক প্রভাব সাধারণ মানুষের ওপর পড়ছে, তেমনি বেশি দামে তেল আমদানি করতে গিয়ে এর বড় ধরনের প্রভাব পড়ছে আমাদের জাতীয় অর্থনীতিতে। তাই কোন পদ্ধতিতে বিদু্যৎ উৎপাদন করলে সমস্যা সমাধান হবে, তা এখন জাতীয় আলোচনার বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়েছে। তবে শুরম্ন থেকেই এ পদ্ধতি নিয়ে সরকারও এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া শুরম্ন হয়। দ্রম্নত বিদু্যৎ সমস্যার নিরসনে কুইক রেন্টাল কিছুটা সুফল দিলেও দিন যতই যাচ্ছে ততই এর নানামুখী ত্রম্নটি ধরা পড়ছে।
সাধারণত যেসব দেশে যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করছে, যেখানে রাষ্ট্র অকার্যকর, এমন দুর্গম অঞ্চল, যেখানে রাষ্ট্রের উপস্থিতি বা প্রশাসন যন্ত্র নেই- এমন সব এলাকায় বিপুল ব্যয়বহুল কুইক রেন্টাল বিদু্যৎকেন্দ্র সাময়িকভাবে বসানো হয়।
ভাড়াভিত্তিক বিদু্যৎ প্রথম চালু করে মার্কিনিরা ভিয়েতনাম যুদ্ধে। এরপর তারা ইরাক ও আফগানিস্ত্মানেও যুদ্ধ পরিচালনার আবশ্যিক জ্বালানি হিসাবে ভাড়াভিত্তিক বিদু্যৎ উৎপাদন ব্যবস্থা চালু করে। সাধারণ বিদু্যৎ কোম্পানিগুলো যখন ঝুঁকিপূর্ণ বা যুদ্ধাবস্থা বিরাজমান কোনো স্থানে বিদু্যৎ স্থাপনা বসাতে অপারগতা প্রকাশ করে তখন, মার্কিন মুলুকেরই বড় বড় কিছু কোম্পানি তাদের সাবসিডিয়ারি হিসেবে ভাড়াভিত্তিক বিদু্যৎ উৎপাদন কোম্পানি গঠন করে। এই হলো সংক্ষেপ রেন্টাল বা কুইক রেন্টাল বিদু্যৎ শুরম্নর কথা।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশে কী এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল, যার জন্য সরকার এই বিপুল ব্যয়বহুল পথে বিদু্যৎ উৎপাদনে গেল?
আওয়ামী লীগ সরকার নির্বাচনী অঙ্গীকার করেছিল, ২০১২ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে লোডশেডিং মুক্ত করবে। আওয়ামী লীগের নির্বাচনী অঙ্গীকারে জনগণ আশায় বুক বেঁধেছিল; এবার বুঝি জ্বালানির একটি সমাধান হবে। আমাদের গ্যাস বা কয়লাভিত্তিক স্থায়ী বিদু্যৎকেন্দ্র স্থাপন করা হবে। এমনই স্বপ্ন দেখেছিল দেশের মানুষ। গ্যাস ও বিদুতের উৎপাদনের সঙ্গে দেশের উন্নয়ন জড়িত-মানুষ সেই উন্নয়নের স্বপ্নই দেখেছিল। কিন্তু হায়? সেই পুরনো পথে, ভূতের পা'র হাঁটা ধরল বর্তমান মহাজোট সরকার। এরা ক্ষমতায় এসে নতুন বিদু্যৎ কেন্দ্র স্থাপন না করে, গ্যাস উত্তোলনকে গতিশীল না করে, পুরনো বিদু্যৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলোকে রক্ষণাবেক্ষণ না করে সহজ পন্থা হিসেবে, স্বল্প সময়ে বিদু্যৎ দেয়ার নাম করে বেসরকারি খাতে ভাড়াভিত্তিক বিদু্যৎকেন্দ্র স্থাপন করার অনুমতি প্রদান করে। ভাড়াভিত্তিক বিদু্যৎকেন্দ্রগুলো চালাতে বহু বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে লাইসেন্স প্রদান করা হয়, যাদের এই সেক্টরে কোনো প্রকার পূর্ব অভিজ্ঞতাই নেই!!
মহাজোট সরকার নিজেদের ও তাদের ব্যবসায়ীদের বাঁচাতে বিদুৎ ও জ্বালানির দ্রম্নত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন, ২০১০ পাস করে। এই দায়মুক্তির আইনের মাধ্যমে সরকার বিনা টেন্ডারে, ইচ্ছেমতো দরে, যে কাউকে বিদু্যৎ তৈরির লাইসেন্স দিতে থাকে এই দায়মুক্তি আইনের মাধ্যমে এই দুষ্ট চক্রের কোনো দুষ্কর্মের বিচারও করা সম্ভব হবে না। বিপুল অংকের টাকা ভর্তুকি দিয়ে ক্ষণস্থায়ী সমাধান করার ফল হচ্ছে দীর্ঘস্থায়ী অন্ধকারের পথে শুরম্ন হলো বাংলাদেশের যাত্রা। ইতিমধ্যে কয়েক দফা বিদু্যতের দাম বাড়ানো হয়েছে। ক্রমাগতভাবে বিদু্যতের দাম বাড়ার ফলে কৃষি, বিভিন্ন খাদ্যসামগ্রী, ছোট-বড় বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠান, সাধারণ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ভেঙে পড়ার উপক্রম হচ্ছে। বিকল্প পদ্ধতিতে জেনারেটর ইত্যাদির মাধ্যমে ব্যবসা বা শিল্পপ্রতিষ্ঠান চালু করা হলেও উৎপাদিত পণ্যের ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে কয়েকগুণ। এর ফলে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে ভয়াবহ রকমের। মানুষ এখন আর আয়ের সঙ্গে কোনোভাবেই ব্যয় সংকুলার করতে পারছে না। বেকার মানুষের সারি দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। ক্রমাগত ঋণের জালে জড়িয়ে পড়ছে দেশ ও দেশের মানুষ। সবমিলিয়ে এক চরম উৎকণ্ঠা, হতাশা ও অনিশ্চয়তায় মধ্যে আজকের বাংলাদেশের মানুষের বসবাস।
১৯৮৮ সালে ফিলিপাইনে স্বৈরাচারী ও দুর্নীতিবাজ মার্কোস মার্কিনিদের সহায়তায় ১ বছরের চুক্তিতে ভাড়াভিত্তিক বিদু্যৎ উৎপাদন কেন্দ্র বসায়। এরপর পাকিস্ত্মানের সরকার রেন্টাল বিদু্যৎকেন্দ্র বসানোর উদ্যোগ গ্রহণ করলেও পাকিস্ত্মানের বিচার বিভাগ তা' বন্ধ করে দেয়। শ্রীলঙ্কায় অনাবৃষ্টির ফলে জলবিদু্যৎকেন্দ্র বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সেদেশে তীব্র বিদু্যৎ সংকটের পরও শ্রীলঙ্কা সরকার রেন্টাল বিদু্যৎ স্থাপন করেনি। বরং তারা চালু বিদু্যৎকেন্দ্রগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ ও দক্ষতা বৃদ্ধি করে, সিস্টেম লস কমিয়ে, লোড ব্যবস্থাপনাকে উন্নত করে তাদের বিদু্যৎ সংকটের তাৎক্ষণিক সমাধান করেছে। অথচ আমরা হাঁটলাম উল্টোপথে।
পরিশেষে বলব, দেশের মানুষের সত্যিকারের কল্যাণ চাইলে কুইক রেন্টাল বা রেন্টাল বিদু্যতের নামে হরিলুট নয়, আমাদের স্থায়ী সমাধানের দিকে যেতে হবে। কিছু লোককে দুর্নীতির সুযোগ আর না দিয়ে, ১৭ কোটি মানুষের কথা ভাবতে হবে। জনগণের কল্যাণ নিশ্চিত করাই একজন প্রকৃত জনপ্রতিনিধির মূল কাজ।

সালাহউদ্দিন আহমেদ
বাণিজ্যবিষয়ক সম্পাদক
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি
 
এই প্রতিবেদন সম্পর্কে আপনার মতামত দিতে এখানে ক্লিক করুন
-এর আরো সংবাদ
অনলাইন জরিপ
অনলাইন জরিপআজকের প্রশ্নজঙ্গিবাদ নিয়ে মন্ত্রীদের প্রচারে আস্থাহীনতার সৃষ্টি হয়েছে_ বিএনপি নেতা আসাদুজ্জামান রিপনের এই বক্তব্য সমর্থন করেন কি?হ্যাঁনাজরিপের ফলাফল
আজকের ভিউ
পুরোনো সংখ্যা
2015 The Jaijaidin
close