নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে হবেগত কয়েক বছরে কোনো বিদু্যৎ উৎপাদন হয়নি তা নয়। বিদু্যৎ উৎপাদন হয়েছে। কিন্তু মূল বিষয়টি অন্য খানে। এ সমস্যা সমাধানে ভ্রান্ত্মনীতি অদক্ষতা প্রমাণ দিয়েছে। তাছাড়া কোন পদ্ধতিতে কীভাবে এ সমস্যা সমাধান করা যায়, তা নিয়ে রয়েছে বিতর্ক। সরকার যখন ক্ষমতায় এসে কুইক রেন্টাল পদ্ধতিতে দ্রম্নত এ সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করে তখন অনেকে এর বিরোধিতা করে কয়লাভিত্তিক বিদু্যৎ উৎপাদনের পরামর্শ দেন। আবার এখনও কেউ কেউ কুইক রেন্টাল পদ্ধতিতে বিদু্যৎ সমস্যার অনেক অগ্রগতি হয়েছে বলে দাবি করেন। অগ্রগতি হলেও এ পদ্ধতি অনেক ব্যয়বহুল।এমএ খালেক বাংলাদেশের অর্থনীতিতে যেমন নানামুখী সম্ভাবনা রয়েছে তেমনি এর সমস্যার সংখ্যাও কম নয়। বাংলাদেশ ক্রমেই কৃষিনির্ভর অর্থনীতি থেকে শিল্পভিত্তিক অর্থনীতির দিকে ধাবিত হচ্ছে। বাংলাদেশে সস্ত্মায় প্রচুর লোকবল পাওয়া যায় বলে এখানে শিল্প-কারখানা স্থাপনে বিদেশিদের অনেকেই উৎসাহী হয়ে থাকেন এমন একটি ধারণা সাধারণভাবে প্রচলিত আছে। কিন্তু এই ধারণা মোটেও ঠিক নয়। কারণ শুধু সস্ত্মায় পর্যাপ্তসংখ্যক শ্রমশক্তির জোগান থাকলেই একটি দেশে বিনিয়োগ হবে তা আশা করা যায় না। কোনো দেশের জনশক্তি যদি প্রশিক্ষিত এবং উদ্ভাবনী শক্তির অধিকারী হয় তাহলে সেটা সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। কিন্তু অপ্রশিক্ষিত এবং কম উদ্ভাবনী শক্তির অধিকারী জনসংখ্যা কোনোভাবেই একটি দেশের জন্য সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে না। বাংলাদেশের জনসংখ্যাকে জনশক্তিতে রূপান্ত্মরের জন্য এখনো কোনো কার্যকর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়নি। বাংলাদেশের শ্রমশক্তি এখনো জনসম্পদে পরিণত হতে পারেনি। কিন্তু এই বিশাল জনগোষ্ঠী অন্য কারণে স্থানীয় এবং বিদেশি বিনিয়োগ আহরণের উপলক্ষ হতে পারে। বাংলাদেশ ১৬ কোটি মানুষের বিশাল বাজার। এখানে স্থানীয়ভাবে মানুষের ভোগ ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশ্বে এমন অনেক অঞ্চল আছে যেখানে ৩/৪টি দেশ মিলেও ১৬ কোটি মানুষ বাস করে না। বাংলাদেশের এই বিশাল বাজার বিদেশি উদ্যোক্তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। বাংলাদেশে বিনিয়োগের যেমন সম্ভাবনা আছে তেমনি এখানে সমস্যাও কম নয়। বিশেষ করে বাংলাদেশে জ্বালানি শক্তির প্রচ- অভাব রয়েছে। কোনো শিল্প-কারখানা স্থাপন বা উৎপাদনমুখী কার্যক্রম সম্পাদন করতে গেলেই জ্বালানি শক্তির প্রয়োজন হয়। কিন্তু সনাতনী জ্বালানি শক্তির উৎস থেকে এই সমস্যা মেটানো যাচ্ছে না। সরকার বলছেন, বিদ্যুতের উৎপাদন ক্ষমতা অনেক বেড়েছে। এটা ঠিক যে উৎপাদন ক্ষমতা বেড়েছে। কিন্তু উৎপাদন কি সেই অনুপাতে বেড়েছে? এ ছাড়া চাহিদা যেভাবে বেড়েছে উৎপাদন তো সেই হারে বৃদ্ধি পায়নি। প্রচলিত পদ্ধতি ব্যবহার করে জ্বালানি শক্তির চাহিদা নিকট ভবিষ্যতে পূরণ হওয়ার কোনোই সম্ভাবনা নেই।
আমাদের নবায়নযোগ্য জ্বালানি শক্তির ব্যবহার বাড়ানোর মাধ্যমে জ্বালানি শক্তির সমস্যা কিছুটা হলেও মেটানো যেতে পারে। বিশ্বের অনেক দেশই তাদের জ্বালানি শক্তির অভাব পূরণের জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানি শক্তির উপর নির্ভর করছে। তেল, গ্যাস, খনিজসম্পদ ও বিদ্যুৎ, বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির পক্ষ থেকে সম্প্রতি জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে 'বাংলাদেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মহাপরিকল্পনা (২০১৭-২০৪১) উপস্থাপন করা হয়। এতে বলা হয়, বাংলাদেশের প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ এখনো গ্রিড বিদ্যুৎ সুবিধার বাইরে রয়ে গেছে। যারা বিদ্যুৎ সংযোগের মধ্যে আছেন তারাও নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পাচ্ছেন না। ট্রান্সমিশন বিতরণ ব্যবস্থা ভয়াবহ ত্রম্নটিযুক্ত। যারা সৌর বিদ্যুৎ পাচ্ছেন তাদেরও দিতে হচ্ছে অস্বাভাবিক উচ্চ দাম। বিদ্যুতের অধিকার প্রতিষ্ঠিত না হলেও নিয়মিত বাড়ছে বিদ্যুতের মূল্য। ২০৪১ সালে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যা হবে ২২ কোটি।
বাড়ছে অর্থনীতির আকার, বিদ্যুৎনির্ভর কৃষি, শিল্পসহ অর্থনৈতিক তৎপরতা বাড়ছে। সাধারণ মানুষের জীবনযাপনেও বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছে। ২০৪১ সাল নাগাদ বিদ্যুতের চাহিদা কয়েক গুণ বৃদ্ধি পাবে। এ বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই আমরা এই মহাপরিকল্পনা উপস্থাপন করছি। এর মূল লক্ষ্য হলো- ক. দেশের সব নাগরিকের জন্য সুলভে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা, খ. দীর্ঘ মেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তার লক্ষ্যে দেশের সম্পদের জাতীয় মালিকানা এবং তার সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করা, গ. সবার জন্য নিরাপদ, ঝুঁকিবিহীন এবং পরিবেশসম্মত বিদ্যুৎ উৎপাদনের পথ ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো নির্দেশ করা এবং ঘ. জাতীয় সক্ষমতার উপর দাঁড়িয়ে বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সামগ্রিক জীবন মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
কমিটির তাদের প্রস্ত্মাবনায় অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে জ্বালানি সঙ্কট নিরসনের জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানি শক্তি ব্যবহারের উপর জোর দেওয়া হয়েছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি বলতে আমরা এমন এক জ্বালানি শক্তিকে বুঝি যা সাধারণত প্রাকৃতিক উৎস থেকে পাওয়া যায়। এই শক্তির উৎস কখনোই শেষ হবে না। ফলে প্রতিবার এই শক্তি ব্যবহারের পর আবার নতুন করে কাঁচামাল বা উপকরণের জোগান দিতে হবে না। অর্থাৎ এই শক্তির উৎস বা উপকরণ আপনাআপনিই নবায়িত হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি পাওয়া যায় প্রধান কয়েকটি সূত্র বা উৎস থেকে। যেমন- সূর্যালোক, সমুদ্রে ঢেউ, নদীর স্রোত, বৃষ্টি ইত্যাদি থেকে। প্রাপ্ত তথ্য থেকে জানা যায়, প্রতি বছর বিশ্বব্যাপী যে এনার্জি কনজামশনের ১৯ দশমিক ২ শতাংশ আসে নবায়নযোগ্য জ্বালানি শক্তি থেকে। একইভাবে মোট বিশ্ব ইলেক্ট্রিসিটি জেনারেশনের ২৩ দশমিক ৭ শতাংশ আসে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে। বিশ্বব্যাপী নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের বিষয়টি কার্যত এখনো উপেক্ষিত রয়ে গেছে। আমাদের অর্থনীতির আকার বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাড়ছে জনসংখ্যা। আগামীতে বিদ্যুৎ এবং অন্যান্য জ্বালানি শক্তির চাহিদা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাবে। সেই বর্ধিত চাহিদা পূরণে আমরা যদি এখনই উদ্যোগ গ্রহণ না করি তাহলে সমস্যায় পড়তে হবে।
নিকট প্রতিবেশী দেশগুলো নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে অনেক দূর এগিয়ে গেলেও আমরা এ ব্যাপারে এখনো পিছিয়ে রয়েছি। প্রতিবেশী দেশ ভারত ইতিমধ্যেই এ ক্ষেত্রে দক্ষতা ও সামর্থ্যরে পরিচয় দিয়েছে। ভারত ইতিমধ্যেই আন্ত্মর্জাতিক সৌর জোটও গঠন করেছে। ভারত সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচও ক্রমাগত কমিয়ে আনছে। আগামীতে ভারত বিদ্যুৎ এবং অন্যান্য জ্বালানি শক্তির জন্য বহুলাংশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎসের ওপর নির্ভর করবে। ভারতের বিশিষ্ট জ্বালানি গবেষক সৌম্য দত্তের মতে, ভারত যদি তার নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারে, এমনকি ৭০ শতাংশও অর্জিত হয় তাহলে অন্ত্মত আগামী ১৫ বছর তাদের কয়লা, পারমাণবিক বা বৃহৎ বাঁধনির্ভর বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রয়োজন হবে না। শুধু ভারতই নয়, চিনও নবায়নযোগ্য জ্বালানি শক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে অনেক দূর এগিয়ে গেছে। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের দূষণ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য চীন ২০১৩ সাল থেকে পরবর্তী ৫ বছরে ২৭৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় করার সিদ্ধান্ত্ম নিয়েছে। একই সঙ্গে চীন নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে ৩৬১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় করবে। এতে দেশটির বিদ্যুৎ চাহিদা অনেকাংশেই পূরণ হবে। এ ছাড়া নতুন করে ১ কোটি ৩০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হবে। ডেনমার্কের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ৪০ শতাংশই আসছে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাত থেকে। আগামী ২০২০ সালে এটা ৫০ শতাংশে উন্নীত হবে। অথচ ৭০-এর দশকের আগে সেখানকার বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থার প্রায় পুরোটাই ছিল আমদানিকৃত জ্বালানি তেলনির্ভর। দেশটি ২০৫০ সালে তাদের মোট বিদ্যুতের পুরোটাই নবায়নযোগ্য উৎস থেকে আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে।
বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল দেশ। দ্রম্নত আমাদের অর্থনৈতিক উন্নয়ন সাধিত হচ্ছে। ২০২১ সালে আমরা একটি কার্যকর মধ্যবিত্ত দেশে পরিণত হতে রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিশ্রম্নতিবদ্ধ। একই ভাবে ২০৪১ সালের মধ্যে আমরা উন্নত দেশে পরিণত হতে চাই। এ জন্য বিশাল কর্মযজ্ঞ শুরম্ন করতে হবে। শুধু কৃষির ওপর নির্ভর করে একটি দেশ কখনোই উন্নত হতে পারে না। এ জন্যই আমাদের পরিকল্পিত শিল্পায়নের ওপর বিশেষ জোর দিতে হবে। বাংলাদেশে জ্বালানি সংকট এখনো তীব্র। সাধারণত আমাদের দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রাকৃতিক গ্যাস এবং কয়লা ব্যবহার করা হয়। কিন্তু কয়লা দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন পরিবেশবান্ধব নয়। তাই গ্যাসের ওপর বেশি নির্ভর করতে হচ্ছে। এ ছাড়া কয়লার জোগানও অত্যন্ত্ম সীমিত। দিনাজপুরের বড় পুকুরিয়া খয়লা খনিতে ৩৯ কোটি টন, খালাশপীর কয়লা খনিতে ৬৮ কোটি ৫০ লাখ টন, দীঘিপাড়া কয়লা খনিতে ৫০ কোটি টন এবং দিনাজপুরের ফুলবাড়ী কয়লা খনিতে ৫৭ কোটি টন কয়লা আছে। এই পরিমাণ কয়লা দিয়ে বেশি দিন চলা যাবে না। এ ছাড়া কয়লাখনি থেকে কীভাবে কয়লা উত্তোলন করা হবে তা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। ফুলবাড়ী কয়লাখনি নিয়ে স্থানীয় জনসাধারণ অনেক দিন ধরেই আন্দোলন করছে। তারা কোনোভাবেই উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন করতে দিতে আগ্রহী নয়। কারণ এতে এলাকার অনেক মানুষ বাড়ি-ঘর ছাড়া হবে। এই একটি মাত্র খনি থেকে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন করতে হলে ১৫০টি গ্রামের ২ লাখ মানুষকে বাড়ি ছাড়া করতে হবে। কয়লা দিয়ে জ্বালানি চাহিদা খুব একটা বেশি দিন মেটানো যাবে না। এ দিকে প্রাকৃতিক গ্যাসের জোগানও পর্যাপ্ত নয়। গভীর ও অগভীর সমুদ্রে বিপুল পরিমাণ গ্যাসের মজুদ রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। উলেস্নখ্য, বাংলাদেশের নিকটবর্তী অভিন্ন ভূপ্রাকৃতিক গঠন সমৃদ্ধ আরাকান বেসিনে সম্প্রতি মিয়ানমার ৯ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের সন্ধান পেয়েছে। আগামীতে আরও কিছু গ্যাস ক্ষেত্র আবিষ্কৃত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু এগুলো দিয়ে বেশিদিন জ্বালানি চাহিদা পূরণ করা যাবে না। তাই আমাদের এখনই বিকল্প জ্বালানি সম্পদের প্রতি দৃষ্টি দিতে হবে। এই বিকল্প জ্বালানি হতে পারে নবায়নযোগ্য জ্বালানি। বাংলাদেশের সমুদ্র তীরবর্তী এলাকার বাতাস কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যেতে পারে। সমুদ্রের ঢেউ অথবা নদীর স্রোত দিয়েও বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যেতে পারে। এ ব্যাপারে এখনই উদ্যোগ নিতে হবে।
এমএ খালেক
অর্থনীতিবিষয়ক কলাম লেখক
 
এই প্রতিবেদন সম্পর্কে আপনার মতামত দিতে এখানে ক্লিক করুন
-এর আরো সংবাদ
অনলাইন জরিপ
অনলাইন জরিপআজকের প্রশ্নজঙ্গিবাদ নিয়ে মন্ত্রীদের প্রচারে আস্থাহীনতার সৃষ্টি হয়েছে_ বিএনপি নেতা আসাদুজ্জামান রিপনের এই বক্তব্য সমর্থন করেন কি?হ্যাঁনাজরিপের ফলাফল
আজকের ভিউ
পুরোনো সংখ্যা
2015 The Jaijaidin
close