একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন-৭টাঙ্গাইল-৪ আসনে কোন্দলে জর্জরিত আ'লীগ-বিএনপিটাঙ্গাইল প্রতিনিধি একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে টাঙ্গাইল-৪ (কালিহাতী) আসনে আওয়ামী লীগ-বিএনপির একাধিক সম্ভাব্য প্রার্থী আগাম গণসংযোগ করছেন। তবে ১৩টি ইউনিয়ন ও দুইটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত টাঙ্গাইল-৪ (কালিহাতী) আসনে সাবেক মন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকীকে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির গলার কাঁটা হিসেবে দেখছেন নির্বাচন বোদ্ধারা।
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে সব দলের সম্ভাব্য প্রার্থীরা বেশ আগে থেকে গণসংযোগ করছেন। বড় দুই দলের মনোনয়নপ্রত্যাশীরা তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে কুশল বিনিময়, নির্বাচনী এলাকায় পোস্টার ও লিফলেট সেঁটে জনগণের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করছেন। আর তৃণমূল নেতাদের সমর্থন ও কেন্দ্রের সবুজ সংকেত পেতে লবিংও চালাচ্ছেন প্রার্থীরা।
এ আসনটি বরাবরই ভিআইপি আসন হিসেবে চিহ্নিত। এ আসনে চির প্রতিদ্বন্দ্বী স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠক ও সাবেক মন্ত্রী শাহজাহান সিরাজ এবং মুক্তিযুদ্ধে টাঙ্গাইলের সংগঠক আবদুল লতিফ সিদ্দিকী উভয়েই রাজনীতির মাঠ থেকে ছিটকে পড়েছেন। এদের মধ্যে শাহজাহান সিরাজ অসুস্থতা জনিত করণে রাজনীতিতে নীরব এবং আবদুল লতিফ সিদ্দিকী নিউইয়র্কে হজ ও তাবলীগ জামাত নিয়ে আপত্তিকর বক্তব্যের কারণে মন্ত্রীত্ব হারান, দল থেকে বহিষ্কৃত হন এবং সংসদ সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করেন। বস্তুত শাহজাহান সিরাজ রাজনীতি থেকে বিচ্যুত হলেও আবদুল লতিফ সিদ্দিকী মনে করেন, তিনি সাচ্চা আওয়ামী লীগার, আওয়ামী লীগ থেকে কেউ তাকে সরাতে পারবে না। তিনি এখনো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ওপর আস্থাশীল। আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন এমন আভাস তার কাছের লোকজনের। গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদ থেকে পদত্যাগের পর থেকে তিনি নিয়মিত এলাকায় আসছেন। কাছের লোকদের নিয়ে বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে যোগ দিচ্ছেন। তিনি নির্বাচনী মাঠে থাকলে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয় দলের জন্যই বড় বাঁধা বলে মনে করেন উভয় দলের নেতাকর্মীরা।
জেলা নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা গেছে, ১৯৭৩ সাল থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী তিনবার, বিএনপি প্রার্থী তিনবার, জাতীয় পার্টির প্রার্থী একবার, জাসদ (সিরাজ) প্রার্থী একবার এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী একবার জয়লাভ করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের সূতিকাগার টাঙ্গাইলের কালিহাতী থেকে মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ আবদুল লতিফ সিদ্দিকী ১৯৭০ সালে প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য, এরপর ১৯৭৩, ১৯৯৬, ২০০৮ ও ২০১৪ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
সরেজমিন দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০০৮ সালে শাহজাহান সিরাজ জেল-হাজতে থাকায় এ আসনে বিএনপির মনোনয়ন দেয়া হয় কেন্দ্রীয় বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য লুৎফর রহমান মতিনকে। তিনি আওয়ামী লীগের আবদুল লতিফ সিদ্দিকীর কাছে পরাজিত হন। লতিফ সিদ্দিকী এমপি হওয়ার পর সরকারের মন্ত্রী হিসেবে এলাকার বেশ উন্নয়ন করেন। সর্বশেষ ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে পুনরায় আবদুল লতিফ সিদ্দিকী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এমপি নির্বাচিত হন। এ আসনে আবদুল লতিফ সিদ্দিকীর জনপ্রিয়তা এখনো ঈর্ষণীয়।
টাঙ্গাইল-৪ (কালিহাতী) আসনে শাসকদল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির অন্তঃকোন্দল সীমাহীন। এ আসনের আওয়ামী লীগ এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলো দৃঢ় সাংগঠনিক দক্ষতায় নিয়ন্ত্রণ করতেন আবদুল লতিফ সিদ্দিকী। তার অনুপস্থিতিতে দলের সর্বেসর্বা এখন উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মোজহারুল ইসলাম তালুকদার। এদিকে, আবদুল লতিফ সিদ্দিকীর পদত্যাগের পর উপ-নির্বাচনে এমপি হয়েছেন হাছান ইমাম খান সোহেল হাজারি। স্থানীয় সাংসদ হাছান ইমাম খান সোহেল হাজারির সঙ্গে উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও উপজেলা আ'লীগের সভাপতি মোজহারুল ইসলামের দূরত্ব এখন যোজন-যোজন। উভয়ের মধ্যকার সম্পর্ক সাপে-নেউলে। কেউ কাউকে সহ্য করেন না। সভা-সমাবেশে একত্রে বসলেও চেয়ার থাকে দূরত্বে। পারত পক্ষে উভয়ই উভয়কে এড়িয়ে চলেন। মোজহারুল ইসলাম তালুকদারের অভিযোগ, এমপি সোহেল হাজারি বিএনপি-জামায়াতের লোক নিয়ে চলাফেরা করেন, আ'লীগের নেতাকর্মীদের গুরুত্ব দেন না। আর এমপি সোহেল হাজারির বক্তব্য হচ্ছে, উপজেলা আ'লীগের সভাপতি তাকে দলীয় কাজে ডাকেন না, যথাযথ মূল্যায়নও করেন না। সাংগঠনিক কোনো কর্মকা-ের খবর পেলে তিনি নিজেই উপস্থিত হন।
বর্তমান সংসদ সদস্য আওয়ামী লীগের হাছান ইমাম খান সোহেল হাজারি আগামী নির্বাচনে প্রার্থী হবেন। দলীয় মনোনয়নও তিনিই পাবেন এমন বিশ্বাস তার কর্মী-সমর্থকদের। সোহেল হাজারি সপ্তাহের ৪-৫ দিন ভোর থেকে রাত পর্যন্ত এলাকার মানুষের খোঁজখবর নেন। সময়-অসময়ে দলীয় নেতাকর্মীদের বাড়িতে গিয়ে হাজির হন, কুশল বিনিময় করেন। এ আসনে দলীয় মনোনয়ন পেতে উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও উপজেলা আ'লীগের সভাপতি মোজহারুল ইসলাম তালুকদার ঠা-ু, ইঞ্জিনিয়ার লিয়াকত আলী, এফবিসিসিআই'র পরিচালক আবু নাসের গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। ইঞ্জিনিয়ার লিয়াকত আলী বিভিন্ন এলাকায় দু'হাতে দান-খয়রাতও করছেন। বিশেষ করে, এবারের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে তিনি প্রায় সব সময় ছিলেন- ব্যক্তি উদ্যোগে উল্লেখযোগ্য ত্রাণ বিতরণও করেছেন। এ ছাড়া আবদুল লতিফ সিদ্দিকী দলীয় মনোনয়ন চাইতে পারেন, তার সহধর্মিনী সাবেক সাংসদ বেগম লায়লা সিদ্দিকীও মনোনয়ন চাইবেন।
আসনটিতে বিএনপির অন্তঃকোন্দলও চরমে। স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠক শাহজাহান সিরাজের স্ত্রী বেগম রাবেয়া সিরাজ, লুৎফর রহমান মতিন, মো. শাফি খান ও বেনজীর আহম্মেদ টিটুর রয়েছে নিজ নিজ গ্রুপ। ২০০৮ সালে বিএনপি দলীয় মনোনয়ন পেয়ে কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য শিল্পপতি লুৎফর রহমান মতিন পরাজিত হলেও ভোট পান ৮৬ হাজার ৯১২টি। কিন্তু নির্বাচনের পরই তিনি দলীয় কার্যক্রমে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন। সরকারবিরোধী কোনো কর্মকা-ে দলীয় নেতাকর্মীরা তাকে পাশে পায়নি। ফলে আন্দোলন-সংগ্রামে মামলা হামলার শিকার নেতাকর্মীরা এলেঙ্গা পৌরসভার মেয়র মো. শাফি খানের দিকে ঝুঁকে পড়ে। ফলে জেলা বিএনপি নেতা মো. শাফি খান তৃণমূলের নেতাকর্মীদের প্রিয়পাত্র। এলেঙ্গা পৌরসভার মেয়র থাকার সুবাদে মো. শাফি খান স্থানীয় নেতাকর্মীদের পাশে থাকছেন। একই সঙ্গে আত্মীয়তার সূত্রে কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করছেন। মো. শাফি খান দলীয় মনোনয়ন পাবেন এমনটাই মনে করেন তার ঘনিষ্ঠ কর্মী-সমর্থকরা। তাছাড়া আগে থেকেই দলীয় মনোনয়ন নিয়ে কালিহাতী উপজেলা বিএনপির সভাপতি শিল্পপতি লুৎফর রহমান মতিনের সঙ্গে স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠক সাবেক মন্ত্রী শাহজাহান সিরাজের সহধর্মিনী বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য বেগম রাবেয়া সিরাজের দ্বন্দ্ব রয়েছে। আগামী নির্বাচনে বেগম রাবেয়া সিরাজ বা ছেলে রাজিব আহমেদ (অপু সিরাজ) দলীয় মনোনয়ন চাইবেন। এ ছাড়া মালয়েশিয়া বিএনপির সভাপতি প্রকৌশলী বাদলুর রহমান বাদল, সাবেক ছাত্র নেতা বেনজীর আহমেদ টিটু, ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল হালিম, ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র দলের সাবেক সভাপতি এসএমএ খালিদ দলীয় মনোনয়নের প্রত্যাশায় এলাকায় গণসংযোগ করছেন। এ আসনে জেলা জাতীয় পার্টির অর্থবিষয়ক সম্পাদক সৈয়দ মোস্তাক আহম্মেদ রতন দলীয় প্রার্থী।
টাঙ্গাইল-৪ আসনের ১৩ ইউনিয়ন ও দুই পৌরসভায় মোট ভোটার দুই লাখ ৯০ হাজার ৫৫ জন। এরমধ্যে নারী ভোটার এক লাখ ৪৬ হাজার ৮০০ এবং পুরুষ ভোটার এক লাখ ৪৩ হাজার ২৫৫ জন।
 
এই প্রতিবেদন সম্পর্কে আপনার মতামত দিতে এখানে ক্লিক করুন
স্বদেশ -এর আরো সংবাদ
অনলাইন জরিপ
অনলাইন জরিপআজকের প্রশ্নজঙ্গিবাদ নিয়ে মন্ত্রীদের প্রচারে আস্থাহীনতার সৃষ্টি হয়েছে_ বিএনপি নেতা আসাদুজ্জামান রিপনের এই বক্তব্য সমর্থন করেন কি?হ্যাঁনাজরিপের ফলাফল
আজকের ভিউ
পুরোনো সংখ্যা
2015 The Jaijaidin