পূর্ববর্তী সংবাদ
প্যাটেন্ট কখন ও কীভাবে?বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক আবিষ্কারের ওপর আবিষ্কারকের একচ্ছত্র বাণিজ্যিক স্বার্থ কায়েম করার আইনি উপায়ের নাম প্যাটেন্ট। বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার এক ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পত্তি, যার সুরক্ষার ব্যবস্থা বাংলাদেশের আইনেও রয়েছে। প্যাটেন্টের সাধারণ ধারণা এবং বাংলাদেশে প্যাটেন্ট পাওয়ার উপায় নিয়ে লিখেছেন আবরার মাসুদধরা যাক, একজন বিজ্ঞানী একটা কিছু আবিষ্কার করলেন। এখন তাহলে সেই আবিষ্কার করা জিনিসটি বাজারে বিক্রি করে বেশ একটা ব্যবসা জমিয়ে তোলা সম্ভব। এখন তার অনুমতি ছাড়াই আরেকজন সেই আবিষ্কার করা জিনিসটি বানিয়ে বাজারে বিক্রি করতে শুরম্ন করলে ব্যাপারটা নিশ্চয়ই ভালো হবে না।
এই ব্যাপারটা বন্ধ করার রাস্ত্মাই হলো প্যাটেন্ট। কেউ কিছু আবিষ্কার করলে সেটা চটজলদি নিজের নামে প্যাটেন্ট করে ফেলতে হবে। তাহলে চাইলেই যে কেউ আর সেটা বানিয়ে বিক্রি করতে পারবে না। যদি করেও, মামলা ঠুকে এর একটা বিহিত করা যাবে। তাহলে যেটা দাঁড়াল, প্যাটেন্ট হলো এক ধরনের অধিকার। কেউ কোনো কিছু আবিষ্কার করলে রাষ্ট্রকে জানাবে, এটা তার আবিষ্কার। রাষ্ট্র মেনে নেবে, এটা বানানোর অধিকার শুধু তার। বিনিময়ে রাষ্ট্রও তাকে কিছু শর্ত দিয়ে দেয়। যেমন : এই অধিকারটা আজীবনের জন্য নয়, বরং একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত্ম পাওয়া যাবে। সাধারণভাবে মেয়াদটা ২০ বছরের মতো হয়। আবিষ্কার করা জিনিসটার ধরন-ধারণ অনুযায়ী এই মেয়াদ কমবেশিও হয়। সাধারণত প্যাটেন্ট করতে গেলে আরও একটা শর্ত দেয়া হয়, আবিষ্কারের বিষয়টা প্রকাশ্যে জানাতে হয়।
আগে এই প্যাটেন্টের বিষয়টা রাষ্ট্রের ইচ্ছাধীন ছিল। মানে, চাইলে কোনো রাষ্ট্র এই অধিকার না-ও দিতে পারত। আবার কোনো রাষ্ট্র চাইলে প্যাটেন্টের বিপরীতে যা ইচ্ছা শর্তও জুড়ে দিতে পারত। পরে বিশ্ব শ্রম সংস্থা এই নিয়ে একটা চুক্তি করল। সেই চুক্তি অনুযায়ী, সংস্থাটির সব সদস্য রাষ্ট্রকে প্যাটেন্টের অধিকার দিতে হবে।
এই প্যাটেন্ট শব্দটা এসেছে লাতিন শব্দ ঢ়ধঃবৎব থেকে, যার অর্থ খুলে রাখা। পৃথিবীতে প্রথম প্যাটেন্টের ধারণা চালু হয় প্রাচীন গ্রিসের শহর সাইবেরিসে, খ্রিস্টপূর্ব ৫০০ অব্দে। এখনকার হিসেবে সেটা ইতালির দক্ষিণ অংশে পড়বে। সেটি অবশ্য এখনকার প্যাটেন্ট ব্যবস্থার মতো ছিল না। সেটি শুরম্ন হয়েছিল খাবার দিয়ে। চমৎকার একটি রান্নার প্রণালিকে উদ্ভাবকের নিজস্ব আবিষ্কার হিসেবে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য (যেমন এক বছর) অন্য কেউ ব্যবহার করতে পারবে না এমন বিধান করা হতো। প্রাচীন রোমেও এমন ব্যবস্থা চালু ছিল।
১৪৭৪ সালে ইটালিতে প্রথম আধুনিক প্যাটেন্ট ব্যবস্থা চালু হয়। ভেনিস প্রজাতন্ত্র একটি ডিক্রি জারি করে যে, নতুন আবিষ্কারের তথ্য প্রজাতন্ত্রকে জানাতে হবে, যাতে আবিষ্কারক তার আবিষ্কারের প্যাটেন্ট রাইট পেতে পারেন। ইংল্যান্ডে ১৬২৩ সালে রাজা জেমস-১ এর অধীনে নতুন আবিষ্কারের প্রকল্পের জন্য প্যাটেন্ট অধিকার প্রদানের বিধান ঘোষণা করা হয়। ওই দেশের রানী এ্যান-এর আমলে (১৭০২-১৪) আইনজ্ঞরা এই প্যাটেন্ট পাওয়ার জন্য একটি লিখিত বিবরণ প্রদানের ব্যবস্থা করেন। সেই ব্যবস্থাটি এখনো প্যাটেন্ট ব্যবস্থার সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
১৭৭৮-৭৯ সময়কালে আমেরিকার অনেক রাজ্য নিজস্ব প্যাটেন্ট ব্যবস্থা চালু করে। ফলে একটি বিভ্রান্ত্মিকর পরিস্থিতির উদ্ভব হয় যা পরে ফেডারেল সরকার একীভূত করে। এই উদ্দেশ্যেই আমেরিকান কংগ্রেস ১৭৯০ সালে প্যাটেন্ট আইন পাস করে। ১৭৯০ সালের ৩১ জুলাই পটাশের প্যাটেন্ট প্রদানের মধ্যদিয়ে আমেরিকায় প্যাটেন্টের যাত্রা শুরম্ন হয়। তবে প্রথম দিকে প্যাটেন্ট ছিল যন্ত্র ও রসায়ন ইত্যাদির প্রক্রিয়াভিত্তিক। যেহেতু ইউরোপে শিল্পবিপস্নব হয় সেহেতু ইউরোপেই প্রথম এই চাপটি বেশি অনুভূত হয় যে, আবিষ্কারকে রক্ষা করতে হবে। পরে বিষয়টি আমেরিকাতেও প্রভাব ফেলে।
ব্রিটেনে ১৬২৪ সালের ২৫ মে একটি বিধিমালা পাস হয় 'স্ট্যাচুট অব মনোপলিজ' নামে। পরে এটাকেই তারা প্যাটেন্ট আইনে রূপান্ত্মরিত করে। বেশির ভাগ দেশই এই বিধিমালা অনুসরণ করেই প্যাটেন্ট আইন তৈরি করেছে।

বাংলাদেশের প্যাটেন্ট আইন
বাংলাদেশে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক আবিষ্কার ও নতুন উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে নিবন্ধন দেয়া হয় ব্রিটিশ আমলে প্রণীত প্যাটেন্ট ও ডিজাইন আইন ১৯১১ এবং এ সম্পর্কিত বিধিমালা ১৯৩৩ এর অধীনে। প্যাটেন্ট ও ডিজাইন আইনের ৩ ধারা অনুসারে বাংলাদেশের নাগরিক কিংবা বিদেশি কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান প্যাটেন্টের জন্য আবেদন করতে পারে। যারা প্যাটেন্ট পাওয়ার যোগ্য, তারা হলো: (ক) একটি উদ্ভাবনের প্রথম এবং প্রকৃত আবিষ্কারক; (খ) প্রকৃত ও প্রথম আবিষ্কারক যাকে প্যাটেন্ট পাওয়ার অধিকার হস্ত্মান্ত্মর করেছেন; (গ) প্রকৃত ও প্রথম আবিষ্কারক যদি মৃতু্যবরণ করেন, সেক্ষেত্রে তার আইনগত প্রতিনিধিরা।
প্যাটেন্টের আবেদন একক বা যৌথভাবে করা যায়। প্যাটেন্ট ও ডিজাইন অধিদপ্তরের ওয়েবসাইট বা অফিস থেকে নির্ধারিত ফরম সংগ্রহ করে বিধি মোতাবেক এই আবেদন করতে হয়। আবেদন করবার সময় আবেদনকারীকে এই মর্মে ঘোষণা দিতে হয় যে, তার দখলে এমন একটি নতুন উদ্ভাবন রয়েছে, যার প্রথম ও প্রকৃত আবিষ্কারক তিনিই অথবা তিনি প্রথম ও প্রকৃত আবিষ্কারকের প্রতিনিধি। আবেদনের সঙ্গে আবিষ্কারের বিস্ত্মারিত ও পূর্ণাঙ্গ বিবরণ দাখিল করতে হয়। এই বিবরণে আবিষ্কারটির প্রকৃতি ও কীভাবে এটি আবিষ্কৃত হয়েছে, তার বিস্ত্মারিত বিবরণ অন্ত্মর্ভুক্ত করতে হয়। আবিষ্কারটির অন্ত্মর্গত প্রক্রিয়া যেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ে সাধারণ জ্ঞানসম্পন্ন একজন ব্যক্তি সহজেই বুঝতে পারেন, সে লক্ষ্যে আবিষ্কারটি তৈরির পূর্ণাঙ্গ প্রক্রিয়া চিত্রের মাধ্যমেও ব্যাখ্যা করতে হয়, যা আবেদনের সঙ্গে সংযুক্ত করা বাধ্যতামূলক।
প্যাটেন্টের আবেদনে বেশ কিছু বিষয় উলেস্নখ ও সংযুক্ত করা বাধ্যতামূলক। যেমন: (ক) আবিষ্কারকের নাম, ঠিকানা ও জাতীয়তা; (খ) আবিষ্কারের দুই কপি পূর্ণ বিবরণী এবং ট্রেসিং পেপারে আবিষ্কারটির পর্যায়ভিত্তিক এককপি চিত্র; (গ) যদি মূল আবিষ্কারকের পরিবর্তে তার থেকে অনুমতিপ্রাপ্ত কেউ প্যাটেন্টের আবেদন করেন, সেক্ষেত্রে মূল আবিষ্কারকের সঙ্গে ওই ব্যক্তির চুক্তির কপি কিংবা আমমোক্তারনামা; (ঘ) যদি বিদেশে ইতোমধ্যে আবিষ্কারটির প্যাটেন্ট গ্রহণ করা হয়ে থাকে, সেক্ষেত্রে সেই নিবন্ধনের দলিলপত্র।
আবেদন পাওয়ার পর প্যাটেন্ট ও ডিজাইন অফিসের নিয়ন্ত্রক বিষয়টি সম্পর্কে বিজ্ঞাপন বা বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে প্রচার করবেন। পরবর্তী চার মাসের মধ্যে যে কেউ এই প্যাটেন্ট সম্পর্কিত আপত্তি উত্থাপন করতে পারবেন। প্যাটেন্ট আইন অনুসারে আবিষ্কারটি প্যাটেন্টের যোগ্য নয়, কিংবা এই আবিষ্কারের প্যাটেন্ট আবেদনকারীর পরিবর্তে অন্য কারো পাওয়া উচিত- এ ধরনের যুক্তিতে প্যাটেন্ট আবেদনের বিরম্নদ্ধে আপত্তি উত্থাপন করা যায়।
চার মাসের মধ্যে যদি কোনো আপত্তি উত্থাপিত না হয়, কিংবা আপত্তি উত্থাপিত হওয়ার পর তা আবেদনকারীর অনুকূলে নিষ্পত্তি হয়, তখন নিয়ন্ত্রক আবেদনকারীর বরাবর প্যাটেন্ট নিবন্ধন করে দেবেন। একটি আবিষ্কারের প্যাটেন্ট ১৬ বছরের জন্য প্রদান করা হয় এবং পরবর্তীতে এটি আরো ক্ষেত্রবিশেষে আরো ১০ বছরের জন্যে বর্ধিত করা যায়।
 
পূর্ববর্তী সংবাদ
এই প্রতিবেদন সম্পর্কে আপনার মতামত দিতে এখানে ক্লিক করুন
অনলাইন জরিপ
অনলাইন জরিপআজকের প্রশ্নজঙ্গিবাদ নিয়ে মন্ত্রীদের প্রচারে আস্থাহীনতার সৃষ্টি হয়েছে_ বিএনপি নেতা আসাদুজ্জামান রিপনের এই বক্তব্য সমর্থন করেন কি?হ্যাঁনাজরিপের ফলাফল
আজকের ভিউ
পুরোনো সংখ্যা
2015 The Jaijaidin
close