নিজেকে নির্দিষ্ট ছকে বেঁধে রাখিনিচিরসবুজ সংগীতশিল্পী ও সংগীতপরিচালক কুমার বিশ্বজিৎ। দীর্ঘ সংগীত ক্যারিয়ারে উপহার দিয়েছেন অসংখ্য কালজয়ী গান। তার গানে যেমন খুঁজে পাওয়া যায় বাঙালির লোকজ সুর, তেমনি তিনি গেয়েছেন সেমি ক্লাসিক্যাল, আধুনিক, ওয়েস্টার্ন, ফিউশন নানা আঙ্গিকের গান। এখনো তিনি অবিরত ছুটে চলেছেন নতুন কিছু সৃষ্টির নেশায়। গান আর গান নিয়েই তার নিত্যদিনের ব্যস্ত্মতা। গান ও সমসাময়িক বিভিন্ন বিষয়ে জনপ্রিয় এই গায়কের সঙ্গে কথা বলেছেন আল মাসিদষ কুমার বিশ্বজিৎবর্তমান ব্যস্ত্মতা ...
গান নিয়েই আমার সব ব্যস্ত্মতা। তবে গান আমার কাছে শুধু পেশা নয়। গানকে আমার চিন্ত্মা চেতনায় ঠাঁই দিয়েছি। গানকে আত্মার খোরাক মনে করেছি বলেই ক্যারিয়ারের অনেক জোয়ার ভাটায় গানকে ছেড়ে যাইনি। বর্তমানে স্টেজ শো নিয়ে বেশি ব্যস্ত্মতা যাচ্ছে। এর বাইরে নতুন কিছু একক গান করছি। অন্যদের জন্যও গান করছি।

ঈদের গান ...
ঈদের মতো বিশেষ উপলক্ষে নতুন গান ভক্তদের উপহার না দিয়ে থাকা যায় না। তাই সম্প্রতি আহম্মেদ হুমায়ূনের সুর-সংগীতে একটি গান গেয়েছি। তবে এখনো কোনো কোম্পানির সঙ্গে কথাবার্তা হয়নি। যে কোনো একটি অডিও কোম্পানির ব্যানারে গানটি ঈদেই প্রকাশ পাবে।

বৈশাখের গানে সাড়া ...
কোন গানটা হিট আর কোনটা ফ্লপ তা বোঝা যায় যখন লাইভ কনসার্টে গাইতে যাই। গেল পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে বাংলাঢোলের প্রযোজনায় 'বৈশাখী প্রেম' শিরোনামে আমার একটি গান প্রকাশ হয়েছিল ইউটিউবে। ইতিমধ্যে গানটি কনসার্টে গাওয়ার জন্য আমি অনুরোধ পেয়েছি। তবে এখনো গাইনি। কারণ গানটি এখনো ভালো করে কণ্ঠে তোলা হয়নি। 'ঢেউ লেগেছে বাংলা ঢোলে বৈশাখী হাওয়ায়/রঙে ঢঙে ছন্দে মাতো বাঙালিয়ানায়' গানটির সুর ও সংগীতায়োজন করেছেন আহম্মেদ হুমায়ুন। মিউজিক ভিডিও তৈরি করেছেন তানিম রহমান অংশু। গানটি আমার কাছে বিশেষ, কারণ এতে দক্ষিণ ভারতের 'নাদাসসুয়ারাম' যন্ত্রের ব্যবহার করা হয়েছে। বাংলাঢোলের ইউটিউব চ্যানেলসহ বাংলাফ্লিক্স, রবিস্ক্রিন, এয়ারটেলস্ক্রিন ও টেলিফ্লিক্সে এরই মধ্যে গানটি ভালো সাড়া ফেলেছে।

চলচ্চিত্রে সংগীতপরিচালনা ...
বর্তমানে একটি ছবির সংগীতপরিচালনা নিয়ে ব্যস্ত্ম আছি। ছবিটির নাম 'ঢাকা ড্রিম'। এটি পরিচালনা করছেন প্রসূণ রহমান। এতে গান গেয়েছেন মমতাজ ও প্রয়াত বারী সিদ্দিকী। এই গান দুটির শুটিংও শেষ। মিউজিক ভিডিও আকারে ঈদে বাংলাঢোলের ইউটিউব চ্যানেলে গান দুটি প্রকাশ হবে বলে শুনেছি। এ ছাড়া এ ছবিতে আমার কণ্ঠেও একটি গান থাকবে। গানটির সুর ও সংগীত করা হলেও এখনো আমি কণ্ঠ দিইনি। অচিরেই কণ্ঠ দেব।

বিদেশ সফর ...
বিদেশের মাটিতে দেশের গান গাইতে বরাবরই ভালো লাগে। কারণ সেখানকার প্রবাসী বাঙালিরা দেশকে কাছে পায় না বলে দেশের সবকিছু খুব মিস করে। তাই আমাদের কাছে পেলে সাদরে গ্রহণ করে। আর আমরা যারা দেশে থাকি তারা দেশের মর্ম সহজে অনুধাবন করি না। কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ায় দুটি শোর কথাবার্তা চলছে। সব ঠিকঠাক থাকলে এ বছরই এই দেশ দুটিতে সংগীতসফর করব।

টেলিভিশন লাইভ ...
আমি টেলিভিশন লাইভের চেয়ে স্টেজ শো বেশি পছন্দ করি। কারণ দর্শকের সরাসরি প্রতিক্রিয়া পাই স্টেজ শোতে। তাছাড়া আমাদের দেশে খুব কম টেলিভিশন লাইভ হয়। আর সেখানে লাইভ অনুষ্ঠানের জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থাও নেই। কোনোমতে জোড়াতালি দিয়ে হয় অনুষ্ঠানগুলো হচ্ছে। ভালো মিউজিসিয়ান, সাউন্ড সিস্টেম বা সম্মানীও মিলছে না টেলিভিশন লাইভ অনুষ্ঠানে। সবকিছু ব্যাটে বলে মিলে গেলে বছরে অল্প কিছু লাইভ অনুষ্ঠান করি।

বর্তমান সংগীতাঙ্গনের হালচাল ...
এক কথায় বলতে গেলে সংগীতাঙ্গনে এক ধরনের ক্রান্ত্মিকাল চলছে। তবে আমি আশাবাদী মানুষ। আবার সংগীতের সোনালি দিন ফিরে আসবে। তবে এ জন্য সংগীতের সঙ্গে জড়িত প্রতিটি মানুষের আন্ত্মরিকতা দরকার। নতুন প্রজন্মকে শুধু শো অফ বা আয় করার চিন্ত্মার চেয়ে সংগীতকে ভালোবেসে কাজ করতে হবে। তাদেরকে ভুলে গেলে চলবে না আমাদের শিকড় কি? বাংলা ঐতিহ্যকে ধারণ করেই গানকে আধুনিক করতে হবে। নয়ত আমরা আমাদের নিজস্ব পরিচয় হারিয়ে ফেলব।
একটা কথা না বললেই নয়, আজকালকার গান স্থায়ী হচ্ছে না। কারণ তাতে নিজেকে খুঁজে পাওয়া যায় না। লক্ষ্য করে দেখবেন, আমরা জীবনের তাগিদে বা আধুনিক জীবনযাপনের আশায় সবাই রাজধানীমুখী হই ঠিকই, কিন্তু ঈদের সময় ঢাকা মানবশূন্য হয়ে পড়ে। কারণ আমাদের শেকড় এখনো গ্রামে পড়ে আছে। তাই যতই যান্ত্রিক জীবনযাপনে অভ্যস্ত্ম হই না কেন আমাদের বাঙালির আবেগ, অনুভূতি, মূল্যবোধ ও চিন্ত্মায় রয়েছে বাঙালিয়ানা। গানকেও সেই বাঙালিয়ানার সঙ্গে মিলিয়ে তৈরি করতে হবে। তবেই মানুষ আবার গানকে নিজের করে নেবে।

মিউজিক ভিডিও ...
এখন মিউজিক ভিডিও এক ধরনের ট্রেন্ড হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই আমিও মিউজিক ভিডিও করছি। আমার মনে হয় মিউজিক ভিডিও হলো গান প্রচারের একটি মাধ্যম মাত্র। তা যেন মূল গানকে ছাড়িয়ে না যায়। কিন্তু আজকাল দেখছি, অনেকের ক্ষেত্রে গানের খরচের চেয়ে ভিডিওর খরচ অনেক বেশি হয়ে যাচ্ছে। এতে করে গানটি একবার মানুষ দেখছে ঠিকই, কিন্তু গানের কথা বা শিল্পীর গায়কি মনে রাখছে না। অন্যদিকে এটা মিউজিক ইন্ডাস্ট্রির জন্যও ক্ষতিকর। কারণ গানের মানুষের চেয়ে ভিডিও মেকার আর মডেলরা বেশি অর্থ নিয়ে যাচ্ছে এখান থেকে।

একাল সেকালের তুলনা ...
আগে আমাদের গানের বিষয় ছিল মানুষের সূক্ষ্ণ অনুভূতি, নদী, প্রেম, কাব্য, সাহিত্য এসব। আর এখন শুধু বাদ্যের ঝনঝনানি। কথা, সুর, সংগীত একটির সঙ্গে আরেকটির কোন মিল নেই এখনকার গানে। গান এখন ভার্চুয়াল হয়ে গেছে। আর আগে ছিল ফিজিক্যাল। এ দুটোর মধ্যে তো পার্থক্য রয়েছেই। গন্ধ নেওয়া আর হাতে স্পর্শ করার স্বাদ তো এক হতে পারে না। এ জন্য এখনকার গান আপন লাগে না শ্রোতার কাছে।

যে গান প্রিয় ...
আমি যে সকল গান করেছি তা খেয়াল করলে দেখবেন, নিজেকে নির্দিষ্ট ছকে বেঁধে রাখিনি। আমার গানে দেশি ও বেদেশি গানের স্বাদ রয়েছে। এসব আমি করতে পেরেছি নানা দেশের নানা ধরনের গান শুনি বলেই। আমার কাছে ফোঁক, ক্লাসিক্যাল, রক, পপ, জ্যাজ সবধরনের গানই ভালো লাগে, যদি তা শুদ্ধ করে গাওয়া হয়।

প্রিয় শিল্পী ...
আমার পছন্দের শিল্পীর তালিকাও অনেক লম্বা। আমাদের দেশের শিল্পীদের মধ্যে সামিনা চৌধুরীর গান বেশি প্রিয়। তার গানে আলাদা এক ধরনের আবেদন আছে। শাহনাজ রহমাতুলস্নাহ, নিয়াজ মোহাম্মদ চৌধুরী, মেহেদি হাসান, কিশোর কুমার, মান্নাদের গানও আমার ভালো লাগে।

কৃতজ্ঞতাভরে স্মরণ ...
আমি আজকের অবস্থানে আসার জন্য অসংখ্য মানুষের কাছে কৃতজ্ঞ। আমাকে নিয়ে যারা কাজ করেছেন সে সমস্ত্ম সংগীতপরিচালক, সুরকার, গীতিকার, মিউজিসিয়ান, টেলিভিশন প্রযোজক, চিত্রপরিচালক, সাংবাদিকের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। সবচেয়ে কৃতজ্ঞ শ্রোতা-দর্শকের প্রতি যারা আমাকে অকৃত্রিম ভালোবাসা দিয়েছেন। তবে কয়েকজন মানুষের কথা না বললেই নয়, যারা আমার সব প্রথমের সঙ্গে জড়িত। আমাকে প্রথম টেলিভিশনে গান গাওয়ার সুযোগ দেন অভিনেতা আল মনসুর, প্রথম অডিও রেকডিং করান লাকী আখন্দ আর পেস্ন-ব্যাকে গান করান আলাউদ্দীন আলী। এই তিনজন মানুষের প্রতি আমার আলাদা কৃতজ্ঞতাবোধ রয়েছে।

ভবিষ্যতের হাল ধরবে ...
অনেক অনেক নতুন মিউজিশিয়ানের মধ্যে খুব অল্পসংখ্যক শিল্পী ভালো কাজ করছে। তার মধ্যে আমার চোখে সবচেয়ে
সম্ভাবনাময় মনে হয় বাপ্পা মজুমদারকে। আমি আশা করি সে মিউজিক নিয়ে লেগে থাকলে দেশকে ভিন্ন ধারার কিছু গান উপহার দিতে পারবে।
 
এই প্রতিবেদন সম্পর্কে আপনার মতামত দিতে এখানে ক্লিক করুন
অনলাইন জরিপ
অনলাইন জরিপআজকের প্রশ্নজঙ্গিবাদ নিয়ে মন্ত্রীদের প্রচারে আস্থাহীনতার সৃষ্টি হয়েছে_ বিএনপি নেতা আসাদুজ্জামান রিপনের এই বক্তব্য সমর্থন করেন কি?হ্যাঁনাজরিপের ফলাফল
আজকের ভিউ
পুরোনো সংখ্যা
2015 The Jaijaidin
close