পূর্ববর্তী সংবাদ
ভয়াবহ সংঘাতের দিকে দেশ এগিয়ে যাচ্ছেআমরা মনে করি দেশের স্বার্থে, মানুষের স্বার্থে নিজ নিজ অবস্থানে অনড় ও অটল না থেকে একটু নমনীয় হলেই বর্তমানের পুঞ্জীভূত জাতীয় সমস্যা থেকে পরিত্রাণ পাওয়া সম্ভব হবে। দুই নেত্রীর শাসন ছাড়া যেমন কোনো বিকল্প নেই, তেমনি দুই নেত্রীর সমঝোতার ওপর শান্তি ও শৃঙ্খলা নির্ভর করছে। এর অন্যথা হলে ইতিহাস তাদের ক্ষমা করবে না। কাজেই সময় পার হওয়ার আগেই ইতিহাসের দিকে তাকিয়ে শক্তি নয় যুক্তি, গোঁয়ার্তুমি নয় বিবেচনা, অহমিকা নয় বিনয়, হুঙ্কার নয় নমনীয়তা, গর্জন নয় আলাপ, ত্রাস নয় শান্তি, স্বেচ্ছাচারিতা নয় গণতন্ত্র, অধৈর্য নয় ধৈর্য দিয়ে দেশের ভয়ঙ্কর ঘাত-প্রতিঘাতমূলক সমস্যাটির সমাধান করতে হবে। মুক্তির পথ এখানেই।আবুল হাসানাত দেশ ও জাতি নিয়ে যারা ভাবিত, তারা ভয়াবহ অস্বস্তির মধ্যে নিপতিত হয়েছেন তাতে আর কোনো সন্দেহ নেই। রাজনীতির দুর্বৃত্তায়নে এমনিতেই দেশের অবস্থা শোচনীয়। ঘুষ-দুর্নীতিতে দেশ মহাবৃত। লাখ লাখ সাধারণ মানুষের পেটে লাথি মেরে, দেশের সম্পদ লুণ্ঠন করে একশ্রেণির লুটেরা মহাসঙ্কটের মুখে দেশ ও আমজনতাকে নিমজ্জিত করেছে। এই লুটেরা হচ্ছে শাসকশ্রেণি_ মন্ত্রী, এমপি, আমলা, ব্যবসায়ী। এদের হাত থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার কোনো উপায় নেই, এ জন্য যে প্রশাসনে, ব্যবসায় ও ক্ষমতায় তারা বসে আছেন এবং সেই উচ্চাসন থেকে বাণী দেন : দেশ গড়ুন, উন্নয়নের জোয়ারে ভেসে যান। আমাদের ভোট দিন। ধারাবাহিক উন্নয়নের জন্য আবার আমাদের ভোট দেন অর্থাৎ গদিনসীন করুন। তা না হলে সম্পদ-অর্থ-ভূমি লুণ্ঠিত হবে কীভাবে।
অর্থনৈতিক অবস্থা রাখঢাক করে রাখলেও তা খুবই নাজুক ও দুর্বল। বড় বড় বুলি অর্থমন্ত্রী আওড়ালেও তা যে সুখকর নয় তা দৈনন্দিন পত্রপত্রিকার খবরাখবর থেকে আমরা জানতে পারি। এ অবস্থায় প্রধানমন্ত্রীর ভোটভিক্ষা একটা নিদারুণ প্রহসন। ভোটভিক্ষার মধ্যে দোষ নেই। কিন্তু অন্যান্য দলও ভোটভিক্ষা করতে পারে তার ব্যবস্থা থাকা ভালো। এই পরিপ্রেক্ষিতে সুধীজনের ও দেশদরদিদের আকুল আহ্বান ও সমাধান_ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন মেনে নেয়া উচিত।
কিন্তু চোর শোনে না ধর্মের কাহিনী। তাহলে তো ইবলিশের রাজত্ব শেষ হয়। এক শয়তান নিয়েই বিধাতা অস্থির। এখন তো বাংলাদেশে লাখখানেক শয়তান দাপিয়ে বেড়াচ্ছে এবং ধর্মকে তারা কী মারাত্মকভাবে ব্যবহার করছে। নইলে পশুর হাট নিয়ে এত মারামারি! যোগাযোগমন্ত্রী বলছেন, যাতায়াতের রাস্তায় পশুর হাট বসানো যাবে না। আর লুটেরা বলছে, বসাব। তা না হলে কোরবানির এই চার দিনে কোটি টাকা আসবে কোথা থেকে।
আমরা আগেও বলেছি, এখনো বলি, ক্ষমতায় বসার জন্য রাজনৈতিক প্রয়াস দোষণীয় নয়। এটা স্বাভাবিক অভিব্যক্তি। কিন্তু হিটলারের মতো পাগল হয়ে গেলে তো সমস্যা। সে সমস্যার সমাধান করা সহজ কাজ নয়। এ অবস্থায় দলের মধ্যে বিবেকবান যে উপদলটি থাকে তাদের ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে। কিন্তু এক ব্যক্তির শাসন_ সরকার ও দলে_ সে সম্ভাবনাকে দূর করেছে।
আমরা এখনো মনে করি_ যে কথা সুধীসমাজ, বিদ্বজ্জন, বক্তা ও সাংবাদিকরা অহরহ জানাচ্ছেন যে সংলাপ ও সমঝোতার ব্যবস্থা করা উচিত; সময় বেশি নেই, ততই লক্ষ্য করা যাচ্ছে দুটি বৃহৎ পার্টির দূরত্ব বেড়েই চলেছে। এতে সংলাপ ও সমঝোতার কোনো আশা আছে বলে আমাদের বোধ হচ্ছে না। তবে মানুষের চেষ্টার কোনো সীমা-পরিসীমা নেই। তাই সৎ, বিবেকবান মানুষ চেষ্টা করেই যাচ্ছে। এতে ফল ফলবে না এমন কথা প্রত্যয় নিয়ে বলা যায় না।
নব্বইয়ের দশক থেকে এখন পর্যন্ত যেসব নেতা রাজনীতি করছেন তারা আদর্শ, নিয়মকানুন, বিধিবিধানের তোয়াক্কা করেন এমন মনে হয় না। ফলে ২০১৩-এর শেষে এসে সঙ্কটে পড়েছে বাংলাদেশ। এ সঙ্কট ভয়াবহ, ক্ষতিকর অনিষ্টকর, ধ্বংসাত্মক, সংঘাতময়, হিংসাত্মক তাতে কোনো সন্দেহ নেই। দুই নেতা দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। তৃতীয়জন ডুগডুগি বাজাচ্ছেন এবং এর ফল আমজনতার জন্য মঙ্গলজনক নয় তা সাধারণ বুদ্ধিতে ধরা পড়ে। এ অবস্থায় একজন বিবেকবান ব্যক্তিত্ববান নেতা থাকা উচিত ছিল, দেশের মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর যিনি সর্ববৃহৎ নেতাও বেয়াদবি করলে 'খামোশ' বলে ধমক দিতে পারতেন।
আগে মাথাওয়ালা নেতৃত্ব ছিল। এখন মাথাহীন নেতৃত্ব। তাই তারা অর্থহীন, ব্যঞ্জনাহীন, উদ্দেশ্যহীন বিবৃতি-বক্তৃতা দিয়ে বেড়াচ্ছেন যা পত্রিকাগুলো কলাম পূরণের জন্য ছেপে যাচ্ছে। এতে তাদের প্রচার হয়; জনগণের কোনো মঙ্গল হয় না। এ অবস্থায় শুভবুদ্ধি উদ্রেককারী ব্যক্তিদের বক্তব্য দুই দলের নেতৃত্বের শ্রবণ করা উচিত ছিল। কিন্তু বর্তমানে সময় এমন প্রতিকূল যে কেউ ভালো কথা শুনতে চায় না। ক্ষোভে-দুঃখে যখন টকশোর বক্তারা ফেটে পড়েন তখন সুবিধাবাদী-লুটেরা নেতারা নাখোশ হয়ে বিস্তর গালাগালি করেন। তবুও বিবেককে স্তব্ধ করা যায় না। সে তার তাড়নায় কথা বলবেই।
একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে : রাজনৈতিক নিয়োগ কতটা খারাপ পরিণতি টেনে আনতে পারে তার নজির রয়েছে ব্যাংকিং ব্যবস্থায়। বিচার, প্রশাসন, পুলিশবাহিনীসহ বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক নিয়োগের কুফল আমরা প্রত্যক্ষ করে যাচ্ছি। সোনালী, জনতা, অগ্রণী ও রূপালী ব্যাংকের বেহাল অবস্থার চিত্র সবাই জানেন। হলমার্ক, বিসমিল্লাহ গ্রুপসহ নানা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন কেলেঙ্কারির ঘটনা সংঘটিত হয় রাজনৈতিক নিয়োগের কারণেই। পুঁজিবাজারেও সে ধরনের ব্যবস্থা চাপিয়ে দেয়ার অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগপ্রাপ্ত দু-এক জন শীর্ষ কর্মকর্তা। তারা চাইছেন সময়ের আগেই চলমান পরিচালনা বোর্ড ভেঙে দিতে। এতে প্রাতিষ্ঠানিক-অপ্রাতিষ্ঠানিক ছোট বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এক ধরনের উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা সৃষ্টি হয়েছে। ফলে পুঁজিবাজারে তারল্যপ্রবাহ হ্রাস পেয়েছে, লেনদেন কার্যক্রমে ভাটা পড়েছে (অর্থনীতি প্রতিদিন, ৬/১০/১৩)।
বলা বাহুল্য, সব ক্ষেত্রে রাজনৈতিক নিয়োগের মানসিকতা বাকশাল কার্যক্রমের ছায়া বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। এতে শাসকগোষ্ঠীর লাভ হয়েছে; কিন্তু দেশের সর্বনাশ হয়েছে। এ সর্বনাশ কেবল যে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে তা নয়, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, প্রশাসনিক ক্ষেত্রেও বটে। এর ঊধর্ে্ব ওঠার মানসিকতা না থাকার ফলে পরিস্থিতি আরো মন্দ হয়ে পড়েছে। এ পরিস্থিতিতে দেশ নির্বাচন রোগে কাঁপছে। একতরফা নির্বাচনের দুন্দুভি বেজে চলেছে। ড. কামাল হোসেন, বি. চৌধুরী ও কাদের সিদ্দিকী প্রমুখ নেতা অত্যন্ত কঠোর ভাষায় হাসিনা সরকারের সমালোচনা করেছেন। তাদের যুক্তি উড়িয়ে দেয়ার মতো নয়। এমনকি জোটের অন্তর্ভুক্ত নেতা এরশাদ সাহেব কঠোর ভাষায় বর্তমান সরকারের নিন্দা করেছেন এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবেন না, তা স্পষ্টাক্ষরে বলে দিয়েছেন।
ফলে আমরা কিংকর্তব্যবিমূঢ়। আমাদের ভবিষ্যৎ কী, তা বুঝতে পারছি না। প্রধানমন্ত্রীর হুঙ্কার ও তার চেলাদের গর্জন দেখে মনে হয় একতরফা নির্বাচন হতে চলেছে। এর ফল যে শুভ হবে না তা সুধীজন আগেই জানিয়ে দিয়েছেন। অর্থাৎ ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য বর্তমান সরকার যা প্রয়োজন তা করবে অর্থাৎ শক্তি প্রয়োগ। এখন প্রশ্ন হচ্ছে_ বিরোধী পক্ষ তো বসে থাকবে না। তাদের তো অস্তিত্বের প্রশ্ন আছে। যারা শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচন করবেন না বলে স্রেফ জানিয়ে দিয়েছেন তারা তো এটা রুখবেন। এর অর্থ সংঘাত, দ্বন্দ্ব, মারামারি। মৃত্যু। ওই মৃত্যুর দায় কে নেবে? বিরোধী পক্ষের আন্দোলনে শান্তিশৃঙ্খলার জন্য গুলি চালাতে বাধ্য হয়েছে বলে সরকার দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে পারবে না। অন্যদিকেও কিছু কথা হচ্ছে। দেশ, জাতি ও অর্থনীতির ক্ষতি। অর্থনীতির ক্ষতিটাই বেশি। সরকার ভোট পাওয়ার জন্য এবং সরকারি কর্মকর্তাদের নির্বাচনে ব্যবহার করার জন্য মহার্ঘভাতা ২০% বাড়িয়ে দিয়েছে_ জানার সঙ্গে সঙ্গে বাজারে পণ্যের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। ব্যবসায়ী ও বিক্রেতাদের ধারণা, সবাই যেন সরকারি চাকরি করেন। সরকারি চাকুরে যে চাকুরেদের সামান্যতম অংশ সে চেতনাও তাদের যেন লোপ পেয়েছে।
অতএব ভয়াবহ সংঘাতের দিকে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। এর দায় নিতে হবে প্রধানমন্ত্রীকে। কিঞ্চিৎ বিরোধীদলীয় নেতাকে। দেশের জন্য, মানুষের জন্য যে ভাবনার উদ্রেক হওয়া উচিত ছিল তা আমাদের নেতাদের মধ্যে নেই। এটি দুঃখজনক ঘটনা। কিন্তু সত্য। সংবিধানের কথা বার বার বলার জন্য মনে হয় নেতা সংবিধান ছাড়া কিছু বোঝেন না এবং সারা শাসনাধীন সময়টি সংবিধান মেনেই চলেছেন এবং সংবিধান মানুষের জন্য, মানুষের জন্য সংবিধান নয়। প্রশাসনে, ব্যাংকে, পুলিশে, র‌্যাবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণ করার পর যে ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে তা কখনই বাংলাদেশের ৪২ বছরের ইতিহাসে লক্ষ্য করা যায় না।
আমরা মনে করি দেশের স্বার্থে, মানুষের স্বার্থে নিজ নিজ অবস্থানে অনড় ও অটল না থেকে একটু নমনীয় হলেই বর্তমানের পুঞ্জীভূত জাতীয় সমস্যা থেকে পরিত্রাণ পাওয়া সম্ভব হবে। দুই নেত্রীর শাসন ছাড়া যেমন কোনো বিকল্প নেই, তেমনি দুই নেত্রীর সমঝোতার ওপর শান্তি ও শৃঙ্খলা নির্ভর করছে। এর অন্যথা হলে ইতিহাস তাদের ক্ষমা করবে না। কাজেই সময় পার হওয়ার আগেই ইতিহাসের দিকে তাকিয়ে শক্তি নয় যুক্তি, গোঁয়ার্তুমি নয় বিবেচনা, অহমিকা নয় বিনয়, হুঙ্কার নয় নমনীয়তা, গর্জন নয় আলাপ, ত্রাস নয় শান্তি, স্বেচ্ছাচারিতা নয় গণতন্ত্র, অধৈর্য নয় ধৈর্য দিয়ে দেশের ভয়ঙ্কর ঘাত-প্রতিঘাতমূলক সমস্যাটির সমাধান করতে হবে। মুক্তির পথ এখানেই।

আবুল হাসানাত: কথাশিল্পী, গবেষক, কলাম লেখক
 
পূর্ববর্তী সংবাদ
এই প্রতিবেদন সম্পর্কে আপনার মতামত দিতে এখানে ক্লিক করুন
অনলাইন জরিপ
অনলাইন জরিপআজকের প্রশ্নজঙ্গিবাদ নিয়ে মন্ত্রীদের প্রচারে আস্থাহীনতার সৃষ্টি হয়েছে_ বিএনপি নেতা আসাদুজ্জামান রিপনের এই বক্তব্য সমর্থন করেন কি?হ্যাঁনাজরিপের ফলাফল
আজকের ভিউ
পুরোনো সংখ্যা
2015 The Jaijaidin