জামায়াতের হরতালে সাড়া নেই, কর্মমুখর দেশযাযাদি রিপোর্ট জামায়াতের ডাকা সকাল-সন্ধ্যা হরতালে বৃহস্পতিবার রাজধানীর জীবনযাত্রা ছিল অন্যদিনের মতো স্বাভাবিক। ছবিটি দুপুরে শাহবাগ এলাকা থেকে তোলা -ফোকাস বাংলাজামায়াতের ডাকা সকাল-সন্ধ্যা হরতালে ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-কারখানা, অফিস-আদালত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কোথাও কোনো প্রভাব পড়েনি। এমনকি নগর সার্ভিস কিংবা দূরপালস্নার যান চলাচলেও সামান্য প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়নি। বরং সপ্তাহের শেষ দিন বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই গোটা দেশ কর্মমুখর হয়ে ওঠে। ঢাকার বাইরের ছয় বিভাগীয় শহরের জীবনযাত্রা ছিল পুরোপুরি স্বাভাবিক।
সারাদিন হরতাল আহ্বানকারী জামায়াতের কোনো পিকেটিং চোখে পড়েনি। তবে চট্টগ্রাম ও সিলেটসহ দেশের গুটিকয়েক জেলায় দলের স্বল্পসংখ্যক নেতাকর্মী রাজপথে ঝটিকা মিছিল করে। যদিও এতে জামায়াত-শিবিরের প্রথম সারির কোনো নেতাকে দেখা যায়নি।
বিগত সময়ে জামায়াতের হরতালে রাস্ত্মাঘাট, বাস-লঞ্চ টার্মিনাল ও রেলস্টেশনসহ বিভিন্ন গুরম্নত্বপূর্ণ পয়েন্টে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারীর যুদ্ধাংদেহী সাজে সতর্ক পাহারায় থাকলেও বৃহস্পতিবার ঢাকাসহ দেশের কোথাও তাদের এ ধরনের প্রস্তুতির খবর পাওয়া যায়নি। দেশের প্রশাসনিক প্রাণকেন্দ্র সচিবালয়সহ বেশকিছু স্পর্শকাতর স্থাপনার আশপাশের্ যাব-পুলিশের টহল থাকলেও তা ছিল অনেকটাই ঢিলেঢালা। হরতাল চলাকালে জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মী ধরপাকড়েরও তেমন কোনো ঘটনা ঘটেনি।
এদিকে হরতাল চলাকালে অন্যান্য সাধারণ দিনের মতোই বৃহস্পতিবার ভোর থেকেই গণপরিবহনের সঙ্গে পালস্না দিয়ে ব্যক্তিগত যানবাহন চলাচল করায় রাজধানী অধিকাংশ সড়কে যথারীতি যানজট দেখা গেছে। সকাল ১০টায় সায়েন্স ল্যাবরেটরির কাছে সিটি কলেজ সিগন্যালে ছিল বাস, অটোরিকশা ও প্রাইভেট কারের দীর্ঘ সারি। এ সিগন্যাল পার হতে অধিকাংশ যানবাহনের ১০ থেকে ১৫ মিনিট সময় লেগেছে। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে বসুন্ধরা সিটির সামনের সিগন্যালের যানজট গ্রীনরোড মোড় ছাড়িয়ে যায়।
বিকালের পিকআওয়ারে ফার্মগেট থেকে কারওয়ান বাজার পর্যন্ত্ম পুরোটাই ছিল বাস-মিনিবাস, অটোরিকশা আর কারের সারি। আধা কিলোমিটারেরও কম পথ পাড়ি দিতে অধিকাংশ যানবাহনের ২০ থেকে ২৫ মিনিট লেগেছে।
ট্রাফিক পুলিশ ও পরিবহন শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শুধু এ কয়েকটি সড়কই নয়, নগরীর অধিকাংশ রাস্ত্মাতেই দিনভর এমন চিত্র ছিল। তবে বিকালে অফিসপাড়াতে বেশকিছু যানবাহন এক দেড়ঘণ্টার যানজটে আটকা পড়ে থাকারও খবর পাওয়া গেছে।
নগরীর বিভিন্ন স্থানে যানবাহন নিয়ন্ত্রণে ট্রাফিক পুলিশকে গলদঘর্ম হতে হয়েছে। গুলিস্থান এলাকায় দায়িত্ব পালনরত পুলিশের এক সদস্য বলেন, আগে হরতালে কোনো সিগন্যাল থাকত না। অথচ আজ একদিকে ছাড়লে অন্যদিকে যানজট লেগে যাচ্ছে।
ধামরাই-গুলিস্ত্মান পথের বাসযাত্রী আতাউর রহমান বলেন, যানজট আছে। তবে আগের তুলনায় কম সময় আটকে থাকতে হচ্ছে।
সকাল সাড়ে নয়টার দিকে মহাখালী রেলক্রসিংয়ের কাছের চৌরাস্ত্মারর চারটি পথেই যানবাহনের সারি দেখা যায়। যাত্রীরা ঠেলাঠেলি করে বাসে উঠছেন, নামছেন। গুলশান ১ নম্বর গোলচত্বরে গিয়ে মনে হয়েছে, মহাখালীর চেয়েও এই স্থানটি বেশি ব্যস্ত্ম। সেখানে একটি বীমা কোম্পানির কর্মচারী জাভেদ হোসেনের কাছে হরতালে যাতায়াতের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'হরতাল কোথায় দেখলেন? জ্যামে পইড়্যা সময়মতো অফিসেই তো যাইতে পারতাছি না।'
মিরপুরের কাজীপাড়া থেকে মহাখালী হয়ে গুলশান, গুলিস্ত্মান হয়ে মতিঝিল কিংবা পুরান ঢাকার সব এলাকাতেই রাস্ত্মার দুই ধারের অফিস ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান খোলা থাকতে দেখা গেছে।
তবে হরতালের কারণে বেশকিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আগাম ছুটি ঘোষণা করে। গতকাল সকালে বেইলি রোডস্থ ভিকারম্নননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের সামনে গিয়ে দেখা গেছে গোটা এলাকা অনেকটাই ফাঁকা। অথচ সাধারণত দিনের অধিকাংশ সময়ই শিক্ষার্থী আর অভিভাবকের উপস্থিতিতে এলাকাটি মুখরিত থাকে। পুরান ঢাকার সেন্ট গ্রেগরি, সেন্ট ফ্রান্সিস জেভিয়ার্স ও গভ. মুসলিম হাইস্কুল ছিল বন্ধ। তাই সেখানকার আশপাশের সড়কে যানবাহন থাকলেও জট ছিল না। তবে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক পরিস্থিতির তেমন কোনো পরিবর্তন ছিল না।
মহাখালীতে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা জানান, বৃহস্পতিবার শুধু প্রশাসনিক কার্যক্রম চলেছে। তবে শিক্ষার্থীরা অনেকেই ক্যাম্পাসে এসেছে।
এদিকের রাজধানীর বসুন্ধরা শপিং মল, নিউমার্কেট, ধানম-ি হকার্স মার্কেট, চাদনি চক ও রাপা পস্নাজার বেশ কয়েকজন দোকানির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হরতালের কোনো প্রভাবে তাদের বেচাবিক্রিতে পড়েনি। ক্রেতাদের উপস্থিতিও ছিল স্বাভাবিক।
এদিকে চট্টগ্রাম, সিলেট, রাজশাহী, রংপুর, খুলনা ও বরিশাল মহানগরের জনজীবন ছিল স্বাভাবিক। এর মধ্যে সিলেট, খুলনা ও চট্টগ্রামে দিনের বিভিন্ন সময়ে ব্যাপক যানজটের খবর পাওয়া গেছে। ছয় মহানগর থেকে দিনে-রাতে দূরপালস্না ও আন্ত্মঃজেলা পথের বিপুল সংখ্যক বাস চলাচল করেছে। তবে কিছু কিছু রম্নটে যাত্রী ছিল কম।
সরেজমিন ঘুরে ও পরিবহন মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাজধানীর গাবতলী টার্মিনাল ও এর আশপাশ থেকে স্বাভাবিক সময়ে গড়ে তিন হাজার যাত্রীবাহী যানবাহন চলাচল করত। বৃহস্পতিবার ভোর ছয়টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত্ম প্রায় এক হাজার বাস চলাচল করেছে। মহাখালী টার্মিনাল থেকে স্বাভাবিক সময়ে গড়ে ৮শ বাস চলাচল করে। দিনের পালার বাসগুলোর ৯০ শতাংশ চলাচল করছে। পরিবহন মালিকদের দাবি, বাকি ১০ শতাংশ বাস যাত্রী স্বল্পতার কারণে চলাচল করেনি। তবে ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, শেরপুর, নেত্রকোনা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া পথে দিনে শতভাগ বাসই চলাচল করছে বলে তারা জানান।
সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল থেকে কুমিলস্না, চাঁদপুর, ফেনী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, মুন্সীগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ পথে সারা দিনই বাস চলছে। এসব পথের বাসে যাত্রীও বেশি দেখা গেছে।
চট্টগ্রাম : আমিরে জামায়াত, সেক্রেটারি জেনারেলসহ জামায়াতের আট নেতাকর্মীকে অন্যায়ভাবে গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে ও নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে বৃহস্পতিবার হরতালের সমর্থনে চট্টগ্রামে মিছিল করেছে জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা।
সকালে ডবলমুরিং থানা, খুলশী থানা ও আকবরশাহ থানা জামায়াত-শিবিরের উদ্যোগে মিছিল পিকেটিং হয়।
দলীয় সূত্র জানায়, নগরীর আগ্রাবাদ এলাকায় ডবলমুরিং থানা, টাইগারপাস এলাকায় খুলশী থানা এবং অলংকার মোড় এলাকায় আকবরশাহ থানা এলাকায় হরতালের সমর্থনে মিছিল করেন জামায়াত ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা।
মিছিল পরবর্তী সংক্ষিপ্ত সমাবেশে জামায়াত নেতারা বলেন, 'জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের অন্যায়ভাবে গ্রেপ্তার ও নির্যাতন চালিয়ে জামায়াতে ইসলামীকে নিশ্চিহ্ন করা যাবে না।'
স্থানীয়রা জানান, জামায়াতের ডাকা হরতালে বাণিজ্যিক নগরী চট্টগ্রামেও কোন প্রভাব পরেনি। হরতালের আগের দিন বুধবার বাঁশখালীতে জামায়াতের নেতা কর্মীরা হরতাল বিরোধী বিক্ষোভ মিছিল করলেও বৃহস্পতিবার তাদের কাউকে মাঠে দেখা যায়নি।
বরিশাল: হরতাল চলাচালে এ মহানগরীর জনজীবন ছিল স্বাভাবিক। অভ্যন্ত্মরীণ ও দূরপালস্নার রম্নটে বিপুল সংখ্য বাস চলাচল করতে দেখা গেছে। এছাড়া সকালে নথুলস্নাবাদ বাস টার্মিনাল দিয়ে দূরপালস্নার বাস চলাচল করেছে এবং ঢাকা থেকেও বরিশালে উদ্দেশ্যে বাস ছেড়ে গেছে বলে জানান হানিফ পরিবহনের ম্যানেজার মো. রানা তালুকদার। রম্নপাতলী থেকে অভ্যন্ত্মরীণ সব রম্নটে বাস চলাচল স্বাভাবিক ছিল বলে জানিয়েছেন শ্রমিক ইউনিয়নের লাইন সম্পাদক মো. সেলিম।
বরিশাল নদী বন্দর থেকে যথানিয়মে অভ্যন্ত্মরীণ রম্নটের লঞ্চ চলাচল অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছেন নৌ-থানা পুলিশের এসআই শফিক।
এদিকে নগরজুড়ে থ্রি-হুইলারসহ সব ধরনের গণপরিবহন চলাচলও স্বাভাবিক ছিল। যথানিময়ে অফিস-আদালতে কর্মব্যস্ত্মতা শুরম্ন হয়েছে, মার্কেটগুলোতেও দোকানপাট খোলা হয়েছে পূর্বের নির্ধারিত সময়েই। ব্যাংক, বিমা ও স্কুল কলেজের কার্যক্রম চলছে স্বাভাবিকভাবেই।
রাজশাহী: জামায়াতে ইসলামীর ডাকা দেশব্যাপী হরতালের প্রভাব পড়েনি বিভাগীয় শহর রাজশাহীতে। কোনো ধরনের পিকেটিং না থাকায় সকাল থেকেই রাজশাহীতে অন্য দিনের মতো স্বাভাবিক গতিতে যানবাহন চলাচল করে। অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যথারীতি ক্লাস চলেছে। অফিসপাড়াতেও চলে দৈনন্দিন কার্যক্রম।
রাজশাহীর শিরোইলে ঢাকা বাসস্ট্যান্ড থেকে সকাল থেকে নির্দিষ্ট সময়েই রাজধানী ঢাকাসহ নিজ নিজ গন্ত্মব্যের উদ্দেশে বিপুলসংখ্যক দূরপালস্নার বাস ছেড়ে গেছে। চলেছে আন্ত্মঃজেলা রম্নটের বাসগুলোও। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নগরীর সাহেব বাজার জিরোপয়েন্ট, গোরহাঙ্গা রেলগেট, বর্ণালী মোড় ও শিরোইল বাস টার্মিনাল এলাকায় যানজট বাড়তে দেখা গেছে।
এদিকে রাজশাহী রেলস্টেশন থেকে সকালে ঢাকাগামী আন্ত্মঃনগর ট্রেন সিল্কসিটি এক্সপ্রেস, খুলনাগামী কপোতাক্ষ এক্সপ্রেস ও বরেন্দ্রসহ বিভিন্ন রম্নটের আন্ত্মঃনগর ও লোকাল মেইল ট্রেনও যথাসময়ে নিজ নিজ গন্ত্মব্যের উদ্দেশে ছেড়ে গেছে।
সিলেট: জামায়াত কেন্দ্র ঘোষিত দেশব্যাপী সকাল-সন্ধ্যা হরতাল চলাকালে সিলেট নগরীর বিভিন্ন স্থানে মিছিল-পিকেটিং করেছে মহানগর জামায়াত।
দলীয় সূত্র জানায়, সিলেট নগরীর শাহী ঈদগাহ, সুবিদবাজার, দক্ষিণ সুরমা ও শাহপরান গেইট এলাকাসহ পৃথক স্থানে অনুষ্ঠিত পিকেটিং ও মিছিল পরবর্তী সংক্ষিপ্ত সমাবেশে বক্তব্য রাখেন- সিলেট মহানগর জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি মো. শাহজাহান আলী, জামায়াত নেতা আনোয়ার হোসেন, হাফিজ মশাহিদ আহমদ, চৌধুরী আব্দুল বাছিত নাহির, মাওলানা ফয়জুর রহমান, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র শিবির সিলেট মহানগর সেক্রেটারি নজরম্নল ইসলাম প্রমুখ। নেতারা সারাদেশের মতো সিলেটে সকাল-সন্ধ্যা শান্ত্মিপূর্ণ হরতাল সফল করায় পরিবহন মালিক শ্রমিক ও ব্যবসায়ী নেতাসহ সর্বস্থরের সিলেটবাসীকে ধন্যবাদ জানান।
 
এই প্রতিবেদন সম্পর্কে আপনার মতামত দিতে এখানে ক্লিক করুন
প্রথম পাতা -এর আরো সংবাদ
অনলাইন জরিপ
অনলাইন জরিপআজকের প্রশ্নজঙ্গিবাদ নিয়ে মন্ত্রীদের প্রচারে আস্থাহীনতার সৃষ্টি হয়েছে_ বিএনপি নেতা আসাদুজ্জামান রিপনের এই বক্তব্য সমর্থন করেন কি?হ্যাঁনাজরিপের ফলাফল
আজকের ভিউ
পুরোনো সংখ্যা
2015 The Jaijaidin
close