মঙ্গলবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৪, ১০ বৈশাখ ১৪৩১

শিক্ষার্থীদের ভাবনায় অমর একুশে

মনের ভাব প্রকাশের অন্যতম মাধ্যম হলো মাতৃভাষা। পৃথিবীর প্রত্যেক জাতির নিজস্ব ভাষা আছে। বিশ্বের বুকে বাঙালিই একমাত্র জাতি, যারা মায়ের ভাষার অধিকার আদায়ে প্রাণ দিয়েছে। ১৯৫২ সালে ২১ ফেব্রম্নয়ারি এ দেশের সূর্য সন্তান সালাম, রফিক ও জব্বার, বরকতসহ দেশপ্রেমিক জনতা মাতৃভাষার জন্য জীবন দিয়েছে। ভাষা আন্দোলনের পথ ধরে বাঙালি ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ তথা স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রেরণা পেয়েছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে বাংলা আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা আর একুশে ফেব্রম্নয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। বর্তমানে দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম শিশুদের বাংলাভাষা ভালোভাবে না শিখিয়ে ইংরেজির পেছনে হচ্ছে, যা আমাদের জন্য অশনিসংকেত। প্রতি বছর ২১ ফেব্রম্নয়ারি শহীদ মিনারে পুষ্পাঞ্জলির মাধ্যমেই কেবল ভাষাশহীদদের হক আদায় হবে না; বরং বাংলাভাষাকে হৃদয়ে ধারণ করতে হবে। এ বিষয়ে শিক্ষার্থীদের ভাবনা তুলে ধরেছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী মো. সাইফুল মিয়া।
নতুনধারা
  ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০০:০০

অমর একুশ ছিল আমাদের সূচনা

নিশাত তাসনিম রিফা

শিক্ষার্থী, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

মা, মাতৃভাষা ও মাতৃভূমি হলো মানুষের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার তিনটি অবলম্বন। তার মধ্যে ভাষা হলো একটি জাতির ঐক্য ও আত্মপরিচয়ের প্রতীক। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্রের সূচনা লগ্নেই জন্ম নিল রাষ্ট্র ভাষায় দ্বন্দ্ব। উর্দু না বাংলা হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা? পাকিস্তান সরকার প্রায় ৫৬ দশমিক ৪০ শতাংশ বাংলা ভাষাভাষী মানুষকে অগ্রাহ্য করে উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্র ভাষা করার সিদ্ধান্ত নিলে বাংলার জনগণ প্রতিবাদে ফেটে পড়ে। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রম্নয়ারি ভাষার জন্য প্রাণ দেয় বাংলার সূর্য সন্তানেরা। তাদের রক্তের বিনিময়ে পাকিস্তানের সংবিধানে বাংলা অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি পায়। ভাষা আন্দোলনের স্বীকৃতিস্বরূপ ইউনেস্কো একুশে ফেব্রম্নয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা দেয়। যা বাঙালি জাতি হিসেবে আমাদের জন্য পরম গৌরবের। মূলত একুশ ছিল সূচনা। এই আন্দোলন থেকেই বাংলার মানুষ নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখায় অধিক সচেতন হয়, স্বপ্ন দেখে একটি স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্রের। যার ফসল আমাদের এই বাংলাদেশ। সর্বোপরি, পৃথিবীর প্রতিটি ভাষাকে শ্রদ্ধার চোখে দেখা উচিত।

একুশের চেতনায় স্বাধীনতার মূলমন্ত্র

জান্নাতুল মাওয়া রাখি

শিক্ষার্থী, সমাজতত্ত্ব বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

বাঙালি জাতির আত্মচেতনায় সমৃদ্ধ জাতীয় জাগরণের উন্মেষ মুহূর্ত অমর একুশ। শোষকের বিরুদ্ধে ন্যায়ের, খন্ডিত অধিকারের বিরুদ্ধে সামগ্রিক অধিকার ও অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভ শক্তির চিরন্তন সংগ্রামের স্মারক এই দিনটি।

ভাষা হলো চিন্তার পোশাক; অন্তরের রূপ। একুশে ফেব্রম্নয়ারির কোনো দিন, ক্ষণ বা থিতি নয়। এটি একটি জাতির জীবন্ত ইতিহাস। অসাম্প্রদায়িক গণচেতনার বলিষ্ঠ প্রকাশ ঘটেছে এই দিনে। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রম্নয়ারি পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী গুলি চালিয়ে হত্যা করে মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে মিছিলরত তরুণদের। ভাষা আন্দোলনের মধ্যে দিয়েই বাঙালি জাতীয়তাবাদের বীজ বপন করা হয়। জাতীয়তাবাদের চেতনায় এই দিনটি চেতনাদীপ্ত ও গৌরব উজ্জ্বল স্মৃতি বিজড়িত একটি দিন হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। একুশের চেতনায় সবার পথ এসে মিলেছে এক অভিন্ন গন্তব্যে। বাঙালি জাতিসত্তা বিকাশের যে সংগ্রামের সেদিন সূচনা ঘটেছিল, মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় পথ বেয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের অভু্যদয়ের মধ্য দিয়ে তার চূড়ান্ত পরণতি লাভ করে। একুশে ফেব্রম্নয়ারি তাই বাঙালির কাছে এক শৃঙ্খলহীন আলোর দিশারী।

বাঙালি জাতিসত্তার আত্মপরিচায়ক অমর একুশ

তন্বী নাথ

শিক্ষার্থী, ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম থেকেই বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে সূচনা হয়েছিল ভাষা আন্দোলনের। মাতৃভাষা নিয়ে এই আন্দোলনেই বীজ বপন হয়েছিল পৃথিবীর বুকে বাংলাদেশ নামে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের। আমরাই পৃথিবীর একমাত্র জাতি যাদের জীবন দিয়ে মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষা করতে হয়েছে।

বাংলা ভাষার স্বকীয়তা একে সমৃদ্ধ করেছে বর্ণ ও শব্দের সমাহারে। বাংলা ভাষার শ্রম্নতিমধুর বুলি ও কমনীয়তা এই দেশের মাটি ও মানুষের দৈনন্দিন জীবনের প্রতিচ্ছবি। বাংলা ভাষাকে এ দেশের মাটি, বায়ু, জল ধারণ করেছে মমতাময়ী মায়ের মতো। আবহমান বাংলার মানুষ এই ভাষায় ব্যক্ত করে আসছে তাদের সুখ-দুঃখের আলাপন। উত্তর আধুনিকতার এই যুগে বাংলা ভাষায় শব্দের অপব্যবহার এই ভাষার গৌরবোজ্জ্বল সমৃদ্ধিকে মলিন করছে। জীবনের প্রতিটি স্তরে বাংলা ভাষার সুষ্ঠু ও সাবলীল ব্যবহারই বাংলা ভাষাকে বিশ্বদরবারে সমুন্নত রাখবে, বাঙালি জাতিকে এই প্রত্যয় নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। তবেই একটি সমৃদ্ধ ও স্বনির্ভর জাতি হিসেবে আমরা বিশ্বে সমাদৃত হব।

রক্তের বিনিময়ে মাতৃভাষার জন্ম

মো. সজল হোসেন

শিক্ষার্থী,সমাজতত্ত্ব বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

দেশ বিভাগের কয়েক মাসের মধ্যেই ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের প্রথম মুদ্রা, ডাকটিকিট, ট্রেনের টিকিট, পোস্টকার্ড ইত্যাদি থেকে বাংলাকে বাদ দিয়ে উর্দু ও ইংরেজি ভাষা ব্যবহার করা হয়। কিন্তু বাঙালি কখনোই উর্দুকে মেনে নেইনি। এরই প্রতিবাদে অনেক সাংস্কৃতিক সংগঠন গড়ে উঠে (রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ)। ১৯৫২ সালের ২১ শে ফেব্রম্নয়ারি দিনটি ছিল বৃহস্পতিবার; বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ঢাকায় ছাত্র, সরকারি কর্মচারীরা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে প্রবল আন্দোলন করে গড়ে তুলেছিল। পূর্ব পাকিস্তান সরকার আন্দোলনকারীদের ওপর গুলিবর্ষণ করে রফিক, জব্বার, বরকত, সালাম, শফিউরসহ নাম না জানা অনেকেই শহীদ হন। রক্তের বিনিময়ে ৫৬-এর সংবিধানে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলাকে পেলাম। এই আন্দোলনই ছিলো আমাদের জাতীয়তাবাদের মূলভিত্তি। আমরা আমাদের মুখের ভাষা, মায়ের ভাষা পেয়েছি। দেশ স্বাধীনের পরে ২১ শে ফেব্রম্নয়ারির দিনটিকে সরকারি ছুটির ঘোষণা করা হয়। প্রতি বছর এই দিনটিতে সারা দেশে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে শহীদদের স্মরণে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয় শহিদ মিনার প্রঙ্গণে। আমরাই প্রথম জাতি লাল রক্তের বিনিময়ে মাতৃভাষা রক্ষা করেছি।

স্বাধিকার সংগ্রামের অস্তিত্বে অমর একুশ

মো. নাঈম বাবু

শিক্ষার্থী, বিশ্বধর্ম ও সংস্কৃতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

একুশ মানেই প্রেরণা, একুশ মানেই স্বাধীন 'বাংলার' অস্তিত্বে মাতৃভাষার নাম। একুশ মানেই রফিক, জব্বার, শফিউর, সালাম, বরকতের রক্তে কেনা স্বাধীন ভাষার নাম। পৃথিবীর মাঝে একমাত্র বাঙালি জাতিই প্রথম তার মাতৃভাষার মর্যাদা রাখার জন্য জীবন উৎসর্গ করেছেন। বায়ান্নর একুশে ফেব্রম্নয়ারিতে বাঙালি লড়াই করে তার অধিকার আদায় করেছে। তাই এ দিনটি আমাদের মাঝে অধিকার-চেতনা নিয়ে আসে। বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের সূচনাও ঘটে ভাষা আন্দোলন থেকেই।

বাঙালির এই আত্মত্যাগের স্বীকৃতি মিলেছে আন্তর্জাতিকভাবে। ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কো কর্তৃক ২১ ফেব্রম্নয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এই স্বীকৃতির ফলে বিশ্বের দরবারে বাঙালি লড়াকু জাতি হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। বিশ্ববাসী জানতে পারে বাঙালিরা অধিকার আদায়ের জন্য প্রয়োজনে জীবন দিতেও কুণ্ঠাবোধ করব না। প্রতি বছর ফেব্রম্নয়ারির ২১ তারিখে আন্তর্জাতিকভাবে দিবসটি পালন করে আচ্ছি আমরা। এ দিনটি মাতৃভূমি ও মাতৃভাষার প্রতি আমাদের ভালোবাসা বাড়িয়ে দেয়। বাঙালি জাতীয়তাবাদ বিকাশে এই দিনটির গুরুত্ব অপরিসীম।

একুশের বর্ণিল মুকুট বাংলা ভাষা

মো. আবির হাসান

শিক্ষার্থী, ইতিহাস বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

একুশে ফেব্রম্নয়ারি বাংলাকে মনে-প্রাণে ধারণ করার এক নতুন প্রণয়। এ দেশের কোটি কোটি কণ্ঠে কলেস্নালিত আজ একুশের চেতনা। ক্ষোভ, দুঃখ, হর্ষ প্রেম-অপ্রেমের সুরে বেজে ওঠে যে ধ্বনি, বাঙালির রক্তস্রোতা প্রেম সেটি, সেটি বাঙালির আবেগের মহাস্থান বাংলা ভাষা। ফেব্রম্নয়ারি হচ্ছে বাংলা ভাষার শুভ সূচনাকেন্দ্র। পুরো ফেব্রম্নয়ারি জুড়েই চলতে থাকে বাংলা ভাষার জয়ধ্বনি। মনে হয় যেন বাংলা ভাষার নবজন্ম হয়েছে ফের। শুধু বাংলাদেশ নয়, সমগ্র বিশ্বের ছায়াতলে সুচারুভাবে স্থান করে নিয়েছে বাংলা ভাষা। বাংলাকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করতে গেলে মনে হয় এ ভাষাকে বিশ্বমঞ্চে তুলতে প্রাণ দিয়েছেন যেসব বীরেরা তাদের কথা। ঘূর্ণিবাতাসের মতো উদ্যমী ছেলেদের সম্মানে তাই এ একুশে ফেব্রম্নয়ারিকে ভাষাশহীদ দিবসও বলা হয়। বাংলা ভাষা, ফেব্রম্নয়ারি আর ভাষাশহীদদের কথা ভাবতেই হৃদয়ের অতলে শ্রদ্ধার সতেজ চারা রোপিত হয়। একুশ আমাদের প্রেরণার জোগান দেয়, হৃদয়ে নিহিত দেশপ্রেমকে সমুজ্জ্বল করে তোলে ফেব্রম্নয়ারির একুশ।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

উপরে