বৃহস্পতিবার, ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১৬ ফাল্গুন ১৪৩০
walton
তিন পর্বের ধারাবাহিকে আজ ছাপা হলো শেষ পর্ব

মামলার দীর্ঘসূত্রিতা ও ব্যয় কমাতে সাক্ষী ব্যবস্থাপনায় যেসব পদক্ষেপ নেওয়া যায়

ফৌজদারি কার্যবিধির ১৭১(২) ধারানুসারে আদালতে সাক্ষী হাজির করার দায়িত্ব পুলিশের। বিচারব্যবস্থায় সাক্ষীর সংকট মোকাবিলায় বিভিন্ন কর্তৃপক্ষ নানা কঠোর আদেশ, পরিপত্র ইত্যাদি জারি করেছেন। নানা ধরনের সাধুবাদযোগ্য উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। কিন্তু আসলে সমস্যার মূলে গিয়ে পদক্ষেপ না নেওয়ায় সেগুলো ফলপ্রসূ হয়ে ওঠেনি। মামলার দীর্ঘসূত্রিতা রোধে সাক্ষী ব্যবস্থাপনায় নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা যেতে পারে।
মো. সাইফুল ইসলাম পলাশ
  ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০০:০০

(গত পর্বের ধারাবাহিকতায়)

ঞ) আদালতে বিচারকের সময় অসীম নয়, বিচার প্রার্থীদের শক্তি ও ধৈর্য অপার নয়। সারাদিন অপেক্ষায় থাকার পর শেষ বিকালে এসে 'সাক্ষ্য হবে না' শোনাটা সাক্ষী ও বিচার প্রার্থীদের জন্য অত্যন্ত হতাশাজনক এবং বেদনাদায়ক। একেক সাক্ষীর জবানবন্দি ও জেরায় একেক রকম সময় থাকতে পারে তাই সাক্ষীর শ্রেণিভেদে সম্ভাব্য সময় বিবেচনায় আদালতের সাক্ষ্য পরিকল্পনা সাজাতে হবে। সাক্ষীর মামলাগুলোতে একদিনে যেন সংশ্লিষ্ট বিচারকের সক্ষমতার বেশি সাক্ষী না আসে সেটাও আদালতকে খেয়াল রাখতে হবে। তবে সাধারণভাবে এটা ২০ জনের বেশি হওয়া সমীচীন নয়।

ট) কোন বিচারক যদি মনে করেন ধার্য তারিখে অধিক সংখ্যক সাক্ষী চলে আসার কারণে সময়ের অভাবে বা নিজের অসুস্থতাজনিত কারণে বা অন্য কোনো কারণে সব সাক্ষীকে পরীক্ষা করা সম্ভব নয়; তাহলে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে নিয়ন্ত্রণকারী কর্মকর্তাকে বিষয়টি জানাবেন। নিয়ন্ত্রণকারী কর্মকর্তা বিচারিক এখতিয়ার ও অন্যান্য আদালতে সাক্ষীর উপস্থিতি বিবেচনায় সাক্ষীসহ নথি এক বা একাধিক আদালতে সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য বদলি করবেন। কয়েকটি জেলায় এই পদ্ধতি অবলম্বন করে অভূতপূর্ব সাড়া পাওয়া গিয়েছে। নিয়ন্ত্রণকারী কর্মকর্তাকেও বিভিন্ন আদালতের সাক্ষ্য গ্রহণের ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। যেমন, কোনো আদালতে ৩০ জন সাক্ষী এসেছে কিন্তু আরেক আদালতে কোনো সাক্ষীই আসেনি। সেক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণকারী কর্মকর্তা বর্ণিত পদ্ধতি প্রয়োগ করে সমন্বয় করতে পারেন।

ঠ) প্রত্যেক ম্যাজিস্ট্রেটের সাক্ষী সংক্রান্ত একটি ব্যক্তিগত ডায়েরি রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে। যেসব মামলায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী আছেন সেসব মামলার তথ্যাদি লিপিবদ্ধ করবেন। পরবর্তী সময়ে আইনের ব্যত্যয় না ঘটিয়ে যতদূর সম্ভব সাক্ষ্য আইনের ৮০ ধারার বিধান অনুসরণ করে ওই জেলা থেকে বদলির পূর্বেই সিআরআরও'র বিধি ৫০ মোতাবেক সাক্ষ্য প্রদান করতে হবে।

ড) আদালতে যে সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়েছে সেই সাক্ষীর নাম আবশ্যিকভাবে অভিযোগপত্র থেকে লাল কালী দিয়ে কেটে দিতে হবে যেন কোনো সরকারি সাক্ষী ভুলক্রমে আদালতে এসে বিড়ম্বনার শিকার না হন।

ঢ) প্রত্যেক সাক্ষীর সাক্ষ্য সম্পর্কিত তথ্যের মধ্যে সহজ প্রবেশাধিকার থাকতে হবে। জিআর মামলার সিডি কোনোভাবেই যেন না হারিয়ে না যায় সে ব্যাপারে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

ণ) পক্ষগণকে জি. আর মামলার মতো নালিশি মামলাতেও (সিআর) প্রযোজ্য ক্ষেত্রে তদন্তকারী কর্মকর্তা ও চিকিৎসক সাক্ষীকে পরীক্ষার সুযোগ দিতে হবে।

ত) সিআরআরও-এর ১৩১ (৪) বিধি সাপেক্ষে সাক্ষীর সাক্ষ্য হাতে লেখার পরিবর্তে বিচারক স্বয়ং বা স্টেনো-টাইপিস্টের সহযোগিতায় কম্পিউটার কম্পোজ করতে হবে। সাক্ষীর সাক্ষ্য সঠিকভাবে লিপিবদ্ধ হচ্ছে কিনা তা নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে বিচারক-সাক্ষী উভয়দিকেই মনিটর স্থাপন করতে হবে।

থ) সাক্ষীর প্রতি সমন, ওয়ারেন্ট বা আদেশের কপি ইসু্য করার পর প্রসেসের নম্বর ও তারিখ আবশ্যিকভাবে নথিবদ্ধ করতে হবে। সংশ্লিষ্ট কর্মচারী যথাসময়ে তা প্রেরণ করছেন কিনা তা বিচারককে ঘন ঘন তদারকি করতে হবে।

দ) সাক্ষী ব্যবস্থাপনায় অবশ্যই একটি মনিটরিং সেল থাকতে হবে। কোন দিন কোন কোন আদালতে কতজন সাক্ষী উপস্থিত হলো এবং কতজনের সাক্ষ্য গ্রহণ হলো ও কতজন কি কারণে ফেরত গেল সে সম্পর্কে প্রতিবেদন প্রস্তুত করতে হবে। সাক্ষী ব্যবস্থাপনাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে নিয়মিত পুলিশ-ম্যাজিস্ট্রেসি কনফারেন্সে এজেন্ডা নিয়ে আলোচনা করতে হবে।

ধ) প্রত্যেক জজশিপ ও ম্যাজিস্ট্রেসিতে একটি হেল্পডেস্ক বা আইনগত তথ্য ও সেবা কেন্দ্র থাকতে হবে। ওই সেবাকেন্দ্রের অন্যতম একটি সেবা হবে সাক্ষীদের প্রয়োজনীয় তথ্য প্রদান করা। কোন আদালতে কখন সাক্ষ্য প্রদান করতে হবে এবং কোনো প্রশ্নের বা সাজেশনে কি ধরনের উত্তর দিতে হবে সেই সম্পর্কে ওই ডেস্ক প্রাথমিক ধারণা প্রদান করবে। এতদ্‌সংক্রান্তে আদালত প্রাঙ্গণে বিভিন্ন তথ্য সংবলিত সাইনবোর্ড, ডিজিটাল ডিসপেস্ন বোর্ড, ব্যানার ইত্যাদি স্থাপন করা যেতে পারে।

ন) প্রত্যেক জজশিপ ও ম্যাজিস্ট্রেসিতে সাক্ষীদের জন্য পর্যাপ্ত বসার ব্যবস্থা ও ওয়াশরুম রাখতে হবে। নারীদের জন্য পৃথক ব্যবস্থা এবং দুগ্ধপোষ্য শিশুদের জন্য ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার থাকতে হবে। এসব জায়গাগুলোতে খাওয়ার জন্য অবশ্যই পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ খাবার পানি বিনামূল্যে সরবরাহ করতে হবে।

প) ফৌজদারি কার্যবিধির ২৬৫ (জি)(২), ৩৪৯(২), ৩৪৯(এ) ও ৩৫০ ধারার বিধানসাপেক্ষে একজন সাক্ষীর জবানবন্দি ও জেরা ক্রমাগতভাবে না নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন তারিখে ভেঙে ভেঙে বা খন্ড খন্ড করে নেওয়া পরিহার করতে হবে।

ফ) প্রতিটি আদালতে অফিসিয়ালি ল্যাপটপ ও স্মার্টফোন সরবরাহ করতে হবে- যাতে সমন, ওয়ারেন্টসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ আদেশের কপি সঙ্গে সঙ্গে পিডিএফ বা ইমেজ কপি হোয়াটস অ্যাপ বা ই-মেইলের মাধ্যমে পাঠানো যায়।

ব) পুলিশের পার্সোনেল ইনফরমেশন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমকে আরেকটু ঢেলে সাজাতে হবে যেন খুব সহজেই একজন পুলিশ সাক্ষীকে খুঁজে পায়। পুলিশ সুপারের সংশ্লিষ্ট শাখার সেই সিস্টেমে সহজ প্রবেশাধিকার থাকতে হবে। একইভাবে প্রত্যেক সার্ভিসেরই এমন ডাটাবেজ প্রস্তুত করতে হবে।

ভ) বোবা, বধির, বুদ্ধি প্রতিবন্ধী ইত্যাদি শ্রেণির সাক্ষীদের ইন্টারপ্রিটারের মাধ্যমে সাক্ষ্যগ্রহণ করতে হবে। এই শ্রেণির সাক্ষীদের আদালতে আসা-যাওয়া, আহার ও বিশ্রাম সংক্রান্তে বিশেষ ব্যবস্থাপনা থাকতে হবে।

ম) যে কোনো সরকারি সাক্ষীর টিএডিএ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পরিশাধ করতে হবে। সময়মতো এই বিল পরিশোধ না হলে সরকারি সাক্ষীরা সাক্ষ্য প্রদানে অনাগ্রহী হন।

য) গুরুতর অপরাধের সাক্ষীদের নিরাপত্তার লক্ষ্যে সাক্ষী সুরক্ষা আইন প্রণয়ন করতে হবে।

র) প্রবীণ, জরাগ্রস্ত ও দুর্বল সাক্ষীদের সাক্ষ্য প্রদানের সময় প্রয়োজনে কাঠগড়ায় বসার ব্যবস্থা রাখতে হবে।

ল) যেক্ষেত্রে সাক্ষী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু তার উপস্থিতি ব্যয়বহুল বা অসুবিধাজনক এবং সময় সাপেক্ষ সেক্ষেত্রে ন্যায়বিচারের স্বার্থে প্রয়োজনে ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০ অধ্যায়ের বিধানাবলি অনুসরণপূর্বক কমিশনে সাক্ষ্য গ্রহণ করা যেতে পারে।

শ) প্রতিটি জেলায় বিজ্ঞ আইনজীবীর মৃতু্যজনিত কারণে বছরে একবার কোর্ট রেভারেন্স বা শোক সভা করা যেতে পারে।

ষ) সাক্ষ্য প্রদানের জন্য সমন বা ওয়ারেন্টের কপি প্রাপ্তির পরেও একাধিক তারিখে যে সাক্ষী আদালতে উপস্থিত হন না সেসব সাক্ষীর প্রতি প্রসেসের সঙ্গে আদেশের কপি প্রেরণ করতে হবে।

এরপরেও গরহাজির থাকলে সরকারি বা বেসরকারি নির্বিশেষে সব সাক্ষীর বিরুদ্ধে ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৮৫ ধারানুসারে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সরকারি সাক্ষীরা সন্তোষজনক কারণ ছাড়া সাক্ষ্য প্রদানে অনুপস্থিত থাকলে হাইকোর্ট বিভাগের নির্দেশনা (ফৌজদারি আপিল নং-৭২৫৩/১৯ ও ৭৩৫৭/১৯) অনুসারে ওই সাক্ষীর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ এবং প্রয়োজনে বেতন বন্ধের আদেশ প্রদান করতে হবে। কোনো কোনো বিশেষ সাক্ষীর ক্ষেত্রে পুলিশ-ম্যাজিস্ট্রেসি কনফারেন্সে এজেন্ডাভিত্তিক আলোচনা করা যেতে পারে।

স) প্রত্যেক সাক্ষীর সঙ্গে ন্যায্যতা ও সম্মানের সহিত কথা বলতে হবে এবং আইনের শাসন সমুন্নত রাখাতে তাদের অবদানের মূল্যায়ন করতে হবে।

ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার সফলতা মূলত আদালতে উপস্থাপিত সাক্ষ্য প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে নির্মিত। সাক্ষীরা তর্কিত বিচার্য বিষয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে ও সত্য খুঁজে পেতে আদালতকে সহায়তা করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফলে সাক্ষীরা হচ্ছেন আদালতের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার মেরুদন্ড। আজ থেকে দেড় শতাধিক বছর আগে প্রখ্যাত আইন বিজ্ঞানী বেনথাম বলেছেন, সাক্ষী হলো বিচারের চোখ এবং কান। আমরা সাক্ষীকে বিচারের চোখ, কান কিংবা মেরুদন্ড যাই বলি না কেন, পক্ষগণের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে পরিকল্পিত সাক্ষী ব্যবস্থাপনা অপরিহার্য।

পুনশ্চ: লেখার শুরুতে বলছিলাম, হেরোইন মামলায় অভিযুক্ত রাজশাহীর সেই গরিব কৃষকের কথা। ২৪ বছর পর ০২ জন সাক্ষী এসেছেন। সেটি পত্রিকায় প্রকাশের ০৩ মাস পর পরবর্তী ধার্য তারিখে এজাহারকারীসহ একজন সঙ্গীয় ফোর্স এসেছেন সাক্ষ্য দিতে। প্রতিবেদনে জানা গেল, এজাহারকারী জব্দকারী কর্মকর্তা ছিলেন পুলিশের একজন কনস্টবল- যার কিনা ঘটনাস্থলে আসামিকে তলস্নাসি করার ক্ষমতাই ছিল না (৩৬ ধারা, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন-১৯৯০)! বাকি সাক্ষীরা কবে আসবেন সেটাও অনিশ্চিত। অথচ একটি পরিকল্পিত সাক্ষী ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতভাবে এমন লাখো মামলায় সাক্ষীদের স্বল্প সময়ে খুঁজে বের করে মামলার দ্রম্নত নিষ্পত্তি করণে সহায়তা করবে।

লেখক : বিচারক (যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ), বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

উপরে