শুক্রবার, ১৯ এপ্রিল ২০২৪, ৬ বৈশাখ ১৪৩১

নারী দিবস ও নারীর ভাবনা

সমাজের বলয় কিংবা পৃথক কোনো বিপত্তি সব ডিঙিয়ে নারীরা আজ বিশ্বে শীর্ষে। নারীর উপস্থিতি ছাড়া পুরুষ যেমন শূন্য, তেমনি পুরুষ ছাড়া নারী অলংকারহীন। নারী-পুরুষের মেলবন্ধন ও সার্বিক বিষয়ের ওপর মতামত সংগ্রহ করেছেন- জিহাদ হোসেন রাহাত
নতুনধারা
  ০৫ মার্চ ২০২৪, ০০:০০

নারী পুরুষের সৌরভ

ফারজানা হাসান রিমি

শিক্ষার্থী, স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ

পুরুষকে যদি একটি ফুলের সঙ্গে কল্পনা করা হয় তবে নারী সেই ফুলের সুভাস। ঠিক তেমনিভাবে নারী যদি হয় ফুল তবে পুরুষ তার সৌরভ। পুরুষ ছাড়া নারীর জীবন কল্পনা করা যায় না। আবার নারী ছাড়াও অচল পুরুষ। আমাদের সমাজে নারীরা পুরুষের সমান অধিকার থেকে বঞ্চিত- এমন দাবি করা দোষের কিছু না। এটা আসলে প্রকৃত অর্থে স্বাধীনতার বঞ্চনা নয়, এটা ভালোবাসা, শ্রদ্ধা, সম্মান, ভক্তি, মায়া ও মমতার বঞ্চনা। নারী সব সহ্য করতে পারে, শুধু পারে না পুরুষের অবহেলা সহ্য করতে। হোক তিনি বাবা, ভাই কিংবা স্বামী। প্রকৃতিগত ভাবেই নারীরা অনেকটা অভিমানী। অধিকাংশ নারীরা তাদের অধিকার বলতে বুঝে সম্মান ও ভালোবাসাকে। নারীর অধিকার কেবল পুরুষের ভালোবাসার মধ্যেই সীমাবদ্ধ- এমনটি বললেও বোধ করি হবে না ভুল।

নারী জাগরণের অগ্রদূত ধরা হয় মহীয়সী নারী বেগম রোকেয়াকে। অথচ রোকেয়ার জীবনের অগ্রগতির পেছনে যে রয়েছে পুরুষের অবদান- সেটিও আজ প্রমাণিত। নারী ছাড়া পুরুষের যেমন মূল্য নেই, তেমনি পুরুষ ছাড়া নারীও মূল্যহীন।

তাইতো কাজী নজরুল ইসলাম বলেছিলেন,জগতের যত বড় বড় জয় বড় বড় অভিযান, মাতা, ভগ্নি ও বধূদের ত্যাগে হইয়াছে মহীয়ান।

কোন্‌ রণে কত খুন দিল নর, লেখা আছে ইতিহাসে, কত নারী দিল সিঁথির সিঁদুর, লেখা নাই তার পাশে।

কত মাতা দিল হৃদয় উপড়ি কত বোন দিল সেবা, বীরের স্মৃতি স্তম্ভের গায়ে লিখিয়া রেখেছে কেবা?

কোন্‌ কালে একা হয়নি জয়ী পুরুষের তরবারি, প্রেরণা দিয়াছে, শক্তি দিয়াছে বিজয়-লক্ষ্ণী নারী।

নারী দিবসেও বলতে হয়, পরিবার, সমাজ, দেশ ও জাতি গঠনে নারী-পুরুষ উভয়ের অবদান সমানে সমান। নারীরা যেন অবহেলিত না হয় সেটি যেমন পুরুষের দেখার দায়িত্ব, ঠিক তেমনি পুরুষও যেন নিগ্রহের শিকার না হন সেটিও নারীর দেখার দায়িত্ব। আমরা শুধু নারী নির্যাতনের কথাগুলোই জানি। কত পুরুষ যে নির্যাতিত হয়ে চক্ষু লজ্জার ভয়ে প্রকাশ করতে পারে না মনের দুঃখ- সে কথাও বলা বড় দায়। উভয়ের ক্ষেত্রেই দায়মুক্ত হোক আমাদের সমাজ- এটাই হোক আমাদের অঙ্গিকার।

নারী হোক পুরুষের, পুরুষ হোক নারীর

ইশরাত জাহান এশা

স্নাতক শিক্ষার্থী, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়

নারীর জন্য কেবল একটি দিন কিংবা পৃথক করে পুরুষের জন্য কোনো দিন কেন নির্ধারণ করা হয়েছে সে প্রশ্নের উত্তর না খোঁজাই ভালো। নারী পুরুষের কল্যাণ কামনা করার পাশাপাশি পুরুষের উচিত নারীর কল্যাণে মনোযোগী হওয়া। কেবল একটি দিবসে নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখার দায়- আমাদের এড়িয়ে চলতে হবে। নারীর উচিত পুরুষের প্রতি শ্রদ্ধা, সম্মান, ভালোবাসা, সহযোগিতা ইত্যাদি বজায় রাখা। ঠিক একইভাবে পুরুষের উচিত নারীর ক্ষেত্রেও এসব বিষয়ের প্রতি খেয়াল রাখা। ঘরের কাজে নারীকে সহযোগিতার বিষয়টি আমাদের পুরুষ সমাজে এখনো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেনি। অথচ গৃহকর্মে নারীর সার্বিক শ্রমমূল্য ও মর্যাদা বিষয়ক মানবিক দাবি ইতোমধ্যেই জাতিসংঘ

নির্ধারণ করে দিয়েছে। জাতিসংঘ কর্তৃক ঘোষণা করা হয়েছে যে, বৈশ্বিক উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (ঝউএ)-২০১৫। আর এই ঘোষণার মাধ্যমে দেওয়া হয়েছে নারীর গৃহস্থালির কাজের স্বীকৃতি। এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা ২০১৫-এর অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছে 'নারী-পুরুষের সমতা' বিধান নিশ্চিত করা। এ লক্ষ্যমাত্রার ৫.৪ নম্বর সূচকে উলেস্নখ করা হয়েছে, 'সরকারি সেবা, অবকাঠামো ও সামাজিক নিরাপত্তা নীতিমালার মাধ্যমে অবৈতনিক ও গৃহস্থালি কাজের স্বীকৃতি ও মূল্যায়ন করা। এমনকি পরিবার ও পারিবারিক দায়িত্ব বণ্টনের বিষয়টি উপযুক্ত করে জাতীয়পর্যায়ে তুলে ধরা। একজন নারী, শিক্ষার্থী ও দেশের নাগরিক হিসেবে এসব কার্যক্রমে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে সরকারসহ সংশ্লিষ্ট পক্ষকে জানাই আহ্বান। নারীরা যেন অবহেলিত না হয়, সে বিষয়ে জোরালো নজরদারি প্রয়োজন। মনে রাখতে হবে একটি সমাজকে পুরুষ চাইলেই একা সমৃদ্ধ করতে পারবে না। সমৃদ্ধকরণে অবশ্যই প্রয়োজন পুরুষের পাশাপাশি নারীর সমান অংশগ্রহণ। আমাদের বুঝতে হবে, নারী ও পুরুষ নিয়েই গঠিত হয় পরিবার। আর এই পরিবারকে সমৃদ্ধ করতে প্রধান ভূমিকা পালন করে একজন নারী। প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নারীকে গৃহবধূ নয়- মানতে হবে পুরুষের অংশ হিসেবে। পুরুষরা যত বেশি সচেতন হবেন, ঠিক ততটাই কমবে বৈষম্য, বাড়বে নারীর মর্যাদা, সাধিত হবে সামাজিক কল্যাণ। এতে করে নারী-পুরুষের সমচেষ্টায় এগিয়ে যাবে সমাজ। কেবল পৃথক দুটি দিবসের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে তবেই নারী হবে পুরুষের আর পুরুষ হবে নারীর।

নারীর পথ হোক বৈষম্যহীন

অনন্যা শিরিন

শিক্ষার্থী, শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ

\হআমাদের সবুজবীথির বাংলাদেশের পারিবারিক জীবন, সামাজিক, রাজনৈতিক কিংবা অর্থনৈতিক পরিমন্ডল- সবখানেই আগের চেয়ে বহুগুণে বেড়েছে নারীর অগ্রযাত্রা। তবে পুরোপুরি সুগম হয়নি নারীর পথ। পুরুষ শাসিত সমাজের একটি অংশ আজও নারীকে দেখছে অবহেলার চোখে। মূলত নারী দিবস হচ্ছে- জাতি, গোষ্ঠী, ভাষা সাংস্কৃতি, অর্থনীতি কিংবা রাজনীতিগত সব ক্ষেত্রে বৈষম্যহীনভাবে নারীর অর্জনকে মর্যাদা দেওয়ার দিন।

এদিনে নারীরা নিজেদের অধিকার আদায়ের জন্য দীর্ঘ সংগ্রামমুখর ইতিহাসকে করে স্মরণ। নিজের আগামীর পথগুলোকে মসৃণ করতে নারী দিবসকে ধরা হয় সাহস বৃদ্ধির অংশ হিসেবে। এমন একটা সময় ছিল যখন নারী শব্দকে অবলা শব্দ দ্বারা বিশেষায়িত করা হতো। যার অর্থ- অসহায়। তবে এখন আর সেই শব্দের ব্যবহার আগের মতো করা না হলেও অসহায়ত্ব থেকে বেরিয়ে আসতে পারিনি আমরা নারী সমাজ।

কালের পরিক্রমায় ও সময়ের বিবর্তনে আজ নারীরা অনেকাংশে স্বাবলম্বী। নিজ গুণে নারীদের একটি অংশ আজ প্রতিষ্ঠিত। আমার মনে হয়, যদি আমাদের প্রতিটি পরিবারের পুরুষরা নারীদের পাশে ঠিকমতো দাঁড়ায়, তবে পরাধীনতার শেকল মুক্ত হবে আমাদের নারী সমাজ। নারীদের যথাযথভাবে শিক্ষার সুযোগ করে দেওয়া হবে এক্ষেত্রে আমাদের প্রথম পদক্ষেপ।

যদিও শিক্ষার কোনো বয়স নেই। সুযোগ পেলে যে কোনো বয়সেই শিক্ষা গ্রহণ করা যায়। শিক্ষার সুযোগ পেলে একজন নারী নিজে যেমন স্বাবলম্বী হবে ঠিক তেমনি বাড়বে আমাদের সাংসারিক আয়। নারী সমাজের একজন হিসেবে ভাবনা আসে মনে- নারী-পুরুষ একই বৃত্তের দুটি গোলাপ ছাড়া আর কিছুই নয়।

শুধু ৮ মার্চ নারী দিবসের একটি দিন নয়, সব ক্ষেত্রেই পুরুষের উচিত নারীকে সম্মান করা। তবেই বৈষম্যহীন হবে নারীর পথচলা।

টেকসই উন্নয়নে নারীকে গুরুত্ব দিতে হবে

সাবেরা সুলতানা

শিক্ষার্থী, ঢাকা সিটি কলেজ

\হআমাদের বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেক নারী। নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া দেশের টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। নেতৃত্বে নারীর কার্যকর অংশগ্রহণ ছাড়া লিঙ্গ সমতা ও সুশাসন নিশ্চিত করাও অনেকাংশে অসম্ভব। প্রকৃতপক্ষে লিঙ্গ অসমতা ও দুর্নীতি একে অপরের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।

মূলত লৈঙ্গিক অসমতা সুশাসন, দেশের অগ্রগতি, টেকসই উন্নয়ন ও দারিদ্র বিমোচনকে বাধাগ্রস্ত করে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে চালানো গবেষণাসমূহে দেখা গেছে, প্রায় প্রতিটি দেশেই দুর্নীতির কারণে ব্যাহত হচ্ছে নারীর ক্ষমতায়ন। বিশ্বের যেসব দেশ জেন্ডার ইকুইটি ও পাওয়ার অব ওমেন্স নিয়ে কাজ করে সেসব দেশ অনেকাংশে অগ্রগতির পথে রয়েছে এগিয়ে। তবে বাংলাদেশ যথাযথভাবে নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত না হওয়ায় এবং দুর্নীতি বাড়ায় থমকে আছে নারী উন্নয়ন। অবস্থাদৃষ্টে বলা চলে, নারীর ক্ষমতায়নে দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা প্রধান অন্তরায়। কারণ দুর্নীতির সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে আমাদের নারী সমাজ।

দেখা যায়, প্রতিনিয়ত নির্যাতনের শিকার হচ্ছে আমাদের নারীরা। হচ্ছে ধর্ষণ ও যৌন হয়রানির শিকার। কোথায় মিলবে প্রতিকার- সে প্রশ্নের উত্তর মেলাও বড় দায়। যার ফলে, দেশে বাড়ছে নারীদের আত্মহত্যার পরিমাণ। আমরা মুখে নারী- পুরুষের সমান অধিকারের স্স্নোগান দিলেও নারীদের দেখা যায় নিপীড়িত হতে। আমরা চাই, শেষ হোক নারী-পুরুষের সব বৈষম্য ও বঞ্চনা। নারীর জন্য প্রতিটি দিন হোক নিরাপদ। পুরুষ শ্রদ্ধা, সম্মান ও ভক্তির চোখে দেখুক নারীকে। ভালোবাসাময় হোক নারী পুরুষের জীবন। নারী হোক শক্তি ও সম্ভাবনার প্রতীক। আন্তর্জাতিক নারী দিবসে এই হোক আমাদের অঙ্গিকার। নারী হোক আগামীর কান্ডারি। দেশের কান্ডারি।

অবশ্য আমাদের দেশের দরিদ্র পরিবারগুলো এখন জোর দিচ্ছে মেয়েদের পড়াশোনার ওপর। উদাহরণ হিসেবে আমরা ডক্টর সেঁজুতি সাহার নাম বলতে পারি। যিনি করোনা ভাইরাসের জিনোম সিকুয়েন্স আবিষ্কারকারী বাংলাদেশি অণুজীব বিজ্ঞানী। আমরা নিশাত মজুমদারের কথা বলতে পারি। আমরা বলতে পারি বিশ্ব পরিব্রাজক নাজমুন নাহার সোহাগীর কথা। আরও এগিয়ে যেতে হবে নারীদের। পুরুষকে ভালোবাসার মোহে আটকে ফেলতে হবে। বাবা, ভাই, দাদা, চাচা, মামা, খালু- সবাইকে শ্রদ্ধার আসনে রাখতে হবে। সামান্য কয়েকজন নরপশুর জন্য আমরা যেন পুরো পুরুষ জাতিকে দায়ী না করি- এই হোক আমাদের অঙ্গীকার।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

উপরে