শনিবার, ২০ এপ্রিল ২০২৪, ৬ বৈশাখ ১৪৩১

প্রবাসী নারীর কর্মজীবন ও নিরাপত্তা

মোশারফ হোসেন
  ০৫ মার্চ ২০২৪, ০০:০০

বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধিতে প্রবাসী নারী শ্রমিকদের ভূমিকা প্রশংসনীয়। বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি নারী ভাগ্যের উন্নয়নে আকাশ ছোঁয়া স্বপ্ন পূরণের উদ্দেশ্যে দূর প্রবাসে পাড়ি জমান মধ্যপ্রাচ্য ছাড়াও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে। গৃহকর্মীর কাজ নিয়ে গেল অর্থবছরে প্রবাসী আয় পাঠানোর শীর্ষে থাকা ১০ দেশের মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার সৌদি আরব, কুয়েত, আরব আমিরাত, কাতার, মালেশিয়া, লিবিয়া, ওমান, ইতালি ও বাহরাইন।

এই ১০টি দেশের মধ্যে ৬টি মধ্যপ্রাচ্যের। সেখানে নারী কর্মীরা শারীরিক, মানসিক নির্যাতন তথা দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ থেকে অমানবিক জুলুম-নির্যাতনের শিকার হন। প্রতিনিয়ত মোকাবিলা করতে হয় অনাকাঙ্ক্ষিত প্রতিবন্ধতা। তাতে জীবন হয়ে উঠে বিপদসংকুল। কণ্টকাকীর্ণ প্রবাসজীবনে আশা ভঙের হতাশা প্রতিনিয়ত তাকে কুরে কুরে খায়। জীবনজীবিকার তাগিদে অভাব নামক দানব প্রবাসে নিয়ে যায় বটে, তাতে লাভের অঙ্কের ফলাফল দাঁড়ায় শূন্য। দুঃখগাথা প্রবাসী নারীর সীমাহীন নিদারুণ কষ্টের বর্ণনা জানা যায় নানা মাধ্যমে। মানবতা পদদলিত হয়। একটু সুখসমৃদ্ধিতে থাকার অভিপ্রায় নিয়ে সহায়-সম্বল বিক্রি করে। পাশবিকতার চরম পর্যায়ে আমরা দেখতে পাই, মানসিক নির্যাতনে ভার মানসিক ভারসাম্য হারানো, পঙ্গু হওয়া, এমনকি মৃতু্যকে আলিঙ্গন করে বেঁচে থাকা।

ব্র্যাকের তথ্যানুসারে, ১৯৯১ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত প্রায় ২০ লাখ নারী পাড়ি জমিয়েছেন প্রবাসে। তাতে মানসিক ভারসাম্য হারানো, পঙ্গুত্ববরণকারীর সংখ্যা হাজারের বেশি। প্রবাস থেকে মরদেহ ফিরে আসার অপ্রত্যাশিত ঘটনাগুলো ঘটছে হরহামেশায়। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিলস) ও ব্র্যাকের তথ্যমতে, গত বছরে পাঁচ শতাধিক নারী শ্রমিকের মরদেহ দেশে এসেছে।

বিশেষজ্ঞরা বিবৃতি দিচ্ছেন, গৃহকর্মী নিয়োগের কথা বলে তাদের জোর করে বাধ্য করছে যৌনকর্মী হিসেবে।

২০২০ সালে করোনাকালে বিদেশ থেকে ফিরে এসেছেন ৪ লাখ ২৫ হাজার ৬৯৭ জন কর্মী। এর মধ্যে ৫০ হাজার ৬১৯ জন প্রবাসী নারীর ওপর নানা ধরনের যৌন নিপীড়ন চালানো হয়। ধর্ষণসহ শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। আবার এসব খবর বাইরে জানানোর চেষ্টা করলে উৎপীড়ন-নিপীড়নের শিকার হওয়া নারীর সন্তানসম্ভবা হলে তাকে গর্ভপাতের জন্য বাধ্য করা হয়। উন্নত জীবনমানের প্রত্যাশায় প্রবাসে পাড়ি জমানো নারী জীবনের স্বর্ণালি দিন তথা জীবন-যৌবন সর্বস্ব বিলিয়ে দিয়েও জীবন নিয়ে আপনজনের কাছে অক্ষত অবস্থায় ফিরে আসতে পারে না।

প্রবাসী নারী কর্মীদের ওপর মধ্যপাচ্যে যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়া অনেকে নিজের প্রতি ঘৃণার উদ্রেক থেকে পরিবারে ফিরে আসতে চান না আবার অনেক ক্ষেত্রে পরিবার তাদের প্রতি নেতিবাচক চিন্তার জায়গা থেকে অপারগতা জানায়। তাতে প্রবাসী নারী কর্মীর সামাজিক, অর্থনৈতিক, পারিবারিক ও মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা এতটাই নাজুক থাকে যে, সে বেঁচে থেকে মৃতু্যর প্রহর গুনতে থাকে। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব রিক্রুট এজেন্সির (বায়রা) তথ্যমতে, বর্তমানে ৫ লাখেরও বেশি নারী শ্রমিক বিভিন্ন দেশে কাজ করছেন।

গত পাঁচ বছরে এ দেশ থেকে সৌদি আরব গেছে ২ লাখ ৩৭ হাজার ৫৭৪ জন শ্রমিক। জানা যায়, সৌদি আরবে যেসব নারী শ্রমিক যাচ্ছেন তাদের প্রায় বেশিরভাগই আরবি ভাষায় নূ্যনতম জ্ঞান না থাকার দরুন অপ্রত্যাশিকভাবে গৃহকর্তার সঙ্গে কথাবার্তার ক্ষেত্রে মারাত্মক সমস্যার সৃষ্টি হয়ে থাকে হরহামেশা। ইশারা-ইঙ্গিতের মাধ্যমে তাদের ভাব প্রকাশ করতে গিয়ে হিতে বিপরীত হচ্ছে প্রবাসী নারী শ্রমিকদের। মাসের পর মাস বেতন-ভাতা না দিয়ে উল্টো তাদের ওপর চড়াও হয়। এমনও শোনা যায়, তাদের শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার ঘটনা। কারও হাত-পা ভেঙেছে, কারও কারও গায়ে গরম পানি ঢেলে দেওয়া, চুল কেটে দেওয়া, নির্জন প্রকোষ্ঠে বন্দি করে রাখা, খেতে না দেওয়া এবং পরনের কাপড় পর্যন্ত দেয় না। নিয়োগদাতার ছেলেমেয়ে, স্ত্রী, স্বয়ং নিয়োগদাতাও নানাভাবে, নানা ফন্দিফিকির করে নির্যাতন করে থাকে নারী গৃহকর্মী ওপর। নিয়োগদাতা বাংলাদেশে যাতে গৃহকর্মী পালিয়ে না যেতে পারে সেজন্য বকেয়া বেতন পরিশোধ তো করেই না বরং নারী শ্রমিকদের নামে মামলা সাজায় এভাবে যে, নারী শ্রমিককে আনতে নিয়োগকর্তার চার পাঁচ লাখ টাকা খরচ হয়েছে, সেই টাকা তাকে ফেরত দিতে হবে।

মামলা কোর্টে তুলে নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত অর্থাৎ আদালত থেকে রায় পাওয়ার পূর্ব পর্যন্ত দেশে ফিরতে পারে না। কখনো টাকা-পয়সা ছাড়াই ফিরতে হয়, প্রেক্ষাপট অনুযায়ী কাউকে দেশ থেকে উল্টো টাকা পাঠাতেও হয়। নিয়ম হচ্ছে, নিয়োগকর্তা যখন তার দেশের রিক্রুটিং এজেন্সির কাছে গৃহকর্মী চান, তখন তিনি সেই এজেন্সিকে প্রয়োজনীয় অর্থ প্রদান করেন। সেই এজেন্সি আবার বাংলাদেশি রিক্রুটিং এজেন্সির সঙ্গে যোগাযোগ করে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশি শ্রমিককে কোনো অর্থ লেনদেন করতে হয় না। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে শ্রমিকদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করা হচ্ছে। মধ্যস্বত্বভোগী এজেন্সিগুলো আর্থিক মুনাফা লাভের জন্য শ্রমিকদের বিক্রি করে দিচ্ছে। প্রবাসী শ্রমিকদের নিয়ে যারা কাজ করেন তারা বলছেন, ২০১৫ সালে শ্রমিক পাঠানোর চুক্তিতে নানা ধরনের দুর্বলতা রয়েছে- যার খেসারত দিতে হচ্ছে নারী শ্রমিকদের।

দেশে ফেরত আসা নারী শ্রমিকদের একটি বড় অংশের অভিযোগ যেসব বাড়িতে গৃহকর্মী পদে তাদের নিয়োগ দেওয়া হয় বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই যৌথ পরিবারে। ফলে সেখানে কাজের চাপ থাকে মাত্রাতিরিক্ত। অনেক আশা নিয়ে বিদেশে পাড়ি জমান, দালালরা লোভনীয় নানা প্রতিশ্রম্নতি বলে, কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, তার সত্যতার লেশমাত্র নেই। মোবাইল দেবে, কথা বলতে দেবে, কাপড়-চোপড়-তেল, সাবান, খাবার, সন্তোষজনক বেতন-ভাতা ইত্যাদি। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। বেতন চাইলে বলে তোর আকামা হয়নি, আকামা করাতে লাখেরও বেশি টাকা লাগবে। এভাবে বুঝিয়ে থাকে সহজ-সরল নারী প্রবাসী কর্মীদের।

বাংলাদেশে আত্মীয়স্বজনদের কাছ থেকে মুক্তিপণ চাওয়া হয়। সেটি দিতে না পারলে তাদের ওপর নির্যাতনের মাত্রা বেড়ে যায়। গত বছর প্রকাশিত রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্ট রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) সমীক্ষা মতে পরিবারের ভাগ্য বদলাতে বিদেশে কাজ করতে গিয়ে কর্মস্থলে প্রায় ৩৫ শতাংশ নারী কর্মী শারীরিকভাবে, ৫২ শতাংশ মানসিকভাবে এবং ১১ শতাংশ যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ভুক্তভোগী নারী কর্মীরা প্রকাশ করতে চায় না লোকলজ্জার ভয়ে- তথা, সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন হওয়ার ভয়ে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের গবেষণা তথ্যানুযায়ী বিদেশে পাড়ি জমানোর আগে এসব নারী শ্রমিককে সামাজিক, অর্থনৈতিক, পারিবারিক, ব্যক্তিগতভাবে তাদের মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা যা ছিল, বিদেশে থেকে ফেরত আসার পর প্রায় সব ক্ষেত্রেই অবস্থা নিম্নগামিতার দিকে ধাবিত হয়ে থাকে। দারদেনা, ঋণ, বন্ধক, চড়া সুদে নেওয়া টাকা দিয়ে বিদেশে গেছেন বাড়তি আয়-রোজগারের প্রত্যাশা নিয়ে। বাড়তি-আয়-রোজগার তো দূরের ব্যাপার- দারদেনা, বিভিন্ন মানুষের কাছ থেকে শর্তসাপেক্ষে নেওয়া টাকাও পরিশোধ করতে পারেন না।

কিন্তু রিক্ত হস্তে দেশে ফিরে এসে শোকে বিহ্বল হয়ে মূর্ছা খায়, পথে বসে যায়। জীবনে নেমে আসে অমানিশার ঘোর অন্ধকার। সামাজিকভাবে সর্বস্তরে অপবাদ, গস্নানি, ঘৃণাই জোটে। অনেকের স্বামীর সংসার করাটাও চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠে অপবাদের বোঝা মাথায় নিয়ে না মরে বেঁচে থাকার মতো জীবন কাটে যুদ্ধ করে। খারাপ কাজের সঙ্গে শিকার হয়েছে বলে একটা 'রটনা' সমাজে জারি আছে। বিদেশফেরত নারী শ্রমিকদের নিয়ে রাস্তাঘাটে নানাভাবে ইভটিজিং এবং বাজে মন্তব্য করা হয়। সামাজিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয়ের প্রকাশ মেলে। এভাবে যে, যেখানে দুর্বিষহ জীবনের বর্ণনা শুনে পরিবার সহানুভূতির দৃষ্টিতে দেখবে মানসিকভাবে তাকে সান্ত্বনা, ভালোবাসার পরশে তার কষ্ট লাঘবে এগিয়ে না এসে নানারকমের কটূক্তি ও ভর্ৎসনা হেয়প্রতিপন্ন করে পরিত্যক্তা হিসেবে তাকে মানবেতর জীবনযাপন করতে হয়।

২০২১ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর ডয়েচে ভেলে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, যেখানে বলা হয়েছে, বিদেশফেরত নারী শ্রমিকের প্রায় ৮৫ শতাংশ হতাশায় ভুগছে।

ব্র্যাকের প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা যায়, গত পাঁচ বছরের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা ৪৮৭ নারী কর্মীর মরদেহ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, আত্মহত্যায় মৃতু্য হয়েছে ৮৬ জনের, স্ট্রোকে মারা গেছে ২৬৭ জন, দুর্ঘটনা নিহত হয়েছে ৭১ জন, খুন হয়েছে ২ জন এবং স্বাভাবিক মৃতু্য হয়েছে ১১৫ জনের।

\হপ্রবাসে মৃতু্যবরণকারী নারীদের মধ্যে বেশিরভাগই সৌদি আরবের- এরপর রয়েছে জর্ডান, লেবানন, ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত।

বাংলাদেশ আজ প্রায় ৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের দেশে পরিণত হতে যাচ্ছে তাতে এটা বড় অবদান হচ্ছে রেমিট্যান্স ভুলে গেলে চলবে না, এরা আমাদের রেমিট্যান্স যোদ্ধা। নিজের জীবন বাজি রেখে অকাতরে বিলিয়ে দিচ্ছে এসব স্বীকৃতিহীন, অবহেলিত নারী শ্রমিক।

যেসব শর্তে নারীদের বিদেশে পাঠানো হচ্ছে তাদের সেসব শর্ত সঠিকভাবে মানা হচ্ছে না। সরকারের পক্ষ থেকে দায়ীদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে না। এমনকি যারা নির্যাতিত হয়ে দেশে ফিরছেন তাদের পুনর্বাসনে কার্যকরী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তথ্য থেকে জানা যায়। যেসব রিক্রুটিং এজেন্সি নারী কর্মীদের সঙ্গে এ ধরনের প্রতারণা করে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। এসব দায়িত্ব বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের।

বিদেশে বাংলাদেশের দূতাবাস বা কন্সু্যলার অফিসেরও দায়িত্ব রয়েছে। যেখানে কর্মরত বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা দেখভালের। মৃত শ্রমিকের মৃতু্যর সঠিক কারণ উদ্ঘাটন, প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ও জনবলসমৃদ্ধ একটি আধুনিক স্থায়ী সেল গঠন জরুরি।

দেশের জন্য সোনালি অধ্যায় রচনায় প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগকে সমন্বয়ের ভিত্তিতে কাজ চালিয়ে যেতে হবে যথাযথ প্রক্রিয়ায়। তবেই বাংলাদেশ বিশ্ব দরবারে উন্নতির চরম শিখরে আরোহণ করতে প্রয়াস পাবে- এটাই প্রত্যাশা।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

উপরে