মঙ্গলবার, ২৮ মে ২০২৪, ১৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

গরম কমার কোনো সম্ভাবনা নেই, বাতাসে মরুর অগ্নিহল্কা

যাযাদি ডেস্ক
  ২১ এপ্রিল ২০২৪, ০৯:৪৯
প্রতিকী ছবি

দেশের ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে তীব্র তাপপ্রবাহ; বাতাসে যেন মরুভূমির আগুনের হল্কা। থার্মোমিটারের পারদ দিন দিন ঊর্ধ্বমুখী হয়ে উঠছে। দেশজুড়ে জারি করা হয়েছে গত শুক্রবার থেকে তিনদিনের জন্য তাপপ্রবাহের সতর্কবার্তা বা হিট অ্যালার্ট। গরমে হাঁসফাঁস করছে মানুষ; অসুস্থ হয়ে পড়ছে অনেকেই। শুধু তাই নয়, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে হিটস্ট্রোকে শিশু ও বৃদ্ধসহ ৬ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। দেশজুড়ে এমন খরতাপ পরিস্থিতি আরও কয়েক দিন বিরাজ করবে বলে জানানো হয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাসে।

দেশের দু’টি জেলার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া তীব্র তাপপ্রবাহ অতি তীব্র তাপপ্রবাহে রূপ নিয়েছে। আর শুক্রবার তাপমাত্রার বিষয়ে আবহাওয়া বিভাগ সতর্কতা জারির পর শনিবার হিটস্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে দেশের তিন জেলায় চারজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। জেলাগুলোর মধ্যে চট্টগ্রামে দু’জন, চুয়াডাঙ্গা ও পাবনায় একজন করে দু’জন।

এদিকে শনিবার বিকাল ৩টায় যশোরে দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৪২ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। চুয়াডাঙ্গায় ৪২ দশমিক ৩ ডিগ্রি এবং পাবনায় রেকর্ড করা হয়েছে ৪১ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। রাজধানী ঢাকার তাপমাত্রাও আগের দিনের তুলনায় বেড়েছে। শনিবার রেকর্ড হয়েছে ৪০ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা শুক্রবার ছিল ৩৮ দশমিক ৪ ডিগ্রি।

আবহাওয়াবিদরা বলছেন, এমন তাপপ্রবাহ আরও কয়েক দিন অব্যাহত থাকতে পারে।

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অতি তীব্র তাপপ্রবাহ এবং কোনো কোনো অঞ্চলে মাঝারি তাপপ্রবাহ বয়ে যাওয়ায় জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। মানুষের পাশাপাশি প্রাণিকুলেও হাঁসফাঁস অবস্থা। বেশি সমস্যায় পড়েছেন শ্রমজীবী মানুষ। প্রচণ্ড গরমে বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হচ্ছেন না কেউ। একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন এলাকায় শুরু হয়েছে ডায়রিয়াসহ নানা রোগ। ভিড় বাড়ছে হাসপাতালগুলোতে। চিকিৎসকরা বলছেন, স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।

আবহাওয়াবিদদের মতে, তাপমাত্রা ৩৬ থেকে ৩৭ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলে তা মৃদু তাপপ্রবাহ, ৩৮ ডিগ্রি থেকে ৩৯.৯ ডিগ্রি হলে মাঝারি তাপপ্রবাহ, ৪০ ডিগ্রি থেকে ৪১.৯ পর্যন্ত তীব্র তাপপ্রবাহ এবং ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলে তা অতি তীব্র তাপপ্রবাহ হিসেবে গণ্য হয়। সেই হিসাবে যশোর এবং চুয়াডাঙ্গা জেলায় বইছে অতি তীব্র তাপপ্রবাহ।

চট্টগ্রামে হিটস্ট্রোকে দু’জনের মৃত্যু চট্টগ্রাম অফিস থেকে ইব্রাহিম খলিল জানান, হিটস্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে দু’জনের মৃত্যুর হয়েছে। এছাড়া মারা গেছে শত শত মুরগি। গরমের ভয়ে নগরীতে মানুষ ও যানবাহন চলাচল কমে গেছে। এতে কিছুটা ফাঁকা হয়ে গেছে চট্টগ্রাম নগরী। নগরীর হাসপাতালগুলোতে জ্বর, ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন অসুখে আক্রান্ত মানুষ দলে দলে ভর্তি হচ্ছেন। এদের মধ্যে শিশু ও বৃদ্ধদের সংখ্যাই বেশি।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের মেডিসিন বহির্বিভাগের রেসিডেন্ট ফিজিশিয়ান (আরপি) ডা. মো. শাহেদ উদ্দিন বলেন, ‘চট্টগ্রামে হিটস্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়া শুরু করেছেন কর্মজীবী মানুষ। ইতোমধ্যে চট্টগ্রামে হিটস্ট্রোকে ছয় মাস বয়সি এক শিশুসহ ৭০ বছর বয়সি এক বৃদ্ধের মৃত্যু হয়েছে।’ জানা গেছে, নিহত বৃদ্ধের নাম ছালেহ আহমদ শাহ (৭০)। তার বাড়ি চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার রায়পুর ইউনিয়নের উত্তর পরুয়াপাড়া এলাকায়।’

ছালেহ আহমদের ছেলে নজরুল ইসলাম বলেন, ‘শুক্রবার সন্ধ্যার দিকে বাবা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে আনোয়ারা হলি হেলথ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। কর্তব্যরত চিকিৎসক সেখানে তাকে মৃত ঘোষণা করেন।’

আনোয়ারা হলি হেলথের পরিচালক সাইফুল ইসলাম শামীম বলেন, ‘হাসপাতালে আসার আগেই ছালেহ আহমদের মৃত্যু হয়েছে। তিনি হিটস্ট্রোকে মারা গেছেন।’

অন্যদিকে একই জেলার বোয়ালখালী উপজেলায় সাফা নামের ছয় মাস বয়সি এক কন্যা শিশুর মৃত্যু ঘটে। শুক্রবার উপজেলার পশ্চিম শাকপুরা ২নং ওয়ার্ড আনজিরমারটেক সৈয়দ আলমের নতুন বাড়িতে এ দুর্ঘটনা ঘটে। তার বাবার নাম মো. নিজাম উদ্দীন। নিহতের বাবা নিজাম উদ্দীন বলেন, ‘ভোরে মায়ের বুকের দুধ পান করার কিছুক্ষণ পর সাফা ঘুমিয়ে যায়। সে সময় ঘরে বিদ্যুৎ ছিল না। সকাল ৭টায় মেয়েকে কোলে নেওয়ার পর তার শরীর ঠান্ডা অনুভব হলে দ্রুত উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে জরুরি বিভাগের উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার ডা. সাবরিনা আকতার তাকে মৃত ঘোষণা করেন।’

পরিবারের ধারণা বিদ্যুৎ না থাকায় সে হিটস্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, চমেক হাসপাতালের বহির্বিভাগে হিটস্ট্রোকের রোগী আসার পর ১৩, ১৪, ১৬ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি দেওয়া হচ্ছে। শনিবার দুপুর পর্যন্ত তিনটি ওয়ার্ডে পাঁচ শতাধিক রোগী ভর্তি রয়েছেন। যাদের প্রত্যেকে হিটস্ট্রোকে আক্রান্ত বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম মেডিকেলের মেডিসিন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. অনিরুদ্ধ ঘোষ জয়।

তিনি বলেন, ‘গরমে হিটস্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ছে, যার কারণে মৃত্যুও হতে পারে। এ জন্য তীব্র রোদে পারতপক্ষে বাইরে বের না হওয়া কিংবা বেশিক্ষণ অবস্থান না করাই ভালো। এছাড়া গরমের প্রভাব থেকে জনসাধারণকে রক্ষায় সুতি কাপড়ের পোশাক পরিধান, তরল জাতীয় খাবার ও ফলমূল খেতে হবে।’

তীব্র গরমে মানুষের পাশাপাশি প্রাণিকুলেও হাঁসফাঁস শুরু হয়েছে। রোদের খরতাপে অতিষ্ঠ হয়ে বারবার পুকুর, ডোবা, খাল, নদীসহ বিভিন্ন জলাধারে ঘণ্টার পর ঘণ্টা শরীর ডুবিয়ে একটু স্বস্তি নেওয়ার চেষ্টা করছে। এরপর ছুটে যাচ্ছে হালকা শীতল পরিবেশের খোঁজে, গাছের ছায়ায়। অনেক প্রাণী আবার গরমে অসহ্য হয়ে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ছে। পিপাসায় কাতর হয়ে পানির সন্ধানে উড়ছে পাখির দল। এসব কারণে চিড়িয়াখানাসহ বিভিন্ন খামার মালিকদের নিতে হচ্ছে বাড়তি যত্ন।

শনিবার চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানায় দেখা যায়, বাঘ, সিংহ, ভালুক খাঁচার ভেতরে জলাধারে শরীর ডুবিয়ে রেখেছে। সিংহগুলো বারবার পানিতে ডুব দিয়ে খাঁচার ভেতরের অপেক্ষাকৃত ছায়াযুক্ত স্থানে দাঁড়িয়ে কাঁপছে। একইভাবে বাঘ দম্পতি তার সন্তানদের নিয়ে পানিতে ডুবে আছে।

চিড়িয়াখানার জলহস্তি দু’টি জলাধারে ডুবে আছে, মুখের সামনের অংশ উঁচু করে কিছুক্ষণ পরপর জোরে জোরে নিশ্বাস নিচ্ছে। একই অবস্থা ভালুক ও কুমিরেরও। হরিণের দল গাছের ছায়ায় জড়ো হয়ে আছে। পাখিগুলো পিপাসায় কাতর হয়ে পানি পান করছে। গুইসাপটি এদিক-ওদিক ছোটাছুটি করছে গরমে। বানর, মুখপোড়া হনুমান, মদনটাক, টিয়া পাখিগুলো নীরব হয়ে আছে। কোনো চঞ্চলতা নেই তাদের মাঝে।

সিভাসু হাসপাতালের পরিচালক এবং ফিজিওলজি ও ফার্মাকোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. এ কে এম সাইফুদ্দিন জানান, গত তিন দিনে চট্টগ্রাম মহানগরীর পাহাড়তলী এলাকায় কয়েকটি পোলট্রি ফার্মে শত শত মুরগির মৃত্যু হয়েছে। ঘটনা তদন্তে গিয়ে দেখা গেছে, সবগুলো মুরগিই হিটস্ট্রোকে মারা গেছে।

সাইফুদ্দিন বলেন, ফার্মের মালিক কিন্তু গরম থেকে মুরগিগুলোকে রক্ষায় কোনো ব্যবস্থা নেননি। ফার্মের মুরগিগুলো ১০৭ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত তাপমাত্রা সহ্য করতে পারে। এর বেশি হলে সেগুলো দুর্বল হতে শুরু করে এবং একপর্যায়ে মারা যায়।

এদিকে চট্টগ্রামের প্রধান আবহাওয়া কার্যালয়ের পূর্বাভাস কর্মকর্তা এম এইচ এম মোছাদ্দেক জানান, গত কয়েক দিনের মতো চট্টগ্রামে শনিবারও ৩৪ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে, যা স্বাভাবিকের চেয়ে ২ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি। আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, এই তাপপ্রবাহ অব্যাহত থাকতে পারে। আগামী পাঁচ দিনের আবহাওয়াতেও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই। তিনি বলেন, ‘তিন দিনের হিট অ্যালার্ট তথা তাপপ্রবাহের সতর্কতা জারি করেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। এই সময়ে ঘর থেকে তেমন বের না হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ফলে চট্টগ্রাম মহানগরীতে মানুষ ও যানবাহন চলাচল কমে গেছে। এতে নগরীর কিছুটা ফাঁকা হয়ে পড়েছে।’

চুয়াডাঙ্গায় ৪২ দশমিক ৩ ডিগ্রি, হিটস্ট্রোকে মৃত্যু ১ চুয়াডাঙ্গা থেকে স্টাফ রিপোর্টার রেজাউল করিম লিটন ও দামুড়হুদা প্রতিনিধি হাসমত আলী জানান, টানা পাঁচদিন ধরে চুয়াডাঙ্গার ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে মাঝারি থেকে তীব্র তাপপ্রবাহ। জেলায় হিট এলার্ট জারি করে মাইকিং করা হচ্ছে এক সপ্তাহ থেকে। এরই মাঝে শনিবার জেলার দামুড়হুদায় হিটস্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে জাকির হোসেন নামে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের এক দপ্তরি মারা গেছেন। সকাল ৭টার দিকে মাঠে কৃষিকাজ করতে গিয়ে তিনি হিটস্ট্রোকে আক্রান্ত হন। তার সঙ্গে কৃষিকাজ করা অন্য কৃষকরা তাকে উদ্ধার করে দামুড়হুদা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়ার পথে তিনি মারা যান।

নিহত জাকির হোসেন দামুড়হুদা উপজেলার দর্শনা থানার সীমান্তসংলগ্ন ঠাকুরপুর গ্রামের আমির হোসেন ছেলে ও ঠাকুরপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দপ্তরি।

নিহত জাকির হোসেনের পিতা আমির হোসেন জানান, রোদ গরমে মাঠের ধান মরার অবস্থা। ধানের জমিতে সেচ (পানি) দেওয়ার জন্য জাকির সকাল ৭টার দিকে মাঠে যায়। মাঠে যাওয়ার ঘণ্টা খানের পর খবর পাই ছেলে মাঠে স্ট্রোক করেছে। মাঠের অন্য কৃষকরা ছেলেকে দামুড়হুদা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়ার পথে সে মারা যায়।

এদিকে চুয়াডাঙ্গা প্রথম শ্রেণির আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের সিনিয়র পর্যবেক্ষক জামিনুর রহমান জানান, ‘শনিবার সকাল ৯টায় চুয়াডাঙ্গার তাপমাত্রা ছিল ৩৩ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এ সময় বাতাসের আর্দ্রতা ছিল ৫৮ শতাংশ এবং দুপুর ১২টায় তাপমাত্রা ওঠে ৪০ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। এ সময় বাতাসের আর্দ্রতা চিল ১৮ শতাংশ। বিকাল ৩টায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৪২ দশমিক ৩ ডিগ্রি।

চুয়াডাঙ্গার শিল্পনগরী দর্শনার হাজীপাড়ার বাসিন্দা ৮০ বছর বয়সি ইমাম হোসেন বলেন, ‘এই বয়সে চুয়াডাঙ্গা অঞ্চলে আমি এমন তাপমাত্রা কখনো দেখিনি। এতো গরম। আর সহ্য করা যাচ্ছে না।’

ভ্যানচালক শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘গায়ে আগুন ধরে যাওয়ার মতো অবস্থা। ভ্যান নিয়ে বের হতে পারছি না। এত তাপ। ভাড়া হচ্ছে না। আয় কমে গেছে। সংসারে টানাটানি চলছে।’

কৃষক আশকার আলী বলেন, ‘পেঁপে বাগান করেছিলাম দু’বিঘা জমিতে। প্রতিদিন পানি (সেচ) দিতে হচ্ছে। মাটি দিয়ে আগুনের মতো তাপ বের হচ্ছে।’

কৃষি সমৃদ্ধ চুয়াডাঙ্গা জেলায় তীব্র তাপদাহের কারণে কৃষিতে সংকট দেখা দিয়েছে। বোরো মওসুমে ধান কাটার সময় এসেছে। ধানকাটা শুরুও হয়েছে। তবে প্রচণ্ড রোদে মাঠে দাঁড়াতে পারছেন না কৃষক-মজুর। এ ছাড়াও কিছু এলাকায় ধানের ব্লাস্ট রোগ দেখা দিয়েছে। প্রচণ্ড খরায় আম-লিচুর গুটি ঝরে যাচ্ছে। সব ফসলে সেচ দিতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে।

চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার মাখালডাঙ্গা ইউনিয়নের কৃষক আজিবর রহমান বলেন, ‘তীব্র তাপপ্রবাহে ধানের জমি শুকিয়ে ফাটল দেখা দিয়েছে। ধানগাছও কড়া রোদে শুকিয়ে যাচ্ছে। জমিতে পানি ধরে রাখতে প্রতিদিনই শ্যালো মেশিন দিয়ে সেচ দিতে হচ্ছে। এতে আমাদের মোটা অঙ্কের টাকা গুনতে হচ্ছে। মনে হচ্ছে, এ বছর লোকসানের মুখে পড়তে হবে।’

শহরের একটি বহুতল ভবনের নির্মাণকাজ করছিলেন কিছু শ্রমিক। এদের মধ্যে সাইফুল আলম নামের এক রাজমিস্ত্রি বলেন, ‘এই কড়া রোদের মধ্যে পাঁচতলা ভবনের ওপরে কাজ করছি। মনে হচ্ছে, সূর্য একেবারে মাথার ওপরে। প্রচণ্ড গরম লাগছে।’

জীবননগর উপজেলার পোলট্রি খামারি আব্দুস সালাম বলেন, ‘এই গরমে প্রতিদিনই হিটস্ট্রোকে মুরগি মারা যাচ্ছে। সবসময় ফ্যান চালু করে রেখেও তেমন ভালো ফল পাওয়া যাচ্ছে না। এ রকম অবস্থা চলতে থাকলে আর্থিকভাবে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হতে হবে।’ অন্যদিকে তীব্র গরম থেকে নিম্নআয়ের সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দিতে জেলার বিভিন্ন স্থানে বিনামূল্যে ঠান্ডা পানি, খাবার স্যালাইন বিতরণ করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।

পাবনায় ৪১ দশমিক ৬ ডিগ্রি, একজনের মৃত্যু

পাবনা প্রতিনিধি আরিফ আহমেদ সিদ্দিকী জানান, তীব্র থেকে তীব্র দাবদাহ পুড়ছে গোটা পাবনা জেলা। অসহনীয় গরমে অতিষ্ঠ জেলার জনজীবন। একদিকে তীব্র তাপদাহ অন্যদিকে চলতি মৌসুমের জেলার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪১ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড হয়েছে ঈশ্বরদীতে। শনিবার সুকুমার দাস (৬০) নামে একব্যক্তি হিটস্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন।

দুপুরে পাবনা শহরের রূপকথা রোডে একটি চায়ের দোকানে চা খাওয়ার সময় হিটস্ট্রোকে আক্রান্ত হন সুকুমার দাম। আশপাশের লোকজন তাকে উদ্ধার করে পাবনা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। তিনি শহরের শালগাড়িয়া জাকিরের মোড়ের বাসিন্দা।

এদিকে তীব্র গরমে মানুষের হাঁসফাঁস অবস্থা। তীব্র এই তাপপ্রবাহে সব থেকে বেশি কষ্টে আছেন শ্রমজীবী মানুষ। জীবন-জীবিকার তাগিদে তীব্র রোদে কাজ করতে হচ্ছে খেটে খাওয়া মানুষদের। বাইরে বের হওয়ার সময় অনেকেই ছাতা নিয়ে বের হচ্ছেন। ঈশ্বরদী আবহাওয়া অফিসের সহকারী পর্যবেক্ষক নাজমুল হক রঞ্জন বলেন, ‘কয়েক দিন ধরেই পাবনায় ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপর তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। শনিবার রেকর্ড করা হয়েছে ৪১ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এর আগে, এ বছর এত তাপমাত্রা রেকর্ড হয়নি। ঈশ্বরদীসহ আশপাশের এলাকাজুড়ে তীব্র তাপপ্রবাহ বইছে। এ তাপমাত্রা আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।’

যশোরে সর্বোচ্চ ৪২ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস যশোর থেকে স্টাফ রিপোর্টার মিলন রহমান জানান, শনিবার যশোরে দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪২ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে। বেলা ৩টায় যশোর বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান বিমান ঘাঁটির আবহাওয়া দপ্তর এ তাপমাত্রা রেকর্ড করেছে। প্রায় এক সপ্তাহ ধরেই খুলনা বিভাগের ওপর দিয়ে তীব্র তাপদাহ বয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে এ বিভাগের যশোর ও চুয়াডাঙ্গায় এ মৌসুমের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা বিরাজ করছে। প্রতিদিনই তাপমাত্রা এক ডিগ্রি করে বাড়ছে। তিনদিন আগে ১৮ এপ্রিল যশোর ও চুয়াডাঙ্গায় দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়। এ দিন তাপমাত্রা ছিল ৪০ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এর আগে ১৯ এপ্রিল যশোরে তাপমাত্রা বেড়ে দাঁড়ায় ৪১ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এদিন চুয়াডাঙ্গায় তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৪১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। শনিবার যশোরে তাপমাত্রা আরও বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪২ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। আর চুয়াডাঙ্গায় দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৪২ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

এদিকে প্রচণ্ড গরমে নাকাল হয়ে পড়েছে যশোরের জনজীবন। শ্রমজীবী মানুষ রয়েছেন চরম ভোগান্তিতে। প্রচণ্ড গরমে গলে গেছে শহরের বেশ কয়েকটি পিচঢালা সড়কের পিচ। এরই মধ্যে প্রখর রোদ উপেক্ষা করেই যাত্রী বয়ে নিয়ে যাচ্ছেন রিকশাচালকরা। সূর্যের তাপ এতই বেশি যে, খোলা আকাশের নিচে হাঁটলেও গরম বাতাস লাগছে চোখে-মুখে। যাত্রাপথে ছাতা মাথায় দিয়ে তাপ থেকে চেষ্টা করছেন অনেকেই। স্বস্তি পেতে শ্রমজীবী মানুষ রাস্তার পাশে জিরিয়ে নিচ্ছেন, আবার কেউ কেউ হাতে মুখে পানি দিয়ে ঠান্ডা হওয়ার চেষ্টা করছেন। আর শিশু-কিশোররা গরম থেকে রেহাই পেতে মাতছে জলকেলিতে।

রিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন শওকত আলী। তিনি বলেন, তীব্র গরমের কারণে রিকশা চালাতে কষ্ট হচ্ছে। এত গরম যে মাথার মধ্যে ঘুরিয়ে উঠছে। কিন্তু ভাড়া না মারলে তো সংসার চলবে না। যশোর শহরের রিকশাচালক মফিজুর রহমান বলেন, ‘মানুষ বাইরে কম বের হচ্ছে। যারা বাইরে আসছে গরমের সঙ্গে তাদেরও মেজাজ গরম থাকছে। মানুষের সঙ্গে ভালো করে কথা বলা যাচ্ছে না। এদিকে গরমে পরিবহণে চলাচল করা যাত্রীরাও নিদারুণ কষ্টে যাতায়াত করছেন।’

শহরের শংকরপুর এলাকার বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘বাসার ছাদের পানির রিজার্ভ ট্যাংকের পানি অনেক গরম হয়ে যায়। দুপুর ১২টা থেকে বিকাল পর্যন্ত পানিতে হাত দেওয়া যায় না।’ শহরে শরবত বিক্রেতা কালাম হোসেন জানান, গরম বাড়ায় তাদের শরবত বিক্রি বেড়েছে। মানুষ পিপাসা মেটাতে ও একটু স্বস্তি নিতে ঠান্ডা লেবুর শরবত পান করছেন। আবহাওয়া দপ্তর জানিয়েছে এ তাপদাহ আরও কিছুদিন বিরাজ করবে। বাতাসে জলীয়বাষ্পের পরিমাণ বেশি হওয়ায় অস্বস্তি বাড়বে।

গ্রিন ওয়ার্ল্ড এনভাইরনমেন্ট ফাউন্ডেশন যশোরের নির্বাহী পরিচালক আশিক মাহমুদ সবুজ বলেন, ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার এত বেড়েছে যশোরে। পুকুর জলাশয় ভরাট, অপরিকল্পিতভাবে গভীর ও অগভীর নককূপ স্থাপনের কারণে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। তাই দ্রুত জলাধর সংরক্ষণ বাস্তবায়ন আইন পাস না করলে ভবিষ্যতে পানির সংকট আরও তীব্র আকার ধারণ করবে।

যশোর জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশল জাহিদ পারভেজ বলেন, ‘গত কয়েক বছর ধরে ওয়াটার টেবিলের লেয়ার নিম্নমুখী। ওয়াটার লেভেল নেমে যাওয়ার কারণে সুপেয় পানির যাতে সংকট না হয় সে জন্য উপজেলা পর্যায়ে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর সাবমারসিবলের পানি সরবরাহ নিশ্চিত রাখার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’

যাযাদি/ এস

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
X
Nagad

উপরে