রোববার, ২৯ জানুয়ারি ২০২৩, ১৪ মাঘ ১৪২৯

বৈশ্বিক খাদ্যসংকট মোকাবেলায় বাংলাদেশের কৃষি 

কামরুল হাসান কামু
  ০১ নভেম্বর ২০২২, ১৯:১৫
আপডেট  : ০১ নভেম্বর ২০২২, ১৯:৫০

স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে নানা ঘাতপ্রতিঘাত পেরিয়ে বাংলাদেশের কৃষি বিশ্বের বুকে বীরদর্পে এগিয়ে যাচ্ছে। প্রায় ১৭ কোটি মানুষের খাদ্যের যোগান দিতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে বাংলাদেশের কৃষি বিভাগ। করোনাকালে বিশ্বের বাঘা বাঘা রাষ্ট্র যখন অর্থনৈতিক ভগ্ন দশায় নিমজ্জিত ছিলো সেসময়ও বাংলাদেশের মানুষের কাছে আশার প্রদীপ হয়ে শিয়রে জ্বলেছে বাংলাদেশের কৃষি।

করোনার এমন ছোবল থেকে স্বাভাবিক হতে না হতেই শুরু হয়েছে বিশ্ব মোড়লদের তান্ডবলীলা যার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বিশ্বের অনেক দেশের ওপর। বিভিন্ন তথ্যসূত্র বলছে ২০২৩ সালের দিকে বিশ্ব দেখবে আরো একটি মন্দা দশা। অর্থনীতির ভাষায় পরপর দুই প্রান্তিকে অর্থনীতি সঙ্কুচিত হলে তাকেই মন্দা বলা হয়।

বিশ্বের পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্রে পরপর দুই প্রান্তিকেই অর্থনীতি সঙ্কুচিত হয়েছে, হয়তো মন্দার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসতে পারে। জার্মানির ডয়চে ব্যাংকের অর্থনীতিবিদদের মতে ২০২৩ সালের মধ্যবর্তী সময়ে মন্দা দেখা দিতে পারে। ব্লুমবার্গের অর্থনৈতিক মডেল অনুসারে ২০২৪ সালে মন্দা পরিলক্ষিত হওয়ার শতভাগ শঙ্কা রয়েছে। সত্যিই যদি বিশ্বে এমন অর্থনৈতিক মন্দা ও খাদ্যসংকট আবির্ভূত হয় তবে সেটি মোকাবেলার জন্যে বাংলাদেশকে এখন থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে নতুবা জনমনে নেমে আসবে দুঃসহ সময়। যদিও ২০০৭-২০০৮ সালের দিকে সংঘটিত বৈশ্বিক মন্দায় বাংলাদেশের কিছুই হয়নি। 

বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দায় মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পায় যার ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম  আকাশচুম্বী হয়। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বস্ত্রশিল্প ও কৃষি খাত, রেমিট্যান্স অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই খাতগুলো বিশ্লেষণ করলে খুব সহজে উপলব্ধি করা যাবে কঠিন সময়ে আমাদের কী ধরনের পদক্ষেপ নিতে হবে। বাংলাদেশের রেডিমেড গার্মেন্টস এর প্রধান বাজার ইউরোপ, আমেরিকা।

ইউরোপ মহাদেশে চলমান রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং করোনা পরবর্তী সময়ে অর্থনৈতিক অবস্থা দুর্বল হওয়ার ফলে সেখানকার মানুষ উচ্চাভিলাষী জীবন ছেড়ে বাঁচার যুদ্ধে লড়াই করে যাচ্ছে। যদি অর্থনৈতিক মন্দা সত্যিই সংঘটিত হয় তবে ইউরোপে আমাদের রেডিমেড গার্মেন্টসের বাজার সংকুচিত হয়ে যাবে। অপরদিকে রেমিট্যান্সের ওপরও প্রভাব পড়তে পারে কারণ অনেকেই চাকুরী হারাতে পারে কিংবা তাদের আয় উপার্জন কমে যেতে পারে। তবে এটা স্পষ্ট যে করোনাকাল এবং ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের কারণে বিশ্বে বাণিজ্যিক সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে যার সবচেয়ে খারাপ প্রভাব পড়েছে কৃষি নির্ভর দেশগুলোর ওপর।

বিশ্বে কৃষি উপকরণ গুলোর মূল্যের লাগামহীন উর্ধগতির কারণে ভুক্তভোগী হচ্ছে তৃতীয় বিশ্বের কৃষি নির্ভর দেশগুলো। বাংলাদেশকে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ কৃষি উপকরণ বিশেষ করে সার বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। ইউক্রেন-রাশিয়ার মধ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে গত বছরের তুলনায় এ বছর সার আমাদানির জন্য প্রায় ৪ গুন বেশি পরিমাণ ভর্তুকি দিতে হয়েছে। বৈশ্বিক পরিস্থিতি খারাপ হলে হয়তো সামনের দিনগুলো আমাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়বে এটা সহজে অনুমেয়। যেহেতু বিপুল জনগোষ্ঠীর এইদেশে খাদ্যপণ্য আমদানি করে চাহিদা মেটানো কঠিন, হয়তো আমাদের সেই সক্ষমতা এখনো হয়নি। সুতরাং আমাদের কে উৎপাদন ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দিয়েই যে কোন কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হবে। আর এ জন্য এখন থেকেই কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে।

আগামী বাজেটে কৃষি খাতে বরাদ্দ বাড়াতে হবে। বিশেষ করে সার, বীজ, কীটনাশক, ডিজেল, বিদ্যুতের মতো গুরুত্বপূর্ণ উপখাতের ওপর যেনো কোন আঘাত না আসে সে বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে এখন থেকেই সচেতন অবস্থান নিতে হবে। কৃষি উপকরণ গুলো যদি কৃষকের হাতের নাগালে থাকে তবে কোন দুঃসময় আমাদের ছুঁয়ে যাবেনা। কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান গুলো নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

প্রতিকূল পরিস্থিতিতে টিকে থাকার জন্যে দরকার জলবায়ু অভিঘাত সহিষ্ণু জাত যা আমাদের কৃষি বিজ্ঞানীদের মাধ্যমে উদ্ভাবিত হচ্ছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাধ্যমে আধুনিক জাত ও প্রযুক্তি কৃষকের দোরগোড়ায় পৌঁছে যাচ্ছে সুতরাং সে বিষয়ে আমরা যথেষ্ট শক্ত অবস্থানে রয়েছি। যদি আগামীদিনে বিশ্বে খাদ্য ঝুঁকির সৃষ্টি হয় এবং বাংলাদেশের কৃষি যদি তার শক্ত অবস্থান ধরে রাখতে পারে তবে নিঃসন্দেহে কৃষিপণ্য রপ্তানির এক বিপুল সম্ভাবনার দ্বার খুলে যাবে। 

তবে আমাদের সামনে কৃষিক্ষেত্রে কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বিশেষ করে প্রতিবছর প্রায় ১% হারে কৃষি জমি অকৃষি খাতে চলে যাচ্ছে অপরদিকে ১.২২% হারে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে যা খুব ভাববার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এছাড়া ভূ-গর্ভস্থ পানির প্রাপ্যতাও কমে যাচ্ছে। সুতরাং এইসব বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে হবে। নতুবা একদিন আমাদেরকে চরমমূল্য দিতে হবে। ইতোমধ্যে সরকার স্মার্ট কৃষির ওপর গুরুত্বারোপ করেছে যা খুবই আশাব্যঞ্জক। তবে কৃষি জমি রক্ষার বিষয়ে জোড়ালোভাবে আইনি পদক্ষেপ প্রয়োজন। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে বাসস্থান তৈরির জন্য প্রচুর পরিমাণ কৃষি জমি কমে যাচ্ছে সেক্ষেত্রে যদি বহুতল ভবনের দিকে যাওয়া যায় তবে কৃষিজমি রক্ষা করা যাবে। এজন্য প্রয়োজনমাফিক সাধারণ মানুষের মাঝে গৃহঋণ সহজলভ্য করা যেতে পারে। 

বৈশ্বিক পরিস্থিতি যেমন-ই হউক সচেতনতার সাথে বাংলাদেশ সেটা মোকাবেলা করতে পারবে। তবে মনেপ্রাণে আশা রাখি বিশ্ব যেন এমন কোন কঠিন পরিস্থিতির দিকে না যায়। এক ইঞ্চি জমিও পতিত না রেখে কৃষি উপকরণ গুলোর সক্ষমতা নিয়ে সুন্দর ভবিষ্যতের প্রত্যাশা রাখছি।

লেখক: কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা, ফুলপুর, ময়মনসিংহ 

যাযাদি/মনিরুল

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

উপরে