logo
রোববার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২০ ৪ আশ্বিন ১৪২৭

  ড. অরুণ কুমার গোস্বামী   ২৩ মে ২০২০, ০০:০০  

ঈদ আনন্দ : সেই কাল ও করোনাকাল

মাসব্যাপী রমজানের সিয়াম সাধনা শেষে খুশির বার্তা নিয়ে আসে ঈদুল ফিতর। ঈদ মানে আনন্দ; কিন্তু এবারের ঈদ এমন এক সময় এসেছে যখন সমগ্র বিশ্ব করোনায় আক্রান্ত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এমন মহাদুর্যোগ আর কখনোই আসেনি। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধকল্পে রমজানের অনেক আগে থেকেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো, অফিস-আদালত, শিল্প কল-কারখানা, শপিংমল, কাঁচাবাজার, হাট-বাজার, যানবাহন, সবকিছু বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সামাজিক দূরত্ব, কোয়ারেন্টিন, হোম কোয়ারেন্টিন, প্রতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিন, আইসোলেশন, লকডাউন, প্রভৃতি এখন অতি পরিচিত শব্দমালা হিসেবে আমাদের মনে ঠাঁই করে নিয়েছে। অর্থনীতির চাকা সচল রাখার স্বার্থে কিছু কিছু ক্ষেত্রে অবশ্য ইতোমধ্যে কর্মচাঞ্চল্য শুরু হয়েছে।

আনন্দ-বেদনা হাসি-কান্নার সমষ্টি আমাদের এই মানবজীবন। ঈদ মানে আনন্দ। এই জীবনে ঈদ অতীতে এসেছে বর্তমান সময়েও পবিত্র ঈদ সমাসীন। সেই কালের ঈদ, আর এই করোনাকালের ঈদের মধ্যে ব্যবধান বিস্তর। সেই কাল মানে যখন স্কুল এবং কলেজের ছাত্রাবস্থায় মায়ের আদরে, পিতার শাসনে, বন্ধুদের সঙ্গে আনন্দ-ফুর্তিতে সময় কাটাতাম, তখনকার কথা বলছি। প্রকৃতপক্ষেই তখন 'ধর্ম যার যার উৎসব সবার' জেনেছি। তখন অবশ্য বাক্যবিন্যাস এভাবে হয়নি। কিন্তু আমাদের সেই সময়ে বাস্তব পরিস্থিতি ছিল তাই। সেই কালে আমরা সব বন্ধু মিলে গ্রামের স্ু্কলের অফিস-কাম-লাইব্রেরির দালানের ছাদে বসেই ঈদের চাঁদ দেখতাম। ছাদে ওঠার কোনো সিঁড়ি ছিল না। ছাদ থেকে বৃষ্টির জল নিষ্কাশনের যে পাইপ ছিল সেই পাইপ বেয়ে উপরে উঠতে হতো। খুব কষ্টের এবং ঝুঁকিপূর্ণ হলেও খুব মজার ছিল! স্কুলটির নাম খালিয়া রাজারাম ইনস্টিটিউশন। বর্তমান মাদারীপুর জেলার রাজৈর উপজেলায় অবস্থিত। এই স্কুলে তখন একটিই পাকা দালান ছিল। অবশিষ্ট সব শ্রেণিকক্ষ প্রভৃতি ঘরগুলো ছিল টিনের তৈরি। আমাদের ছাত্রত্বের শেষের দিকে সায়েন্স ল্যাবরেটরির জন্য একটি দালান নির্মাণ করা হয়েছিল। তবে এখন তো এই স্কুলের সব ভবনই পাকা। স্কুলের প্রবেশ পথেই এখন শক্ত লোহার গেট। যা হোক, বলছিলাম সেই কালের কথা! সেই কালে স্কুলের সামনে টল টলে জলের বিরাট দীঘি, আর পিছনে বড় একটা খেলার মাঠ। এ দুটো এখনো আছে। স্কুলে আমাদের ক্লাসে কোনো মেয়ে পড়ত না। এই কাল অর্থাৎ বর্তমানের করোনাকালে 'সময় ও ক্ষেত্র' দুটোই সম্পূর্ণ ভিন্ন। আমরা এখন গৃহবন্দি জীবনযাপন করছি। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা হয়ে উঠেছে স্বাস্থ্য সুরক্ষার অন্যতম বিধি।

মাসব্যাপী রমজানের সিয়াম সাধনা শেষে খুশির বার্তা নিয়ে আসে ঈদুল ফিতর। ঈদ মানে আনন্দ; কিন্তু এবারের ঈদ এমন এক সময় এসেছে যখন সমগ্র বিশ্ব করোনায় আক্রান্ত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এমন মহাদুর্যোগ আর কখনোই আসেনি। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধকল্পে রমজানের অনেক আগে থেকেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো, অফিস-আদালত, শিল্প কল-কারখানা, শপিংমল, কাঁচাবাজার, হাট-বাজার, যানবাহন, সবকিছু বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সামাজিক দূরত্ব, কোয়ারেন্টিন, হোম কোয়ারেন্টিন, প্রতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিন, আইসোলেশন, লকডাউন, প্রভৃতি এখন অতি পরিচিত শব্দমালা হিসেবে আমাদের মনে ঠাঁই করে নিয়েছে। অর্থনীতির চাকা সচল রাখার স্বার্থে কিছু কিছু ক্ষেত্রে অবশ্য ইতোমধ্যে কর্মচাঞ্চল্য শুরু হয়েছে।

\হকিন্তু স্বাস্থ্য সুরক্ষার যেসব বিধিমালা জারি করা হয়েছে সেগুলো মেনে চলার তাগিদ আরও বেশি করে প্রচার করা হচ্ছে। ঈদের কেনাকাটার জন্য প্রায় ক্ষেত্রেই নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হচ্ছে। জনসমাগম না করার জন্য আহ্বান জানানো হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে ঈদ আনন্দে মেতে ওঠার সেই সব দিনগুলোর স্মৃতি স্বপ্নের মতো মানসপটে ভেসে উঠছে! মনে হয় এই তো সেদিন, অথচ সবই এখন স্মৃতি! কোথায় হারিয়ে গেল সেই সোনালি শৈশব, কৈশোর এবং যৌবনের শুরুর দিনগুলো! সেই সময়গুলো ছিল জীবনের বা বয়সের দেড় থেকে দুই বা সোয়া দুই দশকের মধ্যে! আর এখন ছয় দশক পেরিয়ে জীবনের সাত দশকে পদার্পণ করেছি। জীবনের এই পর্যায়ে দাঁড়িয়ে সেই সব মধুর স্মৃতিগুলো মনের অলিন্দে ভেসে উঠছে! মানবজীবন এমনই পরিবর্তনশীল! প্রাক-সক্রেটিক যুগের গ্রিক দার্শনিক হেরাক্লিতস যেমনটি বলেছেন, 'কোনো মানুষই এক নদীতে দুইবার অবগাহন করতে পারে না, কারণ সেটি আর একই নদী থাকে না এবং সেও আর একই মানুষ থাকে না।' পরিবর্তনের এমন পথরেখা অনুসরণ করেই মানুষের প্রাণস্পন্দন এবং জীবনস্রোত আবহমানকাল ধরে চলছে। স্কুলের গন্ডি পেরিয়ে কলেজে ভর্তি হওয়ার সময় হলো। তখন সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশ। পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখ সমরে শাহাদতবরণকারী মাদারীপুর জেলার রাজৈর থানার তিন বীর মুক্তিযোদ্ধার নামে প্রতিষ্ঠিত কলেজেই বাবা আমাকে ভর্তি করিয়ে দিয়েছিলেন। আর্থিক সামর্থ্য কম থাকলেও, আমার অন্য বন্ধুদের তুলনায় আমাদের কিছুটা হলেও সচ্ছলতা ছিল। তাই প্রতিষ্ঠিত যে কোনো কলেজ ভর্তি করাতে পারতেন। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধে শহিদদের স্মৃতির প্রতি আন্তরিকতার কারণেই বাবা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কলেজের নাম ছিল শহীদ মানিক বিজয় সাঈদুর কলেজ। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর নির্মম হত্যাকান্ডের পর এই নামের পরিবর্তন হয়েছে। এটি এখন সরকারি রাজৈর কলেজ।

আমাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক অভিভাবক মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম দুই সংগঠক সরদার সাজাহান ও হারুন মোলস্না দুজনই অনেক আগেই পরপারে পাড়ি দিয়েছেন। মান্না দে যেমন কফি হাউসের আড্ডার স্মৃতিচারণমূলক গান দিয়ে বাংলাভাষী শ্রেম্নাতাদের নস্টালজিক করে দেন, আমি শিল্পী নই, তথাপিও সেই কালের কথা মনে করে আমিও স্মৃতিকাতর হই! স্মৃতিতে জ্বল জ্বল করে ওঠা যে নামগুলো ছবির মতো ভেসে উঠছে তাদের মধ্যে নুরু এখন হাইকোর্টের উকিল, আহম্মদ পুলিশ সদর দপ্তরে চাকরিরত অবস্থায় মৃতু্যবরণ করেছে অনেক আগে, কুদ্দুছ শিক্ষকতা থেকে অবসর নিয়েছে, চুন্নুও পরলোকগমন করেছে, মুসা, আলী, শ্যামল, বাবলু সবাই সংসারজীবন চালিয়ে যাচ্ছে। আর কে যে কোথায় আছে, জীবিত আছে না মৃতু্যবরণ করেছে, কিছুই জানি না!

সেই কালে ঈদের চাঁদ দেখার আনন্দ প্রকাশার্থে কোনো কোনো সময় দু'একটা বাজি ফুটানো হতো। আমাদের গ্রামের বাজারের ভোলা আর নিমাই ঈদ এবং বিভিন্ন পূজা উপলক্ষে কাঠিওয়ালা বাজি আনত। ভোলা আর নিমাই দুই ভাই। ভোলা বড় আর নিমাই ছোট। এই দুই ভাইয়ের দুটি মুদি দোকান পাশাপাশি। এখান থেকেই বাজি কিনে আনত কেউ কেউ। এই কাঠিওয়ালা বাজি ছিল আবার দুই ধরনের। অপেক্ষাকৃত ছোটটা এক আনা, আর বড়টা দুই আনা। সেই সময় আমরা বন্ধু ও খেলার সাথীরা যারা একসঙ্গে মিশতাম, তাদের সবাই পড়ুয়া, কেউ স্কুলে কেউবা কলেজে। আবার তখনকার দিনে আমাদের পরিবারগুলোর আর্থিক অবস্থাও খুব একটা সচ্ছল ছিল না। কৃষিই ছিল জীবন-জীবিকার একমাত্র অবলম্বন। সবার বাবা, কারও ক্ষেত্রে বড় ভাই এমনকি মা নিজ নিজ জমি-জায়গা চাষাবাদ ও দেখাশোনা করতেন। এদের মধ্যে আমার বাবাই একমাত্র সরকারি চাকরি করতেন। একাত্তরে বঙ্গবন্ধুর অসহযোগ আন্দোলনের ডাকে তিনি পাকিস্তানের সরকারি চাকরি থেকে অনুপস্থিত থাকতেন। সেই সময়ের ফরিদপুর জেলা প্রশাসন থেকে কর্মস্থলে যোগ দেওয়ার জন্য জরুরি নোটিশ দেওয়া সত্ত্বেও তিনি বঙ্গবন্ধুর আহ্বানের প্রতি অবিচল থেকে কর্মস্থলে যোগদান থেকে বিরত থেকেছেন। একাত্তরের এপ্রিলে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার গঠিত হওয়ার পর তিনি সেই সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন। মুক্তিযুদ্ধের পুরোটা সময়ই তিনি মুজিবনগর সরকারের কর্মচারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। দেশ শত্রম্নমুক্ত হওয়ার পর তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের সরকারের চাকরিতে যোগদান করেন। বঙ্গবন্ধু প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে মুক্তিযুদ্ধে বাবার অবদানের স্বীকৃতি দিয়ে তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে একটি পত্র এবং সেই সঙ্গে আর্থিক সাহায্যের একটি চেক পাঠিয়েছিলেন। আমাদের কিছু জমি-জায়গাও ছিল। সেগুলো সব বর্গাচাষে দেওয়া হতো। সেই হিসেবে কিছুটা ভাগ্যবান হওয়া সত্ত্বেও আমাদের পরিবারেও অসচ্ছলতা ছিল। বাবার বদলির চাকরি হওয়া সত্ত্বেও তার চাকরিস্থলে না থেকে, মা এবং ভাই-বোনেরা গ্রামের বাড়িতেই থাকতাম। কারণ হলো আমার ঠাকুমা, বিবাহিতা ও স্বামী আর এক বিয়ে করায় এখানেই থাকা পিসিমা; আর ছিল বাবার একমাত্র বেকার ছোট ভাই অর্থাৎ আমাদের কাকা ও তার বিশাল পরিবারের সবাই। এদের সবার সাংসারিক খরচ ও জীবন-জীবিকার কথা ভেবেই বাবা আমাদের গ্রামের বাড়িতেই রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কিন্তু আমাদের সবার আর্থিক অসচ্ছলতা কিংবা ভিন্ন ধর্মাবলম্বী হওয়ার প্রভাবে ঈদের আনন্দ কখনো ম্স্নান হতো না। আনন্দের দিক দিয়ে সম্পদশালীদেরও ছাড়িয়ে যেত আমাদের সেই কালের ঈদ আনন্দ।

তখন রমজান মাসে ফুটবল খেলা তেমন একটা না হলেও প্রতিদিনই স্কুলের বিস্তৃর্ণ মাঠের এক কোণে ইফতার পার্টির জন্য আমরা বন্ধুরা সবাই সমবেত হতাম। নুরু, আলী, মুসা, ইলিয়াছ, কুদ্দুছ, আহমদ, বাবলু, শ্যামল, সালাম, আক্তার, সিদ্দিকসহ আরও অনেকে আসত। ইফতারের উপকরণের মধ্যে থাকত খেজুর, তালের রস, মুড়ি, পাকা কাঁঠাল, ফুট-বাঙ্গি, তরমুজ, গুড়, পেঁয়াজু, ছোলাভাজি প্রভৃতি।

পাশের শিশু হাসপাতাল থেকে আনা হতো বড় একটা গামলা আর কতগুলো গস্নাস। পানি এবং তালের রস প্রত্যেকে আলাদা গস্নাসে পান করলেও বাকি সব আহার্য বস্তু একসঙ্গে বড় গামলায় মাখিয়ে খাওয়া হতো। কম দামে আমাদের তালের রস সরবরাহ করত যে গাছি, আলম তার নাম, সে একটু খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটত, কিন্তু তালগাছে উঠতে এবং নামতে তার কোনো অসুবিধা হতে কখনো দেখিনি।

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার আগে আমাদের শৈশব ও কৈশোরকালে ঈদ আনন্দের বার্তা বয়ে আনত। দলবেঁধে পাড়া-প্রতিবেশী, খেলার সাথী ও শ্রেণি-সাথীদের বাড়িতে বেড়াতে যাওয়ার অপেক্ষায় থাকতাম। প্রায়ই, প্রতিবেশী মুসলিম বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরতে যাওয়ার জন্য 'পূজা' ছাড়াও 'ঈদের' জন্য নতুন পোশাক না হলেও, অন্তত পক্ষে ঈদ উপলক্ষে পুরাতন কাপড় সুন্দর করে ধুয়ে ইস্ত্রি করা পোশাক পরা হতো। আমাদের সময় স্কুলে যাওয়ার জন্য আলাদা কোনো পোশাক বা ইউনিফর্ম ছিল না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ইংলিশ হাফ প্যান্ট, হাফ শার্ট পরে স্কুলে যেতাম, এই পোশাক কখনো ইস্ত্রিও করা হতো না, শুধু ধুয়ে দেওয়া হতো। কেবল ঈদ উপলক্ষে মা বিশেষভাবে কাপড় ধুয়ে দিত। বাড়িতে ইস্ত্রির ব্যবস্থা ছিল না। তখন তো এতসব বৈদু্যতিক ইস্ত্রিও ছিল না। বাড়ির পাশে ছিল ঘাগড় ধুবির বাড়ি, আমরা কাকা বলে ডাকতাম। তিনি বাড়িতেই কাপড় ধোয়া ও ইস্ত্রি করার কাজ করতেন। ঘাগড় কাকার দুটো ইস্ত্রি ছিল। একটা স্টোভের ওপর অথবা কয়লার চুলায় বসিয়ে উত্তপ্ত করা হতো। আর একটা লোহার তৈরি হাতলযুক্ত বাক্স টাইপের। হাতলের সঙ্গে একটা আংটা দিয়ে আটকানো হতো। ওই বাক্সের মধ্যে থাকত জ্বলন্ত কয়লা। আর তাতেই ইস্ত্রি উত্তপ্ত হতো।

ঈদের দিন দলবেঁধে বাড়ি বাড়ি ঘুরতে ঘুরতে দলের মধ্য থেকে কেউ কেউ ঈদের দিন এক বাড়িতে বেশি না খাওয়ার উপদেশ দিত। কারণ, অনেক বাড়িতে যাওয়ার আছে তাই প্রত্যেক বাড়িতে অল্প অল্প খেতে হবে! এখন আর সেই দলবেঁধে ঈদোৎসব পালন করা হয় না। করোনকালের ঈদেও এবার কোথাও যাওয়া হবে না! এখন যেহেতু ডিজিটাল যুগ তাই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক, ই-মেইল, মোবাইল ফোনে এসএমএস বা কখনো মোবাইলে কথা বলা এভাবেই পালিত হবে এবারের ঈদ! কিছু কিছু ক্ষেত্রে হয়তো ব্যতিক্রমও থাকবে!

এভাবে ঈদ আনন্দের সেই কালের স্মৃতি আর করোনাকালের বাস্তবতা মেলানোর প্রচেষ্টা আনন্দ-বেদনা, হাসি-কান্নার যুগপৎ উপস্থিতি সম্পর্কে দার্শনিক ব্যাখ্যার সামনে আমাদের এগিয়ে নেয়। আমাদের নিজেদের এবং বিশ্বে কীভাবে সব জিনিস অবস্থান করছে, সেগুলো বিবেচনা করলে যে বড় প্রশ্নটির মুখোমুখি আমরা হয়ে থাকি তাহলো আমাদের কী কাঁদা উচিত না আমাদের হাসা উচিত এই বিষয়ের উপর দর্শন ইতিহাসের খুব আকর্ষণীয় যুক্তিসমৃদ্ধ ব্যাখ্যা আছে। প্রাচীন গ্রিস দেশের মহত্তম দুজন চিন্তাবিদ দেমোক্রিতস (৪৬০ খ্রি. পূর্ব--৩৭০ খ্রি. পূর্ব) এবং হেরাক্লিতস (খ্রি. পূর্ব ৫৩৫--খ্রি. পূর্ব ৪৭৫) এ সম্পর্কে তাদের সুচিন্তিত ও গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন। মানুষ এবং বিশ্বপরিমন্ডল সম্পর্কে এই দুজনই খুব গভীর জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন। তবে, দুজন সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে তাদের স্ব স্ব ব্যাখ্যা ও যুক্তি উপস্থাপন করেছেন। হেরাক্লিতসকে বলা হয় কাঁদুনে দার্শনিক (ক্রাইং ফিলোসোফার)। বলা হয়, হেরাক্লিতস না কেঁদে পারেননি। আমরা যদি অস্তিত্বের বাস্তবতার দিকে পরিপূর্ণভাবে লক্ষ্য করি তাহলে, আমরা খুব সহজেই দেখতে পাব যে দুঃখ পাওয়ার মতো কত কিছুই না এ বিশ্বে আছে। হেরাক্লিতসের মতে মানবরূপী জন্তুরা সব অজ্ঞানতিমিরে আচ্ছন্ন, প্রতারিত, অনিয়ন্ত্রিত দানব। যারা নীচতা এবং দুর্ভোগের জন্য যথাযথভাবে মানানসই। এমনই যদি পরিস্থিতি হয়ে থাকে তাহলে, প্রশ্ন হচ্ছে- মানুষ কখনো কী হাসবে না যদি হাসে তাহলে কীভাবে এবং কেন হাসবে অবশ্য আহাম্মকের হাসি, ভাবপ্রবণ, নির্মম, বিরক্তিকর, রসকসহীন পস্নাস্টিক হাসি সব সময়েই আছে। তবে এটি কিন্তু দার্শনিক দেমোক্রিতসের পথ নয়, তিনি হেসেছেন জমকালো এবং উদারভাবে। সুবিধাজনক অবস্থানে থাকার কারণে পরিস্থিতি কত খারাপ হতে পারে সে সম্পর্কে ভুল ধারণার কারণে কিন্তু তিনি হাসেননি। তার উত্তম কৌতুকরসবোধ ভ্রমাত্মক ছিল না বা এটি লক্ষ্যহীন কথার মারপঁ্যাচ ছিল না। বিশ্ব সম্পর্কে তার চিন্তার কারণে দেমোক্রিতস খুব নির্দিষ্ট ও অতি প্রশংসনীয় স্টাইলে হাসতেন। তিনি ছিলেন একজন প্রগাঢ় বাস্তববাদী! মানুষের লোভের প্রবণতা, খুন এবং প্রচন্ড যৌন-লালসা এবং অনবরত দুর্ঘটনা ও দুর্ভাগ্যের দিকে আমাদের প্রবণতা প্রভৃতি সম্পর্কে জানার যা কিছু আছে তার সবকিছুই দেমোক্রিতস জানতেন। অন্ধকার ও অজ্ঞতা সম্পর্কে তিনি এতটাই নিশ্চিত হয়েছিলেন এবং দুর্ভোগ ও ঝুঁকি সম্পর্কে তিনি এতটাই জানতেন যে তিনি কখনোই বিতৃষ্ণ মনোভাব উদ্রেকের কাছে হার মানেননি। অস্তিত্ব সম্পর্কে পুরোপুরি সুস্পষ্ট বাস্তব সত্য ঘটনা হিসেবে এগুলোকে তিনি জানতেন। এ সত্ত্বেও তিনি ফুর্তিতে থাকতেন! কারণ, চলার পথে আসা যে কোনো উত্তম, সুখকর অথবা আনন্দদায়ক পরিস্থিতিকে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে একটি প্রণোদনার অভিজ্ঞতা হিসেবে বিবেচনা করতেন। প্রথম দিকে যা ছিল নিরানন্দ তা পরে একটি খুশির বার্তায় পরিণত হয়। জীবনের অন্ধকার পটভূমির কথা মনে রেখে, যত বাধা-বিপত্তি যা কিছু আসত সেসবের বিরুদ্ধে তিনি আনন্দের রসাস্বাদন করতেন। দেমোক্রিতস আমোদ ফুর্তিতে মেতে থাকার শিল্পায়ত্ত করেছিলেন। তিনি লিখেছেন, অ ষরভব রিঃযড়ঁঃ ভবংঃরারঃু রং ধ ষড়হম ৎড়ধফ রিঃযড়ঁঃ ধহ রহহ 'অ্যা লাইফ উইদাউট ফেস্টিভিটি ইজ অ্যা রোড উইদাউট অ্যান ইন' অর্থাৎ উৎসব-আনন্দ ছাড়া জীবন হচ্ছে সরাইখানা, দীর্ঘ রাস্তা। 'জীবন দুঃখময়' এটি প্রমাণের জন্য স্থায়ীভাবে দুঃখিত হতে হবে, এই নীতিতে তিনি বিশ্বাসী ছিলেন না। নিরাশার মধ্যে আনন্দিত থাকার একজন অভিজ্ঞ ব্যবহারবিদ ছিলেন দেমোক্রিতস। এবারের করোনকালের ঈদের পবিত্র ক্ষণে সেই কালের ঈদ আনন্দের স্মৃতিচারণ 'দেমোক্রিতসের হাসি' আর 'হেরাক্লিতসের ক্রন্দন'-এর মিশ্র দার্শনিক রস আমাদের উপহার দেয়।

অধ্যাপক ড. অরুণ কুমার গোস্বামী: 'ইনস্টিটিউশনালাইজেশন অব ডেমোক্রেসি ইন বাংলাদেশ' গ্রন্থের লেখক এবং পরিচালক, সাউথ এশিয়ান স্টাডি সার্কেল, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সকল ফিচার

রঙ বেরঙ
উনিশ বিশ
জেজেডি ফ্রেন্ডস ফোরাম
নন্দিনী
আইন ও বিচার
ক্যাম্পাস
হাট্টি মা টিম টিম
তারার মেলা
সাহিত্য
সুস্বাস্থ্য
কৃষি ও সম্ভাবনা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
close

উপরে