অবৈধভাবে বিত্তশালী হওয়ার অসুস্থ প্রতিযোগিতা বন্ধ করতে হবে দেশের বৃহত্তর স্বার্থে

যাদের অসৎ অর্থ আছে তারাই এবং তাদের পরিবারই অপরাধ বেশি করে থাকে। তাই অফিস আদালতে ঘুষ নেয়া সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করতে হবে। রাষ্ট্র ভালোভাবেই জানে কারা ঘুষের চাকরি করে, কারা অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়ে। এগুলো কঠোর হস্তে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। কঠোর ভূমিকা পালন করতে হবে রাষ্ট্রকে।
অবৈধভাবে বিত্তশালী হওয়ার অসুস্থ প্রতিযোগিতা বন্ধ করতে হবে দেশের বৃহত্তর স্বার্থে

উচ্চবিত্তের সন্তানরা অবৈধ অর্থের গরমে এবং প্রভাবে বৈধ ও অবৈধ সব উপায়ে জীবনের সব ধরনের শারীরিক ও ইন্দ্রিয় তৃপ্তি ও মজা লুফে নিচ্ছে। মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তরা এগুলো থেকে বঞ্চিত। ফলে এক অসমতা বিরাজ করছে সমাজে। তাই, নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তরা সুযোগ পেলেই জীবনকে উপভোগের নানা কায়দা কানুন বের করে। সুযোগ পেলেই বেপরোয়া হয়ে ওঠে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেখা যায় মধ্যপ্রার্চের শেখরা অর্থবিত্তের তোড়ে জীবনের খেই হারিয়ে ফেলে। তারা তো জ্ঞানার্জন ছাড়া বাকি সব কাজই করে থাকে। জীবনকে উপভোগের জন্য বহু নারীসঙ্গ ভোগ করে। তারপরও খুঁজে খুঁজে বের করে আর কী করলে আর কীভাবে যৌনানন্দ বাড়ানো যায়, যৌন আনন্দ দীর্ঘায়িত করা যায়। তাই তারা দেশ ছেড়ে বিভিন্ন দেশে বিরল প্রজাতির পাখি শিকারে নেমে পড়ে। সেই পাখিদের মাংস ভক্ষণ করলে যৌনতা বেড়ে যায় বলে তাদের বিশ্বাস। কোথায় জ্ঞান, কোথায় বিজ্ঞান, কোথায় গবেষণা, কোথায় মানুষের শান্তি ও মুক্তি...... সব বাদ দিয়ে কীভাবে আরও যৌনতা বাড়ানো যায় সেদিকে তাদের খেয়াল। সে নিয়ে তাদের ধ্যান, জ্ঞান ও গবেষণা! মরুভূমির বুকে এক একজন শেখ অযথা কোনো কারণ ছাড়াই কোটি কোটি ডলার দিয়ে সব ধরনের সুবিধাসহ সুরম্য অট্টালিকা বানিয়ে রেখেছে। প্রকৃতিকে হাতের মুঠোয় বন্দি করে মুরুর বুকে গাছপালা লাগিয়ে জাগতিক স্বর্গ বানিয়ে রেখেছে। কোনো কারণ নেই। বছরে দুয়েকদিন সেখানে বেড়াতে যায়। এ ধরনের বহু স্বর্গ তাদের বিভিন্ন জায়গায় বানানো আছে, ব্যক্তি পর্যায়ে। অথচ চিকিৎসার অভাবে কত শিশু কষ্ট পাচ্ছে এই পৃথিবীর বহু দেশে। দুধের অভাবে, পুষ্টিকর খাদ্যের অভাবে কত শিশু মারা যাচ্ছে। সেদিন সাভারের সি আর পিতে গিয়ে দেখলাম কত বিচিত্র পৃথিবী! এক নারী এসেছেন সুদূর ঠাকুরগাঁও থেকে। দুটো ছেলেই শারীরিক প্রতিবন্ধী। একটি ছেলের জন্য বিশেষ চেয়ারের ব্যবস্থা করেছেন। দ্বিতীয় ছেলেটির জন্যও দরকার কিন্তু তার সাধ্য নেই। চিন্তায় অস্থির কীভাবে ম্যানেজ করবেন একটি হুইল চেয়ার। সঙ্গে সঙ্গে সমাজের, দেশের ও বিশ্বের এসব বেমামান চিত্রসমূহ চোখের সামনে ভেসে উঠল! এসব ধনী শেখরা এবং ধনী অন্যরা যদি বিশ্বের মানুষের কল্যাণ চাইতো তাহলে তো পৃথিবী এ রকম থাকতো না।

এসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখন এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। একদল যদিও তাদের সংখ্যা খুব বেশি নয় অবৈধ অর্থ দিয়ে জীবনকে উপভোগের সব ধরনের সামাজিক, অসামাজিক, বৈধ ও অবৈধ উপায় অবলন্বন করছে। এক অসম ও পাশ্চাত্য আদলের চিত্র মাঝে মাঝে ধরা পড়ে। যেমন ক'দিন আগে রাজধানীর উত্তরার 'ব্যাম্বু শট' নামে এক রেস্তোরাঁয় পার্টিতে অংশ নিয়েছিলেন পাঁচ শিক্ষার্থী। তাদের মধ্যে তিনজন ধানমন্ডির একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তেন। দু'জন আরেকটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন। এ ঘটনায় জড়িত তাদের আরেক বান্ধবী উত্তরার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েও পড়াশোন শেষ পর্যন্ত চালিয়ে যাননি। উত্তরার ওই পার্টিতে অংশ নেওয়া পাঁচ বন্ধুর মধ্যে দু'জনই মারা গেছেন। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, তাদের মৃতু্যর কারণ বিষাক্ত ও নকল মদ খাওয়া। ওই পার্টিতে অংশ নেওয়া চার শিক্ষার্থী এখন আইনের হেফাজতে আছেন। পার্টিতে অংশ নেওয়া পাঁচজনের মধ্যে চার তরুণ-তরুণী পরিবার-বিচ্ছিন্ন জীবনযাপন করে আসছিলেন। তাদের উচ্ছন্নে যাওয়ার অন্যতম কারণ মা-বাবার বিচ্ছিন্নতা। সন্তান কোথায় যাচ্ছেন, কার সঙ্গে মিশছেন আবার কখন কোথায় রাত কাটাচ্ছেন এসব খবর রাখতেন না মা-বাবা। এরই মধ্যে রিমান্ডে এনে তিন শিক্ষার্থীকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিশ। তাদের কাছ থেকেই এসব তথ্য পাওয়া গেছে। রিমান্ডে থাকা শিক্ষার্থীরা পুলিশকে বলছেন, পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ঢিলেঢালা বন্ধন ও মা-বাবার মধ্যে দূরত্ব এবং বিচ্ছিন্নতার ছাপ তাদের জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। প্রাচুর্য থাকলেও পারিবারিক অনুশাসন ও সন্তানদের প্রতি মা-বাবার স্বাভাবিক যে যত্ন সেটা থেকে বঞ্চিত ছিলেন সন্তানরা। এমন ঘটনায় জড়িয়ে সন্তান মারা যাওয়ার অনেক সময় পার হওয়ার পর পরিবার দুঃসহ সংবাদ পায়।

গত ৭ জানুয়ারি ধানমন্ডিতে ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের এক শিক্ষার্থী তার বন্ধুর বাসায় গিয়ে ধর্ষণের শিকার হয়ে মারা যান। ওই ঘটনায়ও হাসপাতালে যাওয়ার পর পরিবার জানতে পারে সন্তান কোথায় কার বাসায় গিয়েছিল। এবার মোহাম্মদপুরের ঘটনায় যে তিন শিক্ষার্থীকে পুলিশ রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে তারা হলেন- মর্তুজা রায়হান চৌধুরী, নুহাত আলম তাফসির ও ফারজানা জামান নেহা। এই তিন শিক্ষার্থীসহ মোট পাঁচজনের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন পার্টিতে অংশ নিয়ে মারা যাওয়া এক ছাত্রীর বাবা। মামলায় তিনি অভিযোগ করেন, মদ পান করিয়ে ধর্ষণের পর তার মেয়েকে হত্যা করা হয়েছে। ওই মামলায় আরও দুই আসামি হলেন শাফায়াত জামিল বিশাল ও আরাফাত। সর্বশেষ নেহা উত্তরার একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েও পড়াশুনা শেষ করেননি। বছরখানেক আগে এক লন্ডন প্রবাসীকে বিয়ে করেন নেহা। প্রায়ই নিয়মিত ঢাকায় বন্ধু ও পরিচিতজনদের সঙ্গে পার্টিতে অংশ নিয়ে আসছিলেন। ঢাকার প্রায় সব সিসাবারের পরিচিত মুখ তিনি। নেহার বন্ধু আরাফাতের বাবা একজন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা। আরাফাতের মা বেঁচে নেই। আরাফাত দেদার টাকার ওড়াতেন। তার ওপর পরিবারের তেমন নিয়ন্ত্রণ নেই।

আরেক আসামি তাফসিরের মা সরকারি একটি দপ্তরে চাকরি করেন, পোস্টিং ফরিদপুর। ঢাকায় মোহাম্মদিয়া হাউজিংয়ে তাদের বাসা। তাফসির একাই ওই বাসায় থাকেন। মাঝেমধ্যে মা ফরিদপুর থেকে এসে মেয়ের কাছে থাকতেন। বাবা অন্য জায়গায় বসবাস করেন। গত ২৮ জানুয়ারি উত্তরার পার্টিতে অংশ নেওয়ার পর অসুস্থবোধ করলে মর্তুজা রায়হান চৌধুরী তার বান্ধবীকে তাফসিরের বাসায় নিয়ে যান। পার্টিতে না গেলেও তাফসির তার খালি বাসায় বন্ধু-বান্ধবীকে আশ্রয় দিয়েছিলেন। সেখানে রায়হান ও তার বান্ধবী রাতযাপন করেন এবং শারীরিক সম্পর্ক করেন। বাসায় নেয়ার পর বমি করে এবং একটু সুস্থ বোধ করার পর তারা শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করেন। পরদিন ২৯ জানুয়ারি শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে ইবনে সিনা হাসাপাতলে নিয়ে যান, সেখানে ভর্তি না করায় আনোয়ার খান মর্ডাণ হাসাপাতলে ভর্তি করান, ৩১ জানুয়ারি ছাত্রীটি মারা যান। এখানে আসল বিষয়টি হচ্ছে এই দীর্ঘ সময় পরিবারের গন্ডির বাইরে থাকার পরও পরিবার বা আত্মীয়স্বজনদের কেউ কোনো খোঁজ খবর নেননি, কারণ তারা এ ধরনের জীবনযাপনে অভ্যস্ত। এ তো দেখছি পশ্চিমা সমজাকেও ছাড়িয়ে গেছে! ওসব দেশে ১৮ বছরের পর ছেলেমেয়েরা কে কি করেন বা না করেন সেসব নিয়ে বাবা-মা'র কোন দায়-দায়িত্ব, নিয়ন্ত্রণ কিছুই নেই। উৎকৃষ্ট পারিবারিক বন্ধনে আবদ্ধ আমাদের এই সমাজে প্রতিটি গৃহ একটি স্বর্গ। এই স্বর্গে সবার হয়তো উপচে পড়া অর্থ নেই, বিলাসিতার সুযোগ নেই কিন্তু বাবা-মা, ভাইবোন, আত্মীয়স্বজন মিলে এক স্বর্গীয় পরিবেশে ও আনন্দে বাস করেন। পশ্চিমারা এর মর্ম বুঝতে শুরু করেছে।

উত্তরার পার্টিতে অংশ নেওয়া সব শিক্ষার্থীর পরিবারে অর্থবিত্তের অভাব ছিল না ছিল হালকা কিংবা ঠুনকো পারিবারিক বন্ধন। সমাজের সঙ্গে পরিবারের দায় অনেক, তাদের এই উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপনে সম্পৃক্ত হওয়ার পেছনে। এই মামলায় গ্রেপ্তারকৃত ফারজানা জামান ওরফে ডিজে নেহা পুলিশের কাছে তার অন্ধকার জগতের অনেক তথ্য দিয়েছেন- যা আমাদের সমাজের সঙ্গে মানায় না, বেমানান। নব্য আধুনিকতার ছোঁয়া, নিজেদের অতিরিক্ত স্মার্ট ভাবা বা দেখানো, আত্মম্ভরিতা ও সমাজের অনেকের থেকেই আলাদা দেখানোর মানসিকতাসম্পন্ন এই ক্ষুদ্র একটি অংশ আমাদের হাজার বছরের কৃষ্টি, কালচার, সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে পাশ্চাত্যের বিকৃত রুচিসম্পন্ন কালচারের প্রসার ঘটাচ্ছে। তার ডায়েরিতে ঢাকা ও চট্টগ্রামের ডজনখানেক শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীর সাংকেতিকভাবে সংরক্ষণ করা ফোন নম্বর পেয়েছে পুলিশ। এসব ধনাঢ্যদের কাছে তিনি মদ ও তরুণী সরবারহ করতেন। কখনো কখনো নিজেই তাদের সঙ্গ দেন। বিনিময়ে তাদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ আদায় করেন। শুধু তাই নয়, ভালো লাগা তরুণ-তরুণীদের একান্তে মিলিত হওয়ার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য ঢাকা ও ঢাকার বাইরের একাধিক আবাসিক হোটেল এবং রিসোর্টের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে। জানুয়ারির শেষদিকে মদ পানের পর অস্বাভাবিকভাবে মারা যায় ইউল্যাব বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী মাধুরি ও তার বন্ধু আরাফাত। এ ঘটনায় মামলা হলে আলোচনায় চলে আসেন নেহা। পুলিশকে জানায়, পরিবার ও স্বামীর সঙ্গে দূরত্বের কারণে এ এমন অনৈতিক কাজে জড়িয়ে পড়েন তিনি। পরিবারই আমাদের ছোট থেকে কীভাবে কথা বলতে হবে, কীভাবে চলতে হবে এসব খুব যত্ন সহকারে শিখিয়ে দেয়। কিন্তু বর্তমান সমাজ ও দেশ আধুনিকতার ছোঁয়া নিয়ে নিজের খেয়াল খুশিমতো ভাসছে আর ডুবে যাচ্ছে সভ্যতা, মানবীয়তা, শিষ্টাচার। হারিয়ে যাচ্ছে নৈতিকতা, মানবতা, সহমর্মিতা, দেশপ্রেম, মানবপ্রেম। পরিবারের সদস্যদের মাঝে এই গুণাবলির অনুপস্থিতি ভয়ংকর বিশৃঙ্খল পরিবেশের সৃষ্টি করেছে পরিবারে আর তা কলুষিত করছে সমাজকে।

যাদের অসৎ অর্থ আছে তারাই এবং তাদের পরিবারই অপরাধ বেশি করে থাকে। তাই অফিস আদালতে ঘুষ নেয়া সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করতে হবে। রাষ্ট্র ভালোভাবেই জানে কারা ঘুষের চাকরি করে, কারা অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়ে। এগুলো কঠোর হস্তে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। কঠোর ভূমিকা পালন করতে হবে রাষ্ট্রকে।

আর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে- প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত সর্বত্রই প্রকৃত শিক্ষক নিয়োগ করতে হবে। শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের নৈতিক মূল্যাবোধে বলীয়ান হওয়া, মূল্যাবোধের চর্চা করা নিয়ে প্রচুর কাজ করতে হবে, গবেষণা করতে হবে। রাজনীতির নামে উচ্চতর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যে চাঁদাবাজি হয় সেগুলো সম্পূর্ণরূপে এবং কঠোরহস্তে দমন করতে হবে। এ বিষয়গুলোতে ঢিলেঢালা ভাব দেখালে সমাজে ক্যানসারের মতো ছড়িয়ে পড়বে উচ্ছৃঙ্খলতা, অনচার ও অনৈতিকতা। সময় থাকতে এগুলোর উৎসমুখ বন্ধ করতে হবে- তা না হলে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে।

মাছুম বিলস্নাহ : শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও গবেষক

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

আরও খবর

Copyright JaiJaiDin ©2021

Design and developed by Orangebd


উপরে