ফিলিস্তিনে নির্বাচন আসন্ন ফাতাহ হামাস সমঝোতা টিকবে তো?

ফিলিস্তিনে নির্বাচনের এতসব আয়োজনের পরও সংশয় সন্দেহ রয়েই গেছে। এক খবরে বলা হচ্ছে : ৭৬ শতাংশ ফিলিস্তিনি মনে করেন নির্বাচনে হামাস জিতলে ফল মেনে নেবে না ফাতাহ। 'নির্বাচন নিয়ে ফিলিস্তিনিদের অবিশ্বাস, বিভক্তি, সন্দেহ' শিরোনামে জানুয়ারির দ্বিতীয়ার্ধে সংবাদ মাধ্যম জানায়, ফিলিস্তিনিদের অনেকেই দেড় দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো হতে যাওয়া জাতীয় নির্বাচন আদৌ হবে কিনা, হলেও তা কোনো পরিবর্তন নিয়ে আসবে কিনা তা নিয়ে খুবই সন্দিহান। এর পাশাপাশি রাজনৈতিক হানাহানি, বিচ্ছিন্ন তিনটি অঞ্চল আর নিজেদের প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি অবিশ্বাস তো আছেই।
ফিলিস্তিনে নির্বাচন আসন্ন ফাতাহ হামাস সমঝোতা টিকবে তো?

ফিলিস্তিনে ১৫ বছর পর নির্বাচন হতে যাচ্ছে। প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস দেশটির পার্লামেন্ট ও প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ঘোষণা ইতোমধ্যে দিয়েছেন। ২২ মে পার্লামেন্ট এবং ৩১ জুলাই প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সর্বশেষ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে আব্বাস জিতেছিলেন, তার আনুষ্ঠানিক মেয়াদ ছিল চার বছর। এর পর আর নির্বাচন না হওয়ায় মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও একযুগ ধরে তিনি দায়িত্বে আছেন। ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকা এবং পশ্চিম তীরে এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচনে মাহমুদ আব্বাসের নেতৃত্বাধীন ফাতাহ আন্দোলন এবং গাজাভিত্তিক ইসলামি প্রতিরোধ আন্দোলন হামাসের মধ্যে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। ২০০৬ সালে ফিলিস্তিনে সর্বশেষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল এবং সে নির্বাচনে গাজাভিত্তিক হামাস ব্যাপক বিজয় লাভ করেছিল। হামাসের নাটকীয় জয়ের পর ফাতাহর সঙ্গে সশস্ত্র এ গোষ্ঠীটির বিরোধ এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে একপর্যায়ে গৃহযুদ্ধ বেঁধে যায় এবং পরের বছরই হামাস অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। গাজা এখন হামাসের নিয়ন্ত্রণে; আব্বাসের দলের প্রাধান্য স্বায়ত্তশাসিত পশ্চিম তীরে। আগে থেকেই ফিলিস্তিনের রাজনীতি ফাতাহ এবং হামাসের মধ্যেই বিভক্ত। গত এক দশক ধরে দুই দলই নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি জানিয়ে আসছিল কিন্তু নির্বাচন অনুষ্ঠানের মতো পরিবেশ নিশ্চিত করার ব্যাপারে তারা কখনো একমত হতে পারেনি। প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস নির্বাচনের ঘোষণা দেওয়ার পর হামাস একে স্বাগত জানিয়েছে এবং নির্বাচনের প্রক্রিয়া সফল হওয়ার ব্যাপারে তাদের জোরালো আগ্রহের কথা ব্যক্ত করেছে। হামাস ও ফাতাহর মধ্যে কয়েক মাস ধরে আলোচনার পর উভয়পক্ষের মধ্যে একটা চলনসই সমঝোতা হয়। হামাস এক বিবৃতিতে বলেছে, 'গত কয়েক মাস ধরে আমরা সব বাধা পার হওয়ার জন্য নানা রকমের সংলাপ করেছি এবং আমাদের পক্ষ থেকে অনেক উদারতা দেখিয়েছি। এরপরই আজকের এই দিনে উপনীত হতে পেরেছি।' হামাস তাদের বিবৃতিতে নির্বাচন অনুষ্ঠানের আগে আরও সংলাপের আহ্বান জানিয়েছে।

মূল আলোচনায় যাওয়ার আগে কয়েক বছরে ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনার বিবরণ দিয়ে নিলে পাঠকের বুঝতে সুবিধে হবে। এর মধ্যে মোটা দাগে দুটো ঘটনা ঘটেছে। একটি আগের মার্কিন সরকারগুলোর ধারাবাহিকতায় না গিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রশাসন ২০১৭ সালের ৬ ডিসেম্বর জেরুজালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেয় এবং পরে তাদের দূতাবাস তেল আবিব থেকে সেখানে সরিয়ে নেয়। আরও কয়েকটি দেশ তাদের অনুসরণ করে। পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী বানাতে চায় ফিলিস্তিনও, পূর্ব জেরুজালেমে রয়েছে তাদের প্রাধান্য। ফিলিস্তিনিরা তো বটেই তুরস্কসহ মুসলিম দেশগুলো এর প্রচন্ড বিরোধিতা করে। তবে কাজের কাজ কিছুই হয়নি। এক্ষণে ক্ষমতায় পাশা খেলায় ট্রাম্পের গদি উল্টে গেছে, এই পরিস্থিতি বর্তমান প্রেসিডেন্ট বাইডেন প্রশাসন কতটা পরিবর্তন করবেন বোঝা যাচ্ছে না। দ্বিতীয় ঘটনা হচ্ছে আরব আমিরাত ও বাহরাইন ২০২০ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর ইসরাইলকে স্বীকৃতি দিয়ে স্বাভাবিক সম্পর্ক স্থাপন করেছে ইহুদি রাষ্ট্রটির সঙ্গে। এই তালিকায় সৌদি আরবও ছিল বলে খবর, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা এ পথ থেকে সরে আসে। এ ঘটনা আরবের ঐক্যকে মারাত্মক ফাটলের মধ্যে ফেলে দেয়। ফিলিস্তিনসহ সমভাবাপন্ন দেশগুলো প্রতিবাদ করেছে, এ ক্ষেত্রেও কাজের কাজ কিছু হয়নি। যেমন- সর্বশেষ খবর হলো আরব আমিরাত ইসরাইলে তাদের রাষ্ট্রদূতের নামও ঘোষণা করেছে। জেরুজালেম পোস্ট জানাচ্ছে, দুবাইয়ের শাসক ও আরব আমিরাতের ভাইস প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন রশিদ আল-মাকতুম দেশটির কূটনীতিক মাহমুদ আল-খাজাকে তেল আবিবে দেশটির প্রথম রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দেন। এই স্বীকৃতিদানের প্রেক্ষাপটে সম্ভবত ফাতাহ হামাস ঐক্য ও নির্বাচনের ঘোষণা। আর ফেব্রম্নয়ারির ১৮ তারিখে প্যালেস্টাইন ক্রনিকল পত্রিকার তাজা খবর হলো ইসরাইলি বাহিনী ১৮৩তম বারের মতো ফিলিস্তিনি গ্রামগুলোতে হামলা চালিয়েছে। অর্থাৎ ফিলিস্তিনে ইসরাইলি বর্বরতা চলছেই। জো বাইডেন ক্ষমতায় আসাতেও কমেনি আর ইসরাইলি নির্বাচনকে সামনে রেখে শান্তির বাতাবরণ তৈরির মুখোশ আঁটার জন্যও তাদের কোনো চেষ্টা নেই। আগামী ২৩ মার্চ দুই বছরে ইসরাইলে চতুর্থ দফা সাধারণ নির্বাচন। আগের দুই দফা নির্বাচন হলেও কোনো দল সরকার গঠন করতে পারেনি, তৃতীয় দফায় ফলাফল প্রায় আগের মতো হলেও দুই প্রধান দল শেষ পর্যন্ত ২০২০ সালে মে মাসে কোয়ালিশন সরকার গঠন করেছিল 'জাতীয়' স্বার্থে। কিন্তু দুই প্রধান নেতা নেতানিয়াহু ও বেনি গান্তজের বনিবনা হয়নি, যেমনটা আগেই ধারণা করা হয়েছিল। ফলে সরকার ভেঙে যায় এবং তার ফল ২৩ মার্চের নির্বাচন।

\হফিলিস্তিনে নির্বাচনের এতসব আয়োজনের পরও সংশয় সন্দেহ রয়েই গেছে। এক খবরে বলা হচ্ছে : ৭৬ শতাংশ ফিলিস্তিনি মনে করেন নির্বাচনে হামাস জিতলে ফল মেনে নেবে না ফাতাহ। 'নির্বাচন নিয়ে ফিলিস্তিনিদের অবিশ্বাস, বিভক্তি, সন্দেহ' শিরোনামে জানুয়ারির দ্বিতীয়ার্ধে সংবাদ মাধ্যম জানায়, ফিলিস্তিনিদের অনেকেই দেড় দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো হতে যাওয়া জাতীয় নির্বাচন আদৌ হবে কিনা, হলেও তা কোনো পরিবর্তন নিয়ে আসবে কিনা তা নিয়ে খুবই সন্দিহান। এর পাশাপাশি রাজনৈতিক হানাহানি, বিচ্ছিন্ন তিনটি অঞ্চল আর নিজেদের প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি অবিশ্বাস তো আছেই।

এতে বলা হয়, দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের মধ্যে চলে আসা বিভক্তি কমিয়ে আনতে প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস চলতি বছরের মে-তে ফিলিস্তিনে পার্লামেন্ট ও জুলাইতে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন আয়োজনের ঘোষণা দিয়েছেন। তার প্রধান প্রতিপক্ষ ইসলামি প্রতিরোধ আন্দোলন বা হামাসও এ ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়েছে। আব্বাসের এ ঘোষণাকে যুক্তরাষ্ট্রের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে খুশি করার চেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক তলানিতে পৌঁছে যাওয়ার পর ফিলিস্তিনিরা এখন বাইডেন প্রশাসনের সঙ্গে বন্ধুত্ব জোরদারের চেষ্টা করছে। তবে আব্বাসের এ নির্বাচনের ঘোষণা নিয়ে ফিলিস্তিনিদের মধ্যেই খুব একটা উচ্ছ্বাস দেখা যাচ্ছে না। ফিলিস্তিনি সেন্টার ফর পলিসি অ্যান্ড সার্ভে রিসার্চের ডিসেম্বরের এক জরিপে অংশ নেওয়া ফিলিস্তিনিদের ৫২ শতাংশ বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে কোনো নির্বাচন হলে তা অবাধ ও সুষ্ঠু হবে না বলেই মনে করছেন তারা। নির্বাচনে যদি হামাস জেতে, তাহলে আব্বাসের দল ফাতাহ ফল মেনে নেবে না বলে মনে করেন ৭৬ শতাংশ ফিলিস্তিনি; ফাতাহর জয় হামাস প্রত্যাখ্যান করবে, এমনটা বিশ্বাস করেন ৫৮ শতাংশ। এটা আগেই উলেস্নখ করেছি।

অন্য এক পত্রিকার খবর হচ্ছে, প্রেসিডেন্টের এবারের ঘোষণায়ও ফিলিস্তিনিরা আশ্বস্ত হতে পারছেন না। গাজার এক বাসিন্দা বলেছেন, 'নির্বাচন বাতিলের জন্য হাজারও কারণ খুঁজে পাবে তারা। ইসরাইল, বিদ্রোহীগোষ্ঠী, ক্ষমতা ভাগাভাগি, কত কিছু। আমি আশা দেখছি না।' করোনাভাইরাসের কারণে দেওয়া লকডাউন অমান্য করায় তিনি নিজের নাম বলতে রাজি হননি। বেথেলহেমের ৫৭ বছর বয়সি চিকিৎসক জুহাইর আল-খতিব আবার অনেকখানি আশাবাদী। তিনি বলেছেন, 'এটা ১০০% ভালো সিদ্ধান্ত। আমাদের একটি পরিস্থিতির সূচনা করা উচিত, থাকা উচিত গণতন্ত্র।'

পশ্চিম তীরের বর্ষীয়ান রাজনৈতিক বিশ্লেষক হানি আল-মাসরি বলেছেন, 'আমরা একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছি, কিন্তু এখনো অনেক দূর যেতে হবে। এখনো অনেক বাধা আছে, সেসব বাধা টপকাতে না পারলে এই পুরো কার্যক্রমই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে।' যেসব বাধার কথা বলা হচ্ছে, তার মধ্যে ফিলিস্তিনের দুই প্রভাবশালী সংগঠন হামাস ও ফাতাহর মধ্যে বৈরিতাও আছে বলে জানিয়েছেন ফিলিস্তিনি পর্যবেক্ষকরা। অবাধ নির্বাচন নিশ্চিত করতে কী প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের অংশ নিতে দেওয়া হবে কিনা এবং ৮৫ বছর বয়সি অসুস্থ আব্বাস ফের নির্বাচনে দাঁড়াবেন কিনা, কিনারা হয়নি এসব প্রশ্নেরও।

এদিকে ফিলিস্তিনের কোনো সরকারে হামাস থাকলে সেই সরকারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন কোনো ধরনের চুক্তিতে যাবে না বলেও আভাস রয়েছে। হামাস পশ্চিমা দেশগুলোর কাছে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে পরিচিত। ইউরোপীয় ইউনিয়ন অবশ্য ফিলিস্তিনে নির্বাচনের ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়েছে। এক বিবৃতিতে ইইউর পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তা নীতিসংক্রান্ত মুখপাত্র বলেছেন, 'নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় সহায়তা করতে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে কাজ করতে ইইউ প্রস্তুত। ইইউ একইসঙ্গে ফিলিস্তিনের সব অঞ্চলে নির্বাচন আয়োজনে সহযোগিতা করতে ইসরাইলি কর্তৃপক্ষের প্রতিও আহ্বান জানাচ্ছে।'

জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেসের এক মুখপাত্র বলেছেন, গণতান্ত্রিক অধিকার চর্চায় সক্ষম হয়ে উঠতে ফিলিস্তিনিদের এ প্রচেষ্টায় সহযোগিতা করতে জাতিসংঘ প্রস্তুত। নির্বাচন 'ফিলিস্তিনিদের ঐক্যবদ্ধ করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ' হতে পারে বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি। আব্বাসের ঘোষণা নিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে ইসরাইলি কর্মকর্তাদের কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। পূর্ব জেরুজালেমে নির্বাচন আয়োজনে আগের মতো এবারও ইসরাইল অনুমতি দেবে কিনা তাও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ফিলিস্তিনিরা গাজা ও পশ্চিম তীরের মতো পূর্ব জেরুজালেমেও নির্বাচন আয়োজনে আগ্রহী। ফিলিস্তিনের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটির চেয়ারম্যান হানা নাসির বলেছেন, 'আমাদের অন্যান্য বিকল্পও আছে; গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে জেরুজালেমের বাসিন্দাদের নির্বাচনে অংশ নিতে পারা।'। দেখা যাচ্ছে নানা মত নানা ভাবনা-চিন্তা রয়েছে। সেহেতু চূড়ান্ত কিছু এখনি বলা যাচ্ছে না। এ জন্য কিছু সময় অপেক্ষা করতেই হবে।

আহমদ মতিউর রহমান : প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

আরও খবর

Copyright JaiJaiDin ©2021

Design and developed by Orangebd


উপরে