ছিটমহল বিনিময় এবং বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক

স্থল সীমান্ত চুক্তির পূর্বেকার বছরগুলোতে যেসব সমস্যা ছিল সেগুলোর লক্ষণীয় উপস্থিতি অব্যাহত আছে, যদিও সমস্যাগুলোর পরিপ্রেক্ষিত বোধগম্যভাবে পরিবর্তিত হয়েছে এবং এর ফলে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক ইতিবাচকভাবে সুদৃঢ় হওয়ার পথে এগিয়ে গিয়েছে। ছিটমহল বিনিময়ের ছয় বছর পর, স্থল সীমান্ত চুক্তির পূর্বেকার পরিস্থিতি থেকে স্থল সীমান্ত চুক্তির পরবর্তী পরিস্থিতির মধ্যে পার্থক্য কতটুকু তা মূল্যায়নের সময় এসেছে।
ছিটমহল বিনিময় এবং বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক

বাংলদেশ ও ভারতের মধ্যে ছিটমহল বিনিময়ের বয়স ২০২১ সালের ৩১ জুলাই ছয় বছরে উপনীত হচ্ছে। ২০১৫ সালের ৩১ জুলাই বাংলাদেশ ও ভারতের ছিটমহল বিনিময় হয়েছিল। দুটি প্রতিবেশী বন্ধুরাষ্ট্রের সীমান্তের মধ্যে ছিটমহল বিনিময় উভয় দেশের পারস্পরিক সম্পর্কের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আর দৈর্ঘ্যের কারণে এর ব্যবস্থাপনা খুবই কঠিন। উভয় দেশের মধ্যে ৪,০৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত, যা বিশ্বের পঞ্চম দীর্ঘতম স্থল সীমান্ত। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের আগে বাংলাদেশ ও ভারত একটি দেশ ছিল। দেশভাগের ফলে পাকিস্তান ও ভারত নামে দুটি আলাদা দেশ গঠিত হয়। ১৯৪৭ সালের ভাগের মধ্যদিয়ে দ্বিতীয় বঙ্গভঙ্গ হয় (১৯০৫ সালে প্রথম বঙ্গভঙ্গ), বাংলা দুইভাগে বিভক্ত হয়। পশ্চিম বাংলা ভারতের সঙ্গে যুক্ত হয় এবং পূর্ব অংশ পাকিস্তানের সঙ্গে পূর্ব বাংলা তথা পূর্ব পাকিস্তান নামে যুক্ত হয়। ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে ও ভারতের সহযোগিতায় স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়। ভারতের যেসব রাজ্যের সঙ্গে বাংলাদেশের সীমান্ত আছে সেগুলো হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গ, মিজোরাম, আসাম, ত্রিপুরা এবং মেঘালয়। অন্যদিকে, ময়মনসিংহ (২০১৫ সালের ১২ জানুয়ারি গঠিত), রংপুর, খুলনা, সিলেট, রাজশাহী এবং চট্টগ্রাম এই ৬টি বিভাগ বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে অবস্থিত। ভারতের বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স (বিএসএফ) এবং বাংলাদেশের বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সীমান্তবর্তী এলাকায় প্রহরীর দায়িত্ব পালন করেন। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত সুন্দরবন ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলকে এবং গাঙ্গেয় বদ্বীপকে ভাগ করার সঙ্গে সঙ্গে অনেক নদ-নদী দুই দেশের মধ্যদিয়ে এঁকে-বেঁকে গিয়েছে। সীমান্তবর্তী এলাকাগুলো খুবই ঘনবসতিপূর্ণ। কিছু কিছু স্থানে সীমান্ত রেখার গ্রামগুলোকে এবং এমনকি কিছু কিছু ক্ষেত্রে ঘর-বাড়ি দালান-কোঠার মধ্যদিয়ে অতিক্রম করেছে। ১৯৪৭ সালের বিভক্তির পর থেকে সুদীর্ঘকালব্যাপী চলে আসা সীমান্ত সমস্যা সমাধানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ২০১৫ সালের স্থলসীমান্ত চুক্তি (এলবিএ) এবং দুই দেশের ছিটমহল ও অপদখলীয় এলাকা বিনিময়। এ সত্ত্বেও প্রশ্ন রয়ে গিয়েছে, এই চুক্তি এবং ছিটমহল ও অপদখলীয় এলাকা বিনিময়, দুই দেশের অমীমাংসিত সীমান্ত-সম্পর্কিত ইসু্যগুলো মীমাংসা করতে এবং বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক সুদৃঢ় করতে কতটুকু অবদান রাখতে পারছে? এই প্রশ্নটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ব্রিটিশরা চলে যাওয়ার পর ১৯৪৭-এর বিভাগোত্তর পূর্ব বাংলা ও ভারতের পশ্চিম বাংলায় ছিটমহলের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। কুচবিহারসহ ১৯৪৭ সালে বিভাগীকরণ প্রক্রিয়া দেশীয় রাজ্যগুলোর জন্য নিয়ন্ত্রিত স্বাধীনতার পরিবর্তে ভারত অথবা পাকিস্তানের যে কোনো একটির সঙ্গে মিলে যাওয়ার অপশন দেওয়া হয়। পছন্দের জাতি-রাষ্ট্র বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে কুচবিহার সর্বশেষগুলোর মধ্যে একটি যারা ১৯৪৯ সালের আগস্টে ভারতের সঙ্গে কুচবিহার একীভূত হওয়ার চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল। যেহেতু ছিটমহলগুলোকে শাসন করার কোনো রেগুলেশন ছিল না, কুচবিহার মার্জার (ভারতের সঙ্গে একীকরণ চুক্তি) চুক্তির পর এগুলো সার্বভৌম ভারত অথবা পাকিস্তানের ভূখন্ডের মর্যাদাপ্রাপ্ত হয়। ১৯৪৭ সালে মাত্র ৩৬ দিনের মধ্যে ব্রিটিশরা ৮ কোটি লোক এবং ১৭৫০০০ বর্গমাইল ভূখন্ড ভাগ করে দেয়, যারা বিভিন্ন উপায়ে প্রায় ১০০০ বছর ধরে একসঙ্গে ছিল। র্ যাডক্লিফ কমিশন পূর্ব ও পশ্চিম বাংলার মধ্যে সীমান্ত রেখা সৃষ্টি করেছিল। এসময় অনেক এলাকা অসীমাবদ্ধ থেকে যায়। ছিটমহলগুলো একটি বিভ্রান্তিকর চিত্র তুলে ধরছিল যেখানে এলাকাগত দিক দিয়ে তাদের কোনো কোনোটি একটি দেশের অন্তর্গত, অথচ সার্বভৌম শাসনের দিক দিয়ে সেগুলো অন্য রাষ্ট্রের। এগুলোকে অপদখলীয় এলাকা বলা হয়। কিছু সমুদ্র সীমানা সম্পর্কিত ইসু্যও অমীমাংসিত থেকে যায়। সীমান্ত সংক্রান্ত কিছু ইসু্য বিবেচনার জন্য ১৯৪৮ সালের জুন মাসে (পাকিস্তানের) পূর্ব বাংলা এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মধ্যকার সীমান্ত সংক্রান্ত ইসু্যগুলো বিবেচনার জন্য সুইডেনের সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি জাস্টিস অ্যালগট বাজ্ঞিকে প্রধান করে এবং ভারতের মাদ্রাজ হাইকোর্টের জাস্টিস সি. আইয়ার ও ঢাকা হাইকোর্টের জাস্টিস এম শাহাবুদ্দীনকে সদস্য করে মোট তিন সদস্যের একটি ট্রাইবু্যনাল গঠন করা হয়। এই ট্রাইবু্যনালের নাম ছিল 'ইন্দো-পাকিস্তান বাউন্ডারি ডিসপুটস ট্রাইবু্যনাল'। ১৯৪৯ সালের ডিসেম্বর মাসে এই ট্রাইবু্যনাল কাজ শুরু করে। ১৯৫০ সালের ৫ ফেব্রম্নয়ারি এই ট্রাইবু্যনাল রিপোর্ট দাখিল করে। এই রিপোর্টে এই মর্মে প্রস্তাব করা হয়েছিল যে ভারত ও পাকিস্তান সরকার (এই রিপোর্ট প্রকাশের) এক বছরের মধ্যে তাদের সীমান্ত চিহ্নিত করবে। ছিটমহলগুলোকে মূলভূখন্ডের সঙ্গে যুক্ত করার জন্য একমাত্র চুক্তি করা হয়েছিল ১৯৫০ সালে। এই চুক্তির দ্বারা সরকারি কর্মকর্তারা তাদের অংশের ছিটমহলে প্রবেশ করতে পারত। কিন্তু জটিল প্রক্রিয়া এবং দুই রাষ্ট্রের মধ্যে শত্রম্নতামূলক সম্পর্কের কারণে এই চুক্তি বাস্তবায়িত হয়নি। ১৯৫২ সালে পাসপোর্ট ভিসার কড়াকড়ি এবং সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ বলবৎ হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত ছিটমহলের অধিবাসীরা কিছু মাত্রায় স্বাধীনভাবে চলাচল করতে পারত। এরপর থেকে ভারত ও বাংলাদেশ (বা এর পূর্বে পূর্ব পাকিস্তানের) ছিটমহলের অধিবাসীরা ক্রমান্বয়ে শারীরিক দূরত্বের কারণে রাষ্ট্রীয় নিয়ম-কানুন ও সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছিলেন। কারণ তারা ছিলেন মূল ভূখন্ড থেকে বিচ্ছিন্ন। ভূখন্ড বিনিময়ের মাধ্যমে ছিটমহলে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা সব সময়েই রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর একটি বিষয় হিসেবে দেখা দিয়েছিল। আন্তঃসীমান্ত দ্বিপক্ষীয় আলোচনার সময় এটিকে বাদ দেওয়া হয়েছে। যেমন- পানি বণ্টন এবং সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতার ক্ষেত্রে। তাছাড়া ভারতে ও বাংলাদেশে (অথবা পূর্ব পাকিস্তানে) কোন চুক্তি অনুমোদনের জন্য প্রয়োজন হয় সংবিধান সংশোধনের। ১৯৫০ সালে ছিটমহলগুলো বিনিময়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এসময় ভারত ও পাকিস্তান 'ভূখন্ডগত লাভ বা ক্ষতি বিবেচনা না করেই' ছিটমহল বিনিময়ে সম্মত হয়েছিল। কিন্তু তা বাস্তবায়িত হয়নি। অগ্নিগর্ভ অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং অস্থিতিশীল দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের কারণে অবাস্তবায়িত থেকে যায়। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর সীমান্ত সমস্যা নিরশনের প্রচেষ্টা: বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী সরকারের সময় সীমান্ত সমস্যা সমাধান এবং ছিটমহল বিনিময়ের জন্য বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ১৯৭৪ সালে স্থল সীমান্ত চুক্তি (ল্যান্ড বাউন্ডারি এগ্রিমেন্ট/এলবিএ) স্বাক্ষরিত হয়। ১৯৫০ সালের চুক্তি এবং ১৯৭৪ সালের উভয় চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য তৃতীয় আর একটি উদ্যোগ নেওয়া হয় ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে স্বাক্ষরিত ল্যান্ড বাউন্ডারি প্রোটোকলের মাধ্যমে। এই প্রোটোকল স্বাক্ষর করা হয়েছিল ১৯৭৪ সালের স্থল সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য। এ সত্ত্বেও বাস্তবায়নের জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট সময়সীমা এই প্রোটোকলে ছিল না। ইতিমধ্যে, মাদক পাচার ও চোরাকারবারি নিয়ন্ত্রণের জন্য ভারত তার সঙ্গে বাংলাদেশের সীমান্তের ৩,৪০৬ কিলোমিটার তারকাঁটা বেড়া দিয়েছে। পশ্চিমবাংলার সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে ভারত ২৭৭ কিলোমিটারব্যাপী ফ্লাড লাইট লাগিয়েছে। যাহোক, বিচ্ছিন্নতার কারণে এবং রাজনৈতিক জটিলতার কারণে সরকারের সঙ্গেও ছিটমহল অধিবাসীরা যোগাযোগ স্থাপন করতে পারছিলেন না। ছিটমহলগুলোর উপর সার্বভৌমত্ব আরোপ করার জন্য কোনো পক্ষই আন্তরিকভাবে ইচ্ছুক না থাকার পাশাপাশি মানবিক দিকদিয়ে ছিটমহল সমস্যা পুরোপুরি সমাধানের চেষ্টা করেননি। ছিটমহল অধিবাসীদের মৌলিক প্রয়োজন মিটানো এবং অর্থনৈতিকভাবে টিকে থাকার জন্য তারা প্রতিনিয়তই সার্বভৌমত্বের গঁ্যাড়াকলে এবং অবৈধ অনুপ্রবেশকারীর তক্‌মা নিয়ে নির্দয় শিকারে পরিণত হচ্ছিলেন। এসব ছিটমহলে বসবাসকারী মানুষের প্রচুর ভোগান্তি পোহাতে হতো কারণ যেসব সরকারি সেবা তাদের প্রাপ্য ছিল সেগুলো তারা পাচ্ছিল না। ভারতের মধ্যে থাকা বাংলাদেশি ছিটমহলগুলোর শতকরা ৭৫ ভাগেরও বেশি অধিবাসীদের বৈধ ভ্রমণ ডকুমেন্ট ছাড়া ভারতে প্রবেশ করার কারণে গ্রেপ্তার হয়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের জেলে বন্দি থাকতে হয়েছে। 'ভারত-বাংলাদেশ ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটি' নীতি-নির্ধারকদের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য বছরের পর বছর অহিংস কর্মসূচি, অনশন ধর্মঘট ও শান্তিপূর্ণ সমাবেশ করেছেন। ভারতে বিজেপি সরকার এবং পরিস্থিতির পরিবর্তন : ২০১৪ সালে ভারতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসাবে ভারতীয় জনতা পার্টির নেতা শ্রী নরেন্দ্র মোদি নির্বাচিত হওয়ার পর পরিস্থিতির পরিবর্তন হতে থাকে। এসময় ছিটমহল সমস্যা সমাধানের জন্য ভারতীয় জনতা পার্টি সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ গ্রহণ করে। যদিও ভারতীয় পার্লামেন্টর উভয় কক্ষে স্থল সীমান্ত চুক্তি ১৯৭৪ অনুমোদিত হওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা ছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিরঙ্কুশভাবে উভয় কক্ষেই তা অনুমোদিত হয়। উলেস্নখ্য, বঙ্গবন্ধুর সরকার ১৯৭৪ সালেই বাংলাদেশ জাতীয় সংসদে এলবিএ ১৯৭৪ অনুমোদন করিয়েছিলেন। ভারতে এটি অনুমোদিত হয় ৪১ বছর পর। এভাবে হস্তান্তরের পথ পরিষ্কার হওয়ার পর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী অনুমোদনের ইনস্ট্রুমেন্ট বিনিময় করেন। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার আমন্ত্রণে ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র দামোদর মোদী ২০১৫ সালের ৬-৭ জুন বাংলাদেশ সফর করেন। সেসময় যেসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় তাতে ভারত বাংলাদেশর দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হয়। সফরের সময় ভারতের প্রধানমন্ত্রী ভারতের আইনসভায় অনুমোদিত স্থল সীমানা চুক্তি এবং ২০১১ সালের প্রোটোকল ভারতীয় পার্লামেন্টর উভয় কক্ষে অনুমোদিত হওয়ার দলিল এবং আনুষাঙ্গিক ইনস্ট্রুমেন্টগুলো বিনিময় করেন। এর দ্বারা বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে আটষট্টি বছরের পুরাতন সীমানা (পাকিস্তানের সঙ্গে ১৯৭১-এর পূর্বে) বিতর্কের পরিসমাপ্তি ঘটে। যদিও আন্তঃসীমান্ত চলাচল, অভিবাসন, মানব পাচার ও চোরাকারবারি ইত্যাদির মতো স্বল্প কিছু আনুষঙ্গিক বিষয় সম্পর্কে উদ্বেগ ও উত্তেজনা রয়ে গিয়েছে। স্থল সীমানা চুক্তির বিষয়বস্তু অনুযায়ী ১৯৭টি ছিটমহলের মধ্যে ১৬২টি বিনিময় হয়েছে এবং ৫০০০ একর স্থলভূমি ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে অদল-বদল হয়েছে। ভারত ৭১১০.০২ একর ভূমিসহ ৫১টি ছিটমহল এবং বাংলাদেশ ১৭,১৬০.৬৩ একর ভূমিসহ ১১১টি ছিটমহল পেয়েছে। ২০১৫ সালের স্থল সীমান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল ২০১৫ সালের ৬ জুন। এই ঐতিহাসিক চুক্তির ফলে ভারত থেকে বাংলাদেশে ১৭,১৬০.৬৩ একর জায়গাসহ ১১১টি ছিটমহল হস্তান্তরের পথ সুগম হয়েছিল। বিপরীত দিকে, বাংলাদেশের মধ্যে থাকা ৭১১০.০২ একর জায়গাসহ ৫১টি ছিটমহল ভারতের নিকট (বাংলাদেশ কর্তৃক) হস্তান্তরের পথ সুগম হয়। এই ঐতিহাসিক চুক্তির আগে ২০১১ সালে তৎকালীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মধ্যে একটি প্রোটোকল স্বাক্ষরিত হয়। এই প্রোটোকল দ্বারা উভয় দেশ অপদখলীয় সম্পত্তি ইসু্যগুলো সম্পর্কে স্থিতাবস্থা বজায় রাখতে সম্মত হয়। ২০১১ সালের প্রোটোকল ভারতের আসাম, মেঘালয়, ত্রিপুরা এবং পশ্চিমবঙ্গের সরকারগুলোর সম্মতিতে স্বাক্ষরিত হয়েছিল। কিন্তু প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে তা বাস্তবায়িত হতে পারেনি। এভাবে, ২০১১ সালের প্রোটোকলে প্রথমবারের মতো উলিস্নখিত ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা ও আসাম সীমান্তবর্তী আনুমানিক ৬.১ কিলোমিটার দীর্ঘ অনির্দিষ্ট স্থল সীমান্ত; ছিটমহল বিনিময়; এবং অপদখলীয় এলাকা সংক্রান্ত অনির্দিষ্ট স্থল সীমান্ত বিষয়গুলো ২০১৫ সালের স্থল সীমান্ত চুক্তির দ্বারা বাস্তবায়িত হয়। এখানে এটি লক্ষণীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ যে স্থল সীমান্ত বিনিময়, ভারতের চেয়ে বাংলাদেশ বেশি এলাকা লাভ করেছে। উপসংহার : ২০১৫ সালের ৩১ জুলাই ছিটমহল বিনিময় সম্পন্ন হওয়ার পর, স্থল সীমান্ত চুক্তি পরে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত সমস্যা পরিস্থিতি মূল্যায়ন এবং আলোচনার জন্য বিজিবি এবং বিএসএফের প্রতিনিধিরা নতুন দিলিস্নতে ২০১৫ সালের ২-৬ আগস্ট ৪১তম বার্ষিক সভা অনুষ্ঠিত হয়। এই সভা পরবর্তী যৌথ বিবৃতিতে কর্মকর্তারা জানান যে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে অপরাধ নিয়ন্ত্রণের জন্য উভয় দেশের অফিসিয়ালদের সমন্বয়ে 'কুইক রেসপন্স টিম' গঠিত হবে। স্থল সীমান্ত চুক্তি ছাড়াও ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফরকালে দুই দেশের মধ্যে ২২টি চুক্তি এবং সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। এ ক্ষেত্রে আর্থিক সহায়তা সম্প্রসারণ এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করার উপর জোর দেওয়া হয়। ভূখন্ড বিনিময় সূত্রপাত করার মতো একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ সীমান্ত চুক্তির দ্বারা সম্পন্ন হলেও পন্ডিত এবং বিশ্লেষকরা এ ব্যাপারে ঐকমত্য পোষণ করেন যে স্থল সীমান্ত চুক্তির পূর্বেকার পরিস্থিতি পুরোপুরি ভাঙা এখনো সম্ভব হয়নি। বরঞ্চ স্থল সীমান্ত চুক্তির পূর্বেকার বছরগুলোতে যেসব সমস্যা ছিল সেগুলোর লক্ষণীয় উপস্থিতি অব্যাহত আছে, যদিও সমস্যাগুলোর পরিপ্রেক্ষিত বোধগম্যভাবে পরিবর্তিত হয়েছে এবং এর ফলে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক ইতিবাচকভাবে সুদৃঢ় হওয়ার পথে এগিয়ে গিয়েছে। ছিটমহল বিনিময়ের ছয় বছর পর, স্থল সীমান্ত চুক্তির পূর্বেকার পরিস্থিতি থেকে স্থল সীমান্ত চুক্তির পরবর্তী পরিস্থিতির মধ্যে পার্থক্য কতটুকু তা মূল্যায়নের সময় এসেছে। প্রফেসর ড. অরুণ কুমার গোস্বামী : ডিন, সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ এবং আহ্বায়ক, বাংলাদেশ শিক্ষক ঐক্য পরিষদ

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

আরও খবর

Copyright JaiJaiDin ©2021

Design and developed by Orangebd


উপরে