সোমবার, ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২৩ মাঘ ১৪২৯
walton1

কঙ্কাল শিক্ষা ব্যবস্থায় উদ্দেশ্যহীন শিক্ষার্থীরা

নতুনধারা
  ২৫ জানুয়ারি ২০২৩, ০০:০০
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার বেহাল দশার কথা নিত্যদিনের আলোচিত বিষয়। শিক্ষা ব্যবস্থায় অনিয়ম, অনুন্নত শিক্ষার অবকাঠামো, এ পস্নাসের আধিক্য, উন্নত প্রযুক্তির অভাব, গবেষণা বিষয়ক শিক্ষার অভাবে শিক্ষার্থীদের মেধার সঠিক বিকাশ হচ্ছে না। যেখানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার্থীরা তাদের সঠিক মেধা বিকাশের সুযোগ পাচ্ছে না। সেখানেই সব শিক্ষার্থীকে গণহারে এ পস্নাস দিয়ে সর্বোচ্চ মেধাবী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। বিশ্বের অন্য দেশগুলো যেখানে তাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য কাজ করছে সেখানে আমাদের দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো মুখস্থ বিদ্যার উপর ভিত্তি করে এ পস্নাস তৈরি কারখানায় পরিণত হচ্ছে। যে এ পস্নাস শিক্ষার্থীদের পরবর্তী সময়ে তাদের কোনো কাজে আসছে না এই সমস্যা থেকে সমাধানের জন্য শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন। বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় এ পস্নাস যেভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে মনে হচ্ছে এক সময় সব শিক্ষার্থীর রেজাল্ট এ পস্নাসে রূপান্তরিত করা হবে। এমন হবে যে রেজাল্টে শুধু একটা গ্রেট থাকবে তা পস্নাস। এই গণহারে এ পস্নাস শিক্ষার্থীদের কোনো কাজে আসছে না বরং শিক্ষা ব্যবস্থাকে প্রশ্ন বিদ্ধ করছে। যদি পূর্ববর্তী সালের রেজাল্ট লক্ষ্য করি তাহলে দেখতে পাবো। ২০০১ সালে এসএসসি পরীক্ষায় এ পস্নাস পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৭৬ জন, ২০১০ সালে ৫২ হাজার ১৩৪ জন, সেই এ পস্নাসের সংখ্যা ২০২২ সালে এসএসসি পরীক্ষায় এসে দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৬৯ হাজার ৬০২ জনে। বলাই চলে বর্তমান বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে এ পস্নাস তৈরির কারখানাতে; কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সুযোগ হয় না অনেক পস্নাসধারী শিক্ষার্থীরও। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ে সীমিতসংখ্যক আসন। আর সেখানে শিক্ষার্থীদের মেধা মূল্যায়নের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ দেওয়া হয়। তখন লক্ষ্য করা যায় অনেক 'এ পস্নাস' না পাওয়া শিক্ষার্থী ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পায় আবার অনেক এ পস্নাস পাওয়া শিক্ষার্থীও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পায় না। যখন শিক্ষা ব্যবস্থার এই অবস্থা তখন শিক্ষার মানও প্রশ্নবিদ্ধ হয়। এই শিক্ষা ব্যবস্থায় যাদের সর্বোচ্চ মেধাবী হিসাবে বিবেচনা করা হচ্ছে তারা তাদের মেধার যথার্থ প্রমাণ দিতে পারছে না- যা খুবই দুঃখজনক একটা বিষয়। শিক্ষা ব্যবস্থার এমন বেহাল দশা শিক্ষার্থীদের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে বেড়ে যাচ্ছে আত্মহত্যার পরিমাণ। ঢালাও এ পস্নাসের ভিড়ে যারা এ পস্নাস পায়নি তাদের সঙ্গে পরিবার, সমাজ খারাপ ব্যবহার করছে। তারা সমাজে বিভিন্ন সমালোচনা এবং অপমানের শিকার হয়ে আত্মহত্যার মতো পথ বেঁচে নিচ্ছে। আর সমাজস্বীকৃত মেধাবী শিক্ষার্থীদের প্রতি সমাজের মানুষের প্রত্যাশা বেড়ে যায়। পরবর্তী সময় তাদের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিদ্রূপ প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। এই সব সমস্যার জন্য একমাত্র দায়ী বাংলাদেশের ঝড় ধরা শিক্ষা ব্যবস্থা। তাই সব সমস্যা সমাধানের জন্য প্রয়োজন শিক্ষা ব্যবস্থার পরিবর্তন। এ ছাড়া এই শিক্ষা ব্যবস্থায় বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তৈরি হয়েছে বেকার তৈরির কারখানায়। প্রতি বছর লাখ লাখ বেকারের জন্ম দিয়ে যাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। যেখানে জ্ঞান-বিজ্ঞানে সমৃদ্ধ হওয়ার প্রত্যাশা নিয়ে শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করে; কিন্তু সত্য কথা হলো- অধিকাংশ শিক্ষার্থীরাই তাদের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়েই বিশ্ববিদ্যালয় পড়াশোনা শেষ করে চলে যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাকে শিক্ষা ব্যবস্থার কোনো মানদন্ডে বসানো খুবই কঠিন। এখানে শিক্ষা প্রধানে চলে শিক্ষকদের বিলাসিতা। রয়েছে প্রযুক্তির অভাব। কোনো সমস্যার মিলছে না স্থায়ী কোনো সমাধান। দিন শেষে এক সাগর হতাশা নিয়ে তাদের পথচলা শুরু করতে হয়। আর কাঁধে বেকারত্ব নামক অভিশাপ নিয়ে। শিক্ষা জাতির মেরুদন্ড। সুশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে একটি জাতি পারে তার সমাজ দেশ তথা সারা বিশ্বের পরিবর্তন করতে। শিক্ষা ছাড়া কোনো দেশ বা জাতির পরিবর্তন কখনো সম্ভব না। আর শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য শিক্ষা ব্যবস্থার পরিবর্তন প্রয়োজন। পাশাপাশি শিক্ষা ব্যবস্থার বাজেট বৃদ্ধিরও প্রয়োজন আছে। দেশ ও জাতিকে উন্নত ও আধুনিক জীবন উপহার দেওয়ার জন্য সঠিক শিক্ষা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষা মানুষকে সমৃদ্ধ করে। শিক্ষার সঙ্গে রাষ্ট্রের উন্নয়ন ও অগ্রগতি নির্ভরশীল। কিন্তু দেশে শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা হলেও শিক্ষাকে পরিকল্পিত গবেষণার মাধ্যমে কীভাবে মানুষের উপযোগী করে তোলা যায় সে বিষয়টি তেমনভাবে ভাবা হয়নি। যদি সেরকম গবেষণা হতো তবে মানবসম্পদ সৃষ্টিতে কোনো ধরনের শিক্ষা ব্যবস্থা আমাদের দেশের জন্য প্রয়োজন সেটি বের করা যেতো। যখন আমরা মানবসম্পদের কথা বলি তখন জীবনসম্পৃক্ত শিক্ষা ব্যবস্থার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। যখন শিক্ষাকে জীবনসম্পৃক্ত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে, তখন কারিগরি শিক্ষাকে প্রাধান্য দিতে হবে। তবে কারিগরি শিক্ষায় প্রবেশের আগে জীবনাচরণগত শিক্ষার প্রয়োজন রয়েছে। শিক্ষার মানোন্নয়ন করতে হলে শিক্ষার প্রতিটি স্তরে পরিবর্তন প্রয়োজন। প্রাথমিক শিক্ষা, মাধ্যমিক শিক্ষা, উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা এবং উচ্চ শিক্ষা প্রতিটি ক্ষেত্রে আলাদা আলাদাভাবে গুরুত্বারোপ করতে হবে। এ ছাড়া কারিগরি শিক্ষার প্রতি বিশেষ নজর দিতে হবে। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার প্রতি আলাদাভাবে নজর দিতে হবে। সেখানে প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার জন্য প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। বিভাগভিত্তিক শিক্ষকের সংকট দূর করতে হবে। তাহলে বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার মৃত প্রায় ধসে পড়া শিক্ষাকে পুনরায় জীবন্ত করা যাবে। বাংলাদেশের শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য সর্বপ্রথম শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে দক্ষ করে তুলতে হবে। তা ছাড়া শিক্ষার্থীদের সঠিক ও যথাযথভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নেও বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। আর কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষার প্রতি মনোযোগ দিতে হবে। তাহলে হয়তো বাংলাদেশকে বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্ত করা সম্ভব। সম্ভব হবে পরবর্তী প্রজন্মকে সুন্দর ও সময়োপযোগী একটি বাংলাদেশ উপহার দেওয়া। মিজানুর রহমান মিজান শিক্ষার্থী ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

উপরে