বৃহস্পতিবার, ১৩ জুন ২০২৪, ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
পাঠক মত

হিংসার আড়ালে চাপা পড়ে যাচ্ছে উৎসাহ দেওয়ার প্রবণতা

আজহার মাহমুদ
  ৩১ মে ২০২৩, ০০:০০
হিংসার আড়ালে চাপা পড়ে যাচ্ছে উৎসাহ দেওয়ার প্রবণতা

এগিয়ে যাওয়ার অপর নাম উৎসাহ। কিন্তু বর্তমান সময়ে মানুষের মধ্যে যে বিষয়টির অভাব সবচেয়ে বেশি সেটা হলো উৎসাহ দেওয়া। দেশ এবং সমাজের মানুষ এগিয়ে যাওয়ার জন্য উৎসাহ এবং প্রেরণা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং অতীব জরুরি। আমাদের বর্তমান সমাজে এমনও কিছু ব্যক্তি রয়েছে, যাদের ভেতর উৎসাহ দেওয়ার প্রবণতা না থাকলেও এগিয়ে যাওয়ার পথে বাঁধা দেওয়ার প্রবণতা আছে। তারা সমাজের যে কোনো ব্যক্তির উন্নয়ন দেখলে তাদের সমালোচনা করতে আগ্রহী হয়ে ওঠে। তাদের কাজ হয়ে দাঁড়ায় কোথায়, কার, কি ভুল হয়েছে সেটা নিয়ে বিশ্লেষণ করা। কিন্তু সেই ভুলের সমাধান কেউ দেয় না। মানুষকে ভালো কাজে এগিয়ে যাওয়ার পথে উৎসাহ দিতে না পারলেও মন্দ কাজে উৎসাহ দেওয়ার মতো কিছু বিষাক্ত মানুষ আমাদের সমাজে বসবাস করে এখনো। তবে কোনো এক কবি তার কবিতায় বলেছেন, 'পাছে লোক কিছু বলে' অন্যের কথায় কান না দিয়ে নিজের লক্ষ্যকে বাস্তবায়ন করতে হবে। আমাদের নিজেদের স্থানে নিজেদের পৌঁছাতে হবে। কে কী বলেছে সেটা শুনে সময় নষ্ট করার প্রয়োজন নেই। তবে এটাও বাস্তব অনেক সময় সামান্য উৎসাহের অভাবে ঝরে যায় দেশের অনেক সম্পদ। যারা হয়তো একদিন দেশের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকত। কিন্তু সেই উৎসাহ দেওয়ার মতো মানুষ আমাদের সমাজে খুবই কম। সহপাঠী, বন্ধু, ছোটদের চেয়েও বড়রা উৎসাহ দিলে সেটা বেশি গ্রহণযোগ্য এবং প্রেরণাময় হয়। আজকের প্রজন্ম উৎসাহ পাবে বিগত প্রজন্ম থেকে। আজকের প্রজন্ম থেকে উৎসাহ পাবে আগামী প্রজন্ম। একজন বন্ধু অন্য বন্ধুকে উৎসাহ দিতে পারে। মা-বাবার পরে বড় ভাই তার ছোট ভাইকে উৎসাহ দিতে পারে। শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের উৎসাহ দিতে পারে। সমাজের মুরুব্বীরা সমাজের যুবকদের এগিয়ে যেতে উৎসাহ দিতে পারে। এই উৎসাহ দিতে কারও কোনো প্রকারের কষ্ট কিংবা ক্ষতি হবে বলে মনে হয় না। তবুও কেন আমরা এত কার্পণ্য বোধ করি উৎসাহ দিতে? এটা তো শুধু উৎসাহ নয়, এটা একটা প্রেরণা। এই প্রেরণার মাধ্যমে একটি ছেলে অথবা মেয়ের মনোবল আরও দৃঢ় হয়। আর এই দৃঢ় মনোবল নিয়ে হয়তো একদিন দেশের নাম উজ্জ্বল করবে তারা। কিন্তু সমাজের মানুষের ভেতর এমন চিন্তাধারা দেখা যায় না। আমরা যদি উৎসাহ দিতে না পারি তবে সমালোচনা করবই বা কেন। সমালোচনা করা তাদের সাঝে, যাদের উৎসাহ দেওয়ার ক্ষমতা আছে। কারও মনোবল ভেঙে দেওয়ার জন্য সমালোচনা করা তো কারও অধিকার না। সমাজে এমনও কিছু ব্যক্তি রয়েছে যারা অন্য মানুষের উন্নতি সহ্য করতে পারে না। তাদের ভেতর যত্ন করে পুষে রাখে হিংসা আর অহংকার। তারা চায় না তাদের চেয়ে উচ্চস্থানে কারও স্থান হোক। তারা সবসময় ভালো কিছুতে বাঁধা দেবে। তাদের নীতি হচ্ছে সমাজের কেউ উচ্চস্থানে যেতে পারবে না। কারও এগিয়ে যাওয়া দেখলে তাদের ভেতর যত্ন করে রাখা হিংসাগুলো তখন বেরিয়ে আসে। আমাদের মানবজাতির মধ্যে কিছু কিছু নিকৃষ্ট মানুষও রয়েছে যা আমাদের কাছে অজানার কিছু নয়। তবে সেই নিকৃষ্ট মানুষগুলোর সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়ছে। সমাজের চোখে থেকে হয়তো তারা খুব সহজেই ছাড় পেয়ে যাচ্ছে। কিন্তু নিয়তি তাদের কখনো ছাড় দেবে না। আজ আপনি একজনকে এগিয়ে যেতে বাঁধা দিচ্ছেন, একদিন আপনি সেই বাঁধাতে নিজেই আটকে যাবেন। আমরা যদি যার যার বিবেকের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে নিজের প্রশ্ন নিজেই করি, তবে আজ হয়তো আমাদের ভেতর থেকে হিংসা আর অহংকারের আধিপত্য কিছুটা কমে যেতো। আমাদের বিচার আমাদের করতে হবে। নিজে যদি সৎ হয়ে থাকেন তবে নিজের বিচারক নিজের চেয়ে বড় কেউ হতে পারে না। এ ধরনের অপরাধ শোধরানোর দায়িত্বও নিজের। কিন্তু আমাদের ভেতর এখনো সেই বোধটুকু কাজ করে না। আমরা মানুষের মনোবল ভেঙে দিতে কার্পণ্যতা করি না। আবার উৎসাহ দেওয়ার বেলায় ঠিকই সেই কার্পণ্যবোধ সজাগ হয়ে ওঠে। হবে না, পারবে না এগুলো বলতে বেশি আগ্রহী। হবে কিংবা পারবে বলতে আমরা যেন বোবা হয়ে যাই। কিন্তু মনোবল দেওয়ার জন্য হলেও বলি না পারবে। আমরা না বলতে খুব বেশি পছন্দ করি, কিন্তু হঁ্যা বলাটা যেন আমাদের জন্য কষ্টের বিষয়। আমাদের কাজে-কর্মে হয়তো আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে, কিন্তু আমাদের মনের ভেতরে এখনো নোংরা মনোভাব লালন করে রেখেছি। আগে নিজেদের মন মানসিকতা পরিবর্তন করতে হবে, তবেই আমরা আমেদের দেশ এবং সমাজকে আধুনিকভাবে পাবো। আমরা উৎসাহ, উদ্দীপনা, প্রেরণামূলক কথা এখন খুব কমই শুনি। আমাদের লেখালেখিতেও এখন উৎসাহ, উদ্দীপনা, প্রেরণামূলক কিছু থাকে না। আমরা শুধু ভুলটা তুলে ধরি, কিন্তু কেউ সেই ভুলের সমাধান কি হবে তা তুলে ধরি না। এটাই কি আমাদের শিক্ষা? একজন মানুষ হয়ে অন্য মানুষের মনোবল ভেঙে দেওয়াটা কখনোই মনুষ্যত্বের মধ্যে পড়ে না। তাই আমাদের উচিত উৎসাহ আর প্রেরণা দেওয়ার প্রবণতা বাড়ানোর। আর নিতান্তই যদি উৎসাহ দিতে না পারি তবে মনবোল যেন ভেঙে না দিই সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। কারণ আপনার জন্য যদি কোনো এক ব্যক্তির লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়, তার সেই ক্ষতি পূরণ দেওয়ার সাধ্য আপনার নেই। উৎসাহ হয়তো আপনার স্থানে কেউ না কেউ দেবে, কিন্তু একবার মনোবল ভেঙে দিলে তার লক্ষ্যটাই হয়তো নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তাই বলা যায় উৎসাহ দেওয়াটা যতটুকু ভালো তার চেয়ে ভালো মনোবল ভেঙে না দেওয়া।

আজহার মাহমুদ

ঢাকা

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
X
Nagad

উপরে