শুক্রবার, ২৪ মে ২০২৪, ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়

অষ্টম শ্রেণির পড়াশোনা

সুধীরবরণ মাঝি, শিক্ষক, হাইমচর সরকারি মহাবিদ্যালয়, হাইমচর, চাঁদপুর
  ২৬ মে ২০২৩, ০০:০০
অষ্টম শ্রেণির পড়াশোনা

চতুর্থ অধ্যায়

গ) তারা যে স্থানটি পরিদর্শন করে সেটি সোনারগাঁও। প্রত্ননিদর্শনের কারণে এই শহরের ঐতিহ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সুলতানি আমলে বাংলার রাজধানী ছিল সোনারগাঁও। মসলিন শাড়ির উৎপাদন ও ব্যবসাকেন্দ্র হিসেবে এর খ্যাতি ছিল। সোনারগাঁওয়ের পানাম নগরে ধনী ব্যবসায়ীরা মূল সড়কের দুই পাশে সারিবদ্ধভাবে অনেক ইমারত নির্মাণ করেন। পানাম নগরে এখনো এরকম ৫২টি ইমারত টিকে আছে। এলাকার নিরাপত্তার জন্য পানামের অধিবাসীরা ইমারতগুলোর চারপাশ ঘিরে পরিখা খনন করেছিল। ব্রিটিশ আমলে নির্মিত এই ভবনগুলোতে ইউরোপীয় স্থাপত্যরীতি অনুসরণ করা হয়। তবে এদের নির্মাণ কলায় মোঘল স্থাপত্যেরও প্রভাব রয়েছে। পানামের আশপাশে আরও কয়েকটি চমৎকার ইমারত এখনো টিকে আছে। এগুলো তৈরি করেছিলেন স্থানীয় জমিদার ও ব্যবসায়ীরা। এগুলোর মধ্যে সরদার বাড়ি, আনন্দমোহন পোদ্দারের বাড়ি ও হাসিময় সেনের বাড়ি উলেস্নখযোগ্য।

ঘ) অর্ণব ও অর্পার মামা তাদের জাদুঘরে নিয়ে গেলে, তারা সেখানে সংরক্ষিত প্রত্নসম্পদ দেখে ঐতিহ্য সচেতন হতে পারবে। বাংলাদেশের পুরাকীর্তিগুলো থেকে পাওয়া অনেক প্রত্ননিদর্শন জাদুঘরে সংরক্ষণ ও প্রদর্শন করা হয়। অর্ণব ও অর্পার মামা তাদের এসব প্রত্নসম্পদ দেখাতে নিয়ে গেলে তারা সেগুলো দেখে দেশের পুরনো ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে ধারণা লাভ করে। ঢাকার জাতীয় জাদুঘর ছাড়াও দেশের বিভিন্ন জাদুঘরেও রয়েছে প্রচুর প্রত্নসম্পদ। জাতীয় জাদুঘরের গ্যালারিতে প্রত্ননিদর্শনের সঙ্গে প্রদর্শন করা হয়েছে বাংলার নবাব, জমিদার ও ইংরেজ শাসনামলের বেশকিছু প্রত্নসম্পদ। কোনো কোনো আঞ্চলিক জাদুঘর ও সংগ্রহশালায় নানা প্রত্ননিদর্শন প্রদর্শনের জন্য রাখা হয়েছে। অধিকাংশ সংগ্রহশালাই জমিদারদের পুরনো প্রাসাদে অবস্থিত। জমিদারদের ব্যবহার করা নানা দ্রব্য ও তাদের সংগ্রহ করা প্রত্নসম্পদ সেখানে প্রদর্শন করা হয়। উলিস্নখিত জাদুঘর ও সংগ্রহশালাগুলোতে অর্ণব ও অর্পার মামা তাদের নিয়ে গেলে সেখানে সংরক্ষিত প্রত্নসম্পদ দেখে তারা ঐতিহ্য সচেতন হতে পারবে।

৩। হাসি ও খুশি দুই বোন। ২৬ মার্চ বিকালে তারা পুরনো ঢাকায় উনিশ শতকে তৈরি একটি স্থাপত্যকর্ম দেখে মুগ্ধ হয়, যেটি ছিল একটি পার্ক। বাসায় এসে পার্কটি সম্পর্কে তার বাবাকে জিজ্ঞেস করলে, বাবা বলেন, এই পার্কটির সঙ্গে বাংলার স্বাধীনতার মর্মান্তিক ঘটনা জড়িত।

ক) ষাট গম্বুজ মসজিদ কোথায় অবস্থিত?

খ) প্রত্ন সম্পদ বলতে কী বোঝায়?

গ) উদ্দীপকে বর্ণিত হাসি ও খুশি যে স্থাপত্যকর্ম দেখে মুগ্ধ হয়েছিল তার নাম উলেস্নখপূর্বক ব্যাখ্যা করো।

ঘ) উক্ত পার্কটি কীভাবে আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত-তা আলোচনা করো।

উত্তর :

ক) ষাট গম্বুজ মসজিদ বাগেরহাট জেলায় অবস্থিত।

খ) প্রত্ন অর্থ পুরনো বা প্রাচীন। প্রত্ন সম্পদ বলতে পুরনো সময়ের বা প্রাচীন কালের স্থাপত্য, শিল্পকর্ম, মূর্তি বা ভাস্কর্য, অলংকার, মুদ্রা ইত্যাদিকে বুঝায়। যেসব জিনিস বা নিদর্শন দেখে দেশের পুরনো ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে ধারণা লাভ করা যায়, সেই সব নিদর্শনই প্রত্নসম্পদ। যার মধ্যদিয়ে আমরা পুরনো সময়ের বা প্রাচীনকালের মানুষের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অবস্থা, জীবনযাত্রা, বিশ্বাস-সংস্কার, রুচি ইত্যাদি সম্পর্কে ধারণা লাভ করতে পারি।

গ) হাসি ও খুশি পুরনো ঢাকার 'বাহাদুর শাহ' পার্ক দেখে মুগ্ধ হয়েছিল। উদ্দীপকে দেখা যাচ্ছে, হাসি ও খুশি উনিশ শতকের যে স্থাপত্যকর্ম দেখেছে, সেটি মূলত সময়ের বিবর্তনে বিভিন্ন নামে পরিবর্তিত হয়েছে যা আজকের বাহাদুর শাহ পার্কের ইঙ্গিত বহন করে। আর পার্ক সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে তাদের বাবা ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের ঘটনার কথা বলেছিলেন। আঠারো শতকের শেষের দিকে বর্তমান পার্কটির স্থানে আর্মেনীয়দের একটি বিলিয়ার্ড ক্লাব ছিল এবং এটিকে কেন্দ্র করে আন্টাঘর নামে একটি ডিম্বাকৃতির ময়দান ছিল। ১৮৫৮ সালে রানী ভিক্টোরিয়া ভারতবর্ষের শাসনভার গ্রহণের পর ঢাকা বিভাগের কমিশনার এ ময়দানেই নামকরণ সংক্রান্ত একটি ঘোষণা পাঠ করে শোনান। সেই থেকে ১৯৫৭ সালের আগ পর্যন্ত পার্কটি ভিক্টোরিয়া পার্ক নামে পরিচিত ছিল। উনিশ শতকের প্রথমার্ধ্বে ইংরেজরা এটিকে পার্কে রূপ দেয় এবং চারদিকে লোহা দিয়ে এর চারকোণায় চারটি দর্শনীয় কামান স্থাপন করেন। পরে ইংরেজরা ১৮৫৭ সালে সিপাহি বিদ্রোহের সময় এ ময়দানে ঢাকার বন্দি সিপাহিদের গাছের সঙ্গে ঝুলিয়ে ফাঁসি দেয়। ১০০ বছর পর, ১৯৫৭ সালে স্বাধীনতার জন্য জীবনদানকারী সৈনিকদের স্মৃতিতে 'ঢাকা ইমপ্রম্নভমেন্ট ট্রাস্ট' (ডিআইটি)-এর উদ্যোগে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মিত হয় এবং ভারতবর্ষের শেষ মোঘল সম্র্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের নামে স্থানটির নাম রাখা হয় বাহাদুর শাহ পার্ক। যেটি দেখে হাসি ও খুশি মুগ্ধ হয়েছিল।

ঘ) উদ্দীপকে ইঙ্গিতকৃত 'বাহাদুর শাহ' পার্ক অন্যায়ের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম ও জীবন উৎসর্গ করার অনুপ্রেরণা জোগায়, যা আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনকে সফল করে তুলেছিল। 'বাহাদুর শাহ' পার্কটি এ দেশে ইংরেজ শাসকদের বর্বরতা, অত্যাচার ও নির্মমতার বিরুদ্ধে দেশপ্রেমিক ও আত্মত্যাগী সিপাহিদের স্মৃতিচিহ্ন ধারণ করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ১৭৫৭ সালে বাংলার স্বাধীনতা অস্তমিত হয়। এর ১০০ বছর পর উপমহাদেশের স্বাধীনচেতা সিপাহিরা স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করে কিন্তু তাদের এই সশস্ত্র আন্দোলন সফল হতে পারেনি। সে সময় ঢাকায় ইংরেজদের হাতে বন্দি হওয়া সিপাহিদের গাছের সঙ্গে ঝুলিয়ে ফাঁসি দেওয়া হয়েছে। তবে ভারতীয়দের এ আত্মত্যাগের স্মৃতিচিহ্ন ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা আন্দোলনে অনুপ্রেরণার আলো ছড়িয়ে ছিল। একইভাবে বাঙালির স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাস সশস্ত্র সংগ্রাম, অধিকার আদায়ে আত্মোৎসর্গসহ নানা ঘটনায় পরিপূর্ণ। নানান ঘটনার পরিক্রমায় ১৯৭০ সালে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে বাঙালি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে এবং আওয়ামী লীগকে জয়ী করে। কিন্তু জয়ী হয়েও বাঙালি ন্যায্য অধিকার ফিরে পায়নি। উপমহাদেশের প্রথম স্বাধীনতা আন্দোলন থেকে এ দেশের মানুষ বুঝতে পারে, সশস্ত্র সংগ্রাম আর আত্মত্যাগ ছাড়া মুক্তি অর্জন সম্ভব নয়। তাই ১৯৭১ সালে বাঙালি ঐক্যবদ্ধ হয়ে সশস্ত্র মুক্তি সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এভাবে 'বাহাদুর শাহ' পার্ক বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে অনুপ্রেরণার আলো ছড়িয়ে ছিল। তাই পার্কটি আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনে জড়িত ছিল বলা যায়।

হ পরবর্তী অংশ আগামী সংখ্যায়

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
X
Nagad

উপরে