আগের সিদ্ধান্ত বাতিল করল ঢাবি, সব পরীক্ষা স্থগিত

হল খোলার দাবিতে শিক্ষার্থীরা অনড়

হল খোলার দাবিতে শিক্ষার্থীরা অনড়
আন্দোলনরত ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা -স্টারমেইল

বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হল খুলে দেওয়ার দাবিতে শিক্ষার্থীরা এখনো অনড় অবস্থানে রয়েছেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বুধবার পর্যন্ত আন্দোলন স্থগিত করলেও হল ছেড়ে যেতে রাজি নয় তারা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হল মার্চের মধ্যে খুলে দেওয়ার দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, তাদের বেঁধে দেওয়া ৭২ ঘণ্টা সময় পেরিয়ে যাওয়ার পর পরবর্তী সিদ্ধান্ত জানাবে। ৭২ ঘণ্টার আলটিমেটাম আজ শেষ হবে। এদিকে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ১ মার্চের মধ্যে হল খোলার আলটিমেটাম দিয়েছেন।

অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক কাউন্সিল জরুরি সভা করে আগের সব সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে। সোমবার শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনির ঘোষণার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তারা বলছেন, স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্বের পরীক্ষার্থীদের জন্য ১৩ মার্চ থেকে আবাসিক হলগুলো খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত স্থগিত থাকবে। একইসঙ্গে পরীক্ষার রুটিনও বাতিল করা হয়েছে। মঙ্গলবার অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলের জরুরি সভা ডেকে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

দেশে করোনাভাইরাসের প্রকোপে মৃতু্যর পরপরই গত বছরের মার্চ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। এরই মধ্যে অনলাইনে ক্লাস নেওয়া শুরু হলেও আবাসন সংকটে থাকা শিক্ষার্থীরা হল খুলে দেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছিলেন।

গত শুক্রবার থেকে আন্দোলন করে যাচ্ছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। শনিবার ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ এবং পরদিন বিভিন্ন হলের তালা ভেঙে ভেতরে অবস্থান নিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও সোমবার এবং মঙ্গলবার একই দাবিতে উত্তাল ছিল। অনুমতি ছাড়া তালা ভেঙে হলে অবস্থান নেওয়া শিক্ষার্থীরা হল ত্যাগে রাজি হচ্ছেন না। জাহাঙ্গীরনগরের মেয়ে শিক্ষার্থীরা দুটি হলের তালা ভেঙে ভেতরে অবস্থান নিয়েছেন গত সোমবার থেকে।

পরিস্থিতির আকস্মিকতায় শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি সোমবার জরুরি সংবাদ সম্মেলন ডেকে আগামী রমজান ও ঈদুল ফিতরের পর ২৪ মে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস শুরু এবং এর সাত দিন আগে ১৭ মে থেকে আবাসিক হল খুলে দেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্তের কথা জানান। মন্ত্রিসভার বৈঠক থেকে প্রধানমন্ত্রী স্কুল-কলেজ খোলার পরিস্থিতি পর্যালোচনার নির্দেশ দেন।

এরই প্রেক্ষিতে মঙ্গলবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা পরিষদ (অ্যাকাডেমিক কাউন্সিল) জরুরি বৈঠকে মিলিত হন। বৈঠকে বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষ সরকারের সিদ্ধান্তের সঙ্গে সহমত প্রকাশ করে আগের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার ঘোষণা দেয়। একই সঙ্গে আগামী ১৭ এপ্রিলের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীকে করোনার টিকার প্রথম ডোজের আওতায় আনার জন্য সরকারের প্রতি সুপারিশ করা হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা-সংক্রান্ত যেকোনো বিষয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সর্বোচ্চ ফোরাম অ্যাকাডেমিক কাউন্সিল গতকাল সকাল সাড়ে ১০টা থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত রুদ্ধদ্বার বৈঠক করে।

বৈঠক শেষে সংবাদ সম্মেলনে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ডক্টর মো. আখতারুজ্জামান বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের করোনা টিকা দেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে সরকার ও সরকারপ্রধান শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ জানিয়েছে অ্যাকাডেমিক কাউন্সিল।

উপাচার্য বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক শেষবর্ষ ও স্নাতকোত্তরের পরীক্ষার্থীদের হলে তোলার যে সিদ্ধান্ত ছিল, টিকা পাওয়ার সুবিধার্থে, তা পুনঃবিবেচনা করে ১৭ মে'র পর হলে শিক্ষার্থীদের ওঠানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। এর আগেই যাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীকে টিকার প্রথম ডোজের আওতায় আনা হয়, এর জন্য অনুরোধ জানানো হয়েছে সরকারকে।

আখতারুজ্জামান বলেন, ১৩ মার্চকে সামনে রেখে বড় আকারের যে পরীক্ষাগুলোর তারিখ ঘোষিত ছিল, সেগুলো স্থগিত করা হলো। তবে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কখনো স্থবির হয় না, এখানে বহু ধরনের পরীক্ষা সব সময় হতে থাকে। কখনো ভাইভা, কখনো ল্যাব পরীক্ষা ইত্যাদি হতেই থাকে। হল খোলার পর শিক্ষার্থীদের দুই সপ্তাহের প্রস্তুতির সময় দিয়ে পরীক্ষাগুলো নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

শিক্ষার্থীদের হল খোলার দাবির বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বলেন, 'আমাদের শিক্ষার্থীরা সব সময় যৌক্তিক অবস্থানে থাকে ও তারা দায়িত্বশীল আচরণের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। ফলে যখন তাদের সুরক্ষার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে একটি মহৎ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, শিক্ষার্থীরা ধৈর্য ও মূল্যবোধ, আইনশৃঙ্খলার প্রতি শ্রদ্ধাশীলতায় কোনো ঘাটতি দেখাবে না। যেকোনো সৎ প্রয়াসের সঙ্গে আমাদের শিক্ষার্থীরা সব সময় সহমত ও একীভূত থাকে।'

অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলের সভা শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এখনই হল খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার ব্যাখ্যা দিয়ে সাংবাদিকদের বলেন, 'মহামারি পরিস্থিতিতে বিচ্ছিন্নভাবে, সমন্বয়হীন সিদ্ধান্ত নেওয়া জাতির জন্য হুমকি। সেটি স্বাস্থ্যে ঝুঁকি বাড়ায়, প্যানডেমিক রুলস-রেগুলেশন সেটি পারমিট করে না।

ঢাবি প্রশাসনের সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে হল খোলার দাবিতে আন্দোলরত শিক্ষার্থীদের মুখপাত্র জুনায়েদ হুসেইন বলেন, 'আমাদের আলটিমেটাম চলছে, ৭২ ঘণ্টা পর আমরা পরবর্তী সিদ্ধান্ত জানাব।'

হল ছাড়বেন না জাবি শিক্ষার্থীরা : আন্দোলন স্থগিত

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নির্দেশনা অমান্য করে আবাসিক হলে অবস্থান করছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। সোমবার রাতে দুই দফা চেষ্টা করেও তাদের হলছাড়া করতে পারেনি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল টিম ও হল প্রশাসন। তবে শিক্ষার্থীদের চলমান আন্দোলন স্থগিত করা হয়েছে। মঙ্গলবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহণ চত্বরের আন্দোলন বুধবার পর্যন্ত স্থগিত করার কথা জানানো হয়েছে। তবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত হলেই থাকবেন বলে জানিয়েছে তারা।

নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের ৪৫তম ব্যাচের শিক্ষার্থী নোশিন আদিবা সাংবাদিকদের বলেন, 'কয়েক দিনের আন্দোলনে আমাদের দাবি ছিল, শিক্ষার্থীদের ওপর যে হামলা হয়েছে, এর বিচার ও নিরাপত্তার জন্য হলে থাকতে দিতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন মামলা করেছে, মামলার প্রক্রিয়ায় সময় লাগবে বলে প্রশাসন আমাদের কাছে সময় চেয়েছে, সে জন্য আন্দোলন স্থগিত করা হয়েছে।' তবে নিরাপত্তার স্বার্থে এখনই হল ছাড়বেন না বলে তিনি জানান।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৬টি আবাসিক হল রয়েছে। ছাত্রদের আটটি আর মেয়েদেরও আটটি হল রয়েছে। ছাত্রদের হলগুলোতে ছাত্ররা এবং ছাত্রীদের দুটি হলে ছাত্রীরা অবস্থান করছেন। প্রক্টরিয়াল টিম ও হলের প্রাধ্যক্ষ সেখানে গিয়ে ছাত্রীদের হল ছেড়ে যেতে অনুরোধ করলেও তারা ছাড়েন নি।

আলটিমেটাম ইবি শিক্ষার্থীদের

আমাদের ইবি প্রতিনিধি শাহাব উদ্দীন ওয়াসিম জানান, ১ মার্চের মধ্যে ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) সব আবাসিক হল খুলে দিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম স্বাভাবিক করার আলটিমেটাম দিয়েছেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। বিশ্ববিদ্যালয়ে চলমান পরীক্ষা স্থগিতের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার ও ১ মার্চের মধ্যে হল খুলে দেওয়া না হলে যেকোনো মূল্যে হলে ওঠার ঘোষণা দেন তারা।

মঙ্গলবার বিশ্ববিদ্যালয়ের ডায়না চত্বরে সাংবাদিক সম্মেলনে এই ঘোষণা দেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। পাশাপাশি, ১ মার্চ পর্যন্ত চলমান আন্দোলন স্থগিতও করেছেন শিক্ষার্থীরা। দাবির স্বপক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডায়না চত্বরসহ ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল করেন শিক্ষার্থীরা। পরে তারা প্রশাসন ভবনের সামনে অবস্থান করেন এবং ভিসির সঙ্গে তিন সদস্যের প্রতিনিধি দল সাক্ষাৎ করেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর ডক্টর শেখ আবদুস সালাম পরে সাংবাদিকদের বলেন, 'আমি শিক্ষার্থীদের দাবির সঙ্গে একমত। তবে আমরা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের বাইরে কিছু করতে পারছি না।'

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী জি. কে সাদিক আগামী ১৭ মে হল, ২৪ মে ক্যাম্পাস খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত অযৌক্তিক ও প্রত্যাখ্যান এবং ওই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়ে বলেন, ১ মার্চের মধ্যে হল ও ক্যাম্পাস খুলে দেওয়া না হলে শিক্ষার্থীরা হলে ঢোকার ব্যবস্থা নিজেরাই করে নিবেন। এর জন্য কোনো পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে এর দায়ভার বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে নিতে হবে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

আরও খবর

Copyright JaiJaiDin ©2021

Design and developed by Orangebd


উপরে