করোনার টিকায় লাখে মাত্র ২৬ জনের মৃদু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া

করোনার টিকায় লাখে মাত্র ২৬ জনের মৃদু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
টিকাদানে এক সেবিকার প্রস্তুতি

দেশে গত ৭ ফেব্রম্নয়ারি গণটিকাদান শুরুর পর থেকে ২২ ফেব্রম্নয়ারি পর্যন্ত মাত্র ১৬ দিনে ২৩ লাখ ৮ হাজার ১৫৭ জন এ কর্মসূচির আওতায় এসেছে। টিকা গ্রহণকারী কারো মধ্যেই এখন পর্যন্ত মারাত্মক কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দেয়নি। তবে এদিন পর্যন্ত টিকা নেওয়া ৬০৯ জনের সামান্য জ্বর, টিকার জায়গায় ফোলা বা ব্যথা, বমি ও ডায়েরিয়া হয়েছে- যা স্বল্পমাত্রার ওষুধ খেয়ে কয়েকদিনের মধ্যেই সেরে গেছে। এ হিসাবে প্রতি এক লাখে মাত্র ২৬ জনের মৃদু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। অর্থাৎ শূন্য দশমিক শূন্য দুই-ছয় শতাংশ মানুষের মৃদু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হয়েছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে টিকার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার যে হার, তা বিশ্বের টিকা গ্রহণকারী অন্যান্য দেশের তুলনায় যথেষ্ট কম। এ হার আরও কমে গেলে তা বিস্ময়ের কোনো ব্যাপার হবে না। এর ব্যাখ্যা দিয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলেন, প্রথম ধাপে যারা টিকা নিচ্ছেন, তাদের সিংহভাগই চলিস্নশোর্ধ্ব। যাদের একটি বড় অংশই অ্যাজমা ও ডায়াবেটিকসহ বহুমাত্রিক রোগে আক্রান্ত। এছাড়া এদের অনেকেই রক্ত পাতলা করার ওষুধ নিয়মিত সেবন করেন। ফলে স্বাভাবিকভাবেই তাদের মধ্যে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বেশি দেখা দেওয়ার কথা। অথচ এখন পর্যন্ত শুধুমাত্র মৃদু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার যে হার তা খুবই সামান্য। তাই আগামীতে আঠারোর্ধ্ব সবাইকে টিকার আওতায় আনা হলে এ হার আরও কমার সম্ভাবনাই বেশি।

এদিকে বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে করোনার টিকার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া যে বেশ কম, তা সেখানকার টিকা গ্রহণকারী মানুষের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার পরিসংখ্যানের সঙ্গে তুলনামূলক বিশ্লেষণে সহজেই নিশ্চিত হওয়া গেছে। জানা গেছে, গত ১৬ জানুয়ারি ভারতে গণটিকাদান কর্মসূচির শুরুর পর প্রথম তিন দিনে ৩ লাখ ৮০ হাজার মানুষকে করোনাভাইরাসের টিকা দেওয়া হয়। এর মধ্যে ৫৮০ জনের শরীরে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। তাদের মধ্যে সাতজনকে হাসপাতালে চিকিৎসা দিতে হয়েছে। উলেস্নখ্য, ভারতে অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার কোভিশিল্ড টিকার পাশাপাশি দেশের বায়োটেকের উদ্ভাবিত কোভ্যাকসিন টিকাও একই সঙ্গে দেওয়া হচ্ছে।

এদিকে যুক্তরাজ্যে অন্তত এক ডোজ টিকা নেওয়া ৪০ হাজার লোকের ওপর চালানো একটি জরিপে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার যে হার বলা হয়েছে সেটিও বেশ চড়া। ওই জরিপ প্রতিবেদনে বলা হয়, টিকা গ্রহণকারীদের মধ্যে এক-তৃতীয়াংশের কিছু বেশি লোকের কোনো না কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হয়েছে। যদিও এর কোনোটিই গুরুতর কিছু নয়। জরিপের তথ্য অনুযায়ী, ৩৭ শতাংশের ক্ষেত্রে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বলতে ছিল ব্যথা, এবং টিকা দেবার জায়গাটিতে ফুলে যাওয়া। এছাড়া দ্বিতীয় ডোজ নিয়েছেন এমন লোকের মধ্যে ৪৫ শতাংশের এ প্রতিক্রিয়া হয়েছে।

আর যারা এক ডোজ টিকা নিয়েছেন তাদের ১৪ শতাংশের ক্ষেত্রে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছিল টিকা নেবার এক সপ্তাহের মধ্যে জ্বর, গায়ে ব্যথা, গা-শিরশির করা, দুর্বল বোধ করা বা মাথাব্যথা। যারা দুটি ডোজ নিয়েছে তাদের ক্ষেত্রে ২২ শতাংশ পর্যন্ত লোকের এমন প্রতিক্রিয়া হয়েছে। যদিও তা কয়েক দিনের মধ্যে ভালো হয়ে গেছে।

এদিকে বাংলাদেশে বর্তমানে কোভিশিল্ড নামের যে টিকা দেওয়া হচ্ছে, তার প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট তাদের ওয়েবসাইটে বলেছে, টিকা নেওয়ার পর হালকা গা ব্যথা, সামান্য জ্বর, চুলকানি, টিকা দেওয়ার স্থান ফুলে ওঠা, ঠান্ডা লাগা, বমি ভাব, মাথাব্যথা বা ক্লান্তিবোধ করার মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে। প্রতি ১০ জনের মধ্যে একজনের শরীরে এসব পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। পেট ব্যথা, অতিরিক্ত ঘাম, মাথা ঘোরা, শরীরে ফুসকুড়ি ওঠার মতো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে এক শতাংশের মধ্যে। মারাত্মক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার মধ্যে যা ঘটতে পারে তা হলো শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া কিংবা মারাত্মক জ্বর।

অথচ এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে টিকার যে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দেওয়ার খবর পাওয়া গেছে তা শুধুমাত্র মৃদু এবং এ হার সেরাম ইনস্টিটিউটের ধারণাকৃত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ৩৮৪ গুণ কম। অন্যভাবে বলতে গেলে, সেরামের ধারণাকৃত হারে দেশে টিকা গ্রহণকারীদের মধ্যে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা গেলে অন্তত ২৩ হাজার জনের গা ব্যথা, জ্বর, চুলকানি, ঠান্ডা লাগা, বমি ভাব, মাথাব্যথা বা কান্তিবোধ হওয়ার কথা। অথচ এ সংখ্যা ২২ ফেব্রম্নয়ারি পর্যন্ত মাত্র ৬০৯ জন।

টিকা নেওয়ার পর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া মানেই তার শরীরে টিকা কাজ করছে, এ তথ্যের কোনো ভিত্তি নেই বলে দাবি করেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)-এর প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. এএসএম আলমগীর বলেন, 'টিকা নেওয়ার পর শরীরে এক ধরনের ইমিউনোলজিক্যাল পরিবর্তন হয়। এর কারণে কারও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে, কারও নাও হতে পারে। পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া না দেখা দিলে টিকা কাজ করছে না, এ তথ্য ঠিক নয়।

এদিকে গণটিকাদান কর্মসূচির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক ও নার্সরা অনেকেই মনে করছেন, টিকায় মৃদু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দেওয়া মানুষের যে সংখ্যা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যে চিত্রে দেওয়া হচ্ছে তা হয়তো পুরোপুরি সঠিক নয়। তাদের ধারণা, টিকা নেওয়ার পর মৃদু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিলেও অনেকেই এ বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করছে না। বেশিরভাগ মানুষই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ধরন অনুযায়ী ওষুধ কিনে খাচ্ছেন। এ কারণে মৃদু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার সঠিক চিত্র না-ও উঠে আসতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত কারো যে গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দেয়নি- তা নিশ্চিত হওয়া যায় বলে মনে করেন তারা।

তাদের এ ধারণা যে একেবারে অমূলক নয়, তা টিকা গ্রহণকারী অসংখ্য নারী-পুরুষের সঙ্গে কথা বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। দেশের খ্যাতনামা একটি শিপিং লাইন্সের উপ-মহাব্যবস্থাপক আবুল কালাম মো. শাহজাহান জানান, গত সপ্তাহে তিনি টিকা নেওয়ার দুইদিন পর তার শরীরের তাপমাত্রা ১০১ থেকে ১০২ ডিগ্রিতে ওঠানামা করতে শুরু করে। তিনি তিন দিন দু'বেলা প্যারাসিটামল খাওয়ার পর তা সেরে যায়। বিষয়টি স্বাভাবিক ধরে নেওয়ায় তিনি এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেননি।

বনশ্রীর বাসিন্দা হোমিও চিকিৎসক আবুল বাসার জানান, টিকা নেওয়ার পর তিনি কয়েকদিন মাথা ব্যথায় ভোগেন। এছাড়া ওইসময় তিনি বেশ ক্লান্তিবোধ করেছেন। তবে পূর্ণ বিশ্রামে থাকায় তা সেরে গেছে। তাকে কোনো ওষুধও খেতে হয়নি। তাই বিষয়টি কাউকে জানানোর প্রয়োজন বোধ করেননি।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

আরও খবর

Copyright JaiJaiDin ©2021

Design and developed by Orangebd


উপরে