ভোগান্তির সঙ্গে লাগামহীন ভাড়া

নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে চলছে দূরপালস্নার বাস, ফেরি চলাচল স্বাভাবিক, বিমানেও অস্বাভাবিক ভাড়া
ভোগান্তির সঙ্গে লাগামহীন ভাড়া
প্রিয়জনের সান্নিধ্যে ঈদ কাটাতে বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে, ভোগান্তি পেরিয়ে বাড়ির পথে ছুটছে মানুষ -ফোকাস বাংলা

প্রিয়জনের সান্নিধ্য ছাড়া ঈদ যেন অপূর্ণ থেকে যায়। সে কারণে এবারের ঈদে পরিবহণ সংকটে সীমাহীন ভোগান্তির পাশাপাশি লাগামহীন ভাড়ায় সবাই যেতে চাইছেন প্রিয় গ্রামে। ভেঙে ভেঙে হোক আর বিকল্প কোনো পরিবহণেই হোক নিয়মিত ভাড়া ১০ থেকে ১৫ গুণ টাকা খরচ করেও স্বস্তিতে বাড়ি ফিরতে পারছেন না বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। অনেক টাকা খরচ করে কোনো রকম গাদাগাদি করে বাড়ি ফিরতে পারলে কিছুটা স্বস্তি পাচ্ছেন।

যাত্রীদের এমন অনুভূতি আর অব্যাহত চাপে ঈদের আগে ফেরি চলাচল বন্ধ রাখার ঘোষণা দিলেও সোমবার বিকাল থেকে ফেরি চলাচল স্বাভাবিক করে দিতে বাধ্য হয় বিআইডাবিস্নউটিসি। তবে চলাচলের ঘোষণা না আসলেও নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে চলছে দূরপালস্নার বাস।

বৈশ্বিক মহামারি করোনা ভাইরাসের বিস্তার রোধে দূরপালস্নার বাস, ট্রেন ও লঞ্চ চলাচল বন্ধ রেখেছে সরকার। একই সঙ্গে ঈদের ছুটিতে কর্মস্থল ত্যাগ না করার নির্দেশ দেওয়া হয়। সরকারের এমন নির্দেশনা উপেক্ষা করেই বাড়ি যাচ্ছেন নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ।

সোমবার সড়ক পথে বিকল্প বিভিন্ন পরিবহণ, বিমান ও ফেরিতে করে নদী পার হয়ে ঢাকা ছেড়েছেন হাজার হাজার মানুষ। এবারের ঈদযাত্রায়

\হপর্যাপ্ত যান না থাকায় গন্তব্যে যেতে অস্বাভাবিক ভাড়া গুনতে বাধ্য হচ্ছেন যাত্রীরা। লাগামহীন ভাড়া হাঁকার তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ করতে না পারলেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ক্ষোভ ঝেড়েছেন অনেকেই। প্রায় সব পথেই হ পৃষ্ঠা ২ কলাম ২

অস্বাভাবিক যাতায়াত খরচ গুনতে হচ্ছে ঈদযাত্রীদের। বিমানের যাত্রীদের কাছ থেকেও গলাকাটা ভাড়া আদায় করার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

ঢাকা থেকে যশোর স্বাভাবিক সময়ে ৩ থেকে সাড়ে চার হাজার টাকা পর্যন্ত। কিন্তু ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা দিয়ে ঢাকা-যশোর বিমান টিকিট বুকিং দিচ্ছেন যাত্রীরা। ঢাকায় ফেরার ক্ষেত্রেও বাড়তি ভাড়া গুনতে হচ্ছে যাত্রীদের। জামাল উদ্দিন নামের এক যাত্রী ক্ষোভ প্রকাশ করে ফেসবুকে লিখেন রোববার রাতে সাড়ে ৯ হাজার টাকা দিয়ে যশোর থেকে ঢাকায় এসেছেন তিনি। রুটের বিমান যাত্রীদেরও চার থেকে পাঁচগুণ ভাড়া গুনতে হচ্ছে। অনেকেই বাড়তি ভাড়া দিয়েও পাচ্ছেন না বিমানের টিকিট।

এদিকে, নিম্নআয়ের মানুষজন ট্রাক-পিকআপে করে বাড়ি যাচ্ছেন। কিন্তু বাড়তি ভাড়া থেকে রেহাই পাচ্ছেন না তারা। সোমবার প্রথম প্রহরে মাঝারি সাইজের একটি ট্রাক পান্থপথের বসুন্ধরা সিটি শপিংমলের সামনে এসে থামে। কিছুক্ষণ পর শুরু হয় যাত্রী তোলা। কেউ পুরনো পত্রিকা আবার কেউ পরিত্যক্ত বিভিন্ন প্যাকেট বা বস্তা বিছিয়ে বসে পড়ছেন ট্রাকে। অনেকটা গাদাগাদি করে বাড়ির উদ্দেশ্যে গভীর রাতে ঢাকা ছাড়ছেন তারা।

তাদের একজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, আশপাশের বিভিন্ন দোকানের কর্মচারীরা মিলে এই ট্রাকটি ভাড়া করেছেন। তারা সবাই উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় যাবেন। ১৫শ থেকে ৩ হাজার টাকা করে জনপ্রতি ভাড়া দিয়েছেন তারা। তাদের একজন জানান, বগুড়ায় যাওয়ার জন্য তিনি ১৮শ টাকা দিয়েছেন!

তাছাড়া সোমবার ঢাকা থেকে বের হওয়ার বিভিন্ন পয়েন্টে ট্রাক, পিকআপসহ পণ্যবাহী বিভিন্ন গাড়িতে যাত্রী পরিবহণ করতে দেখা গেছে। এসব পরিবহণে যাত্রীদের মধ্যে স্বাস্থ্যবিধি মানার ব্যাপারে উদাসীনতা লক্ষ্য করা গেছে। অন্যদিকে, চলাচল বন্ধ রাখার সরকারি সিদ্ধান্তের পরও রাজধানীর বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে ছেড়ে গেছে দূরপালস্নার বাস। রাতের বেলায় কাউন্টার থেকে বিশেষ পদ্ধতিতে টিকিট বিক্রি করে যাত্রীদের এসব বাসে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। কাউন্টারের দায়িত্বে থাকা লোকজন বলছে সবাইকে ম্যানেজ করেই যাত্রী নিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে যাচ্ছেন তারা।

রাজধানীর কমলাপুর, মতিঝিল, শ্যামলী, মিরপুর, পান্থপথসহ বিভিন্ন এলাকার বাস কাউন্টার থেকে অত্যন্ত গোপনে যাত্রীদের বাসে নিয়ে যাচ্ছেন তারা। আশপাশে দায়িত্বে থাকা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও কোনো ধরনের বাধা দিচ্ছেন না।

তাছাড়া ঢাকার ভেতরে চলাচলকারী বিভিন্ন বাসে করেও দূরপালস্নার যাত্রী পরিবহণ করতে দেখা গেছে। অনেকেই জেলার ভেতর চলাচলকারী বাস, সিএনজি, মাইক্রোবাস, প্রাইভেটকার ও মোটর সাইকেল দিয়ে ভেঙে ভেঙে বাড়ি গিয়েছেন অনেকেই।

যাত্রী আর এসব পরিবহণের চাপে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন মহাসড়ক ও টুল পস্নাজার সামনে দীর্ঘ যানজট লেগে যেতে দেখা গেছে। বিশেষ করে গাজীপুরের টঙ্গী ও কালিয়াকৈরে শ্রমিক বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়। যার প্রভাব পড়ে ঢাকা-টাঙ্গাইল ও ঢাকা ময়মনসিংহ মহাসড়কে। তাছাড়া সোমবার রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ঘরমূখী মানুষের চাপ আর ঈদ শপিংকে কেন্দ্র করে যানজটের সৃষ্টি হয়।

টাঙ্গাইল থেকে আমাদের স্টাফ রিপোর্টার জানিয়েছেন, ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের বঙ্গবন্ধু সেতু এলাকায় যানবাহনের বাড়তি চাপে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। মহাসড়কে মাইক্রোবাস, প্রাইভেটকার, ট্রাক, পিকআপের পাশাপশি দূরপালস্নার যানবাহনও ছিল। রোববার ভোর ৬টা থেকে সোমবার ভোর ৬টা পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু সেতু দিয়ে প্রায় ৩২ হাজার যানবাহন পারাপার হয়েছে বলে জানিয়েছেন সেতু রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বপ্রাপ্তরা।

অপরদিকে, গাবতলী থেকে মানিকগঞ্জের পাটুরিয়া ঘাটে বিভিন্ন লোকাল বাসে করে যাত্রী পরিবহণ করতে দেখা গেছে। জেলার বাইরে যাওয়া বা দুই সিটে একজন করে নেওয়ার সরকারি নিয়মের কোনো তোয়াক্কা করা হয়নি। বরং স্বাস্থ্যবিধি অমান্য করে গাদাগাদি করে যাত্রী পরিবহণ করেছে বাসগুলো। ভাড়াও নিয়েছে তিনগুণ। স্বাভাবিক সময়ে ১০০ টাকা ভাড়া নিলেও সোমবার ৩০০ টাকা করে নিয়েছে।

মাদারীপুর থেকে আমাদের স্টাফ রিপোর্টার ও গোয়ালন্দ (রাজবাড়ী) প্রতিনিধি জানিয়েছেন, সোমবার সকাল থেকে পুলিশ-বিজিবির বাধা উপেক্ষা করে ফেরি ঘাটে মানুষের ঢল নামে। পাটুরিয়া ও শিমুলিয়া ঘাটে মানুষের চাপ সামলাতে হিমশিম খেতে হয়েছে ফেরি কর্তৃপক্ষকে। সকাল থেকে যে কয়েকটি ফেরি ছেড়ে গেছে প্রায় সব ক'টিতেই মানুষের উপচে পড়া ভিড় ছিল। গাদাগাদি করে একসঙ্গে যাওয়ায় স্বাস্থ্যবিধি বা শারীরিক দূরত্ব মানা সম্ভব হয়নি তাদের।

তাছাড়া শিমুলিয়া-বাংলাবাজার নৌ পথে ট্রলারে করেও নদী পার হয়েছেন যাত্রীরা। এ সময় ছয়টি ট্রলার মাঝিসহ আটক করে নৌ পুলিশ। মাওয়া ফাঁড়ির ইনচার্জ সিরাজুল কবির জানান, সোমবার সকালে পদ্মা পার হওয়ার চেষ্টাকালে তাদের আটক করা হয়।

ফেরি চলাচল স্বাভাবিক

বাংলাবাজার-শিমুলিয়া নৌরুটসহ প্রায় সব ঘাটেই ফেরি চলাচলে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহণ কর্তৃপক্ষের (বিআইডবিস্নউটিসি)। বাংলাবাজার ঘাট ম্যানেজার সালাউদ্দিন বলেন, ঘাটে মানুষের ভিড় কমছেই না। যে কয়েকটি ফেরি চলাচল করছে তাতে যাত্রীরা গাদাগাদি করে উঠে পড়ছেন। ঘাটে আটকে থাকা অনেক কাঁচামাল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ সোমবার দুপুরের পর ফেরি চলাচল স্বাভাবিক করে দিয়েছে। এখন সব ধরনের ফেরি চলাচল করবে। তাই ঈদে ঘরমুখো যাত্রীদের আর বিড়ম্বনা পোহাতে হবে না বলে জানান তিনি।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

আরও খবর

Copyright JaiJaiDin ©2021

Design and developed by Orangebd


উপরে