রোববার, ২৭ নভেম্বর ২০২২, ১২ অগ্রহায়ণ ১৪২৯

কারাগারে মাদক নিরাময় কেন্দ্রের সুফল মিলছে না

নানা জটিলতায় কার্যক্রম চলছে ঢিমেতালে বন্দিদের ৪০% মাদক মামলার আসামি
গাফফার খান চৌধুরী
  ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০০:০০
যথাযথ তদারকির অভাবে কারাগারের মাদক নিরাময় কেন্দ্রের আশাতীত সুফল মিলছে না। কারাবন্দিদের ৪০ শতাংশই মাদক মামলার আসামি। দিনে দিনে এ সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। কারাবন্দি মাদকাসক্তদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে প্রতিটি কারাগারে মাদক নিরাময় কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েেেছ। অনেক কারাগারে মাদক নিরাময় কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। নানা জটিলতায় কারাগারে মাদক নিরাময় কেন্দ্রের কার্যক্রম চলছে ঢিমেতালে। এদিকে, কারাগারে নিরাময় কেন্দ্রের শতভাগ সুফল মিলছে না। ফলে মাদকাসক্তদের অনেকেই জামিনে বেরিয়ে আবারও মাদকে জড়িয়ে পড়ছে। জঙ্গিবাদের মতো মাদক নিয়ন্ত্রণে না রাখতে পারায় সরকারের শীর্ষপর্যায় থেকে চরম অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়েছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের নিরোধ ও গবেষণা শাখা সূত্রে জানা গেছে, সারাদেশে মাদকাসক্তের সংখ্যা দুই কোটির বেশি। যার মধ্যে এক কোটি নিয়মিত মাদকাসক্ত। আর বাকিরা অনিয়মিত মাদকসেবী। সারাদেশে বেসরকারি মাদক নিরাময় কেন্দ্রের সংখ্যা আগে ছিল ২৯৯টি। গত ৪ বছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৩০টিতে। মাদকাসক্তের পরিমাণ বাড়ার কারণে ঢাকার তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এলাকায় মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ৫০ শয্যার হাসপাতালটি ২৫০ শয্যায় উন্নীত করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য মতে, প্রতিদিন সারাদেশে মাদক আইনে মামলা দায়েরের সংখ্যা দুই শতাধিক। আটকের সংখ্যা প্রায় তিনশ'। কারা অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, দেশের ৬৮টি কারাগারে বন্দি ধারণ ক্ষমতা প্রায় ৩৫ হাজার। সেখানে বর্তমানে বন্দির সংখ্যা প্রায় ৮৬ হাজার। কারাগারগুলোতে প্রায় আড়াই হাজার মাদকাসক্ত বন্দি রয়েছে। এ ছাড়া মাদক মামলায় আটক রয়েছে ৩৫ হাজারের বেশি। যার মধ্যে ১৫ হাজারের বেশি বন্দির বিভিন্ন মেয়াদে সাজা হয়েছে। সূত্রটি বলছে, বন্দিদের ৪০ শতাংশই মাদক মামলার আসামি। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সরকার দেশের প্রতিটি কারাগারে মাদক নিরাময় কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেয়। এই ধারাবাহিকতায় ঢাকা, রাজশাহী, দিনাজপুরসহ দেশের অনেক জেলা কারগারে মাদক নিরাময় কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। সূত্রটি বলছে, এখনো অনেক কারাগারে স্থায়ীভাবে মাদক নিরাময় কেন্দ্র স্থাপিত হয়নি। আবার মাদক নিরাময় কেন্দ্র থাকলেও মাদকাসক্ত বন্দিরা নিরাময় কেন্দ্রে থাকতে নারাজ। মাদকাসক্ত বন্দিদের দাবি, তারা মাদকাসক্ত নয়। বন্দি মাদকাসক্ত কিনা-তা পরীক্ষা নিরীক্ষা করে নিশ্চিত হওয়ার মতো প্রয়োজনীয় উপকরণ ও জনবল কারাগারে নেই। এজন্য নিরাময় কেন্দ্র থাকলেও অনেক সময়ই তা কাজে আসছে না। দায়িত্বশীল একজন কারা কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, এমন জটিল পরিস্থিতির কারণে অনেক মাদকাসক্ত বন্দিদের আর শনাক্ত করা যায় না। এছাড়া কারারক্ষীদের মধ্যেও অনেকেই আবার মাদক আনা নেওয়ার সঙ্গে জড়িত থাকে। তারা মাদকাসক্ত বন্দিদের টাকার বিনিময়ে মাদক সরবরাহ করে থাকে বলেও অভিযোগ রয়েছে। কারাগারের গোয়েন্দা সেলের সদস্যরা মাঝে মধ্যেই কারাগারে অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তারও করে। ইতোমধ্যেই অনেক কারারক্ষীকে এসব কারণে চাকরিচু্যত করা হয়েছে। অনেক বন্দিকে কারা আইনে বাড়তি সাজা দেওয়া হয়েছে। তবে অবস্থার তেমন উন্নতি হয়নি। কারণ অনেক বন্দি কারাগারে প্রবেশ করার পরেই মাদক এমনকি বিড়ি সিগারেট পর্যন্ত খাওয়া বাদ দিয়ে ধর্ম কর্মে নেমে পড়ে। তাদের আর ধরার পথ থাকে না। এসব বন্দিদের প্রায় ৮০ শতাংশই স্বল্প সময়ের জন্য কারাগারে আসে। তারা জামিনে বেরিয়ে আবার মাদক জড়িয়ে পড়ে বলে পরবর্তীতে মাদক মামলায় কারাগারে আসার পর জানা যায়। কারা সূত্র জানায়, মাদক থেকে বন্দিদের দূরে রাখতে প্রতিটি ওয়ার্ডে একটি করে মনিটরিং টিম কাজ করছে। অনেক সময় বাইর থেকেও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নিয়ে মাদকাসক্তদের চিকিৎসা করানো হয়। বিষয়টি সম্পর্কে মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক (চিকিৎসা ও পুনর্বাসন) শেখ মুহাম্মদ খালেদুল করিম যায়যায়দিনকে বলেন, আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করে যাচ্ছি। যাতে দেশে মাদকের চাহিদা কমে আসে। পাশাপাশি নিরাময় কেন্দ্রগুলোতে যথাযথ মনিটরিংয়ের আওতায় আনার আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছি। নানা কারণে অনেক সময়ই তা শতভাগ করা সম্ভব হয় না। আর কারাগারে মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রগুলোর কার্যক্রম গুরুত্বের সঙ্গে পরিচালনার চেষ্টা চলছে। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের জেল সুপার সুভাষ চন্দ্র সাহা যায়যায়দিনকে বলেন, আমরা সব সময়ই মনে প্রাণে চাই মাদকাসক্ত কারাবন্দিরা জামিনে বেরিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাক। এজন্য আমরা মাদক মামলার আসামিদের নানাভাবে কাউন্সিলিং করে থাকি। এর মধ্যে অনেকেই জামিনে বেরিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যায়। তাদের আর সাধারণত মাদক মামলায় আবারো কারাগারে প্রবেশের রেকর্ড দেখা যায় না। তিনি আরও জানান, অনেকেই কারাগারে মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে চিকিৎসা নেয়ার পরেও আবারো মাদক মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আসে। যেটি আসলে সত্যিই হতাশার বিষয়। কারাগারে যাতে কোনভাবে মাদক প্রবেশ করতে না পারে এজন্য সংশ্লিষ্টদের কড়া নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। মাদকের সঙ্গে কোন কারারক্ষীর জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধে কারা আইনে কঠোর সাজা দেয়া হয়। চাকরিচু্যত হয়েছেন অনেকেই। আর কারাবন্দিরা মাদকে জড়িত থাকলে তাদেরও কারা আইনে সাজা দেয়া হয়। কারাগারের মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রের কার্যক্রম আরও জোরদার করার চেষ্টা চলছে।
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

উপরে