রোববার, ২৭ নভেম্বর ২০২২, ১২ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
সরবরাহ পর্যাপ্ত

তিন কারণে সাধারণের নাগালের বাইরে ইলিশ

ম রেজা মাহমুদ
  ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০০:০০
বেশ কয়েক বছর ধরে দেশের বাজারে বেড়েই চলছে ইলিশের দাম। বাড়তে বাড়তে তা এখন সাধারণের ক্রয়সীমার বাইরে। সরেজমিন দেখা গেছে, বেশিরভাগ ক্রেতা ইলিশের দাম জিজ্ঞেস করেই চলে যান। তবু ব্যবসায়ীরা বলছেন চড়া দামেও ক্রেতা চাহিদা থাকায় কমছে না ইলিশের দাম। অনেকেই ইলিশ রপ্তানি ও বাজার সিন্ডিকেটকে এর জন্য দায়ী করলেও বিক্রেতারা বলছেন রপ্তানির পরও দেশের বাজারে পর্যাপ্ত ইলিশ রয়েছে। এছাড়াও বাজারে ধনী ক্রেতার অভাব নেই। অন্যদিকে দীর্ঘদিন সংরক্ষণ সত্ত্বেও ইলিশের স্বাদ ঠিক থাকায় চাহিদা কমলেও দাম কমে না। এসবের পাশাপাশি পাইকারি ব্যবসায়ী ও আড়ত মালিকদের সিন্ডিকেটের কারণে বাজারে ইলিশের প্রায় একই রেট বজায় থাকে। রাজধানীর বিভিন্ন বাজারের ব্যবসায়ীদের তথ্য মতে, প্রধান কিংবা বড় বাজারগুলোতে একজন বিক্রেতা দিনে গড়ে প্রায় দুই থেকে লাখ টাকার ওপরে মাছ বিক্রি করে থাকেন। তাদের হিসেব অনুযায়ী সব খরচ দিয়ে ১ কেজি ওজনের একটা মাছে প্রায় ২০০ টাকা মুনাফা হয়। তবে দেড় কেজির বেশি ইলিশে মুনাফা ৩০০ টাকার বেশি হয়ে থাকে। আর ভরা মৌসুমে কিংবা সরবরাহ বেশি থাকলে মুনাফা ৫০০ টাকা ছাড়িয়ে যায়। তবে ক্রেতা কম অর্থাৎ চাহিদা কম থাকলে মুনাফাও কমে যায়। কিন্তু চড়া দামেও রাজধানীতে ক্রেতার অভাব হয় না। আবার ক্রেতা না থাকলেও মাছ সংরক্ষণ করে রাখা হয় ফলে দাম বাড়তিই থাকছে বলেও জানান তারা। মোহাম্মদপুর বাজারের ইলিশ মাছ বিক্রেতা মনসুর বলেন, এই বাজারে ৬-৮ জন বিক্রেতা নিয়মিত ইলিশ বিক্রি করে থাকেন, গড়ে দিনে প্রায় ২-৩ লাখ \হটাকার বেশি মাছ বিক্রি করে থাকেন। তারা তবে এসব বিক্রেতাদের কেউ ব্যবসায়ী নন। তারা দৈনিক ১ হাজার টাকা মজুরিতে মাছ বিক্রি করে থাকেন। মনসুর বলেন, 'এই বাজারে ২০ বছর ধরে ইলিশ বিক্রি করি। ৫ বছর আগে এর অর্ধেক ব্যবসাও হতো না। মূলত ক্রেতা চাহিদা থাকায় বাজারে মাছের দাম স্বাভাবিকের তুলনায় ২০০-৩০০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি থাকছে। চাহিদা কম থাকলে দাম কমে যায়। আগে সকালে ৮০০ টাকায় বিক্রি করলে দেখা গেছে রাতে ৫০০ টাকায় অর্থাৎ কেনা দামে মাছ বিক্রি করতে হতো। কিন্তু এখন মালিক পক্ষ যে রেট নির্ধারণ করে সে রেটেই বিক্রি করতে হয়। আর বিক্রি না হলে মাছ মালিকের ফ্রিজে চলে যায়, তবুও দাম কমানো হয় না। এসব বিক্রেতারা জানান, এখন কোটি টাকার ব্যবসায়ীরা মাছ বিক্রি করছেন। কারণ বাজারে মাছ নিয়ে বসতে হলে ক্ষমতা দরকার, লাখ টাকা ভাড়া দিতে হয়। এছাড়াও বিভিন্ন জনকে টাকা দিয়ে মালিক এই ব্যবসা চালান। অন্যদিকে পাইকারি বাজারে মাছ কিনতে হলে প্রতিদিন কয়েক লাখ টাকা প্রয়োজন। তবে অনেকেই মাছ কিনে খুচরা বিক্রেতাদের কাছ বিক্রি করেন। তারা ফেরি করে মাছ বিক্রি করেন। বিভিন্ন বাজারে সরেজমিন দেখা যায়, কিছু ক্রেতা ইলিশের দাম জিজ্ঞেস করে চলে যান তবে কীভাবে এত টাকার মাছ বিক্রি হয় জানতে চাইলে ব্যবসায়ীরা বলেন, ঘণ্টায় অন্তত ৫ জন ক্রেতা আসেন যারা ৫০ জন ক্রেতার সমান মাছ কিনে নেন। এমনকি দামও জিজ্ঞেস করেন না। তাই আপাত দৃষ্টিতে ক্রেতা দেখা না গেলেও রাজধানীতে ধনী ক্রেতার সংখ্যা কম নয় বলেও জানান বিক্রেতারা। বিক্রেতাদের অভিযোগ পাইকারি আড়ত মালিকদের সিন্ডিকেট বিভিন্ন গ্রম্নপে নিলাম ডেকে দাম বাড়িয়ে নেন, পরে তা আবার কয়েক ধাপে হাতবদল হয়ে খুচরা বিক্রেতারা কিনে থাকেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, খুচরা বিক্রেতারা মূলত লট হিসেবে মাছ কিনে থাকেন। মাছের আকার ভেদে এসব লট তারা কেজি হিসেবে কিনে আনেন। দেখা গেছে, কোনো লটে ২০ পিস আবার কোনো লটে ৪০ পিস পর্যন্ত মাছ থাকে। যেমন দেড় কেজির ওজনের ইলিশের লট তারা ১৪০০-১৬০০ টাকা দরে কিনে থাকেন। যা ভোক্তা পর্যায়ে ১৮০০ টাকার ওপরে বিক্রি হয়। আবার ৮০০-৯০০ গ্রাম ওজনের ইলিশের লট ৭০০-৯০০ টাকায় কিনে থাকেন। যা বাজারে বিক্রি হয় ১১০০ আবার ১২০০ টাকার ওপরে। অন্যদিকে অসাধু ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট ও মজুত রেখে চড়া দাম বহাল রাখার কারণে সাধারণের পক্ষে ইলিশ কেনা সম্ভব হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন সাধারণ ব্যবসায়ীরা। তারা বলেন, রাজধানীর খুচরা বাজারের বড় একটি অংশ যাত্রাবাড়ী মাছের পাইকারি আড়ত থেকে ইলিশ সংগ্রহ করে থাকেন। এই পাইকাররা মূলত চাঁদপুর থেকে ইলিশ কিনে আনেন। যেখানে চাঁদপুরসহ চট্টগ্রাম ও দক্ষিণের বিভিন্ন জেলা থেকে স্থানীয় ব্যবসায়ী কিংবা জেলেরা মাছ সরবরাহ করে থাকেন। মূলত চাঁদপুরে ইলিশের দুটি গ্রেড আছে। প্রতিটি ইলিশের ওজন ৮০০-৯০০ গ্রাম হলে তার প্রতি মণের দাম পড়ে ৩০-৩৫ হাজার টাকা। প্রতি কেজির দাম পড়ে ৭০০-৭৫০ টাকা। আর যেসব ইলিশের ওজন ৬০০-৭০০ গ্রাম সেগুলোর মণ ২২-২৪ হাজার টাকা। সেই হিসাবে প্রতি কেজির দাম পড়ে ৫০০ টাকা। চাঁদপুরের মৎস্য বণিক সমিতির তথ্য মতে, চাঁদপুর আড়তে এক কেজির বেশি ওজনের ইলিশের মণ বিক্রি হয় ৪২-৪৫ হাজার টাকা। তাতে প্রতিটি এক কেজি ওজনের ইলিশের দাম পড়ে ১০০০ টাকা। এদিকে গত ৪ সেপ্টেম্বর থেকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ৪৯টি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে দুই হাজার ৪৫০ টন ইলিশ রপ্তানির অনুমোদন দিয়েছে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠান ৫০ টন করে আগামী ৩০ সেপ্টম্বর পর্যন্ত ইলিশ রপ্তানি করতে পারবে। জানা গেছে দেশে ১ কেজির বড় ইলিশ ১৪০০ টাকা দরে বিক্রি হলেও ভারতে তা ১১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

উপরে