রোববার, ১৯ মে ২০২৪, ৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

বাংলাদেশ সংঘাতে নয়, শান্তিতে বিশ্বাস করে : প্রধানমন্ত্রী

যাযাদি ডেস্ক
  ৩০ মে ২০২৩, ০০:০০
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সোমবার বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে এক অনুষ্ঠানে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে কর্মরত অবস্থায় শাহাদতবরণকারী অফিসার ও সৈনিক পরিবারের সদস্যদের সম্মাননা প্রদান করেন -ফোকাস বাংলা

বাংলাদেশ শান্তিতে বিশ্বাস করে দাবি করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, 'আমরা সংঘাতে বিশ্বাস করি না। বাংলাদেশ সর্বদা শান্তিতে বিশ্বাস করে এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য যা যা করা দরকার সবই করবে। আমরা যে কোনো সংঘাতের শান্তিপূর্ণ সমাধান চাই।'

আন্তর্জাতিক জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী দিবস-২০২৩ উপলক্ষে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে (বিআইসিসি) আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে সোমবার প্রধান অতিথির ভাষণে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।

'আমরা অস্ত্র প্রতিযোগিতা চাই না উলেস্নখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নারী, শিশু ও প্রতিটি পরিবার এতে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়ে। তাই তাদের এই দুর্ভোগ থেকে রক্ষা করাই আমাদের লক্ষ্য।'

তিনি বলেন, 'বিশ্বে শান্তি নিশ্চিত করা অতীতের চেয়ে এখন বেশি কঠিন। কারণ অশুভ শক্তি প্রযুক্তি ব্যবহার করে মানুষের জীবনের শান্তি কেড়ে নিচ্ছে। প্রযুক্তির সাম্প্রতিক বিকাশ ও অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে অশুভ শক্তির নতুন হুমকি বাড়ছে। প্রযুক্তি মানুষকে আর্থসামাজিক উন্নয়নসহ সব ক্ষেত্রে সুযোগ দিচ্ছে। কিন্তু এর পাশাপাশি আমরা এটাও দেখছি যে- অপশক্তিগুলোও প্রযুক্তি ব্যবহার করে মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে এবং মানুষের জীবনের শান্তি কেড়ে নিচ্ছে। কাজেই জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে শান্তিরক্ষীদের জটিল বহুমাত্রিক পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে। আর এজন্য উন্নত প্রযুক্তির সাহায্যে শান্তিরক্ষা মিশনকে সমৃদ্ধ করার প্রয়োজনীয়তা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।'

শেখ হাসিনা জানান, তার সরকার বিশ্বের সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং ও বিপজ্জনক অঞ্চলে জটিল পরিস্থিতি মোকাবিলায় সর্বদা বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের সর্বাধুনিক প্রশিক্ষণ দিয়ে প্রস্তুত করেছে।

তিনি বলেন, 'আমরা মিশন এলাকার পরিবেশ, আবহাওয়া এবং ভূখন্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ পোশাক, অন্য প্রয়োজনীয় জিনিস ও আধুনিক সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ নিশ্চিত করছি। শান্তিরক্ষীদের যোগাযোগের জন্য বাংলাদেশ কন্টিনজেন্টে আধুনিক মাইন-প্রতিরোধী, অতর্কিত হামলা-সুরক্ষিত যানবাহন ও অত্যাধুনিক

\হপ্রযুক্তি অন্তর্ভুক্ত করেছি। আধুনিক প্রযুক্তি এবং প্রশিক্ষণ অন্তর্ভুক্ত করা একটি চলমান প্রক্রিয়া- যা আমরা ভবিষ্যতেও অব্যাহত রাখব।'

প্রধানমন্ত্রী বলেন, '২০২৩ আন্তর্জাতিক জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী দিবসের থিম- 'পিস বিগিনস উইথ মি' খুবই সময়োপযোগী। এই নীতিবাক্য নিয়ে আমরা আমাদের জাতির পিতার দেখানো পথে বিশ্ব শান্তির জন্য কাজ করব এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে একটি নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ পৃথিবী দেওয়ার চেষ্টা করব- এটাই আজ আমাদের অঙ্গীকার।'

শেখ হাসিনা বলেন, আমি আশা করি বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা তাদের দক্ষতা, পেশাদারিত্ব, সাহসিকতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করে দেশের সম্মান ও ভাবমূর্তি উজ্জ্বল রাখবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা বিশ্বশান্তি বজায় রাখতে এবং দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার ক্ষেত্রে অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। জাতিসংঘ মহাসচিব আরও নারী শান্তিরক্ষী পাঠানোর অনুরোধ করায় আমরা নারী শান্তিরক্ষীদের সংখ্যা বাড়ানোর প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখছি।

তিনি বলেন, বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা বিশ্বের ৪০টি দেশে জাতিসংঘের ৬৩টি মিশন সফলভাবে সম্পন্ন করেছে।'

শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা ফোর্স কমান্ডার, ডেপুটি ফোর্স কমান্ডার এবং সেক্টর কমান্ডার হিসেবে বিভিন্ন মিশনে নিয়োজিত রয়েছেন। জাতির পিতার আদর্শ অনুসরণ করে তারা বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় কাজ করে যাচ্ছেন। 'শান্তিরক্ষা মিশন ছাড়া অন্য আন্তর্জাতিক ফোরামেও আমরা সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করি ও অবদান রাখি।'

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ ১৯৯৭ সালে জাতিসংঘে 'শান্তির সংস্কৃতি' প্রস্তাব পেশ করে- ১৯৯৯ সালে যা সর্বসম্মতিভাবে গৃহীত হয়। তখন থেকে প্রতিবছর জাতিসংঘে বাংলাদেশের ফ্ল্যাগশিপ রেজুলেশন 'শান্তির সংস্কৃতি' সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয়। জাতিসংঘ ২০০০ সালকে 'আন্তর্জাতিক শান্তির সংস্কৃতির বছর' ও ২০০১-২০১০ কে 'শান্তির সংস্কৃতি ও অ-সংঘাতের দশক' ঘোষণা করে। এগুলো বাংলাদেশের জাতির পিতার বৈদেশিক নীতিকেই অনুসরণ করে। তিনি বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় ছিলেন দৃঢ়-প্রতিজ্ঞ। যার ফলে বাংলাদেশ জাতিসংঘের 'বস্নু হেলমেট' পরিবারের সদস্য হয়ে ওঠে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, '১৯৮৮ সালে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ সেনাবাহিনী জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের সঙ্গে যোগ দেয়। পরে ১৯৮৭ সালে বাংলাদেশ পুলিশ এবং বাংলাদেশ নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনী ১৯৯৩ সালে শান্তিরক্ষী বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত হয়।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ বিগত ৩৫ বছর ধরে সুনামের সঙ্গে শান্তিরক্ষা বাহিনীতে কাজ করে যাচ্ছে। সর্বোচ্চ সৈন্য ও পুলিশ সদস্য এই বাহিনীতে দেশের জন্য অবদান রেখে যাচ্ছে এবং এর পাশাপাশি জাতিসংঘের বিভিন্ন শান্তিরক্ষা অভিযানে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করছে। আজ শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখতে আন্তজাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশ একটি নির্ভরযোগ্য নাম।'

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ দক্ষিণ সুদানের আবেইতে একটি ফোর্স প্রটেকশন ব্যাটালিয়ন মোতায়েন করেছে- যেখানে মালিতে একটি কুইক রিঅ্যাকশন ফোর্স হিসেবে একটি মেকানাইজড ইনফ্যান্ট্রি কোম্পানি, কঙ্গোতে একটি বিস্ফোরক অস্ত্র নিষ্পত্তি পস্নাটুন এবং মধ্যাঞ্চলে একটি লেভেল-২ হাসপাতাল কন্টিনজেন্ট যুক্ত করেছে। মালিতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটি নতুন আর্মড ইউটিলিটি হেলিকপ্টার ইউনিট, বেস ডিফেন্স কন্টিনজেন্ট হিসেবে একটি নতুন মেকানাইজড ইনফ্যান্ট্রি কোম্পানি এবং বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর একটি এয়ারফিল্ড সাপোর্ট ইউনিট মোতায়েন রয়েছে।

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন পররাষ্ট্র মন্ত্রী ডক্টর একে আব্দুল মোমেন, সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল এসএম শফিউদ্দিন আহমেদ ও জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারী গুয়েন লুইস।

অনুষ্ঠানের শুরুতে শান্তি প্রতিষ্ঠায় আত্মদানকারী বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।

অনুষ্ঠানে 'বাংলাদেশ ইন গেস্নাবাল পিস' শীর্ষক একটি প্রামাণ্য চিত্র প্রদর্শিত হয়।

নিহত পাঁচজন শান্তিরক্ষীর পরিবারের সদস্যরা প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে পুরস্কার গ্রহণ করেন। তিনি পাঁচজন আহত শান্তি রক্ষীর হাতে পুরস্কার তুলে দেন।

পরে প্রধানমন্ত্রী ইন্টারন্যাশনাল পিসকিপার জার্নাল উন্মোচন করেন।

অনুষ্ঠান শেষে প্রধানমন্ত্রী দক্ষিণ সুদান, মালি, লেবানন, মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র ও ডিআর কঙ্গোসহ বিভিন্ন দেশে মোতায়েন বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের সঙ্গে ভার্চুয়ালি কথা বলেন।

বর্তমানে বাংলাদেশের ৭ হাজার ৪৩৬ শান্তিরক্ষী জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন ও কার্যক্রমে নিয়োজিত আছে আর এই সংখ্যা বিশ্বব্যাপী মোতায়েন শান্তিরক্ষীদের মোট সংখ্যার প্রায় ৯ দশমিক ৮ শতাংশ। এর মধ্যে ৫৭২ জন বাংলাদেশি নারী শান্তিরক্ষীও রয়েছে।

বর্তমানে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা জাতিসংঘের ১৪টি মিশন ও কার্যক্রমে নিয়োজিত আছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ২০টি, বাংলাদেশ নৌবাহিনীর দুটি, বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর চারটি ও বাংলাদেশ পুলিশের তিনটি দল এসব মিশনে কাজ করছে।

দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের মূল

কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত

উন্নয়ন

এদিকে প্রধানমন্ত্রী চীনকে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান উন্নয়ন সহযোগী উলেস্নখ করে বলেছেন, দ্বি-পাক্ষিক সম্পর্কের মূল কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত দুই দেশের আরও উন্নয়ন।

রোববার রাতে চীনের উপপররাষ্ট্র মন্ত্রী সান ওয়েইডং গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে এলে তিনি এ কথা বলেন।

শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ চীনের উদ্যোক্তাদের জন্য বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চলে জমি বরাদ্দ করেছে এবং তারা সেখানে শিল্প স্থাপন করতে পারে।

এ সময় চীনের উপমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে চীনা প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা জানান। প্রধানমন্ত্রীও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে তার ব্যক্তিগত শুভেচ্ছা জানান।

চীনের উপমন্ত্রী বলেন, চীন বাংলাদেশের সঙ্গে বিভিন্ন খাতে বিশেষ করে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও হাইটেক সহযোগিতা জোরদার করতে আগ্রহী। এ ক্ষেত্রে আরও সহযোগিতার সম্ভাবনা রয়েছে।

বাংলাদেশের উন্নয়নের প্রশংসা করে সান ওয়েইডং বলেন, প্রায় ১০ বছর আগে তিনি বাংলাদেশ সফর করেছেন। তবে এবার বাংলাদেশকে অনেক বেশি উন্নত দেখেছেন।

তিনি বলেন, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ অভূতপূর্ব উন্নয়ন হয়েছে।

সান ওয়েইডং বলেন, তিনি পদ্মা সেতু ও বাংলাদেশে চীনের সহায়তায় নির্মিত আরও পাঁচটি প্রকল্প পরিদর্শন করেছেন।

এ সময় প্রধানমন্ত্রীর অ্যাম্বাসেডর-অ্যাট-লার্জ মোহাম্মদ জিয়াউদ্দিন, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব মো. তোফাজ্জেল হোসেন মিয়া, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব (মেরিটাইম অ্যাফেয়ার্স ইউনিট) রিয়ার অ্যাডমিরাল (অব.) মো. খুরশেদ আলম এবং বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন উপস্থিত ছিলেন। বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিম সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
X
Nagad

উপরে