বৃহস্পতিবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২২, ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৯

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় মাল্টার বাম্পার ফলন

ম মো. বাহারুল ইসলাম মোলস্না, ব্রাহ্মণবাড়িয়া
  ০১ অক্টোবর ২০২২, ০০:০০
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর উপজেলার সিঙ্গারবিল এলাকার মাল্টা বাগান -যাযাদি
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এ বছরও সবুজ মাল্টার বাম্পার ফলন হয়েছে। ফলন ভালো হওয়ায় চাষিদের মুখেও তৃপ্তির হাসি। চলতি বছর ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় প্রায় ২৭ কোটি টাকার মাল্টা বিক্রি হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কর্মকর্তারা। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ১৪১ হেক্টর জমিতে সবুজ মাল্টার চাষ করা হয়েছে। গত বছর চাষ করা হয়েছিল ১৩৮ হেক্টর জমিতে। গত বছরের চেয়ে এ বছর ৩ হেক্টর জমিতে বেশি চাষ করা হয়েছে। জানা গেছে, এ বছর সদর উপজেলায় ১ হেক্টর, সরাইল উপজেলায় ২ হেক্টর, কসবা উপজেলায় ৩৫ হেক্টর, নবীনগর উপজেলায় ১৫ হেক্টর, বাঞ্ছারামপুর উপজেলায় ৫ হেক্টর, নাসিরনগর উপজেলায় ২ হেক্টর, আখাউড়া উপজেলায় ১৫ হেক্টর, আশুগঞ্জ উপজেলায় ১ হেক্টর ও বিজয়নগর উপজেলায় ৬৫ হেক্টর জমিতে মাল্টার চাষ করা হয়েছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ছোটবড় মিলিয়ে প্রায় ১ হাজার ৯শ' মাল্টার বাগান রয়েছে। এর মধ্যে বিজয়নগরে ৭৫৪টি, কসবায় ৬৬০টি ও আখাউড়ায় ৪৬৬টি মাল্টার বাগান রয়েছে। বাকিগুলো অন্যান্য উপজেলায়। কৃষি কর্মকর্তারা জানান, মোট ১৪১ হেক্টর জমিতে ২ হাজার ৪৫৩ টন মাল্টা উৎপাদন হবে। উৎপাদিত মাল্টা প্রায় ২৭ কোটি টাকা বিক্রি করা হবে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বাণিজ্যিকভাবে মাল্টার চাষ শুরু হয় ২০১৫ সালে। বিজয়নগর উপজেলার পাহাড়পুর, চম্পকনগর, বিষ্ণুপুর ও সিঙ্গারবিল, নোয়াবাদী ও মেরশানী, আখাউড়া উপজেলার আজমপুর, আমোদাবাদ ও রাজাপুর এলাকার মাল্টার বাগানগুলোতে এখন থোকায় থোকায় মাল্টার সমারোহ। বাগানগুলোতে গাছে গাছে সবুজ পাতার আড়ালে ডালে ডালে ঝুলছে সবুজ মাল্টা। গাছে গাছে সবুজ মাল্টা পথচারীদের নজর কাড়ছে। মাল্টার বাম্পার ফলনে চাষিরাও খুশি। ইতোমধ্যেই মাল্টা পরিপক্ব হওয়ায় বিক্রিও শুরু হয়েছে। ক্রেতাদের কাছেও রয়েছে গুণেমানে পুষ্টি সমৃদ্ধ এই মাল্টার চাহিদা। এতে করে বাগান মালিকরা ভালো দাম পাচ্ছেন। কৃষি অফিস সূত্র ও চাষিরা জানান, ২০১৫ সালে কৃষি বিভাগের প্রণোদনায় প্রথমবারের মতো চাষিরা বারি-১ ও বারি-২ জাতের মাল্টার চাষ শুরু করে। প্রথমদিকে অপরিচিত এই ফলটির চাষাবাদ নিয়ে স্থানীয় চাষিদের মধ্যে কিছুটা দ্বিধাদ্বন্দ্ব থাকলেও উৎপাদন খরচ কম এবং মাল্টার ফলন ভালো হওয়ায় পরবর্তীতে চাষিরা মাল্টা চাষে আগ্রহী হয়ে উঠেন। বিজয়নগর উপজেলার সিঙ্গারবিল ইউনিয়নের চাষি মো. শিমুল মিয়া বলেন, তিনি কয়েক বছর দক্ষিণ আফ্রিকায় ছিলেন। পরে সেখান থেকে দেশে ফিরে মাল্টার বাগান করেন। গত বছরও মাল্টা চাষ করে তিনি লাভবান হয়েছিলেন। এ বছরও তিনি লাভবান হবেন বলে প্রত্যাশা করছেন। গত বছরের তুলনায় এ বছর বেশি লাভ হবে বলে তিনি আশা করছেন। একই এলাকার বাগান মালিক মো. সাচ্চু মিয়া বলেন, 'আমরা যারা এই এলাকায় মাল্টা বাগান করেছি, আমরা সবাই লাভবান হয়েছি। আমার বাগানে আমি পেয়ারা চাষ করতাম। ২০১৫ সালে মাল্টা চাষ শুরু করি। গাছ লাগানোর ২/৩ বছর পরই মাল্টা বিক্রি করতে পারছি। প্রতি বছরই মাল্টা বিক্রি করে লাভবান হচ্ছি।' তিনি বলেন, বর্তমানে পরিকল্পনা করছেন মাল্টা গাছের পাশে অন্যান্য ফলের গাছ লাগানো যায় কিনা। আগামী বছর হলুদ মাল্টা চাষ করার পরিকল্পনা আছে তার। উপজেলার পাহাড়পুর ইউনিয়নের চাষি সোহাগ ভূইয়া জানান, তিনি ৬০ শতাংশ জায়গায় মাল্টার বাগান করেছেন। ৫ বছর আগে ৬০টি মাল্টা চারা দিয়ে বাগান শুরু করেন বর্তমানে তার বাগানে রয়েছে ১৬০টি মাল্টা গাছ। সবগুলো গাছে পরিপূর্ণভাবে ফলন ধরেছে। তার বাগানে দেখা যায় প্রতিটি গাছের থোকায় থোকায় মাল্টা ধরে আছে। মাল্টার ভারে গাছগুলো মাটিতে নুইয়ে পড়েছে। নিয়মিত পরিচর্যা করছেন। আশা করেন ভালো দাম পাবেন। উপজেলার সিঙ্গারবিল গ্রামের মাল্টা চাষি আবদুল আলিম বলেন, 'বাগানে ১৩০টি মাল্টা গাছ আছে। বাগানের পরিচর্যা করতে ২৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। আশাকরি দেড় লাখ টাকার মাল্টা বিক্রি করতে পারব।' বাগান মালিক সাজু ভূইয়া বলেন, বিজয়নগরের পাহাড়ি এলাকার মাটি লাল হওয়ায় মাল্টা চাষের জন্য বেশ উপযোগী। মাল্টার ফলন এবারও ভালো হয়েছে, বিক্রিও বেশ ভালো হচ্ছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বিভিন্ন উপজেলা ছাড়াও কুমিলস্না, নরসিংদী ও হবিগঞ্জ জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে পাইকাররা এসে বাগান থেকে সরাসরি মাল্টা কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। এ ব্যাপারে বিজয়নগর উপজেলা উপ-সহকারী কৃষি অফিসার মো. রুহুল আমীন খাঁন বলেন, 'আবহাওয়া ভালো থাকায় এ বছরও মাল্টার বাম্পার ফলন হয়েছে। চাষিরাও লাভবান হবেন। বর্তমানে সবুজ মাল্টার পাশাপাশি বাউ-৩ এবং বারো মাসি থাই মাল্টার চাষাবাদের জন্য চাষিদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।' এ ব্যাপারে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার উপ-পরিচালক সুশান্ত সাহা বলেন, চলতি বছর জেলায় ১৪১ হেক্টর জমিতে মাল্টার চাষ করা হয়েছে। মাল্টার চাষাবাদে আগ্রহ বাড়াতে চাষিদের হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। মাঠপর্যায়ে কৃষি কর্মকর্তারা বাগানে বাগানে গিয়ে খোঁজখবর রাখছেন। সেপ্টেম্বরের শেষ থেকে মধ্য অক্টোবর পর্যন্ত মাল্টা বিক্রির উপযুক্ত সময়। এ বছর জেলায় প্রায় ২৭ কোটি টাকার মাল্টা বিক্রি হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

উপরে