বুধবার, ২২ মে ২০২৪, ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

তীব্র তাপপ্রবাহে পুড়ছে খুলনা অঞ্চল, বিপর্যস্ত জনজীবন

খুলনা অফিস
  ২১ এপ্রিল ২০২৪, ১৩:২২
তীব্র তাপপ্রবাহে পুড়ছে খুলনা অঞ্চল, বিপর্যস্ত জনজীবন

তাপমাত্রার পারদ দিন দিন বাড়ছে। তাপপ্রবাহে পুড়ছে গোটা খুলনা বিভাগ। তীব্র গরমে মানুষের হাঁসফাঁস অবস্থা। বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। প্রয়োজন ছাড়া কেউ বের হচ্ছেন না ঘর থেকে। অনেকেই বের হচ্ছেন ছাতা নিয়ে। গরমে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন কর্মজীবীরা।

আজ রোববার যশোরে ৪২ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। যা চলতি মৌসুমে দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা। আর খুলনায় গতকাল চলতি বছরের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪১ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে।

আবহাওয়া দপ্তর জানিয়েছে, খুলনা বিভাগে শনিবারও দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা বিরাজ করছে। টানা তিন দিন চুয়াডাঙ্গায় দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল। যশোরে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪২ দশমিক ৬ ডিগ্রি রেকর্ড করা হয়েছে। এদিন বাতাসের আর্দ্রতা ছিল ২৫ শতাংশ বলেও জানিয়েছে আবহাওয়া অফিস। তবে গত বছরের ১৯-২০ এপ্রিল চুয়াডাঙ্গা দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪২ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছিল। এবারও তাপমাত্রা আরও বাড়তে পারে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।

খুলনা আবহাওয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার খুলনায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৪১ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এর আগে ২০২৩ সালের ১৬ এপ্রিল তাপমাত্রায রেকর্ড করা হয়েছিল ৪১ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। যা এর আগের ২৪ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল।

এছাড়া শনিবার যশোর জেলায় ৪২ দশমিক ৬ ডিগ্রি, চুয়াডাঙ্গায় ৪২ দশমিক ৩ ডিগ্রি, খুলনায় ৪১ দশমিক ২ ডিগ্রি, সাতক্ষীরায় ৪০ দশমিক ৭ ডিগ্রি, মোংলায় ৪১ দশমিক ৭ ডিগ্রি, কুষ্টিয়ায় ৪১ দশমিক ২ ডিগ্রি এবং পাবনার ঈশ্বরদীতে ৪১ দশমিক ৬ ডিগ্রি, ফরিদপুর ও গোপালগঞ্জে ৪০ দশমিক সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে।

খুলনা আবহাওয়া অফিসের ইনচার্জ সিনিয়র আবহাওয়াবিদ মো. আমিরুল আজাদ সাংবাদিকদের বলেন, চলতি বছরের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা শনিবার রেকর্ড করা হয়েছে। শনিবার খুলনায় বাতাসের আর্দ্রতা ছিল ২৭ শতাংশ। যা আরও দুই-তিনদিন অব্যাহত থাকতে পারে। এরপর বৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে চলতি মাসজুড়ে তাপমাত্রা ৩৭-৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।

নগরীর ময়লাপোতা মোড় এলাকার রিকশায় বসে ছিলেন চালক রফিকুল। তিনি নগরীর বানরগাতি এলাকার বাসিন্দা। রফিকুল বলেন, প্রচণ্ড গরম। এই গরমে যাত্রী তেমন মিলছে না। যাত্রী না থাকলে রোজগারও হয় না। এই গরমে মানুষ কম বের হলেও আমাদের পেটের দায়ে বের হতে হয়।

তিনি বলেন, অসহ্য গরম। এই গরমে বার বার গলা শুকিয়ে আসছে। ঠিকমতো রিকশাও চালানো যায় না। বাতাসের সঙ্গে মনে হচ্ছে গরম ভাপ উড়ছে। বৃষ্টি হলে কিছুটা স্বস্তি মিলবে।

যশোর শহরের দড়াটানা মোড়ের তরমুজ বিক্রেতা রুহুল আমিন বলেন, তরমুজ ঢেকে রাখলে ক্রেতারা দেখতে পায় না। এমনিতেই শহরে লোক নেই, ক্রেতাশূন্য। আর আলগা করে রাখলে রোদে তরমুজ শুকিয়ে যাচ্ছে। বেচাকেনা তো নেই বললেই চলে।

কাজীপাড়ার বাসিন্দা রিকশাচালক ইসমাইল হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, দুই বছর আগে করোনার সময় যে লকডাউনের চিত্র দেখেছি, শনিবার যশোরে সেই চিত্র দেখলাম। রাস্তায় একটা মানুষও নেই। সকাল থেকে ১২০ টাকা আয় করেছি।

চুয়াডাঙ্গার প্রথম শ্রেণির আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জামিনুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, শনিবার বিকেল ৩টায় চুয়াডাঙ্গায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৪২ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। শনিবার থেকে জেলায় অতি তীব্র তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে।

চুয়াডাঙ্গা আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগার সূত্রে জানা গেছে, জেলায় ২০২৩ সালের ১৯-২০ এপ্রিল সর্বোচ্চ ৪২ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়। এছাড়াও ২০০৫ সালের ২ জুন ৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস, ২০১২ সালের ৪ জুন ৪২ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস, ২০০৪ সালের ১৩ মে ৪২ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ২০০৯ সালের ২৭ এপ্রিল সর্বোচ্চ ৪১ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়।

এদিকে তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে আরও পাঁচ দিন স্কুল-কলেজ বন্ধ রাখার ঘোষণায় কিছুটা স্বস্তি মিলেছে অভিভাবকদের মাঝে। আগামী ২৭ এপ্রিল পর্যন্ত ছুটি বাড়ানো হয়েছে। ফলে ২৮ এপ্রিল থেকে খুলছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।

টানা তাপদাহে অতিষ্ঠ এখানকার জনপদ। অসহ্য গরমে ওষ্ঠাগত হয়ে উঠেছে প্রাণীকুল। তীব্র তাপে বিপাকে পড়েছেন নিম্ন আয়ের শ্রমজীবী মানুষ। প্রয়োজনের তাগিদে মানুষ ঘর থেকে বেরিয়েও কাজ করতে পারছেন না। দিনের বেশিরভাগ সময় সূর্যের তাপে গরম অনুভূত হচ্ছে। তীব্র প্রখরতায় উত্তাপ ছড়াচ্ছে চারপাশে। নিম্ন আয়ের শ্রমজীবী মানুষ পড়েছেন চরম বিপাকে। বাইরে নির্মাণ শ্রমিক, কৃষি শ্রমিক, ইজিবাইকচালক ও রিকশা ভ্যানচালকদের গরমে নাভিশ্বাস উঠেছে। হা-হুতাশ করতে দেখা গেছে তাদেরকে।

নগরীরে রিকশাচালক আব্দুল মজিদ বলেন, সকালে রিকশা নিয়ে বের হয়ে বেলা ১০টা পর্যন্ত তাপমাত্রা সহনীয় পর্যায়ে ছিল। এরপর তাপ বাড়তে থাকে। গা পুড়তে শুরু করে।

ঠেলাগাড়িতে কাঠ বিক্রেতা গোলাম হোসেন বলেন, এখন কাঠের ব্যবহার কমে গেছে। কিন্তু উপায় নেই। কাঠ না বেচলে পেট চলে না। গরমের মধ্যে এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় যেতে পারছেন না। দুই কদম হাঁটলে আর পা চলে না।

খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব বাবুল হাওলাদার বলেন, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে হলে পরিবেশবান্ধব শহর গড়তে হবে। যে শহরে থাকবে পর্যাপ্ত গাছপালা। খুলনা শহর ঘুরে সড়কের পাশে ছায়া পাওয়ার মতো কোন গাছ পাওয়া কঠিন। এক সময় শহরে প্রচুর পুকুর ডোবা নালা ছিল। এখন তা খুঁজে পাওয়া যায় না।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স ডিসিপ্লিনের প্রধান অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ হারুন চৌধুরী বলেন, একসময় ঈশ্বরদীর আশেপাশে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি তাপমাত্রা থাকতো। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে পদ্মায় পানি ছিল না। এখন চুয়াডাঙ্গাতেও একই অবস্থা। একসময় এ অঞ্চলে প্রচুর জলাভূমি ছিল। এছাড়া এর আশপাশে হাওড়-বাওড় ছিল। যা তাপকে শোষণ করতে পারতো। এখন এর পরিমাণ কমে গেছে। মূলত এটাও একটা বড় কারণ তাপমাত্রা বেশি অনুভূত হওয়ার।

অপরদিকে তীব্র দাবদাহের কারণে সারাদেশে তিন দিন হিট এ্যালার্ট জারি করেছে আবহাওয়া অফিস। গত শুক্রবার এটি জারি করা হয়। আবহাওয়া অফিস বলছে, শনিবার থেকে তাপমাত্রা বেশি থাকবে। এ সময় সবাইকে গরম থেকে বাঁচতে সতর্কতার সঙ্গে চলার নির্দেশনা দিয়েছে আবহাওয়া অফিস।

যাযাদি/ এসএম

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
X
Nagad

উপরে