logo
সোমবার ১৪ অক্টোবর, ২০১৯, ২৯ আশ্বিন ১৪২৬

  অনলাইন ডেস্ক    ০৯ অক্টোবর ২০১৯, ০০:০০  

তোপের মুখে বুয়েট ভিসি

আবরার হত্যার প্রতিবাদে বিক্ষোভে উত্তাল সারাদেশ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গায়েবানা জানাজা, কফিন নিয়ে মিছিল বুয়েট শিক্ষার্থীদের ৭ দফা মোট গ্রেপ্তার ১৩ জন

আবরার হত্যার প্রতিবাদে বিক্ষোভে উত্তাল সারাদেশ
আবরার হত্যার দুদিন পর মঙ্গলবার বিকেলে শিক্ষার্থীদের সামনে গিয়ে তোপের মুখে পড়েন বুয়েট ভিসি অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম ষ আরও ছবি পৃষ্ঠা-১৬ -যাযাদি
যাযাদি ডেস্ক

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) মেধাবী ছাত্র আবরার ফাহাদ হত্যার প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে উঠেছে সারাদেশ। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি)সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মানববন্ধন, বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করে অতিদ্রম্নত খুনিদের গ্রেপ্তার ও তাদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানানো হয়েছে। দেশব্যাপী এসব কর্মসূচিতে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ছাড়াও সব শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেয়।

এর মধ্যে আবরার ফাহাদকে (২১) হত্যার প্রতিবাদে সাত দফা দাবি জানিয়েছেন বুয়েটের সাধারণ শিক্ষার্থীরা। মঙ্গলবার সকাল থেকেই বুয়েট ক্যাম্পাসে জড়ো হতে থাকেন শিক্ষার্থীরা। সকাল ১০টা ৩৫ মিনিটে বুয়েট ক্যাফেটেরিয়ার সামনে থেকে একটি মিছিল বের করেন শিক্ষার্থীরা। মিছিলের আগে সব শিক্ষার্থীর সঙ্গে দাবির বিষয়ে আলোচনা করে নেন তারা।

'আবরার ফাহাদ হত্যার বিচার চাই'-ব্যানারে মিছিলটি বুয়েটের হলগুলো ঘুরে বেলা সোয়া ১১টার দিকে বুয়েট শহীদ মিনারের সামনে যায়। সেখানে সাংবাদিকদের কাছে নিজেদের সুনির্দিষ্ট সাতটি দাবি তুলে ধরেন শিক্ষার্থীরা।

সেগুলো হলো: খুনিদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে; ৭২ ঘণ্টার মধ্যে খুনিদের শনাক্ত করে সবার ছাত্রত্ব আজীবন বহিষ্কারের বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে; দায়েরকৃত মামলা দ্রম্নত বিচার ট্রাইবু্যনালের অধীনে স্বল্পতম সময়ে নিষ্পত্তি করতে হবে; বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য কেন ৩০ ঘণ্টা অতিবাহিত হওয়ার পরও ঘটনাস্থলে উপস্থিত হননি, তা তাকে সশরীরে ক্যাম্পাসে এসে বিকেল ৫ টার মধ্যে জবাবদিহি করতে হবে। একই সঙ্গে ডিএসডবিস্নউ স্যার কেন ঘটনাস্থল থেকে পলায়ন করেছেন, এ বিষয়ে তাকে বিকেল ৫ টার মধ্যে সবার সামনে জবাবদিহি করতে হবে; আবাসিক হলগুলোতে র?্যাগের নামে ও ভিন্ন মতাবলম্বীদের ওপর সকল প্রকার শারীরিক এবং মানসিক নির্যাতন বন্ধে প্রশাসনকে জড়িত সবার ছাত্রত্ব বাতিল করতে হবে। একই সঙ্গে আহসানউলস্না হল এবং সোহরাওয়ার্দী হলের পূর্বের ঘটনাগুলোতে জড়িত সবার ছাত্রত্ব বাতিল ১১ অক্টোবর,২০১৯ তারিখ বিকেল ৫ টার মধ্যে নিশ্চিত করতে হবে; রাজনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার করে আবাসিক হল থেকে ছাত্র উৎখাতের ব্যাপারে অজ্ঞ থাকা এবং ছাত্রদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হওয়ায় শেরে বাংলা হলের প্রভোস্টকে ১১ অক্টোবর, ২০১৯ তারিখ বিকেল ৫ টার মধ্যে প্রত্যাহার করতে হবে; মামলা চলাকালে সব খরচ এবং আবরারের পরিবারের সব ক্ষতিপূরণ বুয়েট প্রশাসনকে বহন করতে হবে।

এই কর্মসূচি মঙ্গলবার বিকেল ৫ টা পর্যন্ত চলে বলে জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। এ সময় শিক্ষার্থীরা 'বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র রাজনীতি বন্ধ চাই' স্স্নোগান দিতে থাকেন।

বুয়েট ক্যাম্পাসে শিক্ষক সমিতির সভাপতি এ কে এম মাসুদ বলেন, অতীতে যেসব বেআইনি ঘটনা ঘটেছে, সেগুলোর কোনো বিচার হয়নি। তারই খেসারত হিসেবে এই হত্যাকান্ড। আগের ঘটনার কোনো ব্যবস্থা নিলে এ ঘটনা ঘটত না। শিক্ষক সমিতির সদস্যরা সোমবার ভিসির সঙ্গে দেখা করেন। তিনি বলেছিলেন ব্যবস্থা নেবেন। তারপর আর তার সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। শিক্ষক সমিতি ছাত্রদের এই আন্দোলনের সঙ্গে একমত। এটি যৌক্তিক বলে মনে করে।

ঢাবিতে গায়েবানা জানাজা, কফিন মিছিল

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ছাত্র আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যার প্রতিবাদে গায়েবানা জানাজা ও কফিন মিছিল হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে।

মঙ্গলবার দুপুরে রাজু ভাস্কর্য চত্বরে এই গায়েবানা জানাজায় নেতৃত্ব দেন ডাকসুর সমাজ সেবা সম্পাদক আকতার হোসেন। পরে প্রতীকী কফিন নিয়ে শিক্ষার্থীদের একটি বিশাল মিছিল বুয়েটে যায়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি চত্বর, পলাশী হয়ে বুয়েট ক্যাম্পাসে প্রবেশ করে সেই কফিন মিছিল। সেখানে কিছুক্ষণ অবস্থানের পর বকশি বাজার হয়ে আবার টিএসসির দিকে ফেরে তারা।

গায়েবানা জানাজার পর সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে ডাকসুর ভিপি নুরুল হক নুর বলেন, 'ভারতের সঙ্গে দেশবিরোধী চুক্তির বিরোধিতা করায় আবরারকে হত্যা করা হয়েছে। আবরারের রক্তস্নাত দেশবিরোধী চুক্তি পুনর্বিবেচনা করতে হবে।'

আবরারকে হত্যার পর দেশের বিভিন্ন জায়গায় প্রতিবাদ মিছিলে পুলিশ ও ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা বাধা দিয়েছে অভিযোগ করে তিনি বলেন, 'ছাত্র সমাজকে বলব, প্রত্যেকটা ছাত্র, যে যেখানে বিপদে পড়ুক, আপনারা পাশে দাঁড়ান, প্রতিবাদ করুন। '

পরে কফিন মিছিল থেকে 'ভারতের দালালেরা, হুঁশিয়ার সাবধান', 'দেশবিরোধী চুক্তি বাতিল কর, করতে হবে', 'আবরারের খুনিদের, ফাঁসি চাই দিতে হবে', 'ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা, হুঁশিয়ার- সাবধান', 'ছাত্রলীগের গুন্ডারা, হুঁশিয়ার-সাবধান', 'বুয়েট তোমার ভয় নাই, আমরা আছি লাখো ভাই'- ইত্যাদি স্স্নোগান দিতে শোনা যায়।

শিক্ষক সমিতির বিবৃতি

অতীতে বিভিন্ন সময় শিক্ষার্থীদের ওপর ঘটে যাওয়া নির্যাতন ও র?্যাগিংয়ের ঘটনায় দোষী ব্যক্তিদের শনাক্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদানে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নিষ্ক্রিয় ছিল। এতে আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটেছে। এর ফলে আবরার ফাহাদ হত্যাকান্ডের মতো নির্মম ঘটনা ঘটেছে, যার দায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এড়াতে পারে না। আবরার হত্যার ঘটনায় বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) শিক্ষক সমিতির এক বিবৃতিতে এসব কথা বলা হয়েছে।

মঙ্গলবার বুয়েট শিক্ষক সমিতির বিবৃতিতে বলা হয়, ৬ অক্টোবর রাতে তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগ এবং শেরে বাংলা হলের ১০১১ নম্বর কক্ষের ছাত্র আবরারের নির্মম হত্যাকান্ডের ঘটনায় বুয়েট শিক্ষক সমিতির কার্যনির্বাহী পরিষদ তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ জানাচ্ছে।

বুয়েট শিক্ষক সমিতি বিবৃতিতে বলেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলে কোনো শিক্ষার্থী নির্যাতনের শিকার হবেন এবং মৃতু্যবরণ করবেন, তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ভবন ও আবাসিক হলগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের। আবরার হত্যার ঘটনা প্রমাণ করেছে, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়েছে।

আবরার হত্যাকান্ডে জড়িত সবাইকে দ্রম্নততম সময়ের মধ্যে চিহ্নিত করে বিচারের মাধ্যমে সর্বোচ্চ শাস্তির ব্যবস্থা করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এবং সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের কাছে দাবি জানিয়েছে বুয়েট শিক্ষক সমিতি। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি জানিয়েছে শিক্ষক সমিতি।

বুয়েট ক্যাম্পাসে শিক্ষক সমিতির সভাপতি এ কে এম মাসুদ বলেন, 'আমরা ছাত্রদের এই আন্দোলনের সঙ্গে একমত। এটি যৌক্তিক। সামগ্রিক বিষয় নিয়ে আগামীকাল সকালে শিক্ষক সমিতির বৈঠক আছে। ওই বৈঠকে অতীতে যেসব অনিয়ম হয়েছে, সেগুলো নিয়ে আলোচনা হবে। বৈঠকে পরবর্তী কর্মসূচি, করণীয়, পদক্ষেপ ঠিক করা হবে।'

আবরারের দাফন সম্পন্ন

কুষ্টিয়া প্রতিনিধি জানান, কুষ্টিয়ায় মানুষের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন ছাত্রলীগের নির্যাতনে? নিহত বুয়েট ছাত্র আবরার ফাহাদ। মঙ্গলবার সকালে কুষ্টিয়া শহরের পিটিআই রোডস্থ আল-হেরা জামে মসজিদ চত্বরে দ্বিতীয় এবং ১০টায় কুমারখালীর কয়া ইউনিয়নের রায়ডাঙ্গায় আবরারের গ্রামের বাড়িতে তৃতীয় জানাযা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।

কুষ্টিয়ায় দুই দফা জানাজা ও শেষবারের মত ফাহাদের লাশ দেখতে নারী-পুরুষসহ হাজার হাজার মানুষের ঢল নামে। এদিকে লাশ দাফনের প্রস্তুতিকালে ফাহাদের নিজ গ্রাম কুমারখালীর রায়ডাঙ্গা এলাকায় শত শত মানুষ পস্ন্যাকার্ড হাতে নিয়ে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। বিক্ষোভকারীরা মেধাবী বুয়েট ছাত্র ফাহাদের হত্যাকারীদের অবিলম্বে ফাঁসির দাবি জানান।

মঙ্গলবার ভোর সাড়ে ৫ টার দিকে ঢাকা থেকে লাশবাহী গাড়িতে ফাহাদের মরদেহ কুষ্টিয়ায় এসে পৌঁছে। কুষ্টিয়ায় লাশ পৌঁছার পর এক হৃদয়-বিদারক দৃশ্যের অবতারণা ঘটে। নিহতের পরিবারপরিজন, আত্মীয়স্বজন কান্নায় ভেঙে পড়েন। এ সময় তাদের আহাজারি ও বিলাপে পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। পরিবারপরিজনের পাশাপাশি লাশ দেখতে আসা এলাকাবাসীও চোখের পানি ধরে রাখতে পারেনি।

সম্ভাবনাময় মেধাবী ছাত্র ও স্বপ্নের ধন পূত্র আবরার ফাহাদকে হারানোর শোকে মুহ্যমান মা রোকেয়া খাতুন। পাগলপ্রায় পিতা বরকত উলস্নাহ ও ছোটভাই আবরার ফাইয়াজ। নির্মম ও পৈশাচিক এ হত্যাকান্ডের সঙ্গে জড়িতদের প্রতি চরম ঘৃণা প্রকাশসহ তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করে নিহতের পরিবার ও এলাকাবাসী।

এদিকে রায়ডাঙ্গা গ্রামের বাড়িতে জানাজা শেষে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ-সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় বিক্ষুব্ধ জনতা শ্লোগানে-শ্লোগানে প্রতিবাদ জানাতে থাকেন এবং হত্যাকান্ডের সঙ্গে জড়িত প্রত্যেকের ফাঁসির দাবি জানান। হত্যাকারীদের একমাত্র পরিচয় তারা অপরাধী। তাই ফাহাদ হত্যাকারীরা দলীয় পরিচয়ে যেন কোনোভাবেই পার পেয়ে না যায় সে দাবিও তোলেন বিক্ষুব্ধ জনতা। লাশ দাফনের পর পরই বিচারের দাবিতে মিছিলসহ প্রতিবাদী জনতার ঢল নামে কুমারখালীর রায়ডাঙ্গা গ্রামে।

জাবি শিক্ষার্থীদের সড়ক অবরোধ

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদের হত্যাকারীদের ফাঁসির দাবিতে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। এ সময় শিক্ষার্থীরা বলেন, ভারতের সঙ্গে সাম্প্রতিক চুক্তিতে দেশের স্বার্থ বিসর্জন দেওয়া হয়েছে।

মঙ্গলবার বেলা একটায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনারের পাদদেশ থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের হয়। মিছিলটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক ঘুরে জয় বাংলা ফটকে গিয়ে শেষ হয়। পরে জয় বাংলা ফটক-সংলগ্ন ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে টায়ার জ্বেলে সড়ক অবরোধ করেন তারা। শিক্ষার্থীরা বেলা আড়াইটা পর্যন্ত অবরোধ চালিয়ে যান।

অবরোধ চলাকালে ছাত্র ইউনিয়নের বিশ্ববিদ্যালয় সংসদের কার্যকরী সদস্য রাকিবুল হক বলেন, 'দেশের সব স্বার্থকে বিসর্জন দিয়ে ভারতের সঙ্গে চুক্তি করেছে এ দেশের সরকার। সেই চুক্তির সমালোচনা করায় আবরারকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। আবরারের দেশপ্রেম কি অপরাধ? এই দেশে বাস করে ভারতের গোলামি করতে হবে নাকি?'

বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার যুগ্ম-আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম বলেন, 'আবরার ফাহাদ যেসব চুক্তির সমালোচনা করেছে, যেসব চুক্তির বিরোধিতা করেছে, যেসব কথা বলেছে, সেসব আমারও কথা। তাহলে কি এখন আমাকেও পিটিয়ে হত্যা করা হবে?' তিনি বলেন, 'আবরার হত্যার ঘটনায় বুয়েট কর্তৃপক্ষ শুধু একটা সাধারণ ডায়েরি করেছে। শুধু জিডি করেই এর দায় বুয়েট কর্তৃপক্ষ এড়াতে পারে না। হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে বুয়েট কর্তৃপক্ষকেও মামলা করতে হবে।'

বিচার দাবি প্রগতিশীল ছাত্রজোটের

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ছাত্র আবরার ফাহাদ হত্যার তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করে হত্যাকান্ডে জড়িত সবার দৃষ্টান্তমূলক বিচারের দাবি জানিয়েছে প্রগতিশীল ছাত্রজোট কেন্দ্রীয় কমিটি।

মঙ্গলবার সংগঠনের সভাপতি ছাত্রনেতা আল কাদেরী জয় ও সাধারণ সম্পাদক নাসিরউদ্দিন প্রিন্স স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ দাবি জানানো হয়।

বিবৃতিতে নেতৃবৃন্দ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, 'ফেসবুকে সরকারবিরোধী স্ট্যাটাস দেয়ার অপরাধে আবরার ফাহাদকে রুম থেকে ডেকে নিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হলো, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ওই শিক্ষার্থীর জীবন রক্ষায় কার্যত নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। ব্যর্থতার দায় নিয়ে অবিলম্বে হল প্রাধ্যক্ষসহ সবার অপসারণ দাবি করছি। একই সঙ্গে হত্যাকান্ড সংঘটিত হওয়ার পরও বুয়েটের উপাচার্য শেরে বাংলা হলে না যাওয়ায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করছি।'

নেতৃবৃন্দ দেশের মেধাবীদের সেরা প্রতিষ্ঠান বুয়েট ক্যাম্পাস ও হলগুলোকে ছাত্রলীগের দখলমুক্ত করাও জোর দাবি জানান। এছাড়া আবরার হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার ও বিচারের দাবিতে প্রগতিশীল ছাত্রজোট ঘোষিত আগামী ৯ অক্টোবর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ঘেরাও কর্মসূচি সফল করার জন্য গণতন্ত্রপ্রিয় ছাত্রসমাজের প্রতি আহ্বান জানান।

এছাড়া আমাদের সংবাদদাতা ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর:

যশোর: আবরার ফাহাদ হত্যার প্রতিবাদে মঙ্গলবার দুপুরে যশোর প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন কর্মসূচি পালিত হয়েছে। সাধারণ ছাত্র পরিষদ, যশোরের আয়োজনে দুপুর ১২টা থেকে ১টা পর্যন্ত এ মানববন্ধন কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। এতে বক্তব্য দেন পরিষদের আহ্বায়ক আফরোজ সুলতানা মৌ, যুগ্ম আহ্বায়ক আশিক ইকবাল, আরিফ খান, নুসরাত নাজনীন, অলিক মোহাম্মদ প্রমুখ।

মানববন্ধন থেকে বক্তারা বর্বরোচিত এই হত্যাকান্ডের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।

রাজবাড়ী: আবরার ফাহাদ হত্যাকান্ডে জড়িত ছাত্রলীগ সদস্যদের গ্রেপ্তার ও বিচা?রের দাবিতে রাজবাড়ী?তে মানববন্ধন ক?রে?ছে ছাত্র ইউ?নিয়ন। মঙ্গলবার দুপুর ১২টার দি?কে ছাত্র ইউ?নিয়ন রাজবাড়ী জেলা সংস?দের আয়োজনে শহরের ১নং রেল?গেট-সংলগ্ন মু?ক্তি?যোদ্ধা স্মৃ?তিফল?কে এ মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়।

এ?তে বক্তব্য রা?খেন ছাত্র ইউ?নিয়ন রাজবাড়ী জেলা সংস?দের সভাপ?তি আব্দুল হা?লিম বাবু, সাধারণ সম্পাদক কাউছার আহ?মেদ রিপন, সাংগঠ?নিক সম্পাদক রাতুল হাসান জ?নি, শহর ক?মি?টির সদস্য খা?লেদ বিন রনি ও জেলা ওয়ার্কার্স পা?র্টির সভাপ?তি আব্দুস সামাদ মিয়া।

মানববন্ধ?নে বক্তরা হত্যাকারী?দের দ্রম্নত গ্রেপ্তার ক?রে বিচা?রের দাবি জানান। দাবি পূরণ না হ?লে বৃহত্তর আন্দোলনের হুম?কি দেন তারা।

নোয়াখালী: আবরার ফাহাদ হত্যার প্রতিবাদ ও বিচার দাবিতে নোয়াখালীতে মানববন্ধন করতে গিয়ে পুলিশি বাধায় পড়েছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। মঙ্গলবার সকাল ১০টার দিকে টাউন হল মোড়ে এই ঘটনা ঘটে। এ সময় লাঠিচার্জ করে ও ধাওয়া দিয়ে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয় পুলিশ।

পরে সকাল সাড়ে ১০টায় পুলিশের বাধা উপেক্ষা করে পুনরায় মানববন্ধন-সমাবেশে মিলিত হন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। প্রায় আধা ঘণ্টাব্যাপী এই কর্মসূচিতে বিশ্ববিদ্যালয়, বিভিন্ন কলেজ ও মাদরাসার কয়েকশ শিক্ষার্থী অংশ নেন। এ সময় তারা আবরার হত্যার প্রতিবাদ ও বিচার দাবিতে নানা স্স্নোগান দেন। তারা আবরার হত্যায় জড়িতদের গ্রেপ্তার এবং দ্রম্নত বিচার আইনে শাস্তি নিশ্চিতের দাবি জানান।

ময়মনসিংহ: আবরারের হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার ও বিচারের দাবিতে মুখে কালো কাপড় বেঁধে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল করেছে ময়মনসিংহের বিভিন্ন সংগঠন। মঙ্গলবার সকালে নগরীর ফিরোজ-জাহাঙ্গীর চত্বরে এ মানববন্ধনের আয়োজন করে প্রগতিশীল ছাত্র জোট ও বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ জেলা শাখা।

ঘণ্টাব্যাপী এ মানববন্ধনে একাত্মতা প্রকাশ করে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির জেলা শাখার সভাপতি অ্যাডভোকেট এমদাদুল হক মিলস্নাত, সুজনের মহানগর শাখার সাধারণ সম্পাদক আলী ইউসুফ, যুব ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক জহিরুল আমীন রনি, ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি আসজাদুল বোরহান তাহাসিন, সাধারণ সম্পাদক বাহার উদ্দিন শুভ, বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের জেলা শাখা আহ্বায়ক ঝর্ণা আফরিন, যুগ্ম আহ্বায়ক শহিদুল ইসলামসহ সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের নেতার বক্তব্য রাখেন।

মানববন্ধনে বক্তারা অবিলম্বে দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের দখলদারিত্ব দূর করে আবরার হত্যাসহ সব হত্যার বিচার দাবি করেন। পরে ফিরোজ-জাহাঙ্গীর চত্বর থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের হয়ে শহরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে।

বগুড়া: বুয়েট ছাত্র আবরার ফাহাদ হত্যাকান্ডের বিচারের দাবিতে বগুড়ায় মানববন্ধন করা হয়েছে। মঙ্গলবার দুপুরে শহরের সাতমাথায় বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন বগুড়া জেলা সংসদের উদ্যোগে এই মানববন্ধন করা হয়।

ছাত্র ইউনিয়ন বগুড়া জেলা সংসদের সভাপতি নাদিম মাহমুদের সভাপতিত্বে সমাবেশে বক্তব্য রাখেন, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি বগুড়া জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক আমিনুল ফরিদ, ছাত্র ইউনিয়ন বগুড়া জেলা সংসদের সাবেক সভাপতি হাসান আলী শেখ, সাধারণ সম্পাদক মো. সাদ্দাম হোসেন, যুব ইউনিয়ন বগুড়া জেলা সংসদের সাধারণ সম্পাদক শাহনেওয়াজ কবির খান পপ্পু, ট্রেড ইউনিয়ন বগুড়ার সহ-সভাপতি ফজলুর রহমান ও ছাত্র ইউনিয়ন আজিজুল হক কলেজ শাখার সাধারণ সম্পাদক শহিদুল ইসলাম।

পটুয়াখালী: পটুয়াখালী সরকারি কলেজের প্রধান ফটকে সর্বস্তরের শিক্ষার্থীদের ব্যানারে এই কর্মসূচি পালন করা হয়। কর্মসূচিতে পটুয়াখালী সরকারি কলেজের ছাত্রসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্ররা অংশ গ্রহণ করেন। পরে একটি বিক্ষোভ মিছিল সরকারি কলেজ রোড এলাকা প্রদক্ষিণ করে।

মানববন্ধনে অন্যদের মধ্যে ছাত্র প্রতিনিধি হাসান মাহমুদ খন্দকার, মাহফুজুল ইসলাম মানিক, মেহেদী আলম ও মাইনুল ইসলাম সুমন বক্তব্য রাখেন।

কুষ্টিয়া:কুষ্টিয়া প্রেসক্লাবের সামনে ফাহাদের হত্যাকারীদের বিচার দাবিতে মানববন্ধন করেছেন বাংলাদেশ জাতীয় মানবাধিকার সমিতি কুষ্টিয়া জেলা শাখার নেতৃবৃন্দ। এর আগে ১১টার দিকে 'ইসলামী শাসনতন্ত্র ছাত্র আন্দোলন' কুষ্টিয়া জেলা শাখার ব্যানারে রায়ডাঙ্গায় মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করেন সংগঠনের নেতৃবৃন্দ। এদিকে আবরার ফাহাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কুষ্টিয়া জিলা স্কুলের শিক্ষার্থীদের মঙ্গলবার বেলা ১১টায় মানবন্ধন ও বিক্ষোভ করার কথা থাকলেও পুলিশের নিষেধাজ্ঞায় তারা কর্মসূচি পালন করেনি বলে জানা গেছে। তবে বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে বুধবার জেলার বিভিন্ন স্থানে মানববন্ধন কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে।

বাউফল (পটুয়াখালী): পটুয়াখালীর বাউফলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) মেধাবী শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যাকান্ডের সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবিতে এক মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করা হয়েছে।

বাউফল সচেতন যুব সমাজের ব্যানারে মঙ্গলবার বেলা ১১টার দিকে বাউফল উপজেলা পরিষদের গেটের সামনে ঘণ্টাব্যাপী ওই মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করা হয়। মানববন্ধন কর্মসূচিতে বক্তব্য রাখেন ইঞ্জিনিয়ার ফারুক তালুকদার মহিলা কলেজের প্রভাষক আবদুল জলিল ঝন্টু, সাবেক ছাত্রলীগ নেতা মো. মাহমুদ হাসান রুবেল, দৈনিক যুগান্তরের বাউফল উপজেলা প্রতিনিধি মো. শিবলী সাদেকসহ অন্যরা।

চবি: বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েটের) মেধাবী ছাত্র আবরার ফাহাদ হত্যার প্রতিবাদে ও হত্যাকারীদের বিচারের দাবিতে অবস্থান করেছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) এক ছাত্র। মঙ্গলবার সকাল সাড়ে দশটা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহিদ মিনার চত্বরে অবস্থান নেন তিনি। অবস্থানকারী শিক্ষার্থী খালিদ সাইফুলস্নাহ বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষের ছাত্র।

এ সময় 'আবরারতো নেই, আমি না হয় গুম হব।', 'আবরার হত্যার বিচার চাই।', 'আমাকে মারুন বাংলাদেশই মরবে।', 'আমি কোনো ভুল করছি না তাই আমি ভীত নই।', ' যে কোনো বিষয়ে আসুন, বসুন, কথা বলুন।' ইত্যাদি স্স্নোগান-সম্পন্ন পস্ন্যাকার্ড দেখা যায়।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া: ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রেসক্লাবের সামনে জেলার বিভিন্ন কলেজের শিক্ষার্থীরা এই মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করে। মানববন্ধনে শিক্ষার্থীদের পক্ষে বক্তব্য রাখেন, মো. জুয়েল, সুজন আকবর ও মিজানুর রহমান।

মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, মেধাবী ছাত্র আবরার ফাহাদকে ছাত্রলীগের সদস্যরা নৃশংসভাবে হত্যা করেছে। স্বাধীন দেশে ভিন্ন মত প্রকাশের কারণে একজন ছাত্রকে পিটিয়ে মারা জঘন্য অপরাধ। আবরারকে পিটিয়ে মারার ঘটনায় জড়িত ছাত্রলীগের সদস্যদের ফাঁসির দাবি জানান তারা। যাতে করে বাংলাদেশে আর কোনো ছাত্রকে এভাবে নৃশংস হত্যাকান্ডের শিকার না হতে হয়।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে