logo
সোমবার, ১৬ ডিসেম্বর ২০১৯, ১ পৌষ ১৪২৬

  যাযাদি ডেস্ক   ১২ নভেম্বর ২০১৯, ০০:০০  

বুলবুলে ২২ জনের মৃতু্য

এবারও বাঁচিয়ে দিল সুন্দরবন

২০০৯ সালের মে মাসে ঘূর্ণিঝড় আইলা এবং ২০০৭ সালের নভেম্বরে ঘূর্ণিঝড় সিডরও স্থলভাগে উঠে এসেছিল সুন্দরবন উপকূল দিয়ে। এর মধ্যে আইলায় বাতাসের গতি ছিল ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ১২০ কিলোমিটার। আর সিডরের শক্তি ছিল তার দ্বিগুণেরও বেশি, ঘণ্টায় ২৬০ কিলোমিটার

এবারও বাঁচিয়ে দিল সুন্দরবন
ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের আঘাতে বাগেরহাট-মোংলা হাইওয়ে সড়কের ওপর দুমড়ে-মুচড়ে পড়া গাছ রোববার সরিয়ে নেন স্বেচ্ছাসেবকরা -বিডিনিউজ
অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড় বুলবুল উপকূল অতিক্রম করে বাংলাদেশে প্রবেশের সময় ঢাল হিসেবে কাজ করেছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল সুন্দরবন।

আর এর ফলে লোকালয়ে ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানির শঙ্কা অনেকটাই কমে এসেছে বলে মনে করছেন আবহাওয়াবিদ ও বনকর্মীরা।

বুলবুলের শক্তি যখন সর্বোচ্চ মাত্রায় ছিল, তখন ঘণ্টায় দেড় শ কিলোমিটার গতির বাতাস নিয়ে উপকূলের দিকে ধেয়ে আসছিল এ ঝড়। তবে উপকূল অতিক্রম করার আগে এর শক্তি কিছুটা কমে আসে।

ঘণ্টায় ১১৫ কিলোমিটার থেকে ১২৫ কিলোমিটার বেগের বাতাসের শক্তি নিয়ে শনিবার রাত ৯টায় বুলবুল পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার সাগর দ্বীপ উপকূলে আঘাত হানে।

এরপর রোববার ভোর ৫টার দিকে এ ঝড় যখন সুন্দরবনের কাছ দিয়ে পশ্চিমবঙ্গ-খুলনা উপকূলে পৌঁছায়, তখন খুলনার কয়রায় বাতাসের গতি ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৯৩ কিলোমিটার ছিল বলে আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক সামসুদ্দিন আহমেদ জানান।

তিনি বলেন, 'সুন্দরবন এ ঘূর্ণিঝড়ের গতিবেগ কমিয়ে দিয়েছে। খুলনা অঞ্চলে যখন এসেছে, ততক্ষণে অনেকটা দুর্বল হয়ে পড়ে। এ কারণে বাংলাদেশে ততটা ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। সরাসরি এলে ক্ষয়ক্ষতি অনেক বেশি হতে পারত।'

ক্রমশ দুর্বল হয়ে বুলবুল স্থল নিম্নচাপে পরিণত হলে রোববার সকালে দেশের তিন সমুদ্রবন্দরকে মহাবিপৎসংকেত নামিয়ে স্থানীয় সতর্কসংকেত দেখাতে বলে আবহাওয়া অধিদপ্তর।

সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান বলেন, 'যে রূপ ধারণ করে ঘূর্ণিঝড় বুলবুল ধেয়ে আসছিল, তাতে সুন্দরবন না থাকলে এই দক্ষিণাঞ্চলে প্রাণহানির আশঙ্কা ছিল। সুন্দরবন আমাদের রক্ষা করেছে, ঘূর্ণিঝড় বুলবুলকে রুখে দিয়েছে।'

২০০৯ সালের মে মাসে ঘূর্ণিঝড় আইলা এবং ২০০৭ সালের নভেম্বরে ঘূর্ণিঝড় সিডরও স্থলভাগে উঠে এসেছিল সুন্দরবন উপকূল দিয়ে। এর মধ্যে আইলায় বাতাসের গতি ছিল ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ১২০ কিলোমিটার। আর সিডরের শক্তি ছিল তার দ্বিগুণেরও বেশি, ঘণ্টায় ২৬০ কিলোমিটার।

দক্ষিণের উপকূলীয় এলাকাগুলোর মানুষদের জীবনে 'সিডর' এক দুঃসহ স্মৃতির নাম। ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর বাংলাদেশের সুন্দরবন-সংলগ্ন উপকূলীয় এলাকায় আঘাত হানে প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় সিডর।

প্রলয়ংকরী সিডরে মৃতু্য হয় প্রায় সাড়ে তিন হাজার মানুষের। কিন্তু আরও বহু মানুষ বেঁচে যায় সুন্দরবনের কারণে। এই ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় সেই ঝড়ে, ভেঙে পড়ে হাজার হাজার গাছপালা।

বন বিভাগের খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক মঈন উদ্দিন খান বলেন, এবার বুলবুলের কারণে সুন্দরবনের খুব বেশি ক্ষতি হয়নি বলেই তারা আশা করছেন।

তিনি বলেন, 'বনের ভেতরে নদীপাড়ে গাছপালা উপড়ে পড়েছে। বন্যপ্রাণী মারা পড়ল কি না, বনের আরও ভেতরে কেমন ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা জানতে আরও কিছু দিন সময় লাগবে। বন বিভাগের কর্মীরা সরেজমিনে কাজ করতে শুরু করেছেন। তবে প্রাথমিকভাবে আমরা ধারণা করছি, ক্ষতি খুব বেশি হয়নি।'

দুর্যোগ প্রতিমন্ত্রী এনামুর রহমান ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, 'সুন্দরবন সবুজ বেষ্টনী হিসেবে কাজ করে। এর ওপর অনেক অত্যাচার হয়। এখানে আরো গাছ লাগিয়ে সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।'

মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১৩

এদিকে ঘূর্ণিঝড় 'বুলবুলের' তান্ডবে সারাদেশে ১৩ জন প্রাণ হারিয়েছে বলে সবশেষ খবরে জানা গেছে। এর মধ্যে এক শিশুসহ ১১ জন মারা গেছে রোববার। দুজন মারা গেছে গত শনিবার। একজন ছাড়া অন্যরা গাছ ও ঘরচাপায় মারা গেছে। আশ্রয়কেন্দ্রে হৃদ্‌?রোগে আক্রান্ত হয়ে একজনের মৃতু্য হয়েছে।

বরিশাল, পটুয়াখালী, বরগুনা, পিরোজপুর, শরীয়তপুর ও গোপালগঞ্জে এসব প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে।

গাছচাপা পড়ে খুলনার দিঘলিয়া উপজেলায় আলমগীর (৪০) ও দাকোপ উপজেলায় প্রমিলা মন্ডল (৫২) মারা গেছেন। গাছচাপায় বাগেরহাটের ফকিরহাট উপজেলায় হীরা বেগম (২৫) এবং রামপাল উপজেলায় কিশোরী সামিয়া (১৫) মারা গেছে। বরিশালের উজিরপুর উপজেলায় আশালতা দেবী (৬৫), পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলায় হামিদ কাজী (৬৫) এবং পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলায় ননি মন্ডল (৫৫) মারা গেছেন। বরগুনা সদর উপজেলার হালিমা খাতুন (৭০) আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা অবস্থায় হৃদ্‌?রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।

শরীয়তপুরে মারা যাওয়া দুজন হলেন, নড়িয়া উপজেলার আলী বক্স ছৈয়াল (৬৮) ও ডামুড্যা উপজেলার আলেয়া বেগম (৪৮)। বসতঘরের ওপর গাছ ভেঙে পড়লে তারা মারা যান। এ ছাড়া গাছচাপা পড়ে গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলার সাথী বৈদ্য (৬) ও ছাকেন হাওলাদার (৭০) এবং সদর উপজেলার মাজু বেগম (৮৫) মারা যান।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম, জেলা প্রশাসক এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সূত্রে মৃতু্যর এসব তথ্যের বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া গেছে।

এছাড়া ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের কারণে আহত হয়েছে ১৫ জন। তাদের মধ্যে ৯ জন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। অন্য ছয়জনকে চিকিৎসা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। ঘূর্ণিঝড়ের সময় পটুয়াখালী ও বাগেরহাটে দুই শিশুর জন্ম হয়েছে। উভয় নবজাতকই ডাক্তার ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সেবা পেয়েছে।

ট্রলারডুবিতে নিখোঁজ ৯

জনের মরদেহ উদ্ধার

এদিকে ভোলার মেঘনা ও ইলিশা নদীর মোহনায় ট্রলারডুবির ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৯ জনের লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। সোমবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলা থেকে আটজনের লাশ উদ্ধার করা হয়। এর আগে রোববার রাতে একই জায়গা থেকে আরেকজনের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।

ভোলা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এনায়েত হোসেন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। রোববার ঝড়ের কবলে পড়ে ট্রলারটি ডুবে যায়।

পুলিশ ও স্থানীয় এলাকাবাসী সূত্রে জানা গেছে, ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার আবদুলস্নাহপুর ইউনিয়নের তোফায়েল আহমেদ মাঝির ট্রলারটি রোববার দুপুরে চাঁদপুর থেকে ছেড়ে আসে। ২৪ জন যাত্রী নিয়ে ট্রলারটি চাঁদপুর থেকে চরফ্যাশন যাচ্ছিল। যাত্রাপথে ঘূর্ণিঝড় 'বুলবুল'-এর কবলে পড়ে মেঘনা ও ইলিশা নদীর মোহনায় ট্রলারটি ডুবে যায়। এ সময় পুলিশ ও কোস্টগার্ড ১০ জনকে উদ্ধার করতে সক্ষম হলেও বাকি ১৪ জন নিখোঁজ ছিলেন। এই ১৪ জনের মধ্যে ৯ জনের লাশ উদ্ধার করা হলো।

ভোলা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এনায়েত হোসেন বলেন, রোববার রাতে বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলার মেঘনা নদী থেকে খোরশেদ আলম নামের একজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। সোমবার সন্ধ্যার দিকে একই জায়গা থেকে আরও ৮ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।

ঢাকা থেকে সারাদেশে

নৌ চলাচল শুরু

ঘূর্ণিঝড় 'বুলবুলের' কারণে টানা ৫৯ ঘণ্টা বন্ধ থাকার পর সোমবার ঢাকা নদীবন্দর থেকে সারাদেশে নৌযান চলাচল শুরু হয়েছে।

সকাল ছয়টায় ঢাকার সদরঘাট টার্মিনাল থেকে চাঁদপুর, বরিশাল, শরীয়তপুর, পটুয়াখালীসহ বেশ কয়েকটি নৌপথে ১৩টি লঞ্চ ছেড়ে গেছে।

ঢাকা নদীবন্দরের নৌযান পরিদর্শক মো. শাহনেওয়াজ এ তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, আবহাওয়া স্বাভাবিক হওয়ায় ঢাকা নদীবন্দর থেকে দক্ষিণাঞ্চলের ৪২টি নৌপথে যান চলাচল শুরু হয়েছে। তবে যাত্রীর উপস্থিতি কম ছিল।

ঘূর্ণিঝড় 'বুলবুলের' কারণে গত শুক্রবার সন্ধ্যা সাতটার পর থেকে ঢাকা নদীবন্দর সদরঘাট টার্মিনাল থেকে কোনো যাত্রীবাহী লঞ্চ ছেড়ে যায়নি। শুক্রবার নৌ নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বিভাগের পক্ষ থেকে ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের কারণে ঢাকা নদীবন্দর সদরঘাট টার্মিনালে সব ধরনের যাত্রীবাহী নৌযান চলাচল বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। লঞ্চ চলাচল বন্ধ থাকায় অনেক যাত্রীকে মালামাল নিয়ে টার্মিনালে অবস্থান করতে দেখা যায়।

আজ 'উপকূল দিবস'

উপকূলের সুরক্ষা ও মানুষের জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্য নিয়ে তৃতীয়বারের মতো পালিত হতে যাচ্ছে 'উপকূল দিবস'।

আজ দেশের ৬০টি স্থানে একযোগে এ দিবস পালিত হবে বলে জানিয়েছেন উপকূল দিবস বাস্তবায়ন কমিটি।

১৯৭০ সালে ১০ লাখ মানুষের প্রাণহাণী ঘটানো প্রলয়ংকরী ওই ঘূর্ণিঝড়ের দিনটি স্মরণে ১২ নভেম্বর রাষ্ট্রীয়ভাবে 'উপকূল দিবস' হিসেবে ঘোষণা করার দাবি করে আসছে তারা।

'সিম্পসন স্কেলে ক্যাটাগরি ৩ মাত্রার' ভয়াল ঘূর্ণিঝড়টি ১১ নভেম্বর রাতে ঘণ্টায় ১৮৫ কিলোমিটার সর্বোচ্চ গতিবেগে দেশের উপকূলে আঘাত হানে।

গত বছর জাতিসংঘের বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডবিস্নউএমও) বিশ্বের পাঁচ ধরনের ভয়াবহ প্রাণঘাতী আবহাওয়া ঘটনার শীর্ষ তালিকায় স্থান পায় এই ঘূর্ণিঝড়।

ওই তালিকায় এই ঘূর্ণিঝড়কে বিশ্বের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকর প্রাণঘাতী ঝড় হিসেবে উলেস্নখ করা হয়েছে বলে জানায় উপকূল দিবস বাস্তবায়ন কমিটি।

উপকূল দিবস বাস্তবায়ন কমিটির নেতারা জানান, '৭০-এর ১২ নভেম্বরের ী ঘূর্ণিঝড় স্মরণে এ দিনটিকে 'উপকূল দিবস' হিসেবে ঘোষণার দাবি ওঠে ২০১৭ সালে।

সে বছর থেকেই বিভিন্ন সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের উদ্যোগে দেশের উপকূলীয় অঞ্চলজুড়ে এ দিবস পালিত হয়ে আসছে।

এ বছর এ দিবসের কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে সব স্থানে শোভাযাত্রা, আলোচনা সভা, ঘূর্ণিঝড়ে প্রয়াতদের স্মরণে মোমবাতি প্রজ্বালন এবং প্রশাসনের কাছে স্মারকলিপি পেশ রয়েছে বলে জানান আয়োজকরা।

এছাড়া এ কর্মসূচি উপলক্ষে ১১ নভেম্বর সন্ধ্যায় পটুয়াখালীর গলাচিপা, বরগুনার তালতলীর শুভসন্ধ্যা সমুদ্র সৈকত ও লক্ষ্ণীপুরের কমলনগরে ১০০১টি মোমবাতি প্রজ্বালন করা হবে। সাতক্ষীরার শ্যামনগরের হরিনগরে রয়েছে ফটো প্রদর্শনী।

'উপকূল দিবস' উপলক্ষে ১২ নভেম্বর সকাল সাড়ে ১১টায় ঢাকায় জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হবে। একই সময়ে উপকূলের ৬০ স্থানে মানববন্ধন, শোভাযাত্রা ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে