logo
বৃহস্পতিবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১৫ ফাল্গুন ১৪২৬

  হাসান মোলস্না   ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০০:০০  

ওবায়দুল কাদের-মির্জা ফখরুল ফোনালাপ

নতুন পথের বাঁকে খালেদা জিয়ার মুক্তি

নতুন পথের বাঁকে খালেদা জিয়ার মুক্তি
খালেদা জিয়া
বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য আইনি লড়াই ও সাদামাটা আন্দোলনে কোনো ফল না আসার পরে জিয়ার পরিবারের তৎপরতার মধ্যে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহণ ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের এক বক্তৃব্যে এই ইসু্যটি নতুন দিকে বাঁক নিতে শুরু করেছে। শেষ পর্যন্ত সমঝোতার মাধ্যমে বিএনপিপ্রধান মুক্ত হচ্ছেন এমন আলোচনায়ই এখন সর্বত্র। বিএনপির কাছে স্পর্শকাতর হওয়ায় এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো নেতা কথা বলছেন না। তবে যেকোনো মূল্যে খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়কে দল সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে বলে আভাস পাওয়া গেছে।

চলতি মাসের শুরু থেকে জিয়া পরিবার ও দলের পক্ষ থেকে নতুন করে খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য তৎপরতা শুরু করা হয়। রাজনৈতিক এবং আইনি- এ দুই প্রক্রিয়াই সমানতালে তৎপরতা চালানো হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে পর্দার আড়ালে সরকারের সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা চলছে বলে এতদিন গুঞ্জন থাকলেও শুক্রবার তা সবার সামনে পরিষ্কার হয় ওবায়দুল কাদেরের এক বক্তব্যের মধ্য দিয়ে। ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ওবায়দুল কাদের বলেন, বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তাকে ফোন করেছেন। বেগম খালেদা জিয়ার প্যারোলে মুক্তির বিষয়ে তার সঙ্গে ফখরুল ইসলাম আলমগীরের টেলিফোনে কথা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীকে খালেদা জিয়ার প্যারোলের বিষয়ে বলার জন্য বিএনপি মহাসচিব অনুরোধ করেছেন। খালেদা জিয়ার প্যারোলে মুক্তির বিষয়ে

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইনমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছেন। এ ব্যাপারে বিএনপির পক্ষ থেকে তারা লিখিত কোনো আবেদন পাননি। বিএনপি শুধু মুখে মুখেই বলছেন, কিন্তু লিখিত কোনো আবেদন করেননি। এটি দুর্নীতির মামলা। রাজনৈতিক মামলা হলে সরকার বিবেচনা করতে পারত।

ওবায়দুল কাদের বলেন, বিএনপি বারবার সরকারের কাছে খালেদা জিয়ার মুক্তি বা প্যারোলে মুক্তি চাচ্ছে, কিন্তু বিষয়টি রাজনৈতিক মামলা নয়। সরকার বিষয়টি তখনই বিবেচনা করতে পারত, যদি সেটা রাজনৈতিক হতো।

কাদের বলেন, তারা (বিএনপি) প্যারোলোর জন্য আবেদন করলে কী কী কারণে প্যারোল চান তা আবেদনে উলেস্নখ করতে হবে। সেটা নিয়মের মধ্যে পড়ে কি-না তাও দেখতে হবে।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মেডিকেল বোর্ড যে রিপোর্ট দেবে তা আদালতের কাছে পৌঁছাতে হবে। খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা নিয়ে নেতারা যেভাবে বলেন, দায়িত্বরত ডাক্তাররা সেভাবে বলেন না। খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে সরকার এতটা অমানবিক আচরণ করবে না।

আরেক প্রশ্নের জবাবে কাদের বলেন, বিএনপি এক মুখে দুই কথা বলেন। এটা দ্বিচারিতা। তারা কী চান নিজেরাই জানেন না। এ কারণে তারা রাজনীতিতে সফল হতে পারছেন না।

ওবায়দুল কাদেরের এই বক্তব্যের পরে গতকাল বিকালে গুলশানে চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটিসহ সিনিয়র আইনজীবীরা এই বেঠক করেন। লন্ডন থেকে স্কাইপেতে যুক্ত দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সভাপতিত্বে মির্জা ফখরুল ছাড়াও বৈঠকে স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদ, জমিরউদ্দিন সরকার, মির্জা আব্বাস, আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু এবং খালেদা জিয়ার আইনজীবীদের মধ্যে অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন, অ্যাডভোকেট জয়নাল আবেদীন, অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান, ব্যারিস্টার মাহবুবউদ্দিন খোকন ও ব্যারিস্টার কায়সার কামাল ছিলেন। বৈঠকের পরে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সঙ্গে টেলিফোনের আলাপের বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ওবায়দুল কাদের কী বলেছেন এটা উনাকে জিজ্ঞাসা করলে, উনাকে বললে বেটার হবে। এখন প্রশ্ন একটাই যে, দেশনেত্রীকে এই মুহূর্তে তার শরীরের যে অবস্থা, গুরুতর অবনতি হয়েছে তার ট্রিটমেন্টের জন্য তাকে বাইরে বিদেশে পাঠানোর জন্য তার পরিবার থেকেই আবেদন জানানো হয়েছে। সরকারের এখন আর এগুলো নিয়ে রাজনীতি না করে সম্পূর্ণ মানবিক কারণে তাকে মুক্তি দেয়াটা অত্যন্ত জরুরি।

মির্জা ফখরুল বলেন, ম্যাডামের মুক্তির দাবিটা নিয়ে গত ২ বছর ধরেই বিএনপি কোর্টে যাচ্ছে। কথা বলছে, রাস্তায় নেমেছে, চিৎকার করেছে। সারা দেশবাসী এই মুহূর্তে ম্যাডামের মুক্তির দাবি করছে। একই সঙ্গে খালেদা জিয়ার পরিবারও করছে। কয়েকদিন আগেই পরিবার লিখিতভাবে বিএসএমএমইউ'র ভাইস চ্যান্সেলরকে এডভান্স ট্রিটমেন্টের জন্য চিঠি দিয়েছেন।

তিনি জানান, চেয়ারপারসনের আইনজীবীদের সঙ্গে তার মামলার বিষয় নিয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়েছে।

স্থায়ী কমিটির সঙ্গে বৈঠকের পর সুপ্রিম কোর্টের প্রবীণ আইনজীবী অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, আগামী সপ্তাহে খালেদা জিয়ার জামিন চেয়ে আবার আবেদন করা হবে। হাইকোর্ট দেশের জনগণের শেষ আশ্রয়স্থল। সেখানে এবার জামিনের আবেদন করলে অবশ্যই জামিন লাভ হবে আশা করি।

কবে নাগাদ জামিন আবেদন করবেন জানতে চাইলে প্রবীণ আইনজীবী ব্যারিস্টার জামির উদ্দিন সরকার বলেন, সিনিয়র ল'ইয়ারের সঙ্গে আলাপ করে এজ আরলি এজ পসেবল- মে বি নেকস্ট উইক, উইক আফটার আবেদন করব।

এদিকে দলের একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্রমতে, জিয়া পরিবার ও বিএনপি কাছে খালেদা জিয়ার জীবনকে এখন সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। এ নিয়ে সমঝোতার জন্য বিভিন্ন পর্যায়ে দেন-দরবারও হচ্ছে। অনানুষ্ঠানিকভাবে বিএনপির কয়েকজন নেতার সঙ্গে ক্ষমতাসীনদের কথা হয়েছে। এছাড়া ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ড. কামাল হোসেনও তৎপরতা চালাচ্ছেন। এ নিয়ে খালেদা জিয়ার ভাই ও বোনের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের এক কর্মকর্তার সঙ্গে ড. কামালের বৈঠক হয়েছে।

সূত্রমতে, এতদিন প্যারোলের ব্যাপারে বেগম জিয়াকে রাজি করানো সম্ভব না হলেও এখন কিছুটা নমনীয়। সঙ্গত কারণে বিভিন্ন মহলে প্যারোলের ব্যাপারের দুটি শর্ত নিয়ে কথা হচ্ছে। এক. দোষ স্বীকার করে চিকিৎসার জন্য প্যারোল এবং দুই. সাজা স্থগিত করে চিকিৎসা কালীন রাজনৈতিক কর্মকান্ড থেকে বিরত থাকা। এই দুটি শর্তের মধ্যে দোষ স্বীকার করে প্যারোলে যাবেন না বলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত খালেদা জিয়ার। তবে সাজা স্থগিত করে চিকিৎসার সময় দেশের বাইরে থাকাকালে সব ধরনের রাজনৈতিক কর্মকান্ড থেকে বিরত থাকার শর্তে হয়তো বেগম জিয়া রাজি হতে পারেন।

বিএনপির এক নেতা বলেন, সম্মানজনক সমঝোতায় বিএনপিপ্রধানকে হয়তো রাজি করানো সম্ভব হতে পারে। তবে আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে কোনো আপস খালেদা জিয়া করবেন না। প্রয়োজনে জেলখানায় মৃতু্যবরণ করবেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পর্দার আড়ালে বিভিন্ন মহলের আলোচনা হলেও দলীয়প্রধানের মুক্তির জন্য আইনগত ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার পাশাপাশি রাজনৈতিকভাবেও সোচ্চার থাকবে বিএনপি। চেয়ারপারসনের মুক্তির দাবিতে ইতোমধ্যে ঢাকায় সমাবেশ করেছে বিএনপি। আজ শনিবার দেশব্যাপী বিক্ষোভ সমাবেশের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও ২০ দলীয় জোটের শরিকদেরও সক্রিয় করা হচ্ছে। খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবি জানিয়ে এই দুই জোট সভা-সমাবেশও করেছে।

অন্যদিকে পারিবারিক অবস্থান প্রসঙ্গে জানা গেছে, কারাবন্দি খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বিগ্ন বেগম জিয়ার পরিবার। যে কোনো মূল্যে কারামুক্ত করে বিদেশে নিয়ে চিকিৎসা করাতে চান তারা। এ ক্ষেত্রে প্যারোলে মুক্তি নিয়েও তাদের আপত্তি নেই। তার চিকিৎসার ব্যাপারে লন্ডনে অবস্থানরত দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানও ইতিবাচক। মায়ের চিকিৎসাকেই তিনি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছেন। তার পরামর্শেই পরিবারের সদস্যরা কাজ করে যাচ্ছেন।

বিএনপি নেতাদের মতে, খালেদা জিয়ার মুক্তি সরকারের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও সরকারের সিগন্যাল ছাড়া কিছুই করবে না। এমন পরিস্থিতিতে আইনি প্রক্রিয়ার ভেতর থেকে কীভাবে তার জামিন পাওয়া যায় সেই চেষ্টাই চলছে। পর্দার আড়ালে সরকারের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধির সঙ্গে বিএনপির শীর্ষ কয়েক নেতা ও পরিবারের সদস্যদের আলোচনা চলছে। আন্তর্জাতিকভাবে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টিরও চেষ্টা করছে দলটি। খালেদা জিয়ার মুক্তির অংশ হিসেবে পরিবারের পক্ষ থেকে বিদেশে উন্নত চিকিৎসার দাবি জানিয়ে একটি আবেদন করা হয়েছে। গত মঙ্গলবার খালেদা জিয়ার ছোট ভাই শামীম ইস্কান্দার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি বরাবর এ আবেদন করেন। আবেদনে বলা হয়েছে, খালেদা জিয়ার দ্রম্নত অবনতিশীল স্বাস্থ্যের পরিপ্রেক্ষিতে যে কোনো অপূরণীয় ক্ষতি এড়াতে আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসংবলিত বিদেশি হাসপাতালে চিকিৎসা প্রয়োজন। খালেদা জিয়ার পরিবার ব্যয় বহন করবে এবং তাদের দায়িত্বে উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ক্ষেত্রে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা চেয়ে এ আবেদন করা হয়েছে। মেডিকেল বোর্ড যেন খালেদা জিয়াকে বিদেশে চিকিৎসার ব্যাপারে সরকারকে সুপারিশ করে। মঙ্গলবার এ আবেদন করার পর তার পরিবারের সদস্যরা খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তার সঙ্গে দেখা করে অপেক্ষমাণ সাংবাদিকদের কাছে সেজবোন সেলিমা ইসলাম বলেন, খালেদা জিয়ার উন্নত চিকিৎসায় মুক্তির জন্যে সরকারের প্রতি মানবিক আবেদন জানিয়েছেন। শারীরিক অবস্থা খুব খারাপ হওয়ায় মানবিক দিকটা বিবেচনা করে তাকে মুক্তি বা জামিন দেওয়া উচিত সরকারের।

প্রসঙ্গত, জিয়া অরফানেজ এবং চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুটি দুর্নীতির মামলায় খালেদা জিয়া ১৭ বছরের সাজা নিয়ে জেল খাটার দুবছর পুরো হয়েছে গত ৮ ফেব্রম্নয়ারি। বর্তমানে তিনি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে