শনিবার, ১৫ জুন ২০২৪, ১ আষাঢ় ১৪৩১

তুরস্ক, মিশর ও চায়না থেকে পেঁয়াজ পেঁয়াজ আনার চিন্তা

যাযাদি ডেস্ক
  ২১ আগস্ট ২০২৩, ০৯:৪৫
তুরস্ক, মিশর ও চায়না থেকে পেঁয়াজ পেঁয়াজ আনার চিন্তা

দেশে পেঁয়াজের দাম ফের বেড়েছে। প্রতিবেশী দেশ ভারত পণ্যটি রপ্তানিতে ৪০% শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেওয়ার পরপরই এ ঘটনা ঘটে। যদিও শুল্কযুক্ত দামের পেঁয়াজ এখনো দেশে আমদানি হয়নি। কিন্তু এক দিনের ব্যবধানে কেজিপ্রতি অন্তত ১৫ টাকা বেড়ে গেছে। এর কারণ হিসেবে ব্যবসায়ীরা বলছেন, ‘সরবরাহ কম’। আগের মতো পেঁয়াজের বাজারে অস্থিতিশীলতা ফিরে আসার শঙ্কা করছেন তারা। অবশ্য কৃষিমন্ত্রী জানিয়েছেন, শুল্ক আরোপে দামে প্রভাব পড়বে না।

জানা গেছে, ২০২০ সালের জানুয়ারি মাসের শুরুর দিকে রান্নার গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ পেঁয়াজের বাজার অস্থিতিশীল ছিল। তখন পাইকারি ও খুচরা বাজারে পণ্যটি কেজিতে ৩০-৫০ টাকা বেড়েছিল। সে সময় প্রতি কেজি দেশি পেঁয়াজ পাইকারি পর্যায়ে ১৬০ টাকা থেকে ১৭০ টাকায় বিক্রি হয়। আর চীন থেকে আমদানিকৃত পেঁয়াজ পাইকারিতে ৭০ টাকা পর্যন্ত কেজিতে বিক্রি হয়েছিল। তখনো ব্যবসায়ীরা বলেছিলেন, ‘চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় দাম বেড়েছে।’

চলতি বছরও পেঁয়াজের দাম দফায় দফায় বেড়ে আবার কমেছে। এবার আগস্ট মাসের শুরুর দিকেও পণ্যটির দাম বৃদ্ধি পায়। বিশেষ করে ‘সরবরাহ সংকটের’ অজুহাত দেখিয়ে ভারত থেকে আমদানি করা পেঁয়াজ চাক্তাই-খাতুনগঞ্জে পাইকারি বাজারে প্রতি কেজিতে দাম বাড়ে ৫ থেকে ৭ টাকার বেশি। আর খুচরা বাজারে প্রতি কেজিতে বাড়ে ৮ থেকে ১০ টাকা। খুচরা বাজারে প্রায় ৫০ টাকায় বিক্রি হয়েছিল পণ্যটি। একইভাবে দেশীয় পেঁয়াজের দামও তখন বেড়ে যায়।

সর্বশেষ গত শনিবার পেঁয়াজ রপ্তানিতে শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেয়। এ খবরের পরই দেশে রোববার খুচরা পর্যায়ে দাম বেড়ে যায়। ভারতের অভ্যন্তরে দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে দেশটির সরকার এ পদক্ষেপ নিলেও বাংলাদেশে যথাযথ কারণ ছাড়াই বেশ কিছু অঞ্চলে পেঁয়াজের দাম বাড়ানো হয়েছে।

ভারতীয় অর্থ মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে বলা হয়, নতুন করে আরোপিত শুল্ক হার শিগগিরই কার্যকর হবে। চলতি বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত তা বহাল থাকবে। দেশের বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে এবং ক্রমবর্ধমান দামে লাগাম টানতে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গত কয়েক মাস ধরেই স্থানীয় বাজারে পেঁয়াজের দাম বাড়ছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পোর্টালে দেখা যায়, ২০২৩ সালের এপ্রিল-জুনে ৬ দশমিক ৩৮ লাখ টন নিত্যপণ্যটি রপ্তানি করেছে ভারত। গত বছরের একই সময়ের চেয়ে যা ২৬ দশমিক ৫১ শতাংশ বেশি। ওই সময় ৫ দশমিক ০৪ টন তা চালান করেছিলেন দেশটির রপ্তানিকারকরা।

জানা গেছে, এতদিন ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানি করতে কোনো শুল্ক দিতে হতো না বাংলাদেশকে। হঠাৎ পেঁয়াজ রপ্তানিতে ৪০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেয় দেশটি। সবশেষ ভারত থেকে ৩৮ থেকে ৪৬ টাকায় পেঁয়াজ আমদানি করা হয়েছে। শুল্ক আরোপের পর কেজিপ্রতি ৫৩ থেকে ৬৫ টাকা পর্যন্ত খরচ পড়বে।

সোনামসজিদ বন্দরে বাড়ল ১৫ টাকা

রপ্তানিতে শুল্ক আরোপের খবরে চাঁপাইনবাবগঞ্জের সোনামসজিদ স্থলবন্দরের খুচরা ও পাইকারি বাজারে এক লাফে পেঁয়াজের দাম বেড়েছে ১০-১৫ টাকা। রোববার প্রতি কেজি পেঁয়াজ প্রকারভেদে বিক্রি হয়েছে ৫০ থেকে ৫৫ টাকা।

আমদানি তথ্য থেকে জানা গেছে, এ বন্দর দিয়ে গত ৭ দিনে ৫৭০টি ভারতীয় ট্রাকে করে ১৬ হাজার ৩৮৭ টন পেঁয়াজ আমদানি হয়েছে। গত ১৩ আগস্ট ৬৯ ট্রাকে ১ হাজার ৯৮৯ টন এবং সর্বশেষ ১৯ আগস্ট ৮৭টি ভারতীয় ট্রাকে ২ হাজার ৫০৭ টন পেঁয়াজ আমদানি হয়েছে। তবে রোববার বিকাল ৩টা পর্যন্ত কোনো ভারতীয় পেঁয়াজের ট্রাক বন্দরে প্রবেশ করেনি। সোনামসজিদ স্থলবন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান পানামা পোর্ট লিংক লিমিটেডের অপারেশন অফিসার কামাল খান সংবাদ মাধ্যমকে জানান, শনিবার এ বন্দর দিয়ে ৮৭টি পেঁয়াজের ট্রাক বাংলাদেশে প্রবেশ করলেও রোববার বিকাল পর্যন্ত কোনো পেঁয়াজের ট্রাক বাংলাদেশে প্রবেশ করেনি। তিনি ভারতীয় একটি চিঠির উদ্ধৃতি দিয়ে আরও বলেন, চলতি বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত পেঁয়াজ রপ্তানির ওপর ৪০ শতাংশ শুল্ক আরোপ অব্যাহত রাখবে ভারত সরকার। এতে করে এ বন্দর দিয়ে পেঁয়াজ আমদানি কমার আশঙ্কা রয়েছে। তবে এর আগে আমদানিকৃত পেঁয়াজ ভারতীয় ট্রাক থেকে আনলোড করে দেশীয় ট্রাকে দেশের বিভিন্ন স্থানে যাওয়া অব্যাহত রয়েছে।

হিলিতে বিক্রি হয়েছে ৫০ টাকা দরে

দিনাজপুরের হিলিতে কেজিপ্রতি ১০ থেকে ১৫ টাকা পর্যন্ত দাম বেড়েছে পেঁয়াজের। ফলে ক্রেতা সমাগম কমেছে হিলির পাইকারি ও খুচরা বাজারে। এক দিন আগেও ভারতীয় যে পেঁয়াজ ৩০ থেকে ৩৫ টাকা কেজিতে বিক্রি হতো বর্তমানে সে পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৪৫ থেকে ৫০ টাকা দরে। হিলির খুচরা বাজারের বিক্রেতারা জানান, ‘ভারতীয় শুল্ক বাড়ার খবরে হিলিতে পেঁয়াজের দাম বেড়েছে। আমরাও বেশি দামে কিনছি, তাই বাড়তি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।’

হিলি স্থলবন্দরের আমদানি-রপ্তানি গ্রুপের সভাপতি হারুন-উর রশিদ হারুন সংবাদ মাধ্যমকে জানান, ‘হঠাৎ করে ভারত পেঁয়াজের ওপর শুল্ক আরোপ করায় বাংলাদেশের বাজারে পেঁয়াজের দাম অনেক বাড়বে। এ কারণে বন্দরের ব্যবসায়ীরা অনেক ক্ষতির মুখে পড়বেন। আমাদের অনেক পেঁয়াজ আমদানির জন্য এলসি করা আছে। সেই পেঁয়াজ দেশে এলে দাম অনেকটাই স্বাভাবিক থাকত। আমরা চাই, দুই দেশের সরকারি কর্মকর্তারা বৈঠকের মাধ্যমে এর একটি সমাধান করুক।’

চট্টগ্রামে বিক্রি ৮০ টাকায়

দেশের অন্যতম বৃহৎ ভোগ্যপণ্যের পাইকারি বাজার চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে শনিবার ভালোমানের পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে কেজিপ্রতি ৪৬ থেকে ৫০ টাকা। রোববার বিক্রি হয়েছে ৬৬ থেকে ৭০ টাকা। এছাড়া চট্টগ্রামের রিয়াজউদ্দিন বাজারসহ বিভিন্ন খুচরা দোকানে কেজিপ্রতি পেঁয়াজ ৮০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে।

চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ আড়তদার সাধারণ ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. মহিউদ্দিন সংবাদমাধ্যমকে বলেন, জলাবদ্ধতার কারণে বিভিন্ন গোডাউনে পণ্য নষ্ট হয়ে গেছে। একই কারণে বাজারে কয়েকদিন গাড়ি প্রবেশ করতে পারেনি। এতে বাজারে সরবরাহ কমে গেছে। তাই দাম বাড়তির দিকে।

যশোর চেম্বার অব কমার্সের সাবেক সভাপতি মিজানুর রহমান সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘আমাদের দেশের ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। ৪০ শতাংশ শুল্কসহ এলসি করা পেঁয়াজ এখনো দেশে আসেনি কিন্তু ব্যবসায়ীরা এই ঘোষণার পরই দেশের বাজারে দাম বাড়িয়েছেন।’

বেনাপোল বন্দরের পরিচালক আ. জলিল সংবাদমাধ্যমকে জানান, আজ (রোববার) বন্দর দিয়ে ২৬ টন পেঁয়াজ আমদানি হয়েছে ভারত থেকে। তবে সেগুলোর এলসি হয়েছে আগের নিয়মে। অর্থাৎ, এসব পেঁয়াজে কোনো বাড়তি শুল্ক নেই।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘শুল্ক আরোপের ঘোষণাতে পেঁয়াজের দাম বেড়ে গেছে। আমাদের দেশের ব্যবসায়ীদের স্বভাব এমনই। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তি দামের পণ্য দেশে আসার আগেই দাম বাড়িয়ে দেন তারা। আবার কোনো সময় দাম কমলেও পণ্য এখনো আসেনি বলে দাম কমাতে চান না।’

দামে প্রভাব পড়বে না : কৃষিমন্ত্রী এদিকে, পেঁয়াজ রপ্তানিতে ভারত ৪০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করলেও বাংলাদেশে দামে তেমন প্রভাব পড়বে না বলে জানিয়েছেন কৃষিমন্ত্রী ডক্টর মো. আব্দুর রাজ্জাক। রোববার বিকালে রাজধানীর ফার্মগেটে তুলা উন্নয়ন বোর্ড (সিডিবি) মিলনায়তনে এক অনুষ্ঠানে মন্ত্রী বলেন, ‘এখন পর্যন্ত ১৩ লাখ টন পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি দিয়েছি, দেশে এসেছে মাত্র তিন লাখ টন। এর অর্থ হলো দেশেও পেঁয়াজ আছে। মাঠপর্যায়েও খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, কৃষকদের কাছে এখনো তুলনামূলকভাবে পেঁয়াজের মজুত আছে। কাজেই, ভারত পেঁয়াজ রপ্তানিতে ৪০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করলেও দেশে দামে তেমন প্রভাব পড়বে না। শুল্ক আরোপের ঘোষণায় এখন দাম কিছুটা বাড়লেও কয়েকদিন পর কমে আসবে।’

তুরস্ক, মিশর ও চায়না থেকে পেঁয়াজ আমদানির চেষ্টা করা হবে বলেও জানান মন্ত্রী।

যাযাদি/ এস

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
X
Nagad

উপরে