বৃহস্পতিবার, ১৩ জুন ২০২৪, ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

শিশুশ্রমের অভয়ারণ্য হয়ে উঠছে জাবি ক্যাম্পাস

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি
  ০১ জুন ২০২৩, ১৬:৩০
আপডেট  : ০১ জুন ২০২৩, ১৬:৩৭
শিশুশ্রমের অভয়ারণ্য হয়ে উঠছে জাবি ক্যাম্পাস

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) বটতলার হাবিব টি স্টল। সকালের ব্যস্ত সময়ে ক্রেতাদের চা-নাস্তা এনে দিচ্ছে ১৪ বছরের শিহাব। খুব অল্প বয়সে বাবা-মাকে হারিয়ে দোকান মালিক হাবিবই তার শেষ আশ্রয়স্থল। থাকা-খাওয়ার পর মাস শেষে পাওয়া যায় মাত্র পাঁচ হাজার টাকা। তাই দিয়ে তিন ভাই-বোনের স্কুলের বেতন আর পড়াশোনার খরচ চালায় সে। নিজের পড়াশোনার ব্যাপারে শিহাবের ভাষ্য, ‘পড়ালেখা করলে পরিবার চলবো ক্যামনে! দোকানে তিনবেলা খাওন দেয়, মাসশেষে পাঁচ হাজার টাকা পাই। বাড়িতে ভাই-বোনগুলারে জামাকাপড় কিইনা দিতে হয়। পড়ালেখা কি আর সবার কপালে থাকে?’

দোকান মালিক হাবিব বলেন, ‘ওদেরকে তো আমরা জোর করে আনি না। ছোট ছোট ছেলেরা নিজে থেকে আসে কাজ করতে। পরিবারের সমস্যার কথা বলে, কান্নাকাটি করে। অসহায় ছেলেগুলারে দেখে মায়া হয়। আমরা কাজে না রেখে পারি না।’

শিহাবের মতো গল্প জাবি ক্যাম্পাসের এমন শ’খানেক শিশুর। কেউ অল্প বয়সে বাবা-মা পরিবারকে হারিয়েছে। কেউ অভাবের টানে কাজ করতে আসে পরিবারের দারিদ্রের বোঝা কমাতে। কিছুদিন আগেও যারা মায়ের হাতে সকালের নাস্তা খেয়ে স্কুলে যেত, তাদের এখন কাকডাকা ভোরেই কাজে লেগে যেতে হয়। খুব সকালে শুরু হওয়া কর্মঘণ্টা শেষ হতে হতে প্রায়ই রাত ১১ টা বেজে যায়। পরিবারের জন্য এমন কষ্ট নিরুপায় হয়েই মেনে নিতে হয়েছে এই শিশু বয়সে। এমন দিনলিপি শুধু ওই একটি শিশুর নয়, জীবনের নানা দুর্বিপাকে পড়ে কাজে লেগে যাওয়া তার মত কয়েকশ শিশুর; যারা শ্রম বিক্রি করছে জাবির আবাসিক হলগুলোর ক্যান্টিন এবং বটতলার বিভিন্ন খাবার ও চায়ের দোকানগুলোতে।

সরেজমিনে ক্যাম্পাস ঘুরে দেখা যায়, জাবিতে ছেলে ও মেয়েদের মোট ২১ টি আবাসিক হল রয়েছে। মেয়েদের হলে শিশুশ্রমের দৌরাত্ম না থাকলেও ছেলেদের অধিকাংশ হলেই ক্যান্টিন, ইস্ত্রি দোকান, সেলুনে শিশুরা খুব অল্প পারিশ্রমিকে কাজ করে। বটতলার ১৩ টি দোকানে কাজ করে ১৯ জন শিশু।

সালাম বরকত হলের সামনের আটটি দোকানের চারটিতেই শিশুদের কাজ করতে দেখা যায়। ছেলেদের ১১ টি আবাসিক হল ঘুরে দেখা মেলে অন্তত ৩০ জন শিশুশ্রমিকের।

এছাড়া টারজান পয়েন্ট, পরিবহন চত্বর, পুরাতন কলার খাবার দোকানগুলোতে খাবার বিতরণ থেকে শুরু করে টেবিল পরিষ্কার, পানি আনাসহ বিভিন্ন ধরনের কায়িক শ্রমে যুক্ত আছে শিশুরা। এছাড়াও আছে ভ্রাম্যমাণ চা-বাদামওয়ালা। বিকেল হলেই চায়ের কেটলি, বাদামের ঝুড়ি নিয়ে কেন্দ্রীয় খেলার মাঠ; শহীদ মিনার চত্বরে ফেরি করে তারা। এসব শিশুদের বেশিরভাগই ছিন্নমূল।

শিশুদের সাথে কথা বলে জানা যায়, বটতলা ও হলের ক্যান্টিনের খাবারের দোকানগুলোতে কাজ করে দৈনিক দু’শ থেকে তিন’শ টাকা পাওয়া যায়। চা বা বাদাম বিক্রি করে পাওয়া যায় দৈনিক প্রায় তিন’শ টাকা। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক থেকে শহীদ মিনার পর্যন্ত দেখা মেলে এমন অন্তত ৩০ জন শিশুর। অন্তত ১০-১৫ জন শিশুর সাথে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। অল্প বয়সে কাজে যোগ দেয়ার কারণ হিসেবে তারা জানায় পরিবারের অভাব, পড়াশোনায় অনিচ্ছা, খুব ছোট বয়সে পিতৃমাতৃহীন হওয়া আর দারিদ্রতার কথা।

বাংলাদেশের শিশু আইন ২০১৩ অনুযায়ী, অনূর্ধ্ব ১৮ বছর পর্যন্ত সবাই শিশু হিসেবে গণ্য হবে। বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬ এ বলা হয়েছে, শিশুদের ন্যূনতম কাজের বয়স ১৪ বছর। এর কম বয়সীদের কাজে নিয়োগ দেওয়া যাবে না। এমনকি শিশুর অভিভাবক তাকে কাজ করানোর জন্য কারো সাথে চুক্তিও করতে পারবে না।

বটতলার দোকান মালিকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, শিশুদের কাজে লাগনোর মূল কারণ শ্রমের স্বল্পমূল্য। নামমাত্র দৈনিক মজুরিতে পাওয়া যায় এসব শিশুদের। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এ সময়েও লাভ ধরে রাখতে দোকান মালিকরা শিশুদের নিতে আগ্রহী হন।

সুজন রেস্টুরেন্টের মালিক সুজন মিয়া বলেন, ক্যাম্পাসে অনেক ছেলে এমনি এমনি ঘুরে বেড়ায়। অনেকে দোকানে কাজ করতে চায়। তাদেরকে দুইবেলা খেতে দেই, রাতে থাকতে দেই। করোনার পর দোকানের লাভও কমে গেছে। তাদের অল্প বেতন দিলেই তারা খুশি থাকে। দরিদ্র পরিবারগুলোর উপকার হয়।

বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষা নিয়ে কাজ করে সামাজিক ও সেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘তরী’। প্রতিদিন বিকেলে সমাজবিজ্ঞান অনুষদের সামনের চত্বরে শিশুদের পাঠদান করেন স্বেচ্ছাসেবকরা। সংগঠনটির সভাপতি সাজ্জাদ হোসেন রিফাত বলেন, ‘ক্যাম্পাসে শিশুশ্রমিকদের নিয়ে আমরা চাইলেও অনেক কিছু করতে পারিনা। এদের নিয়ে কাজ করাটা খুব জটিল। বিকেলে পড়ানোর সময় তারা চা-বাদাম বিক্রি করে। এসময় আয় রোজগার বাদ দিয়ে পড়ায় আগ্রহী হয় না।’