মঙ্গলবার, ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২৪ মাঘ ১৪২৯
walton1

মুমিন জীবনে রাসূলপ্রেমের অপরিহার্যতা

যাযাদি ডেস্ক
  ১১ নভেম্বর ২০২২, ১১:০৯

বনু দিনার গোত্রের এক আনসারি মহিলা। উহুদ যুদ্ধ থেকে ফেরার সময় সাহাবায়ে কেরাম তাকে সংবাদ দিলেন, আপনার স্বামী-ভাই-পিতা শহীদ হয়েছেন। মহিলা বললেন, আগে বলো, রাসূল সা: কেমন আছেন? সাহাবায়ে কেরাম বললেন, আলহামদুলিল্লাহ, তিনি ভালো আছেন। মহিলা বললেন, রাসূল সা:-কে দেখিয়ে দাও। তাঁকে নিজ চোখে দেখে শান্ত হবো। ইশারায় দেখিয়ে দেয়া হলো। সেই মহিলা রাসূল সা:-কে দেখে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনাকে দেখার পর আর কোনো মুসিবত রইল না (সিরাতে মুসতফা উর্দু, প্রথম খণ্ড)।

একজন ব্যক্তিকে কতটুকু ভালোবাসা যায়? কতটুকু ভালোবাসলে প্রমাণ মিলবে ভালোবাসার? এর মাপকাঠি কী? কতক্ষণ পর্যন্ত ভালোবাসতে হবে একজন ব্যক্তিকে? সেই ব্যক্তিটি যদি রাসূল সা: হন তাহলে?

খেলনার প্রতি শিশুর আগ্রহ যেমন; রাসূল সা:-এর প্রতি আমাদের আগ্রহ কি তেমনই হবে? না ফুলের সাথে মৌমাছির যেমন সম্পর্ক? না ওহুদ যুদ্ধে রাসূল সা:-এর জীবন্ত ঢাল আবু তালহার রাসূলপ্রেমের মতো হবে আমাদের প্রেম?
কুরআনে এসেছে, নবী ঈমানদারদের তাদের প্রাণের চেয়েও বেশি ঘনিষ্ঠ (সূরা আহজাব-৬)। ওমর রা: একবার রাসূল সা:-কে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনাকে আমি সব থেকে বেশি ভালোবাসি। কেবল আমার সত্তা ছাড়া। রাসূল সা: বললেন, আল্লাহর কসম! প্রাণাধিক বেশি ভালো না বাসলে মুমিন হতে পারবে না। ওমর রা: বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনাকে এখন প্রাণাধিক বেশি ভালোবাসি। রাসূল সা: বললেন, এখন হে ওমর (তুমি প্রকৃত মুমিন)!

জায়েদ ইবনে দাছিন রা:-কে আবু সুফিয়ান গ্রেফতার করে জিজ্ঞেস করেছিল, হে জায়েদ! তুমি কী এটি ভালো মনে করো যে, তোমার স্থানে মোহাম্মদকে হত্যা করা হবে আর তুমি পরিবারের কাছে নিরাপদে ফিরে যাবে? জায়েদ রা: চিৎকার করে বলেন, আল্লাহর কসম! পরিবারের সাথে আরামে থাকব; রাসূলের পায়ে কাঁটা ফুটবে- এটিও সহ্য করব না।
একজন অন্যজনকে ভালোবাসে, ভালো জানে অনেক কারণে। কখনো জ্ঞানের গভীরতা দেখে। কখনো সৌন্দর্য দেখে। কোনো একটি মহৎ গুণকে কেন্দ্র করেও তৈরি হয় ভালোবাসার স্বপ্নিল প্রাসাদ।

যদি কোনো একজন ব্যক্তির মধ্যে সব মহৎ গুণের সমারোহ ঘটে। সাথে সৌন্দর্যেরও তাহলে এসব প্রেমায়িত আলাপের মূল প্রার্থিত ব্যক্তি হলেন মুহাম্মদ সা: যিনি আমাদের সব ভালোবাসার কেন্দ্রবিন্দু। নবী করিম সা: ইরশাদ করেছেন, ‘তোমাদের কেউ মুমিন হতে পারবে না যতক্ষণ পর্যন্ত আমি তার কাছে অধিক প্রিয় না হবো পিতা-মাতা, সন্তান-সন্ততি, এমনকি সব মানুষ থেকে’ (বুখারি-২৫৬)।

কিয়ামতের দিন সব নবী তাদের উম্মতকে অন্য নবীর কাছে যেতে পরামর্শ দেবেন। তখন মুহাম্মদ সা: সবার জন্য সুপারিশ করবেন। মা সন্তানকে দেখে পলায়ন করবে। তখন তিনি এক একজন উম্মত খুঁজে খুঁজে বের করে সুপারিশ করবেন। মুমিন-জীবনে তো এমন নবীর প্রেম সাধনা করাই ব্রত হওয়া উচিত। কিন্তু মানুষ এই ভালোবাসা বা প্রেমের জায়গা নির্বাচনে ভুল করে জেনে, না জেনে। ইমাম মালেক রহ: বলেছেন, ‘শেষ জামানার উম্মত সততা, সফলতা পাবে কেবল ওই জিনিসের মাধ্যমে যার মাধ্যমে পেয়েছিল প্রথম মুসলমানগণ।’ অর্থাৎ সাহাবিরা।

প্রেম সর্বদা ফুটনোন্মুখ। প্রকাশোন্মুখ। সেটা চলনে হোক বা বলনে। রাসূলপ্রেম যে যুগেই মুমিন জীবনে বেশি প্রকাশ পেয়েছে সে যুগেই তারা সব সভ্যতাকে পেছনে ফেলে পুরো বিশ্বের আইডলে পরিণত হয়েছে। সেই প্রেম পরিত্যাগ করে আজ আমরা সর্বস্বান্ত। পশ্চিমীয় নগ্ন সভ্যতা-সংস্কৃতি আমাদের দিগম্বর হতে বাধ্য করেছে। সুতরাং মুমিন জীবনের প্রতিটি পরতে পরতে রাসূলপ্রেম ফুটে ওঠা অত্যাবশ্যক।

হজরত হুজাইফা রা: যখন ইরান আক্রমণ করেন কিসরা তাকে নিজ দরবারে আমন্ত্রণ জানান। সেখানে গেলে প্রথমে আপ্যায়ন করা হয়। খাবারের সময় তার হাত থেকে লোকমা পড়ে যায়। তিনি সেটি তুলে খেতে চাইলে পাশ থেকে একজন সাহাবি বললেন, ‘এখানে এমনটি না করলেও হয়’। তখন তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘এই নির্বোধদের জন্য আমি কি রাসূলের সুন্নত ছেড়ে দেবো’ (মুফতি ত্বকি উসমানীর বয়ান সঙ্কলন থেকে)? চলনে-বলনে নবীর সুন্নতের প্রতি প্রেমের এমন প্রকাশ তাদের ইতিহাসের হিমাদ্রিতে পৌঁছে দিয়েছিল। আসআদ মুলতানি বলেছেন, সুন্নত পালনে যদি তুমি মানুষের ভয় করো, তাহলে জামানা তোমার ওপর হাসতেই থাকবে (উর্দু কবিতা থেকে অনুবাদ)।

নবীজির প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের আরেকটি চিত্র দেখতে পাই উম্মুল মুমিনিন উম্মে হাবিবা রা:-এর জীবনে। একবার তার পিতা আবু সুফিয়ান তার সাথে দেখা করার জন্য মদিনায় আসেন। আবু সুফিয়ান বিছানায় বসতে গেলে উম্মে হাবিবা রা: বলেন, বাবা একটু দাঁড়ান! তখন তিনি বিছানার চাদর তুলে ফেলেন। তারপর পিতাকে বসতে বলেন। আবু সুফিয়ান বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করেন, এমনটি কেন করলে? তখন উম্মুল মুমিনিন রা: পিতাকে যুগান্তকারী জবাব দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘এই চাদরে রাসূল সা: বসেন। আপনি বসতে পারবেন না। আপনি কাফের হওয়ার কারণে নাপাক।’ আম্মাজান-এর সেই উত্তর এখনো মনের গহিনে ঝড় তোলে। বলে দেয়, কিভাবে রাসূলকে ভালোবাসতে হবে? কী পরিমাণ ভালোবাসতে হবে? মুমিন-জীবনে রাসূলপ্রেম কতটুকু প্রকাশ পাবে?

রাসূলপ্রেমের এমন গভীর চিত্র প্রকাশ করেই তো সেই সময় মুসলমানরা পদদলিত করেছিল তৎকালীন পৃথিবীর দুই পরাশক্তিকে। এর ঠিক উল্টো চিত্র বর্তমানে রাসূলপ্রেম ছেড়ে দিয়ে মুসলমানরা আজ নিজেরাই দলিত মথিত সবখানে। তাই রাসূলপ্রেমই মুমিন জীবনের পাথেয়, চলন শক্তি।

রাসূলুল্লাহ সা:-এর প্রেম মুমিন জীবনে ধারণ না করলে উপায় থাকবে না। এক সাহাবি রাসূল সা:কে জিজ্ঞেস করলেন, কেয়ামত কবে হবে? রাসূল সা: বললেন, তুমি তার জন্য কী প্রস্তুতি নিয়েছ? সাহাবি বললেন, আমি অনেক বেশি নামাজ পড়িনি। রোজা রাখিনি। তবে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ভালোবাসি। রাসূল সা: বললেন, ‘দুনিয়াতে যার সাথে ভালোবাসা থাকবে আখিরাতে সে তার সাথেই থাকবে।’ তাই রাসূলপ্রেম জীবনে ধারণ করতেই হবে। তাকে অনুসরণও করতে হবে ইচ্ছায়-অনিচ্ছায়।

যাযাদি/ সোহেল

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

উপরে