কিশোর অপরাধ প্রবণতা ও প্রতিকার

আজকের কিশোররাই আগামীর উন্নত ও সমৃদ্ধশালী দেশের কর্ণধার। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা হিসেবে দেশকে গড়ে তুলতে হলে শিশু-কিশোরদের সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
কিশোর অপরাধ প্রবণতা ও প্রতিকার

শিশু-কিশোররাই দেশ ও জাতির ভবিষ্যৎ কর্ণধার। শিশু-কিশোররা সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে বেড়ে উঠলেই দেশ ও জাতির উন্নতি ও অগ্রগতি নিশ্চিত হয়। প্রকৃতপক্ষে তাদের এ বয়সটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ। এ প্রসঙ্গে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যথার্থই বলেছেন, 'তেরো-চৌদ্দ বছরের ছেলের মতো পৃথিবীতে এমন বালাই আর নাই'। এ বয়সে শিশু-কিশোররা রঙিন স্বপ্ন দেখে এবং অতিকৌতূহলী হয়। কিন্তু প্রতিকূল পরিবেশের কারণে তারা অনেক সময় আশাভঙ্গের বেদনায় ব্যথিত হয়ে অপরাধ জগতের অন্ধকারে পতিত হয়। যার ফলে সমাজে প্রায়ই নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের ঘটনা ঘটে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম অন্ধকারাচ্ছন্ন ভবিষ্যতের দিকে ধাবিত হয়। কিশোর অপরাধের ভয়াবহ পরিণতি উপলব্ধি করতে পারেন কেবল ভুক্তভোগী পিতা-মাতাই। তাই সমাজের দায়িত্ববান সবার উচিত কিশোর অপরাধ প্রবণতা প্রতিরোধে সচেষ্ট হওয়া ও কিশোর অপরাধীদের অন্ধকার জগৎ থেকে আলোর দিকে ফিরিয়ে আনতে উদ্যেমী হওয়া এবং যথাযথভাবে বেড়ে ওঠার জন্য সুষ্ঠু ও সুন্দর পরিবেশ নিশ্চিত করা। বর্তমানে কিশোর অপরাধ প্রবণতা অন্যতম একটি সামাজিক সমস্যা। বাংলাদেশের শিশু আইন ২০১৩ অনুযায়ী ১৮ বছরের কম বয়সি যে কোনো মানুষ যখন কোনো অপরাধে লিপ্ত হয়, তখন সেই অপরাধকে কিশোর অপরাধ বলে। প্রাপ্তবয়স্করা সাধারণত সুচিন্তিতভাবে ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করতে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে অপরাধমূলক কাজ করে থাকে। পক্ষান্তরে, কিশোররা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কৃত অপরাধের পরিণাম ফল চিন্তা না করে পরিবেশ ও আবেগের বশবর্তী হয়ে বিভিন্ন প্রকার অপরাধমূলক কার্যকলাপে জড়িয়ে পড়ে। কিশোর অপরাধীরা তাদের সঙ্গ সাথীদের নিয়ে সংঘবদ্ধ হয়ে বড় ধরনের অপরাধ কার্যক্রম করে থাকে, যা কিশোর গ্যাং নামে পরিচিত। বর্তমানে শুধু রাজধানী ঢাকাতেই ৭৮টির বেশি কিশোর গ্যাং সক্রিয় আছে এবং ৫১ জন গডফাদার অপরাধকর্মে ইন্দন জোগাচ্ছে। এ সব কিশোর গ্যাং-এ ২ হাজারেরও বেশি সক্রিয় সদস্য রয়েছে। (মানবজমিন, তারিখ ০৭ মার্চ ২০২২।) তারা বিভিন্ন চমকপ্রদ নামে সমাজে পরিচিত হয়। ঢাকা মোহাম্মদপুরে ফিল্ম ঝির ঝির, আতঙ্ক, স্টার বন্ড, গ্রম্নপ টোয়েন্টি ফাইভ, লাড়া দে, লেভেল হাই, দেখে ল-চিনে ল এবং কোপাইয়া দে গ্যাং গ্রম্নপ। তেজগাঁওয়ে মাঈনুদ্দিন গ্রম্নপ, উত্তরায় নাইন স্টার, ডিস্কো বয়েজ, পাওয়ার বয়েজ, বিগ বস, নাইন এম এম বয়েজ, সুজন ফাইটার, ক্যাসল বয়েজ, আলতাফ জিরো, ভাইপার, তুফান এবং ত্রি গোল গ্যাং। মিরপুরে সুমন গ্যাং, পিচ্চি বাবু, বিহারী রাসেল, বিচ্চু বাহিনী, সাইফুল গ্যাং, বাবু রাজন, রিপন গ্যাং, সাব্বির গ্যাং, নয়ন গ্যাং এবং মোবারক গ্যাং। বংশালে জুম্মন গ্যাং গ্রম্নপ, ধানমন্ডিতে রয়েছে একে ৪৭, নাইন এম এম ও ফাইভ স্টার বন্ড গ্যাং গ্রম্নপ। রাজধানীর মুগদায় চান জাদু (জমজ ভাই), ডেভিল কিং ফুল পার্টি, ভলিয়ম টু ও ভান্ডারি গ্যাং গ্রম্নপ। (যুগান্তর, তারিখ ২০ জুন ২০২১)। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন এলাকায় কিশোর গ্যাং বিভিন্ন চমকপ্রদ নামে এলাকায় অপরাধ কর্মকান্ডে জড়িত হয়। সাম্প্রতিক ঘটে যাওয়া কিছু কিশোর অপরাধের লোমর্হষক ঘটনা জনমনে চিন্তার উদ্বেগ করেছে। গত ২০১৭ সালের ০৬ জানুয়ারি আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে উত্তরা, ঢাকার 'নাইন স্টার' গ্যাংয়ের সদস্যরা তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী সংগঠন 'ডিস্কো বয়েজ'-এর সদস্য আদনানকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। প্রেমের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ২৬ জুন ২০১৯ তারিখ বরগুনা জেলার নয়ন বন্ড-০০৭ নামক কিশোর গ্যাং কর্তৃক প্রকাশ্যে জনসম্মুখে হত্যার শিকার হয় রিফাত শরীফ। তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ০৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯ তারিখ গাজীপুর সদর থানাধীন রাজদীঘিরপাড় এলাকায় 'দীঘিরপাড় গ্রম্নপ' এবং 'ভাই-ব্রাদার্স গ্রম্নপ'-এর মধ্যে কোন্দলে দীঘিরপাড় গ্রম্নপের সদস্য নুরুল ইসলাম নামক এক কিশোরকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে। আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে গত ১০ আগস্ট ২০২০ তারিখ নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলায় কিশোর গ্যাং কর্তৃক খুন হয় মিনহাজুল ইসলাম নিহাদ ও জিসাদ আহমেদ। (যুগান্তর, তারিখ ১০ জুন ২০২১)। তাছাড়া গত ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২১ তারিখ পুরান ঢাকার লালবাগের ৪৭/১ ডুরি আঙ্গুলি লেনের পাঁচতলা একটি ভবনের ছাদে হাফিজ (১৩) নামক এক কিশোরকে গলা কেটে নৃশংসভাবে হত্যা করে কিশোর গ্যাং-এর সদস্যরা। তাছাড়া মাদকাসক্ত ও উচ্ছৃংখল জীবনযাপনের ফলে গত ১৬ আগস্ট ২০১৩ তারিখ রাজধানীর চামেলীবাগ এলাকায় নিজ কিশোরী কন্যা ঐশীর হাতে নির্মমভাবে নিহত হন পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) পরিদর্শক ও তার স্ত্রী। (বাংলাদেশ প্রতিদিন, তারিখ ১২ মার্চ ২০১৮)। এ সব মর্মান্তিক কিশোর অপরাধগুলো জনমনে ব্যাপক আতঙ্ক সৃষ্টি করছে। কিশোর অপরাধ প্রবণতার কারণগুলো অনুসন্ধানে প্রথমেই যে বিষয়টি বিবেচনায় আসে তা হলো ঝুঁকিপূর্ণ সামাজিক অবস্থা। আমাদের দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩০-৩২ শতাংশ অর্থাৎ প্রায় ৪ কোটি শিশু-কিশোর। এর মধ্যে এক-তৃতীয়াংশের অধিক প্রায় ০১ কোটি ৩০ লাখ শিশু-কিশোর বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত। (যুগান্তর, তারিখ ২৯ মে ২০২১)। ফলে অতি সহজেই তাদের যে কোনো অপরাধমূলক কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। আধুনিক সমাজব্যবস্থায় দ্রম্নত শিল্পায়ন ও নগরায়ণের নেতিবাচক ফল হিসেবে ক্রমবর্ধমানহারে বেড়ে চলেছে কিশোর অপরাধ। শহর ও বস্তির ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশ এবং সমাজজীবনে বিরাজমান বৈষম্য, নৈরাজ্য, বিশৃঙ্খলা, দরিদ্রতা ও হতাশা কিশোর অপরাধ বৃদ্ধির প্রধান কারণ। কিশোর অপরাধের ক্ষেত্রে পরিবার এবং সমাজের ভূমিকা অনেকাংশেই দায়ী। কেননা একটি শিশু পরিবারে জন্মগ্রহণ করে এবং পরিবারের মাধ্যমেই সমাজ তথা বাহ্যিক পরিবেশের সঙ্গে পরিচিত হয়। পরিবার থেকেই ধর্মীয় নীতি-নৈতিকতা ও সামাজিক প্রথার শিক্ষা গ্রহণ করে থাকে। এ জন্য পরিবার এবং সমাজই হলো সুনাগরিক হিসেবে বেড়ে ওঠার প্রধান ভিত্তি। পিতা-মাতার মধ্যে মনোমালিন্য ও কলহ বিবাদ থাকলে সন্তানের উপর তার বিরূপ প্রভাব পড়ে। যার পরিণামে শিশু-কিশোরদের অপরাধপ্রবণ হতে বিশেষভাবে সাহায্য করে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রভাবও শিশু-কিশোরদের গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বর্তমানে দ্রম্নত পরিবর্তনশীল সমাজে অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার অন্তর্নিহিত তাৎপর্য, ছাত্র-শিক্ষকের পারস্পরিক সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক, ছাত্রছাত্রীর নৈতিক ও সামাজিক মূল্যবোধের অনুশীলন ও শিক্ষার অভাব বিরাজমান। তাছাড়া শিক্ষার্থীদের জন্য গঠনমূলক সুষ্ঠু চিত্তবিনোদন, খেলাধুলার সুযোগ-সুবিধা ও সুষ্ঠু মেধা বিকাশের সুযোগের অভাবও প্রকট। বর্তমান সমাজে অনেক চাকরিজীবী পিতা-মাতার চাকরিজনিত কারণে ঘন ঘন বদলির ফলে বাচ্চাদের মধ্যে পারস্পরিক সংযোগ ও সংহতির অভাব পরিলক্ষিত হয়। নতুন পরিবেশে নতুন সামাজিক ও সংস্কৃতির সঙ্গে তারা নিজেদের খাপ খাওয়াতে হিমশিম অবস্থার সৃষ্টি হয়। ফলে এ সব কিশোররা বিভিন্ন প্রকার অপরাধমূলক কর্মকান্ডে লিপ্ত হয়। 'সৎ সঙ্গে স্বর্গ বাস আর অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ' কিশোর অপরাধের ক্ষেত্রে এ প্রবাদটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এই বয়সে কিশোর-কিশোরীরা পরিবারের প্রভাবমুক্ত হয়ে স্বাধীনভাবে চলতে চায়। এসময় তারা পাড়া-প্রতিবেশী, খেলার সাথী ও সমবয়সিদের সঙ্গে মিশে সঙ্গপ্রভাবে অত্যন্ত সহজে ও স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিভিন্ন শিক্ষা লাভ করে থাকে। এসময় অপরাধপ্রবণ বন্ধু এবং সমবয়সিদের সঙ্গে তাল মেলাতে অনেক সময় কিশোর-কিশোরীরা জঘন্য অপরাধমূলক কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়ে। বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো কিশোর-কিশোরীদের দারুণভাবে প্রভাবিত করে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের ফলে কিশোর-কিশোরীদের কাছে পর্নোগ্রাফি সাইট উন্মুক্ত হয়ে পড়ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তারা সহজেই পর্নোগ্রাফি এবং অশ্লীল ভিডিও চিত্র অতি সহজেই পেয়ে যাচ্ছে। যার মাধ্যমে তাদের অপরিপক্ব মানসিকতায় বিরূপ প্রভাব ফেলছে। ফলস্বরূপ বুদ্ধির বন্ধ্যত্ব তৈরি হচ্ছে ও সুষ্ঠু মেধা বিকাশে বিঘ্নিত হচ্ছে। এর ফলে সমাজে বেড়ে যাচ্ছে ধর্ষণ, ইভ টিজিং, যৌন হয়রানিসহ নানাবিধ কিশোর অপরাধমূলক কর্মকান্ড। পরিবারের দরিদ্রতা ও অর্থের প্রাচুর্যতা উভয়ই কিশোর অপরাধের জন্য দায়ী। দরিদ্রতার জন্য মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে না পারায় কিশোর-কিশোরীরা হতাশা ও মানবেতর জীবনযাপন করে। মৌলিক চাহিদা পূরণ এবং হতাশা থেকে বাঁচার প্রয়াসে এসব কিশোর-কিশোরীরা বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়ে। পক্ষান্তরে, যে সব কিশোর-কিশোরীরা প্রয়োজনের তুলনায় বেশি অর্থ পায় এবং তা ব্যয় করতে অভিভাবকের নিকট তেমন কোনো জবাবদিহিতা করতে হয় না। সে সব কিশোর-কিশোরীরা অর্থের প্রাচুর্য থেকে মাদকাসক্ত ও ইভ টিজিংসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কার্যক্রমে লিপ্ত হয়। কিশোর অপরাধ প্রবণতা প্রতিরোধে শিশু-কিশোরদের জন্য সুষ্ঠু বিনোদন ও খেলাধুলার সুব্যবস্থা থাকা খুবই দরকার। ১৮৭৮-১৮৮০ সালে ব্রিটেনের দায়িত্বশীল কতিপয় ব্যক্তি কিশোর অপরাধে অতিষ্ঠ জনগণের সুরক্ষায় এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। তারা কিশোর অপরাধীদের মননশীল বিনোদনের জন্য ১৮৭৮ সালে ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টার শহরে নিউটন হিথ এল অ্যান্ড ওয়াই আর এফসি এবং ১৮৮০ সালে সেইন্ট মার্কস (ওয়েস্ট গর্টন) নামে দুটি ফুটবল ক্লাব গঠন করেন। খুব অল্প সময়ের মধ্যে এ ক্লাব দুটির মাধ্যমে কিশোর তরুণদের সমাজবিচু্যতি মনোভাব পাল্টে দিয়ে সৃজনশীল কর্মকান্ডে প্রচন্ডভাবে উৎসাহিত করে। আর এ দুটি ক্লাবই হচ্ছে পরবর্তী এবং বর্তমান সময়ের সফল ও জনপ্রিয় ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ও ম্যানচেস্টার সিটি ফুটবল ক্লাব। কিশোর অপরাধ প্রতিরোধে ধর্মীয় অনুশাসনের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। ধর্ম মানবজীবনকে পরিপূর্ণ ও সৌন্দর্যমন্ডিত করে। সব ধর্মই মানুষকে নীতি ও নৈতিকতার শিক্ষা দেয়। সব ধর্মই অন্যায়ের বিপক্ষে এবং ন্যায়ের পক্ষে কথা বলেছে। সব ধর্মই সব সময় সৎ পথে চলার, সুন্দরভাবে বাঁচার ও সরলপথ অনুসরণ করার তাগিদ দিয়েছে। নিজ নিজ ধর্মের বিশুদ্ধ চর্চা ও যথাযথ অনুশীলনের মাধ্যমে কিশোর অপরাধস্পৃহা অবদমনসহ আত্মশুদ্ধির পথ উন্মুক্ত হয়। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শিশু ও কিশোরদের সুষ্ঠু মানসিক বিকাশের জন্য এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন। তিনি শিশু আইন-১৯৭৪ প্রণয়ন করেছিলেন। তার সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদের অনুসরণে শিশু আইন ১৯৭৪-কে আরও যুগোপযোগী করে শিশু আইন-২০১৩ প্রণয়ন করেন। জাতিসংঘ কর্তৃক বেঁধে দেওয়া বয়সসীমার পরিপ্রেক্ষিতে শিশুদের ক্ষেত্রে ১৩ বছর পর্যন্ত এবং কিশোরদের ক্ষেত্রে ১৩-১৮ বছর পর্যন্ত এই আইনের আওতায় পড়ে। কিশোর অপরাধীদের সংশোধনের মাধ্যমে সমাজের মূলধারায় ফিরিয়ে আনাসহ সমাজে কিশোর অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকারের যাবতীয় কার্যক্রম এ আইনে উলেস্নখ রয়েছে। শিশু আইন ২০১৩ অনুযায়ী দেশের সব থানায় শিশু কিশোরদের বিষয় নিয়ে একটি করে ডেস্ক রাখার কথা বলা হয়েছে। শিশু আইন ২০১৩ অনুযায়ী কিশোর অপরাধ মামলার নিষ্পত্তি ও শুনানির জন্য শিশু আদালত প্রতিষ্ঠার বিধান রাখা হয়েছে। শিশু আদালত প্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত কিশোর অপরাধ মামলার নিষ্পত্তি ও শুনানির জন্য নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইবু্যনালকে দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছে। বর্তমানে সারাদেশে ১০১টি ট্রাইবু্যনাল নিয়মিতভাবে এই অর্পিত দায়িত্ব পালন করে আসছে। ১৯৭৬ সালে ঢাকার অদূরে গাজীপুর জেলার টঙ্গীতে প্রতিষ্ঠিত হয় কিশোর আদালত, কিশোর হাজত এবং সংশোধন প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে জাতীয় কিশোর অপরাধ সংশোধন ইনস্টিটিউট। শিশু-কিশোরদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে এবং অপরাধপ্রবণতা থেকে দূরে রাখতে বর্তমান সরকার সারাদেশব্যাপী বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামো গড়ে তুলেছেন। এ সংক্রান্ত আইন-কানুন ও নীতি যুগোপযোগী করা হয়েছে। মাতা-পিতা ও অভিভাবকদের অনুপস্থিতিতে অনাথ শিশুদের দায়িত্ব সরকার সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে নিচ্ছেন। এ সব শিশু-কিশোরদের খাদ্য, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ বিভিন্ন মৌলিক চাহিদা নিশ্চিত করে সরকারি শিশু পরিবার, সরকারি আশ্রয়কেন্দ্র, দুস্থ শিশু প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসন কেন্দ্র, কিশোর-কিশোরী উন্নয়ন কেন্দ্র, ছোটমণি নিবাস প্রভৃতি নানা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করা হচ্ছে। বাংলাদেশে কিশোর অপরাধ প্রবণতা কমাতে এবং শিশু-কিশোরদের সুষ্ঠু ও স্বাভাবিক মানসিক বিকাশের প্রয়াসে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে সারাদেশে ইউনিয়ন পর্যায়ে প্রায় আট হাজার ক্লাব শিশু-কিশোরদের নিয়ে কাজ করছে। (ঔধমড়হবংি২৪.পড়স, তারিখ ২৩ আগস্ট ২০২১)। কিশোর অপরাধ সংশোধনে এ সব ক্লাব খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। কিশোর অপরাধ দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সদা তৎপর। 'সবার হোক একটাই পণ, কিশোর অপরাধ করব দমন' এই স্স্নোগানকে সামনে রেখের্ যাব ফোর্সেস লিড এজেন্সি হিসেবে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। গ্যাং কালচার ও কিশোর অপরাধ দমনের্ যাবের সাঁড়াশি অভিযান অব্যাহত আছে। ২০১৭ সাল থেকে আপ পর্যন্ত সাত শতাধিক কিশোর অপরাধীকে গ্রেপ্তার করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।র্ যাব ফোর্সেস বিভিন্ন মিডিয়ার মাধ্যমে কিশোর অপরাধ প্রবণতা রোধকল্পে জনসচেতনতামূলক প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে। তাছাড়া বিভিন্ন সভা-সেমিনার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্রছাত্রীদের কিশোর অপরাধ প্রবণতা প্রতিরোধ ও তার কুফল সম্পর্কে নিয়মিত প্রেষণা প্রদান করছে। এই বাহিনীটির নিয়মিত প্রচার প্রচারণার পাশাপাশি কিশোর অপরাধমুক্ত সমাজ গঠন ও বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সার্বক্ষণিক গোয়েন্দা নজরদারি ও বিভিন্ন আভিযানিক কর্মকান্ডের মাধ্যমে পরিস্থিতি উন্নয়নের জন্য কাজ করে যাচ্ছে। আজকের কিশোররাই আগামীর উন্নত ও সমৃদ্ধশালী দেশের কর্ণধার। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা হিসেবে দেশকে গড়ে তুলতে হলে শিশু-কিশোরদের সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। \হকিশোর-কিশোরীদের সুপ্ত প্রতিভাকে বিকশিত করে দেশের উন্নয়নের স্বার্থে কাজে লাগাতে হবে। কিশোর অপরাধ দমনে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সমাজের সংশ্লিষ্ট সবাইকে সচেতন থাকতে হবে। শিশু-কিশোরদের জন্য খেলাধুলা, সুষ্ঠু বিনোদন ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের ব্যবস্থা করতে হবে। সুদৃঢ় পারিবারিক বন্ধন, সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধ শিশু-কিশোরদের সব ধরনের অপরাধ থেকে দূরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। যে কোনো মূল্যেই কিশোর অপরাধমুক্ত সমাজ গড়তে হবে। বর্তমান শিশু-কিশোরদের নিরপরাধী ও প্রকৃত মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারলেই, আগামীর বাংলাদেশ হবে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর সুখ সমৃদ্ধিপূর্ণ স্বপ্নের সোনার বাংলা। লেফটেন্যান্ট কর্নেল মুহাম্মদ মোসতাক আহমদ, বিএসপি, পিএসসি : অধিনায়ক,র্ যাব-৬

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

আরও খবর

Copyright JaiJaiDin ©2022

Design and developed by Orangebd


উপরে