logo
সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২০ ৬ আশ্বিন ১৪২৭

  আহমদ মতিউর রহমান   ১২ আগস্ট ২০২০, ০০:০০  

শ্রীলংকায় রাজাপাকসের দলের বিপুল বিজয় প্রভাব রাখবে এ অঞ্চলের রাজনীতিতেও

মাহিন্দার নতুন সরকার কোন পথে যাবে? চীনের স্বার্থ আর ভারতের মন রক্ষা করে চলা কঠিন হয়ে পড়তে পারে বলে ভাষ্যকারদের অভিমত। এসব বিষয় স্পষ্ট হবে নতুন মন্ত্রিসভা গঠন ও সরকারের ১০০ দিনের হানিমুন পিরিয়ড শেষ হওয়ার পর। সে পর্যন্ত অপেক্ষা করতেই হবে।

যেমনটা মনে করা হয়েছিল তাই হয়েছে শ্রীলংকায়। বিরোধী শিবিরে ভাঙন ক্ষমতাসীন দলকে বিশাল বিজয় তো দিয়েছেই সেই সঙ্গে দেশের রাজনীতিতে রিবাট পরিবর্তন নিয়ে আসছে। দেশটিতে অস্থিরতা চলছিল বহুদিন থেকে। পার্লামেন্ট নির্বাচন দেশটি আগামীতে কোন পথে চালিত হবে তার একটি ইন্ডিকেটর হিসেবে কাজ করবে ভাষ্যকারদের অভিমত ছিল এমনই। নির্বাচনী ফলে সেটা স্পষ্ট হয়েছে। ভাষ্যকাররা ভাবছিলেন এমনটাই। একদিকে করোনাভাইরাস অন্যদিকে আঞ্চলিক রাজনীতির পাশা খেলায় দেশটির অবস্থা ভালো নয়। দেশটিকে নিয়ে চীন-ভারতের দ্বৈরথ ঠেলে দিতে পারে কঠিন আবর্তে। করোনার কারণে দুবার পেছানো হয়েছে নির্বাচন। শেষে বিধি মেনে ভালোয় ভালোয় কাজটা শেষ হলো। আগের কাহিনি একটু বলতে হয় ঘটনাবলি বোঝার জন্য। ২০১৮ সালের নভেম্বরে প্রেসিডেন্ট সিরিসেনা পার্লামেন্ট ভেঙে দিয়ে নির্ধারিত সময়ের এক বছর আগে ২০১৯ সালে সাধারণ নির্বাচন আহ্বান করেন। সুপ্রিম কোর্ট সেই আদেশ বাতিল করে ২০২০ সালেই নির্বাচন করার নির্দেশ দেয়। এরই মধ্যে এসে পড়ে করোনা মহামারি। ফলে নির্ধারিত সময়ে আর নির্বাচন হয়নি। এ সময় শ্রীলংকায় আরও কিছু ঘটনা ঘটে গেছে। পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি ঘটায় ৫ আগস্ট সেই পার্লামেন্ট নির্বাচন সম্পন্ন হলো। সাবেক প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমসিঙ্গের সঙ্গে সিরিসেনার বিরোধের ফলে রাজনৈতিক সংকট হয়েছে পাঠকদের নিশ্চয় তা জানা। নির্বাচনে রনিল পুরোপুরি আউট হয়ে গেছেন। টিকে গেছে তার দল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া সাজিথ প্রেমদাসার একেবারে আনকোড়া নতুন দল। আর মাহিন্দাকে হারিয়ে শ্রীলংকার খোল নলচে পাল্টে দেওয়া সাবেক প্রেসিডেন্ট সিরিসেনা এখন সেই মাহিন্দার দলেরই এমপি। এজন্য বলা হয়ে থাকে রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই। তবে কেন সিরিসেনা তার নিজের ক্ষমতা কমিয়েছিলেন, যা আবার আগের স্থানে আসতে যাচ্ছে এটাই বিশ্লেষকদের কাছে বিস্ময়।

মাহিন্দার দল এটি ছাড়াও সংবিধানে বহু পরিবর্তন আনতে চাইছে। আর তারা চীনা কক্ষপথের পথিক হয়ে চলতে চাইছে সেটাও পরিষ্কার। তবে বড় প্রতিবেশী ভারতও শ্রীলংকাকে তার বাহুডোরে নিতে আগ্রহী। ভারতের সঙ্গে ভুল বোঝাবোঝির অবসান চায় বিজয়ী এসএলপিপি। দলটির বিজয়ের সঙ্গে সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির অভিনন্দন জানানোও তাৎপর্যবহ। এতসব সত্ত্বেও তিনি দিলিস্নর সাউথ বস্নককে কতটা আশ্বস্ত করতে পারবেন বলা মুশকিল।

এখন আসুন আমরা নির্বাচনের ফলাফলটা একবার দেখে নিই। ২২৫ আসনের মধ্যে এসএলপিপি পেয়েছে ১৪৫ আসন। ভোট প্রাপ্তির হার ৫৯ শতাংশ। ৫৪ আসন নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে সাজিথ প্রেমদাসার এসজেবি (সমাজি জন ওয়েগিয়া)। ভোট পেয়েছে ২৩ দশমিক ৯ শতাংশ। তৃতীয় স্থানে আছে ১০ আসন নিয়ে মধ্যপন্থি তামিল দল আইটিএকে (আইলংকাই তামিল আরাসু কাদচি)। তাদের ভোটপ্রাপ্তির হার ২ দশমিক ৮ শতাংশ। রনিল বিক্রমসিঙ্গের ইউএনপি মাত্র একটি আসন পেয়েছে। ভোটপ্রাপ্তির হার ২ দশমিক এক পাঁচ শতাংশ। এ ছাড়া জেজেবি (জাথিকা জন ওয়েগিয়া) ৩টি, এআইটিসি (আহিলা আইলংকাই তামিল কংগ্রেস) ও ইডিপিপি (ইলাম পিপলস ডেমোক্রেটিক পার্টি দুটি করে আসন পেয়েছে। শ্রীলংকা ফ্রিডম পার্টি, মুসলিম ন্যাশনাল এলায়েন্স ও শ্রীলংকা মুসলিম কংগ্রেসসহ ৯টি দল পেয়েছে ৯টি আসন। এসব দলের ভোটপ্রাপ্তি খুবই কম। আর নির্বাচন শান্তিপূর্ণ, অবাধ নিরপেক্ষ হয়েছে বলেই মনে করা হচ্ছে। ভোটদানের হার ৭১ শতাংশ, করোনাকালে তা নিতান্ত কম নয়। আর মনে করিয়ে দিই শ্রীলংকার নির্বাচন ব্যবস্থাটা একটু জটিল। সেখানে ২২টি মাল্টি মেম্বার ইলেকটোরাল ডিসট্রিক্টে আমেরিকার মতো একটি পদ্ধতি (ডিহন্ড মেথড) মতে একটি ওপেন লিস্টে প্রোপোরশনাল রিপ্রেজেন্টেশন সিস্টেমে (আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থা) ২২৫ আসনের মধ্যে ১৯৬ জন এমপি নির্বাচিত হন। বাকি ২৯টি আসন প্রতিদ্বন্দ্বী দল ও নির্দল গ্রম্নপের জাতীয়ভাবে প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে বরাদ্দ করা হয়। এই জটিলতায় ২ দশমিক ৮ শতাংশ ভোট পেয়ে আইটিএকে ১০ আসন পেলেও ২ দশমিক এক পাঁচ শতাংশ ভোট পেয়ে ইউএনপি প্রাপ্ত আসন মাত্র একটি।

নানা ঝড়-ঝাপটার মধ্যদিয়ে রনিল সাম্প্রতিক একটি টার্ম ক্ষমতায় ছিলেন। তাকে ফেলে দেওয়ার চেষ্টায় মাহিন্দাকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ দেন প্রেসিডেন্ট সিরিসেনা। কিন্তু তা ধোপে টেকেনি। একে পার্লামেন্ট ভবন দখলে ছিল রনিলের। তার ওপর সিরিসেনার নির্দেশ বাতিল করে দেয় সুপ্রিম কোর্ট। আগেভাগে নির্বাচনের নির্দেশ দিয়েও তিনি টেকাতে পারেননি। সেকথা আগেই বলেছি। কিন্তু এতসব হওয়ার পর রনিলের এই শোচনীয় পরাজয়ের কারণ কি? হামবানতোতা বন্দর চীনের কাছে লিজ দেওয়া মনে হয় নাগরিকরা ভালোভাবে নেয়নি। তারপর হোটেলে বোমা হামলায় প্রায় ৩০০ লোকের প্রাণহানি শ্রীলংকার বড় জাতিগত অংশ সিনহালা বা সিংহলিরা ভালোভাবে নেয়নি। মাহিন্দা আগের প্রেসিডেন্ট টার্র্মে কর্তৃত্ব পরায়ণ হয়ে উঠেছিলেন বলে তাকে সরাতে তেলে-জলে মিশ খেলেও তা স্থায়ী হয়নি। রনিলের সঙ্গে সিরিসেনার বিরোধ সেই কথাই বলে। আরও কিছু কারণ থেকে থাকবে যা এই লেখায় হয়তো বলা সম্ভব নয়, অন্তত বলার সময় আসেনি। রনিলের দল ক্ষমতায় থাকার পর আলসেমিতে নেতারাও ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন একথা বলেছেন স্থানীয় ভাষ্যকাররা। সেখানে আবার দলের ভেতরে ভাঙন সৃষ্টি হলে, একে অন্যের প্রতি কাদা ছোড়াছুড়ির পর মাহিন্দার দলের জন্য তা ছিল সোনায় সোহাগা। শ্রীলংকা পদুজনা পেরামুনা (এসএলপিপি) বা শ্রীলংকা পিপলস ফ্রন্টের ৫ আগস্টের নির্বাচনকে সামনে রেখে অবস্থা হয়েছিল তাই। দলটি জয়ী হতে পারবে কিনা সে প্রশ্ন ছিল না, প্রশ্ন ছিল তারা একাই কি ২২৫ আসনের পার্লামেন্টে দুই-তৃতীয়াংশ আসন পাবে কিনা। নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর সব প্রশ্নের সমাধান মিলেছে। এসএলপিপি প্রতিষ্ঠাতা ও দলের জাতীয় নেতা বাসিল রাজাপাকসে নির্বাচনে ১৩০ থেকে ১৩৫টি আসন পাবে বলে ধারণা করলেও পেয়েছে আরও বেশি। তাদের জয় প্রেসিডেন্ট গোটাবায়ার হাতকে শক্তিশালী করবে এতে কোনো সন্দেহ নেই।

ভোটের আগে রনিল বলেছিলেন, ''নতুন প্রধানমন্ত্রী মনোনয়নের ক্ষমতা কেবল পার্লামেন্টের। আর প্রধানমন্ত্রীই মন্ত্রী নিয়োগ দিতে পারেন।' নতুন সরকার সংবিধানকে আবার আগের স্থানে নিয়ে গেলে প্রেসিডেন্টের কাছে চলে যাবে এই ক্ষমতা। গোটাবায়া তা প্রয়োগও করবেন। ফলে রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন আসবে। যে ভোটাররা প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা কমালেন তারাই আবার তা বাড়ালেন। তাদের মতিগতি বোঝা ভার। তবে ইউএনপিতে বিভক্তি বিপক্ষ দলকে ভোটের বাক্স ভরতে সহায়তা করেছে এটাও মনে রাখতে হবে। রনিলের সরকার পরিচালনার ব্যাপারে তার মন্ত্রী ও ইউএনপি উপনেতা সাজিথের সন্তুষ্টি ছিল না, ছিল বিভিন্ন বিষয়ে মতের অমিলও। এটাই ইউএনপি ভাঙার প্রধান কারণ বলে জানা যাচ্ছে। কে এই সাজিথ? গত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে গোটাবায়ার কাছে হেরে যান তিনি। বোমা হামলায় নিহত দেশের সাবেক প্রেসিডেন্ট প্রেমাদাসার ছেলে সাজিথ। তার পিতার একটি ভোট ব্যাংক ছিল, যেটা সাজিথ পেয়েছেন। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে পরাজিত হওয়ায় কিছু সিমপ্যাথি ভোটও তিনি পেয়ে থাকবেন। তা না হলে অতি সম্প্রতি নতুন দল করে নির্বাচনে নেমে এ সাফল্য এলো কি করে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে- ভোটের পরে কী হবে? রাজাপাকসেকে চীনের প্রতি ঝুঁকে পড়া ও দেশের প্রধান জনগোষ্ঠী সিনহালা বা সিংহলিদের সমর্থনপুষ্ট বলে মনে করা হয়। অন্যদিকে তার প্রতিদ্বন্দ্বী সাবেক প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমাসিংহকে ভারতপন্থি এবং তামিল ও মুসলিম সংখ্যালঘুদের প্রতি সহানুভূতিশীল ও তাদের সমর্থনপুষ্ট বলে মনে করা হয়। তবে কূটনৈতিক কায়দায় বা উপরে উপরে উভয় গ্রম্নপই ভারত বা চীন দুটি দেশের সঙ্গেই তাদের সুসম্পর্কের কথা বলে থাকে।

মাহিন্দার নতুন সরকার কোন পথে যাবে? চীনের স্বার্থ আর ভারতের মন রক্ষা করে চলা কঠিন হয়ে পড়তে পারে বলে ভাষ্যকারদের অভিমত। এসব বিষয় স্পষ্ট হবে নতুন মন্ত্রিসভা গঠন ও সরকারের ১০০ দিনের হানিমুন পিরিয়ড শেষ হওয়ার পর। সে পর্যন্ত অপেক্ষা করতেই হবে।

আহমদ মতিউর রহমান : প্রাবন্ধিক, কলাম লেখক
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সকল ফিচার

রঙ বেরঙ
উনিশ বিশ
জেজেডি ফ্রেন্ডস ফোরাম
নন্দিনী
আইন ও বিচার
ক্যাম্পাস
হাট্টি মা টিম টিম
তারার মেলা
সাহিত্য
সুস্বাস্থ্য
কৃষি ও সম্ভাবনা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
close

উপরে